ঢাকা, শনিবার 7 July 2018, ২৩ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটা আন্দোলনরতদের ওপর হামলাকারী পুলিশ ও ছাত্রলীগের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি

কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ, আহতদের সুচিকিৎসা এবং মামলা থেকে নিঃশর্ত মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবক ও উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মুক্তি চেয়েছেন তারা। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশবাহিনী এবং ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছে নাগরিক সমাজ এবং অভিভাবকরা। পাশাপাশি গ্রেফতার হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তি, সরকারি উদ্যোগে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি করেন তারা।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল শুক্রবার বিকেলে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়েছে। এসময় উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন এ্যাভোকেট হাসনাত কাইয়ূম, পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম ইনামুল হক, নির্যাতনের শিকার কোটা বিরোধী আন্দোলনের নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নূরুল হক নূরের বাবা, তেল-গ্যাস বিদ্যুৎ, বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জাকির হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ।
প্রতিবাদ সমাবেশে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম ইনামুল হক বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন ছাত্রসমাজের ন্যায্য আন্দোলন। এই আন্দোলনে কারা হামলা করেছে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারের এত এত গোয়েন্দা সংস্থা, এ ঘটনার ছবি, ভিডিও ফুটেজ আছে। সরকারের উচিত এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী এগুলো চোখে দেখছেন না। তিনি এই আন্দোলনের পেছনে ১২৫ কোটি ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন।’
 ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের পেটোয়া বাহিনী ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। আজ কোদাল দিয়ে কোপানো হচ্ছে, লাঠি দিয়ে মারা হচ্ছে, হাতুড়ি পেটা করা হচ্ছে। যারাই প্রতিবাদ করতে যাচ্ছেন, যুক্তিসঙ্গত আন্দোলন করছেন তারাই পেটোয়া বাহিনীর রোষানলে পড়ছেন। সরকারি বাহিনী ছাত্রলীগ যেভাবে সাধারণ ছাত্রদের পা ভেঙ্গে দিয়েছে তেমনিভাবে আজ রাষ্ট্রেরও পা ভেঙ্গে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী অন্যায়ভাবে হামলা চালানোর মদদ দিতে পারেন না- নূরুল হক নূরের বাবা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের মা, প্রধানমন্ত্রীর উচিত তার ছেলেদের কথা শোনা। তিনি মা হয়ে অন্যায়ভাবে সন্তানদের ওপর হামলা চালানোর মদদ দিতে পারেন না। কোটা আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানাতে এসে এই প্রতিবাদ সভায় নির্যাতনের শিকার কোটা বিরোধী আন্দোলনের নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নূরুল হক নূরের বাবা এসব কথা বলেন। নূরের বাবা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর উচিত তার ছেলেদের কথা শোনা, মায়ের কাছে ছেলেরা দাবি জানিয়েছে। তিনি তা মানবেন কি, মানবেন না এটা তার বিষয়।’ পটুয়াখালী থেকে এসে প্রতিবাদ সমাবশে যোগ দেন এই কৃষক। তিনি বলেন, ‘আমি জায়গা জমি বিক্রি করে ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছি। সে ইংরেজিতে অনার্স করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। আমি মনে করি, আমার ছেলে আমার থেকে বেশি জ্ঞান ধারণ করে। আমার ছেলে বলেছে যে বাবা আমি কোটা আন্দোলন করছি। আমি তাতে সহমত পোষণ করেছি। কেন না আমি তো ছেলের ভবিষ্যতের জন্য জমি বিক্রি করে ঢাকায় পাঠিয়েছি। তো সে যদি একটি ন্যায্য আন্দোলনে যোগ দেয় তবে তো আমার না করার উপায় থাকে না।’
 কোটা আন্দোলন যৌক্তিক উল্লেখ করে নূরের বাবা আরও বলেন, ‘অথচ ডিবি পুলিশ আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গিয়ে যে নির্যাতন করেছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে আমার ছেলের ওপর যেভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে তা যৌক্তিক নয়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ছেলের লেখাপড়া করাচ্ছি জমিজমা বিক্রি করে। হামলায় আমার ছেলে গুরুতর আহত হয়েছে। এখন জমিজমা বিক্রি করে তার চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছি।’
প্রতিবাদ সমাবেশে তেল-গ্যাস বিদ্যুৎ, বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকারের ভাষায় সরকার উন্নয়ন করছে। জনগণের জন্য যদি উন্নয়ন হয় তাহলে সরকারের এত ভয় কেন? কেন তাদের পেটোয়া বাহিনীর দরকার হচ্ছে? কেন আন্দোলনকারীদের ওপর এমন হামলা চালানো হলো?’
