ঢাকা, শনিবার 7 July 2018, ২৩ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজাতির ভাষা ও সাহিত্য

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : বাংলাদেশে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এখানে অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাস করে। বাংলাদেশে উপজাতির সংখ্যা চল্লিশের অধিক। অপর এক গবেষণা মতে, বাংলাদেশে উপজাতির ভাষার সংখ্যা ছাব্বিশটি (ইনডিজেনাস কমিউনিটিস গ্রন্থে)। তারা প্রধানত বাস করে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, পটুয়াখালী, বরগুনা, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে।
উপজাতীয় ভাষাগুলোর মধ্যে ওঁরাও, খাসিয়া, গারো, চাকমা, মগ, মণিপুরী, মুক্তা ও সাঁওতালি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও রয়েছে খুমি, কোচ, হাজং, চাক, খাড়িয়া, খিয়াং, তঞ্চঙ্গ্যা ইত্যাদি।
১। ওঁরাও ভাষা : বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও সিলেটের চা-বাগান এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক লোকের মাতৃভাষা ওঁরাও। ওঁরাও ভাষীদের সর্বোচ্চ সংখ্যা রংপুরে এবং সর্বনিম্ন সিলেটে। ওঁরাও ভাষা কুরুখ নামে সমধিক পরিচিত। এ ভাষার কোন লিখিত রূপ নেই, তবে তা লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ। ওঁরাও ভাষায় অসংখ্য উপকথা, রূপকথা, গীত, ছড়া, ধাঁ ধাঁ প্রবাদ ইত্যাদি রয়েছে।
লোকসাহিত্য ওঁরাওদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হাসিকান্নার বাহক। প্রেম, প্রকৃতি, জীবিকা, আচার-অনুষ্ঠান, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত ওঁরাও লোকসঙ্গীত যথেষ্ট কাব্যময় ও শক্তিশালী। এ ভাষায় অগণিত ছেলে ভুলানো ছড়া ও ঘুম পাড়ানি গান রয়েছে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে মুণ্ডা ও ওঁরাও ভাষা একই। ওঁরাও ও বাংলা ভাষায় কিছু গহনার নাম এক যথা- টিকলি, বালা, পায়রা, বালি, কানপাঁশা ইত্যাদি। সম্বন্ধসূচক অনেক ওঁরাও এবং বাংলা শব্দও এক যথা- মা, বাবা, মামা-ভাগিনা ইত্যাদি। এ ছাড়াও কিছু বাংলা শব্দ ও ওরাঁও শব্দের মধ্যে যথেষ্ট মিল দেখা যায় যথা- ওঁরাও ভাগোয়ান, বাংলা ভগবান, ওঁরাও ভগতি, বাংলা ভক্তি, ওঁরাও ভূত, বাংলা ভূত ইত্যাদি।
২। খাসিয়া ভাষা : খাসিয়া ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। খাসিয়া ভাষায় গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ও পার্বত্য অরণ্য অঞ্চলে তাদের বসবাস। খাসিয়া ভাষার মধ্যে রয়েছে প্রধানত পাড়, লিংগাম ও ওয়ার। পাড় মানে পর্বত ও খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পূর্বাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রচলিত ভাষাই পাড়। লিংগাম শব্দে গারো পাহাড়কে বোঝায়। তাই গারো পাহাড়ের সন্নিকটের অঞ্চলের ভাষাই লিংগাম নামেই সমধিক পরিচিত। ওয়ার মানে উপত্যকা।
এক সময় খাসিয়া ভাষা বাংলা হরফে লিখিত হতো। বাংলা অক্ষরে বাইবেলের কিছু অংশ খাসিয়া ভাষায় প্রথম অনূদিত হয়েছিল। বর্তমানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খ্রীস্টান মিশনারিদের প্রচেষ্টায় রোমান অক্ষরে চেরাপুঞ্জি ও এতদঅঞ্চলের খাসিয়া ভাষা লিখিত হচ্ছে। মেঘালয় রাজ্য এ ভাষাকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম করা হয়েছে। বাংলাদেশে খাসিয়াদের জনসংখ্যা অত্যধিক নয়। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন পার্বত্য ও অরণ্য অঞ্চলে তাদের বসবাস।
