ঢাকা, শনিবার 7 July 2018, ২৩ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গাজীপুর সিটি নির্বাচন : গণতন্ত্রকে দাফনের চূড়ান্ত আয়োজন

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জনগণ আজব এক নির্বাচনী সিস্টেমের সাথে পরিচিতি লাভ করছে। বাইরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট মার্কা নির্বাচনে সরকারি দল যে চমৎকার দক্ষতা এবং কূটচালের অবতারণা করতে পেরেছে তা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সত্যিই বিরল। একটি অতি পরিচিত শ্লোগান হচ্ছে ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেবো। এরই বর্তমান আওয়ামী ভার্সন হচ্ছে ‘আমার ভোট আমি দেব- তোমার ভোটও  আমি দেবো। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলা হচ্ছে আপনাদের কষ্ট করে ভোট দিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই- আমরাই আপনাদের ভোট দেবার ব্যবস্থা করবো।’ ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখে তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে ফেলেছে। সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার জন্য সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিনাদ্বিধায়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এ বাহিনী সরকারের বাহিনী হিসেবে পেশাদারিত্বের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীর মত আচরণ করতে বেশি পারঙ্গমতা দেখাচ্ছে। ২০০৮ সালে মঈন-ফখরের বিশেষ কারসাজির নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে কোনো নির্বাচনই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। অতি সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক ধর-পাকড় অভিযানের মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতাকর্মী এবং ভোটারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক এবং ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে। তালিকা সংগ্রহ করে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের গ্রেফতার করে। এরপরও সাহস করে যে সকল এজেন্ট ভোট কেন্দ্রে গিয়েছে তাদের ভয় দেখিয়ে, কাউকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে ভোট কেন্দ্র হতে বের করে দেয়া হয়। খুলনার এ নির্বাচনকে নির্বাচন না বলে জবর দখল এবং ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছার প্রতিফলনই বলা যায়। ক্ষমতাসীন দল যাকে চেয়েছে সেই বিজয়ী হয়েছে। খুলনার এ বিতর্কিত নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হলো গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। জনগণ ভেবেছিল খুলনার নির্বাচনে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর চক্ষু লজ্জার ভয়ে অথবা অন্তত ন্যূনতম সম্ভ্রম রক্ষার জন্য হলেও আওয়ামী লীগ এ লজ্জাজনক কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না। কিন্তু গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে গণতন্ত্রের কবর রচনার কাজকে নিশ্চিত করেছে। এ কাজে তারা কারো সমালোচনা, বাদ প্রতিবাদকে সামান্যতম কেয়ার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। আওয়ামী লীগ অতীতে বার বারই গণতন্ত্র এবং ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বেশি উচ্চারণ করেছে। এ মেয়াদে তারা ক্ষমতায় আসার পর তাদের দ্বারাই জনগণের ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার, নাগরিক অধিকার, মৌলিক মানবিক অধিকার সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভোট ছাড়াই সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার রেকর্ড আওয়ামী লীগের একটি অন্যতম অর্জন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি কলঙ্ক তিলক।
বর্তমান গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় জনগণের অধিকার ও ক্ষমতা প্রয়োগের স্বীকৃতি মাধ্যম হচ্ছে ভোটাধিকার। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ সময়ব্যাপী ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং আন্দোলন করে, কিন্তু আজও পর্যন্ত সে অধিকার তো নিশ্চিত করা যায়ই-নি, বরং আওয়ামী লীগ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা এবং স্বাতন্ত্রকে চরমভাবে বিপন্ন করেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণের ভোটাধিকার আদায় এবং নির্বাচনের ফলাফল ভোগ করার দাবিটি ছিল সর্বাগ্রে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেয়ার প্রেক্ষাপটেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত। বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের দাবিটি সবচেয়ে বেশি উচ্চকিত হয়েছে। কিন্তু জনগণের এ অধিকার হরণে আওয়ামী লীগ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের জায়গাটি অনায়াসে দখল করেছে।
