ঢাকা, শনিবার 7 July 2018, ২৩ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আল্লামা ইকবাল প্রেরণার কবি

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : মৃত্যুকে রুখার সাধ্য  জগৎ সংসারে কারও নেই। জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ জন্ম ও মৃত্যুর ফ্রেমে বন্দী। হাজার বছর ধরে এভাবে চলছে মৃত্যুর মিছিলের পদযাত্র। মানুষের জন্ম-মৃত্যু মহান আল্লাহ তায়ালার ফায়সালা মোতাবেক হয়ে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- “তিনিই সেই সত্তা যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন এজন্য যে তিনি পরীক্ষা করে নিতে চান তোমাদের মধ্যে কে উত্তম আমল করে।” (আল কুরআনঃ সূরা মূলক)। প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বাবা-মাকে হারিয়ে চলেছি। তবু আমরা সষ্ট্রাকে ভুলে যায়। আর যারা সষ্ট্রাকে ভুলে যায় তাদের দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ অর্জিত হয় না এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে যারাই ক্ষমতার দাম্ভিকতায় ফেরাউনের ভূমিকা পালন করছে তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে সময়ের ব্যবধানে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। মানুষ দুনিয়ার মোহে অন্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক! কিন্তু সষ্ট্রাকে ভুলে গিয়ে নয়। পৃথিবীর সব মানুষকে সবাই মনে রাখে না। তবে দুই শ্রেণীর মানুষকে স্মরণ করে। এক শ্রেণীর মানুষকে ঘৃণার মাধ্যমে আরেক শ্রেণীর মানুষকে শ্রদ্ধার সঙ্গে। ইসলামের কান্ডারী হিসেবে যারা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের সাথে রক্তের সর্ম্পক না থাকলেও মন থেকে তাদেরকে ভুলা যায় না। তাদেরই একজন কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস জাতিয়তাবাদের কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল। তাঁর সর্ম্পকে কিছু কথা লিখা সত্যিই কঠিন। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও একজন মহৎ মানবতাবাদী কবি হিসেবে তাঁর সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে আছে। অধ্যাপক উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ তার মডার্ন ইসলাম ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থে ইকবালকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি ও চিন্তাবিদ হিসেবে সম্মানিত করে বলেছেন বিশ্বব্যাপী তিনি যে মর্যাদা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন তা থেকেই উপলব্ধি হবে তার মহত্ত্বের বিশালতা। আজকের তরুণেরা রবীন্দ্রনাথ কিংবা হুমায়ুন আহাম্মেদকে যতটা চিনেন তার তুলনায় চেতনার কবি আল্লামা ইকবালকে একটু কমই চিনেন। কেউ হয়তো তাঁর নামটা শুনেছে মাত্র। যারা বয়সে প্রবীণ এবং ইসলামী ভাবধারার মানুষ তারা হয়তো আল্লামা ইকবাল সর্ম্পকে কিছুটা জানেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে ইকবালের পরিচয় তুলে ধরায় এই নিবন্ধনের মূল উদ্দেশ্য।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন : আল্লামা ইকবাল একটি নাম একটি জীবন্ত ইতিহাস। যার রচনার মধ্যে কবিত্ব ও জীবনদর্শন ও প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আল্লামা ইকবাল নামেই পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, ইরান ও আফগানিস্তান জুড়ে সর্বাধিক পরিচিত।  তাঁর কবিতা, দর্শন, চিন্তা, বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ, সংষ্কৃতি ও রাজনীতির বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ইকবাল শুধু  কবি কিংবা দার্শনিক ছিলেন তা কিন্তু নয়! তিনি একজন জ্ঞানতাপস রাজনীতিবিদ ছিলেন। প্রখ্যাত এই মুসলিম মনীষী যে সময়টাতে জন্মগ্রহণ করেছিল সে সময়টা ছিল মুসলিম মিল্লাতের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। পাক ভারত উপমহাদেশের রাজত্ব মুসলমানদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়ার পর মুসলিম সমাজ যখন অধঃপতনের শিকার হচ্ছিল ঠিক সেসময় আল্লামা ইকবাল অধঃপতিত এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোর দিশা দেখাতে কলম ধরেন। ইকবাল শুধু মুসলমানের কবি নন, তিনি মানবতার কবি তথা বিশ্বমানবের কবি ছিলেন। একজন মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। আল্লামা ইকবাল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রায় ৩৬ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে জহুরুল হক নামকরণ করা হয়। এমনকি পাঠ্যতালিকা হতে তাঁর রচনা ও জীবনীকে ডিলিট করে দেওয়া হয়। আল্লামা ইকবাল কোন দল বা গোষ্ঠীর কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী মানবতার কবি। তিনি ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ নূর মুহাম্মদ পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। মাতা ইমাম বিবি ছিলেন একজন ধর্মানুরাগী পরহেযগার মহিলা। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৮৯৩ সালে স্কচ মিশন হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে উর্ত্তীণ হন এবং মেডেল বৃত্তি লাভ করেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮৯৫ সালে ইন্টারমেডিয়েট পাস করে লাহোর সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯৭ সালে  বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আরবিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে তিনি দর্শনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০৫ সালে বৃত্তি লাভের পর লন্ডনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯০৭ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০৮ সালে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছরে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারী এবং আরবিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০৮ সালের জুলাই মাসে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করার জন্যে শিয়ালকোটের নাগরিক সমাজ তাঁকে বিশাল সংবর্ধনা দেন। পাঞ্জাব কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ১৯০৯ সালের মে মাসে তিনি লাহোর সরকারি কলেজে দর্শনের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৩৩ সালের ৪ ডিসেম্বর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। তিনিই একমাত্র প্রথম ভারতীয় ব্যক্তি যাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। শিক্ষকতা ও আইন ব্যবসা ছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। সর্বোপরি তিনি একজন বিখ্যাত মানবতার কবি ছিলেন।
উপমহাদেশের রাজনীতে ইকবালের ভূমিকা : আল্লামা ইকবাল রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পুরোপুরি পক্ষপাতী ছিলেন না, কিন্তু ১৯২৬ এর পরবর্তী সময়ে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত তাঁকে রাজনীতিতে টেনে আনে এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। ইকবালের কোন পরিচয়টি সবচেয়ে বেশি বড় তা আমি জানি না। তবে এইটুকু জানি যে তিনি মুসলিম মিল্লাতের প্রেরণার কবি ছিলেন। ইসলামের একজন দায়ী হিসেবে লিখনীর মাধ্যমে সংগ্রাম করেছেন। মুসলিম উম্মাকে উজ্জীবিত করার জন্য আসরারে খুদি বা খুদির দর্শন জাতিকে উপহার দিয়েছেন। ইকবালের রাজনৈতিক দর্শন মানুষ খেয়াল না করলেও  উপমহাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে তাঁর অবদান অস্বীকার করা যাবে না। রাজনীতির ক্ষেত্রে ইকবালের অবদান খুবই প্রণিধানযোগ্য। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মূল প্রতিষ্ঠান ছিল। ইকবাল তদানীন্তন মুসলিম লীগে সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম লীগকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সাধ্যমতো কাজ করেছেন। যার ফলশ্রুতিতে মুসলিম লীগ ভারতীয় রাজনীতিতে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ভারতের রাজনৈতিক বিবর্তনে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। তিনি ইসলামের ভাবধারা ও চেতনার সাথে আধুনিক জাতীয়তার সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তাঁর  অপরিসীম ত্যাগ ও কোরবানীর স্বীকৃতি দিতে গিয়ে মরহুম কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ইসলামের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি সেই বিরল মনীষার অন্তর্গত যার মনন ও বুদ্ধিবৃত্তি উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ইসলামী আবাসভূমির রূপরেখা বিনির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী  গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু সেকুলার গণতন্ত্রকে পছন্দ করতে না। ইসলামভিত্তিক গণতন্ত্রকে  প্রকৃত গণতন্ত্র বলে মনে করতেন; যেখানে আইন হবে মহান আরশের মালিকের আর শাসন হবে মানুষের। ১৯০৮ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। পাঞ্জাব আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে ইকবালের ভূমিকা স্বল্পকালীন হলেও বিভিন্ন দিক দিয়ে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য ভক্ত ও অনুরাগীরা পীড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু তাঁর পুরনো বন্ধু মিয়া আব্দুল আজিজের সাথে নির্বাচনী যুদ্ধে অংশগ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন এবং লাহোরের জনগণের সমর্থন ও ঐকান্তিক সহযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বী খান বাহাদুর মালিক মোহাম্মদ দীনকে তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ভূমি রাজস্বের উপর আয়কর উসুল করার প্রস্তাবের উপর পাঞ্জাব আইন সভায় ভাষণ দেন। ১৯২৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত All Party Muslim Confeence-এ ভাষণে মুসলমানদের স্বতন্ত্র কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। পাঞ্জাবের গভর্নর স্যার ম্যালকম হেইলি স্যার ফজলে হোসেনের মাধ্যমে ইকবালকে হাইকোর্টের বিচারপতি বানানোর প্রস্তাব পাঠানো হলে ইকবাল তা প্রত্যাখ্যান করেন। ২৫ জুলাই ১৯২৭ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব অ্যাসেম্বলিতে তিনটি প্রস্তাব পেশ করেন। এক. নবী করিম (সাঃ) কে অবমাননার পথ রুদ্ধ করার জন্য আইন জারি করার দাবি উত্থাপন করেন। দুই. পাঞ্জাবে মদ পান বন্ধের জন্য আইন প্রণয়নের দাবি করেন। তিন. একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে বলেন, আমি ভারত ও ইসলাম দুয়েরই বৃহত্তর স্বার্থে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করেন।
ইসলামের দায়ীর ভূমিকায় ইকবাল : ইকবাল তাঁর সুবিখ্যাত শিকওয়া কাব্যগ্রন্থে মুসলমানদের গৌরবময় যুগের কথা উল্লেখ করে বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে,এমন একটা সময় তো ছিল যখন মুসলমানেরা সংখ্যায় নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালার বাণীকে বহন করিবার জন্য তারা যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করিতে প্রস্তুত ছিল। হককে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে তারা জীবনের রক্তটুকু বিলিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। ইকবাল আফসোস করে বলেছিলেন,আধুনিক কালে মুসলমানেরা এই মিল্লাতের ঐক্যকে নিঃশেষ করেছে এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা ও আকাংখাকে হারিয়ে ফেলেছে।  যে কারণে মুসলমানদের উপর বাতিল পন্থীদের জুলুমের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তিনি মুসলিম বিশ্বকে একই সুতায় গাঁথার জন্য আমৃত্যু একজন কলম যোদ্ধা হিসেবে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। ইকবালের প্রত্যাশা ছিল ইসলাম একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই। মহান আরশের মালিক যেন কালেমার পতাকে বিশ্বব্যাপী উড্ডীন করেন।
ইকবালের রচনাবলী : ওঠো দুনিয়ার গরীব ভুখারে জাগিয়ে দাও। ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও। কিষাণ-মজুর পায়না যে মাঠে শ্রমের ফল। সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও। কবির কবিতার এই লাইনগুলোই প্রমাণ করে তিনি মানবতা ও নিপীড়িত মানুষের কবি ছিলেন। ইকবালের সাথে বাঙ্গালী মুসলমানের পরিচয় হয়েছিল মুলত ইতিহাসের একটি বিশেষ সময় ও কালের প্রেক্ষাপটে। আল্লামা ইকবাল শৈশবকালেই ক্যাবচর্চা শুরু করেন। স্কচ মিশন হাইস্কুলের ছাত্র অবস্থায় তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত ১৮৯১ সালে জবান পত্রিকায় হয়। ইকবালকে উর্দু ভাষার কবি বলা হলেও তিনি উর্দু ও ফার্সি ভাষার কবি ছিলেন। তার বারো হাজার কবিতার মধ্যে সাত হাজার কবিতাই ফারসি ভাষায় লেখা। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ আসরার-ই-খুদি। তিনি এটি ফারসি ভাষায় লিখেছিলেন। এই গ্রন্থে তিনি খুদির দার্শনিক ব্যাখা দিয়েছেন। খুদি বলতে কুরআনে বর্ণিত রুহুকে বুঝিয়েছেন। যাকে আমরা সাধারণত আত্মা বলি। আর দ্বিতীয় কাব্য রুমুজ-ই-বেখুদি প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে। এই গ্রন্থের কবিতার মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, ইসলামী জীবনব্যবস্থাই হচ্ছে একটি জাতির উত্তম মাধ্যম। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে রচিত কবিতাগুলো মূলত মুসলমানদের অতীত গৌরব, বিশ্বজনীন ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং জাগরণের কথা তুলে ধরেছেন। ইকবালের কাজ ও রচনাবলি দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিল তৎকালীন মুসলিম বিশ্ব। তার দার্শনিক চিন্তা ও সমকালীন মুসলিম বিশ্বে ঝড় তুলেছিল। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ, ভোগবাদ ও উগ্রবস্তুবাদ মানুষকে শান্তি দিতে পারে না এটা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই একজন কলম যোদ্ধা হিসেবে অসংখ্য বই রচনা করেছেন। গদ্য ও পদ্য উভয় রচনায়ই পারদর্শী ছিলেন। নানান বিষয়ের উপর তিনি কলম ধরছেন। কবি হয়েও তিনি অর্থনীতির মতো জটিল বিষয়ে একটি গ্রন্থ লিখেছেন। অর্থনীতির উপর লেখা ইলমুল ইকতিসাদ। ১৯০৩ সালে লাহোর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক থাকাকালীন সময়ে তিনি এটি লিখেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ শিকওয়া এবং জবাব-ই-শিকওয়া। ১৯১৫ সালে আসরারে-ই-খুদী প্রকাশিত হওয়ার পর সর্বত্র সাড়া পড়ে যায়। কিন্তু সূফী তরীকার অনুসারীরা বিরোধীতা করেন। এমনকি আল্লামা ইকবালকে কাফের হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা ইকবালের কবিতার মমার্থ না বুঝে কাফের বলেছিল তারাই আবার জওয়াব-ই-শিকওয়া কবিতাটি লিখার পর ইকবালকে আল্লামা উপাধীতে ভূষিত করেন। আল্লামা ইকবালের চিন্তার গভীরতার জন্যই ইকবালের কবিতা শুধু মুসলমানের জন্য নয়, গোটা বিশ্বমানব সমাজের জন্য হয়ে ওঠে নতুন চিন্তার দিকর্দশন। কেননা তিনি যে সংকট ও সমস্যার কথা চিন্তা করেছিলেন তা শুধু মুসলিম সমাজের নয়, বিশ্বসমাজ ব্যবস্থার সমস্যার কথা লিখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ইকবালের উল্লেখযোগ্য রচনাবলীগুলো হচ্ছে-ইলমুল ইকতিসাদ, তারিখ-ই-হিন্দ হিন্দুস্তানের ইতিহাস, আসারার-ই-খুদী, পায়াম-ই-মাশরিক, বাঙ্গ-ই-দারা কারাভানের ডাক, যবূর-আযম, ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন, জাবিদনামা-শাশ্বত গাথা, বাল-ই-জিব্রীল-জিব্রাইলের ডানা ইত্যাদি।
দুশমনদের দৃষ্টিতে ইকবাল : কোনো মানুষের ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে তার দুশমনদের ওপর দৃষ্টিপাত করা উচিত। ইতিহাস সাক্ষী বড় মানুষদের সারা জীবন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মুখোমুখী হতে হয়েছে। এ ধারা তাদের মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে। আল্লামা ইকবাল একজন মানুষ । সঙ্গত কারণে তার মধ্যে বেশ কিছু মানবিক দুর্বলতা ছিল। সর্বদা নিজেকে গুনাহগার মানুষ মনে করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও কাব্যচর্চার মধ্যে ভুলক্রুটি চিহ্নিতকারীকে সমীহ করতেন। তবে ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপকারীকে উপেক্ষা করে চলতেন। ইকবালের ওপর ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপকারীদের মধ্যে আহমদিয়া জামায়াত ও কংগ্রেসি আলেমদের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পৃক্ত ছিল। লাহোরের উজিরখান মসজিদের মৌলভি দিদার আলী তার বিরুদ্ধে কুফরের ফতোয়া জারি করেছিলেন। অন্য দিকে কিছু আলেম স্যার খেতাব গ্রহণ করায় ইকবালকে ইংরেজদের এজেন্ট বলে আখ্যায়িত করেছিল। অথচ মাওলানা সাইয়্যেদ সুলায়মান নদভি ও মাওলানা শিবলী নুমানীর মতো বড় আলেমরা ইকবালের চিন্তা ও দর্শনের অনুরাগী ছিলেন। ইকবালের বিরোধীতা কিংবা সমালোচনা করা যাবে না বিষয়টি এমন নয়! তবে বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা পরিহার করা উচিত। পৃথিবীতে এমন বহু কবি জন্মগ্রহণ করেছে যারা মদ ও নর্তকীদের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে। কিন্তু আল্লামা ইকবাল সেদিক থেকে ব্যক্রিতম ছিলেন বলেই প্রেমের লড়াই ছাড়াই ভালো কবিতা জাতিকে উপহার দিয়েছেন।
ইকবালের মৃত্যু : ১৯৩৪ সালের জানুয়ারী মাসে তার গলায় এক অজানা রোগ হয়। লাহোর ও দিল্লীতে এ রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করার পরও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। এ সময় তিনি লাহোরের পাঠানকোটের কাছে জামালপুরে দারুল ইসলাম ট্রাস্ট ইন্সটিটিউট স্থাপন করেন। ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং সামাজিক কাজে সহায়তা করাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য। একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে জনমত গঠন করতে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এই কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তার শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ১৯৩৪ সালে আইন ব্যবসা বন্ধ করে দেন। কয়েক মাস গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কাটানোর পর ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে যখন মসজিদের মিনার হতে ফজরের আযান হচ্ছিল ঠিক সে সময় তিনি মহান প্রভুর ডাকে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকদফা জানাযার পর লাখো ভক্ত অনুরাগীকে কাঁদিয়ে রাত পৌনে দশটার দিকে লাহোর দুর্গ ও বাদশাহী মসজিদের প্রবেশদ্বারের মাঝখানে হাজুরিবাগে তাকে কবর দেয়া হয়। পরিশেষে আরশের মালিকের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁর দোষত্রুটিকে ক্ষমা করে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