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা অবিশ্বাস্য বাজে পরিবেশে বাস করছি। সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং ছাত্রলীগের কর্মীরা একই কায়দায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ মরিয়মকে হুমকি দিয়ছিল যে তার ব্যাগে ইয়াবা ভরে দিয়ে তাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বানাবে। পুলিশ আর ছাত্রলীগ এখন ব্যাপক ক্ষমতাশালী। কিন্তু তাদেরকে এতো ক্ষমতা দিতে হবে কেন। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির অসঙ্গতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা প্রকৃতভাবে সুবিধাবঞ্চিত সেই অসহায় নারী, সুবিধাবঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধারা এর সুফল পায় না। সরকারি আমলা, কর্মকর্তা ও তাদের লোকজন এই কোটার সুযোগ নিচ্ছে। কোটা যত থাকবে, নিয়োগ বাণিজ্যে তত লাভ। এই কারণে তারা এই কোটার সংস্কার চায় না। সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু সেটির বাস্তবায়ন হলো না। এটি সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।  এ কারণে পরবর্তীতে আরও জটিলতা  তৈরি হয়েছে।’
প্রতিবাদ সভায় নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ বলেন, ‘মরিয়ম নামে তেজগাঁও কলেজের এক শিক্ষার্থী এই আন্দোলনে ছাত্রলীগ এবং পুলিশের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মরিয়ম বলেছে যে সে দুইটি জাহান্নাম দেখেছে, একটি সিএনজিতে ছাত্রলীগের যৌন নির্যাতনের জাহান্নাম। অন্যটি থানাতে পুলিশের যৌন হয়রানির ঘটনা। তাই যৌন নির্যাতনের ঘটনাও তদন্ত করে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ ছাত্রীদের ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের পা-ারা ভয় ও ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করছে। ছাত্রলীগ ছাত্রীদের উলঙ্গ করে ছবি প্রকাশের গুমকি দিচ্ছে। এমন ঘটনায় কোথায় আছে বাংলাদেশের অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী, কোথায় স্পিকার শিরিন শারমিনসহ বিভিন্ন উচ্চ পদে আসীন নারী নেতারা।’
অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ আরও বলেন, আমরা চাই, অবিলম্বে আমাদের সন্তান, ছোটা ভাইদের ওপর সরকারের প্রশ্রয়ে যে হামলা ও নির্যাতন হচ্ছে তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হোক। পুলিশ প্রকাশ্যে কোটা আন্দোলনকারী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ করার হুমকি দিচ্ছে। এটা একটি সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অবনতি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া হোক। প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পর প্রায় তিন মাসেও এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় গত শনিবার থেকে ফের আন্দোলনে নামে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, আজকে আমরা কোন পরিস্থিতির কারণে প্রেস ক্লাবের সামনে এই প্রতিবাদ সভায় অংশ নিয়েছি- তা সবাই জানেন। সরকার কোটা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সাধারণ শিক্ষার্থীরা- যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের গ্রেফতার করছে অথচ আক্রমণকারীদের কিছুই বলছে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে গেলেও চিকিৎসা পাচ্ছে না। আক্রান্তকারীদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নুরুকে এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তরিকুলকে বের করে দেওয়া হয়েছে- চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এ কেমন বাংলাদেশ, এ কেমন মানসিকতা।
আমরা উল্টো রাজার দেশে বাস করছি- মন্তব্য করে ফাহমিদুল হক বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রলীগের নামধারীরা শত শত মোটরবাইক নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। এটা কিসের লক্ষণ? এই সমাজ আমরা চাই না।
তিনি আরো বলেন, যে সমাজ নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলার এবং মুক্তভাবে কথা বলার অধিকার দিতে পারে না, এমন সমাজ আমরা চাই না। সরকার যদি স্বাধীন সমাজের পরিস্থিতি গড়তে না পারে তবে চলে যাক। বিক্ষুব্ধ মানুষ ঘুরে দাঁড়ালে কিছুই করার থাকবে না। যারা আক্রমণ করেছে তাদের গ্রেফতার করতে হবে এবং আক্রান্তদের বিরুদ্ধে মামলা বিনা শর্তে তুলে নিতে হবে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মুক্তি দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জাকির হোসেন বলেন, আমিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আমাদের সময়ে জিয়া-এরশাদের বিরুদ্ধে আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি, আন্দোলন করেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ঢাকা বিশ্ববিশ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক আগেই শিখেছে। অথচ আধুনিক সময়ে এসে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা লজ্জার। ন্যায্য আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সরকার যেভাবে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে তা লজ্জাজনক।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রক্টর বলছে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে! তিনি যদি না-ই জানেন, তবে ওই পদে বসে আছেন কেন- প্রক্টর সাহেব ইস্তফা দিয়ে এখনই চলে যান।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ কামাল। তিনি বলেন, ‘এই সরকার রাষ্ট্রবিদ্রোহী সরকার। রাষ্ট্রবিদ্রোহ কেবল নাগরিক করে না, সরকারও করে সেটি আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে।’ দেশের রাজা যদি ঠিকমতো দেশ শাসন না করেন তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত বলে মন্তব্য করেন তিনি। আন্দোলনকারীদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশাসনের মতো অথর্ব ও তেলবাজ প্রশাসন আমি দেখিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তা আর কোনো শিক্ষক দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।’
আহমেদ কামাল আরও বলেন, ’৭৫ এ বাকশাল ঘোষণা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেন বাকশালে যোগ দেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু শিক্ষক বাকশালে যোগ দেননি। আজকেও দেখি কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তরুণ শিক্ষক দাঁড়িয়েছেন। এখনও আলো নিভে যায়নি, একদিন আলো দপ করে ঠিকই জ্বলে উঠবে।’
তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের ফলে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হলো। কিন্তু তারপরও দেখলাম প্রশাসন আন্দোলনকারীদের তথ্য নিয়েছে, নাম-ঠিকানা নিয়েছে তাদের পরিবারকে হয়রানি করেছে। ভয়-ভীতি দেখিয়েছে। অগ্নিকন্যা বললেন এরা সব রাজাকারের বাচ্চা। প্রথম দিকেই এদের রাজাকার, জামায়াত, দেশদ্রোহী বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। এই ছাত্র সমাজ সকলের ইন্টারেস্ট দেখছে। সে কারণে কাজ হয়নি। সকলের জন্য সমান সুযোগ দেওয়া এটা একটি ডেমোক্রেটিক ডিমান্ড।’
ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ছাত্রলীগের চরিত্র বোঝা যাচ্ছে না। কখনো তারা আন্দোলনের পক্ষে, কখনো বিপক্ষে। এখন দেখা যাচ্ছে তারা হাতুড়ি, বাঁশ, রড নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তাদেরকে সাবধান করে দিতে চাই, এভাবে চললে ভবিষ্যতে খারাবি আছে। কেননা এগুলো ফৌজদারি অপরাধ। আর পুলিশও একই অপরাধ করছে। আইনের লোক পোশাক পরে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবেন- এমনটা ভাবার কিছু নেই।
পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ সভায় ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, ‘কোটা আন্দোলনের পক্ষ নিয়ে আমার একজন জুনিয়র নারী আইনজীবী তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল। স্ট্যাটাস দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকাকে তারই ছাত্র ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। একবার ভাবুন তো আমরা কী অসভ্য সমাজে বাস করছি। তিনি আরো বলেন, ‘কিছু বললেই জামাত-বিএনপির সিল জড়িয়ে দেওয়া হয়। আপনারা অন্যায় করবেন, রাস্তায় পেটাবেন, ধর্ষণের হুমকি দেবেন আর আমরা কিছুই বলতে পারবো না।’
তিনি আরো বলেন, কিছু বললেই জামায়াত-বিএনপির ট্যাগ জুড়ে দেওয়া হয়। আপনারা অন্যায় করবেন, রাস্তায় পেটাবেন, ধর্ষণের হুমকি দেবেন- তা তো হতে পারে না। “১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উল্লেখ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি বজায় রাখা প্রক্টরের দায়িত্ব। অথচ তিনি এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না। দায়িত্ব নিতে না পারলে প্রক্টরের পদত্যাগ করা উচিত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোটা আন্দোলন নিয়ে ৫টি মামলা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর থেকে কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। রাশেদকে গ্রেফতার করে কোথায় রাখা হয়েছে জানা যায়নি। রাশেদের বাবা একজন রাজমিস্ত্রী, জামায়াতের তকমা দিয়ে তাকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। পুলিশ আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল আমার উদ্দেশ্য কী, আমি কেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করব। আমি পাল্টা জানতে চাইলাম- আপনার উদ্দেশ্য কী, আমাকে কেন এগুলো প্রশ্ন করছেন।”
গত মঙ্গলবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছিল উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিক সমাজ। এ সময় ছাত্র-শিক্ষক, অবিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের মানববন্ধনে দাঁড়াতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশি বাধায় ওইদিনের কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পর প্রায় তিন মাসেও এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় গত শনিবার থেকে ফের আন্দোলনে নামে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছেন।
এরপর রোববার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সোমবারও আন্দোলনকারীদের ওপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হামলা চালানো হয়। সেখান থেকে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেনকে আটক করা হয়। মঙ্গলবার ফারুক হোসেনসহ তিনজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর দুই মামলায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। গত শনিবার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হন। এরপর রোববার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গত সোমবারও তাদের ওপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হামলা চালানো হয়। সেখান থেকে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেনকে আটক করা হয়। আর আজ মঙ্গলবার ফারুক হোসেনসহ তিনজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর দুই মামলায় তাদের কারাগারে পাঠানো হলো। আজ ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে তাদের তিনজনকে হাজির করে পুলিশ। এ সময় মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশর পরিদর্শক বাহাউদ্দীন ফারুকি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম সুব্রত ঘোষ শুভ তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অপর দুইজন হলেন-তরিকুল ইসলাম (২২) জসিম উদ্দিন (২১)।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত কোটা ৫৬ শতাংশ। বাকি ৪৪ শতাংশ নেয়া হয় মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে। বিসিএসে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০, জেলা কোটায় ১০, নারী কোটায় ১০ ও উপজাতি কোটায় পাঁচ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণ করা আছে। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে এক শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের বিধান রয়েছে। এই কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধও করছিলেন তারা।
 কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কোটাব্যবস্থা বাতিলের কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দেব।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি কোটা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ গত ২৭ জুন জাতীয় সংসদে ‘সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকতে হবে, কমানো যাবে না’- বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবশ্যই, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই তো আজ আমরা স্বাধীন। তাদের অবদানেই তো আমরা দেশ পেয়েছি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