বহু কাক্সিক্ষত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন, চরম দলীয় আনুগত্যশীল প্রশাসন এবং আওয়ামী লাঠিয়াল ও কর্মী বাহিনী যে নজির স্থাপন করেছে তা জনগণ যেমন অনেক দিন মনে রাখবে একইভাবে বর্তমান সরকারের গণতন্ত্র বিরোধী কর্মকা-র যে ধারাবাহিক অর্জন তা আওয়ামী লীগের জন্য আরো একটি কালো সনদ হয়ে থাকবে।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পূর্বে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এক সাংবাদিক সম্মেলনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যে গাজীপুরে যেন খুলনার পুনরাবৃত্তি না হয়। সরকার এ দাবি এবং আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং ৯০ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে তার বিপরীত কাজটি করেছে। তার মানে খুলনায় অন্যায়-অপরাধ এবং ভোট ডাকাতির যে সকল ফেরেববাজী বাকী ছিল তা ষোলকলায় পূর্ণ করা হয়েছে গাজীপুরে। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার হারুনকে প্রত্যাহার করা। কিন্তু সরকার অথবা নির্বাচন কমিশন কেউই এ দাবি বাস্তবায়নকে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করেনি। অথচ এ হারুন সেই ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্য রাজপথে জাতীয় সংসদের সামনে বিরোধী দলের চিপ হুইপকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে তাকে চরম নির্যাতন এবং অপমান করেছিল। সেই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা না করে তাকে প্রমোশন দিয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ দিয়েছে। যিনি প্রকাশ্য রাজপথে বিরোধী দলের চিপ হুইপকে চরম লাঞ্ছনা এবং নির্যাতন করে পদোন্নতি পেতে পারে তার কাছে কতটুকু পেশাদারিত্ব অথবা নিরপেক্ষ আচরণ আশা করা যেতে পারে? বিপরীত পক্ষে আমরা যদি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাবি অথবা তাদের আচরণের কথা চিন্তা করি তবে কি দেখতে পাই, তারা কোনো কারণ ছাড়াই তিলকে তাল বানিয়ে সারা দেশ অচল করে দেয়ার মত তুলকালাম কা- অতীতে বহুবার ঘটিয়েছে। ১৯৯৪ সালে দিনাজপুরে এক দুষ্টু পুলিশ অফিসার কর্তৃক ইয়াসমিন নামক এক নারীকে নির্যাতনের ঘটনায় আওয়ামী লীগ দিনের পর দিন আন্দোলনের নামে সারা দেশ অচল করে রেখেছিল। তারা তখন হরতাল অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছিল। এ সময় তাদের আন্দোলন যতটুকু না ছিল মানবিক তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্য।
২০০৬ সালে যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার কথা ছিল বিচারপতি কে এম হাসানের, তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের মামলা চলাকালে তিনি সে মামলার শুনানি গ্রহণ করতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন। জনগণের যেমন বিচার পাবার আইনগত মৌলিক অধিকার আছে, একইভাবে যে কোনো বিচারকেরই যে কোনো মামলা শোনা অথবা সে মামলার বিচারে নিজেকে সম্পৃক্ত না করার বিষয়টিও একটি আইন স্বীকৃত। তাকে যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না করা হয় সে জন্য আওয়ামী লীগ লগি বৈঠার যে তা-ব ঘটিয়েছিল, পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন এ নারকীয় পৈশাচিকতা জনগণ স্মরণে রাখবে। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে না পারে এ জন্য তারা একই দিনে প্রকাশ্য রাজপথে লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে অর্ধ শতাধিক মানুষকে হত্যাসহ হাজার হাজার মানুষকে আহত করে। তারা তখন রাষ্ট্র এবং জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট করে। তখন সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিটি যত জোরালো ছিল তার আড়ালে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টিকে আওয়ামী লীগ প্রাধান্য দিয়েছিল, তা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়। তাই আন্দোলনের নামে খুন, জখম, জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদি করে ক্ষমতার সিঁড়িতে আরোহণ করা। আওয়ামী লীগ সে কাজটিকে নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে এ বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার পর তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সুষ্ঠু নির্বাচনকে। তারা যেহেতু ষড়যন্ত্র, জ্বালা-পোড়াও, মানুষ হত্যার মত ন্যাক্কারজনক  কাজে সবচেয়ে বেশি পারঙ্গম। তাই বিরোধী দল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যখনই সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে তখনই তারা তাকে ষড়যন্ত্র এবং নাশকতা বলে চালিয়ে দিতে চায়। ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মনসুর, জাফরুল্লাহ চৌধুরীরা যখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ঐক্যের কথা বলে তখন সরকারি দলের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে’ সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র এবং নাশকতার গন্ধ কেন আবিষ্কার করা হয়, তা প্রতিটি মানুষই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছে।
শুরু করেছিলাম গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে, কিন্তু সারা অঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেবো কোথা? ১৯৯৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দিনের পর দিন আন্দোলনের নামে যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল এখন স্বাভাবিকভাবেই মোটা দাগের সাদাদিধে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, মাগুরা উপনির্বাচনে কি হয়েছিল? ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন, খুলনা সিটির নির্বাচন এবং সদ্য সমাপ্ত গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ফ্যাসিজম কায়েম করেছে তার হাজার ভাগের এক ভাগ অন্যায়ও কি তখন হয়েছিল? ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেত্রীকে প্রকাশ্য রাজপথে দলীয় ক্যাডার দ্বারা আক্রমণ করানোসহ এমন কোনো অন্যায় কর্ম নেই যা আওয়ামী লীগ করেনি। খুলনা সিটি নির্বাচনের আগে প্রতিদিন ভোটার এবং বিরোধী জোটের প্রার্থীর এজেন্টদের গ্রেফতার করে বিভীষিকাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। গাজীপুরে সংঘটিত অন্যায়-অপকর্মের মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনার কাজটি সুচারুরূপে করতে সরকার সক্ষম হয়েছে। এ সকল অন্যায় এবং জুলুমের সিংহভাগই আওয়ামী লীগ হজম করার মতো পারঙ্গমতা দেখিয়েছে। কারণ আইন, বিচার, সংসদ, প্রশাসন সবই এখন তাদের হাতের মুঠোয়।
গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় সংবাদপত্রকে বলা হয় ফোর্থ পার্লামেন্ট। এ ফোর্থ পার্লামেন্টের যারা মেম্বার তারা সবাই প্রায় আওয়ামী লীগের প্রচার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ফোর্থ পার্লামেন্টেও বর্তমান জাতীয় সংসদের মতো অবস্থা। সরকারের সমালোচনা করার মতো পত্রিকার সংখ্যা নেই বললেই চলে, যারাও দু’একজন আছে তারা সব সময় ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করে। কারণ সবাই জানে, আমার দেশ, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভির কি অবস্থা হয়েছে? এতো কিছুর পরও যা দু’চারটি ছিটেফোঁটা ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে এসেছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু চিত্র প্রকাশিত হয়েছে তার কিয়দংশ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি-
বিবিসির সংবাদদাতা কাদির কল্লোল বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্র ঘুরে যে একটি সচিত্র অবস্থা বর্ণনা করেছেন : ‘অনেক কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্ট নেই। কোন কেন্দ্রে বলা হচ্ছে এজেন্টরা সকালে এসেছিল এবং পরে চলে গেছে। আবার কোন কোন কেন্দ্রে ধানের শীষের কোন এজেন্ট আসেনি বলে জানিয়েছে’। কেন ধানের শীষের এজেন্ট নেই এ বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট করে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলেছে, তাঁদের এজেন্টদের হুমকি ধমকি দেয়া হচ্ছে, যাদের নির্বাচনের আগের রাতে বাড়িতে পাওয়া গেছে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে অথবা শাসিয়ে আসা হয়েছে তারা যেন ভোট কেন্দ্রে না যায়। ভোট কেন্দ্রের ভিতরে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে; যার কারণে অনেক এজেন্ট ভয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কাউকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়েছে, বের হয়ে না গেলে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হয়েছে। যা বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায় ছিল না।
কাদির কল্লোল উল্লেখ করেন, ‘কোন কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে এজেন্ট দেখা গেলেও কেউ ব্যাজ পরিহিত অবস্থায় ছিল না। তারা ভয়ে ব্যাজ পড়েনি বলে জানিয়েছে। গাজীপুর কোনাবাড়িতে এম এইচ আরিফ কলেজ কেন্দ্রে নৌকা মার্কার ব্যাজ পরিহিত লোকজন এসে একটি বুথ থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে অন্য একটি কক্ষে গিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ করা হয়েছে’। ভোট দিতে না পারা লোকজন তার কাছে একই অভিযোগ করেছেন আরো বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে। এর মধ্যে মদিনাতুল উলুম মাদরাসা কেন্দ্রে প্রায় সব ক’টি বুথে ২০/২২ জন লোক প্রবেশ করে জোরপূর্বক নৌকা মার্কায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করেছে।
দৈনিক নয়াদিগন্তের সংবাদ ছিলÑ বাইরে কঠোর নিরাপত্তা, ভিতরে কেন্দ্র দখল। নয়াদিগন্ত গাজীপুর সিটি নির্বাচনের যে সংবাদ ছেপেছে তার অতি কিঞ্চিৎ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি : ‘সকাল বেলা বিভিন্ন মার্কায় ভোট দিতে পারলেও দুপুর হতেই নৌকা মার্কা ব্যতীত অন্যদের ভোট কেন্দ্রে অবস্থান অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল পড়লেও দেখার কেউ ছিল না।... বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও ভিতরে একতরফাভাবে শুধুমাত্র নৌকায় সিল মারা হয়েছে।’ নয়া দিগন্তে অনিয়ম হওয়া কয়েকটি কেন্দ্রের নাম উল্লেখ করে বলা হয় : ‘এ সকল কেন্দ্রে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়ার পর একতরফাভাবে নৌকা মার্কায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে জাগরণী কেন্দ্র, টঙ্গী ইসলামিয়া মাদরাসা কেন্দ্র, আউচপাড়া কেন্দ্র, সাতাইশ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র, গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র উল্লেখযোগ্য। জাগরণী কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ৪৯নং ওয়ার্ড সভাপতির নেতৃত্বে ত্রাস সৃষ্টির পর ধানের শীষের এজেন্টরা ভয়ে কেন্দ্র হতে চলে যায়, এরপর নৌকা মার্কায় একচেটিয়া সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য কয়েকজন যুবক উদ্বুদ্ধ করে। এর বাইরে অন্য কোন মার্কায় কেউ ভোট চাইলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়’।
দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় : ‘কেন্দ্রের ভিতরে ধানের শীষের কোন এজেন্ট নেই। এমনকি প্রকাশ্যে কাউকে ধানের শীষের ব্যাজ পড়ে ঘুরতেও দেখা যায়নি। কোন কেন্দ্রে মারামারি বা হাতাহাতিও হয়নি। দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে গাসিক নির্বাচনে বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। বাইরে ভোটের দীর্ঘ লাইন; নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোটের জন্য অপেক্ষামান লাইন শেষ হচ্ছে না। এমন নীরবতায় কেন্দ্রের ভিতরে চলছে নৌকায় সিল মারার মহোৎসব। প্রতিবাদ করার কেউ নেই। এ যেন নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’। উক্ত সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘গাছা উচ্চ বিদ্যালয়, কাউনিয়া, এরশাদনগর, কাসিমপুর হাক্কানিয়া ছালেহিয়া আলিম মাদরাসাসহ ১৫টি কেন্দ্রে ঘুরে ধানের শীষের কোন এজেন্ট পাওয়া যায়নি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে এ সংখ্যা বাড়তে থাকে।’
বেলা ১১টায় অনলাইন নিউজ পোর্টাল শীর্ষ নিউজের সংবাদ ছিল : ‘বেলা ১১টার মধ্যে সব ভোট দেয়া শেষ। টঙ্গীর আউচপাড়া কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে বলে উক্ত সংবাদে উল্লেখ করা হয়’।
বেলা ১২টায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন থেকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় ১০০টি কেন্দ্রে তাঁদের এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়েছে। দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে দলটির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, অন্তত দু’শত ভোট কেন্দ্রে অনিয়ম, জালভোট, জোরপূর্বক ব্যালট পেপার কেড়ে নেয়া, নৌকা প্রতীকে পাইকারী সিল মারার ঘটনা ঘটেছে। এ সকল অভিযোগ নিয়ে বিএনপির প্রতিনিধি দল অন্তত তিনবার নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে গিয়েছে কিন্তু তার কোন প্রতিকার পাননি। দিনের শেষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচন কমিশন অফিসে গিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের এই বলে ধন্যবাদ দিয়ে আসেন যে ‘গণতন্ত্রের কবর রচনার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ’। নির্বাচন কমিশন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় বিএনপি নেতা বরকত উল্লাহ বুলু এ কথা উল্লেখ করেন।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এ সকল সংবাদ এবং বিএনপি নেতাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের নাটকীয় নির্বাচনে বিজয়ী বর্তমান গাসিক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিএনপি বললে তাদের কিছু এজেন্ট দিয়ে সহযোগিতা করতাম’। চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এ বক্তব্য যে কত বড়ো প্রহসন তা যে কোন ব্যক্তিই বুঝতে পারে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি তাদের দলীয় কোন্দলের কারণে এজেন্ট দিতে পারেনি’। গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মার্সা বার্নিকাট অনিয়ম ও ব্যাপক জালভোটের ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে ওবায়দুল কাদের সাহেব আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে তাকে রীতিমতো ধমক দিয়েছেন এবং সাবধান ও সতর্কতার সাথে কথা বলার জন্য নসিহত করেছেন।
আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করছে। সব জায়গায় শুধু আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। তারা কোথাও এর ব্যতিক্রম দেখতে চায় না। আজীবন ক্ষমতায় থাকার নেশা আওয়ামী লীগকে অন্ধ ও বধির করে দিয়েছে। জনগণের না বলা কথাগুলো বোঝার জন্য হৃদয়ের যে উদারতা দরকার তার কপাট তারা বন্ধ করে রেখেছে। জনগণকে বাদ দিয়ে জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার রশিকে খুব বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। স্বাভাবিক পরিবর্তনের চেয়ে অস্বাভাবিক পরিবর্তনে যা ঘটে তা কল্পনা করেও শেষ করা যায় না। অস্বাভাবিক পরিবর্তন নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা চায়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আওয়ামী লীগ কতটুকু এগিয়ে সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করুক এ প্রত্যাশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