৩। গারো ভাষা : গারো ভাষা প্রধানত চীনা-তিব্বতী ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এবং অনক্ষর ও অলিখিত একটি প্রাচীন অনার্য ভাষা। চীনা ভাষার সঙ্গে এ ভাষার শব্দ, ব্যাকরণ ও ভাষা তত্ত্বগত প্রচুর মিল রয়েছে। এ ভাষা প্রবাদ-প্রবচন, শ্লোক, গান, ছড়া, কিংবদন্তি, উপকথা, পালাগান ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ। এতে নৃতত্ত্ব ও ধর্মের কথাও আছে। বহু ভাষার শব্দ দ্বারা গারো ভাষার শব্দকোষ পুষ্ট। এ ভাষার বাক্য গঠন, পদ বিন্যাস, বিভক্তি, প্রত্যয়ের অবস্থান, ক্রিয়া ও শব্দের রূপান্তর উন্নত ভাষার মতো সুশৃঙ্খল। বাংলা ও অসমীয়া ভাষার সঙ্গে এ ভাষার সাদৃশ্যের কারণে কেউ কেউ গারো ভাষাকে এই দুই ভাষার মিশ্ররূপ বলে মনে করেন। গারোরা বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করে বলে এ ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ দেখা যায়। খ্রীস্টান মিশনারিরা গারো ভাষায় রোমান অক্ষর প্রচলন করেন। বাংলা হরফে গারো ভাষা স্বচ্ছন্দে লেখা যায়। বর্তমানে গারোদের পারিবারিক ভাষা গারো কিন্তু তাদের পোশাকি ভাষা বাংলা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও ভারতের মেঘালয় সীমান্তে রয়েছে গারোদের বসবাস।
৪। চাকমা ভাষা : চাকমা ভাষা বাংলাদেশের উপজাতীয় ভাষাসমূহের মধ্যে উন্নততর। এ ভাষায় কিছু প্রাচীন পুঁথি রয়েছে। সে সবের মধ্যে তালপাতায় লিখিত ‘চাদিগাং চারা’ পালা একটি। এ থেকে জানা যায় যে চাকমারা নেপাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা দেশ পরিক্রম করে ব্রহ্মদেশ ও আরাকানের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে উপনীত হয়। প্রাচীনকাল থেকেই এখানে তাদের আনাগোনা থাকলেও মাত্র তিন শ’ বছর পূর্বে তার পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তাদের আদিনাম ‘শাক’ (TS ak)। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন লক্ষাধিক লোক চাকমা ভাষায় কথা বলে। চাকমা ভাষার বর্ণমালা থাইল্যান্ডের ক্ষের, আন্নাম, লাওস, কম্বোডিয়া, শ্যাম ও দক্ষিণ ব্রহ্মের লিপির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
চাকমা ভাষায় চীনা ভাষার মতো টান (Tone) আছে, যে কারণে একই শব্দের অর্থ পার্থক্য ঘটে, তবে তা তেমন প্রকট নয়। শব্দতত্ত্ব, ছন্দ প্রকরণ লোকসাহিত্য, বাগ বিন্যাস ও ধ্বনিতত্ত্বের দিক দিয়ে চাকমা ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার খুব মিল রয়েছে। বাংলা ভাষার সব ধ্বনি চাকমা ভাষায় রয়েছে। রাঙ্গামাটি থেকে ‘চাকমা প্রথম পাঠ’ নামে একটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রণেতা নয়ন রাম চাকমা।
চাকমা ভাষায় রচিত অনেক গীতও আছে, যেগুলো চাকমা কথ্য ভাষায় রচিত। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে চাকমা কবি শিবচরণ রচিত ‘গোজেল লামার’ ভাষা প্রায় হুবহু বাংলা, এতে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকার’ মতো বন্দনা গীতি রয়েছে। ‘রাধামন ধানপাতি’ ও ‘চাদিগাং চারা’ পালা চাকমাদের দুটি উল্লেখযোগ্য পালা। চাকমা ও বাংলা ছড়ার ছন্দ প্রায় অভিন্ন। এ দুটি ভাষার পদবিন্যাসও প্রায়ই একই রকম।
চাকমা লোকসাহিত্য বেশ সম্দ্ধৃ। বহু লোকগাঁথা ও কিংবদন্তি রয়েছে এ ভাষায়।’ ‘উভাগীত’ চাকমাদের প্রিয় ঐতিহাসিক গান। প্রবাদ-প্রবচন চাকমা ভাষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এতে প্রধানত কৃষি, পশুপাখি, প্রকৃতি, সমাজ, ধর্ম, দেহতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয় বিধৃত হয়েছে। চাকমা ভাষায় প্রবাদ-প্রবচনকে বলে ‘দগ অ ক ধা’। বর্তমান এ ভাষা রূপগতভাবে বাংলা, অসমিয়া, রাজবংশী, গারো, সাঙ্ঘমা ও চাটগেঁয়ে ভাষার কাছাকাছি। এ ভাষার ছয়টি আঞ্চলিক রূপ রয়েছে। এমনকি, চাকমা গোত্রে- গোত্রেও এর পৃথক কথ্যরূপ দেখা যায়।
৫। মগ ভাষা : মগ ভাষা হলো- আরকানী ভাষার কথ্যরূপ এবং একটি সংকর ভাষা। তিব্বতী-বর্মণ গোষ্ঠীভুক্ত এ ভাষায় অসেট্রা-এশীয় ভাষার প্রচুর উপাদান রয়েছে। চীনা, প্রাচীন বর্মী এবং মিজো ভাষার সঙ্গে এ ভাষার যথেষ্ট মিল রয়েছে। তবে সবচেয়ে বর্মী ভাষার সঙ্গে রয়েছে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মগ ভাষার আদিনিবাস আরাকান। বাংলাদেশে দুই লক্ষাধিক লোক মগ ভাষায় কথা বলে।
মগ ভাষা আরাকান ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রিত ভাষা। এক সময় ব্রহ্মদেশীয় রাজার অত্যাচারে দুই-তৃতীয়াংশ আরাকানী বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করেছিল। ফলে তাদের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সংমিশ্রণে মগ ভাষার উৎপত্তি হয়।
মগ বর্ণমালার নাম ‘ঝা’। বর্ণগুলো মানুষের কোন না কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নামে উচ্চারিত হয়। এর আকৃতিতে চীনা চিত্রলিপির ছাপ লক্ষণীয়।
আরাকান ও বাংলাদেশেও এক শ্রেণীর মগ আছে। যাদের ভাষা বাংলা। বড়ুয়ারা মূলত মগ, কিন্তু বাংলাভাষী। পালি মগদের ধর্মীয় ভাষা। এ কারণে বহু পালি শব্দ কিছুটা বিকৃত কিংবা অবিকৃতভাবেই মগ ভাষায় প্রবেশ করেছে। যেমন- ভিক্ষু, নির্বাণ, বিহার, ভাবনা (ধ্যান), দুক্্খ, বস্্সা (বর্ষা) ইত্যাদি।
বাংলা ও মগ ভাষার কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণ ও অর্থে এক, যথা : আদ্য, মধ্য উপাধি, আপত্তি ইত্যাদি। আত্মীয় সূচক কিছু মগ শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হয়, যা উচ্চারণ ও অর্থে এক। আবার কোন কোনটিতে অর্থের কিছু তারতম্য ঘটেছে, যথা : বাবা, বাজী, মা।
আঞ্চলিক বাংলায় বাবা, বাজী সমার্থক, কিন্তু মগ ভাষায় বাজী মানে জেঠা। মগরা ছোট মেয়েকে বলে ‘মা;, কিন্তু আঞ্চলিক বাংলায় মেয়েকে আদর করে বলা হয় ‘মা’।
বর্মী ও মগ ভাষায় বার ও মাসের নাম এবং সংখ্যা গণনা অভিন্ন। মগরা আরাকানে থাকতেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিল, কারণ মধ্যযুগে আরাকানে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের চর্চা হতো। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা ও মগ ভাষার মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব লক্ষণীয়।
মগ ভাষায় সৃজনশীল সাহিত্য না থাকলেও লোকসাহিত্যের উপাদান আছে প্রচুর। এতে রয়েছে প্রবাদ, ধাঁ ধাঁ, উপকথা, গীত, ভূতের গল্প, জাতকের গল্প, বৌদ্ধ রাজা-রানীদের কাহিনী ইত্যাদি। গল্প গীতি প্রিয় মগরা অবকাশ মৌসুমে রাতভর গল্প শোনে, বাদ্যসহ নাচ-গান করে এবং বাংলা যাত্রা গানের মতো ‘পা ওয়ে’ নামক এক ধরনের অভিনয়ে অংশগ্রহণ করে। কোন কোন গল্প আবার তাদের বর্মী অক্ষরে লিখিত।
৬। মণিপুরী ভাষা : মণিপুরী ভাষা মোঙ্গলীয় ভাষা পরিবারের তিব্বতি-বর্মী শাখার কুকি-চীন গোষ্ঠীভুক্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বছরের প্রাচীন ভাষা। মৈতৈ জাতির নামানুসারে উনিশ শতকের পূর্বাব্দ পর্যন্ত এ ভাষার নাম ছিল মৈতৈ। পরবর্তীতে মণিপুরী নামে অভিহিত হয়। মূল মৈতৈ বর্ণমালায় বর্ণ ছিল ১৮টি পরে আরও বর্ণমালা সংযোজিত হয়। বর্মী-আরাকানী বর্ণমালার মতো মৈতৈ বর্ণমালা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উচ্চারিত হয়। এর বর্ণগুলো তিব্বতি বর্ণমালার অনুরূপ।
মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব যুগের প্রথম নিদর্শন গীতি কবিতা ‘ঔগ্রী’। তৎপূর্বে বিচিত্র প্রেম, গীত, প্রবাদ-প্রবচন, পালাগান. ছড়া ইত্যাদির প্রচলন ছিল। প্রেম গীতগুলো বেশ চিত্তাকর্ষক। এগুলো যুবক-যুবতীরা বাদ্যনৃত্য সহযোগে দলবদ্ধভাবে পরিবেশন করে। মণিপুরী ভাষায় প্রচুর সামরিক সঙ্গীত এবং কতিপয় নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্য, এমনকি মাহকাব্যও রচিত হয়েছে। এ ভাষায় বাংলা ও পাশ্চাত্যোর বিশেষ বিশেষ গ্রন্থ এবং রামায়ণ, মহাভারতও অনূদিত হয়েছে। ভারতের মণিপুরে এ ভাষা রাষ্ট্রভাষা এবং অন্যতম ভারতীয় জাতীয় ভাষারূপে স্বীকৃত।
মণিপরী একটি সংকর ভাষা। বাংলাদেশ, ত্রিপুরা অসম ও ব্রহ্মদেশে প্রায় ত্রিশ লক্ষাধিক লোক এ ভাষায় কথা বলে। বর্তমানে বৃহত্তর সিলেটে মণিপুরী ভাষীর সংখ্যা প্রায় অর্ধ লাখ।
৭। মুণ্ডা ভাষা : মুণ্ডা অস্ট্রো-এশিয় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং ভারতীয় আর্য ভাষা থেকেও প্রাচীনতর। এ ভাষা উড়িয়া, অসমিয়া ও বাংলা ভাষার প্রাথমিক ভিত রচনা করেছে। খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল, কোল ইত্যাদি উপজাতীয় ভাষার সঙ্গে মুণ্ডা ভাষার সম্পর্ক লক্ষণীয়। অসংখ্য মুণ্ডা শব্দ বাংলা ভাষায় বিশেষত আঞ্চলিক ভাষায় বিদ্যমান। কৃষি, গৃহস্থালি, বসতি, গণনা, আত্মীয়তা, ওজন, ভূমি, পশুপাখি, গাছ- গাছড়া ইত্যাদি সংক্রান্ত শব্দ মুণ্ডা তথা অস্টো-এশিয় ভাষা থেকে আগত।
মুণ্ডা ভাষা ব্যাপক অঞ্চলজুড়ে চালু ছিল বলে এর আঞ্চলিক রূপও ছিল। দক্ষিণ বিহার ও উড়িষ্যার সংলগ্ন অঞ্চলে, মধ্য প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক কোটি মুণ্ডা ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা প্রায় ১৫-২০ হাজার।
অনার্য মুণ্ডা ভাষার সঙ্গে বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও পদ ক্রমের ব্যাপক সাদৃশ রয়েছে মুণ্ডা ভাষায় শব্দ দ্বৈতের বাহুল্য আছে। স্ত্রী-পরুষ বাচক শব্দ বসিয়ে লিঙ্গান্তর করা হয়। মুণ্ডা ও বাংলায় কারক বিভক্তির ব্যবহার অনেকটা অনুরূপ। মুণ্ডা ও বাংলায় ১০ পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর বুৎপত্তি এক। ‘হালি’ এবং ‘কুড়ি’ বাংলার মতো মুণ্ডায়ও গণনার একক। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রকাশিত Mundari- English Dictionary-র মাধ্যমে মুণ্ডা ভাষার ব্যাপক পরিচয় পাওয়া যায়।
৮। সাঁওতালী ভাষা : সাঁওতালী ভাষা অস্ট্রো-এশীয় ভাষা গোষ্ঠীর প্রাচ্য শাখার অন্তর্ভুক্ত। প্রায় দশ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া হয়ে ব্রহ্মদেশ ও অসমের ভেতর দিয়ে অস্ট্রো-এশীয় জনগোষ্ঠী ভারত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিহারে সাঁওতাল পরগনায় সাঁওতালভাষী জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি। পশ্চিমবঙ্গে বিহার সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এবং বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে দিনাজপুর, রাজশাহী ও রংপুরে বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় দেড় লক্ষ সাঁওতাল ভাষী লোকের বাস আছে। তারা বাংলায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে এবং নিজেদের ভাষায়ও বহু বাংলা শব্দ ব্যবহার করে। সাঁওতাল ভাষায় দুটি উপভাষা আছে ‘নাইলি’ ও ‘করকু’। এটি অনক্ষর ভাষা। ভারতে এখনও সাঁওতালী ভাষা দেব নগরী অক্ষরে লিখিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে কোন সাঁওতালী বই-পুস্তক নেই। খ্রিস্টান মিশনারিরা দু’-একটি সাঁওতাল বিদ্যালয় স্থাপন করে ইংরেজী বর্ণমালায় সাঁওতালী ভাষা শিক্ষা দিচ্ছে।
সাঁওতালী ভাষার প্রায় সব ধ্বনিই বাংলায় রয়েছে। বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্যান্য ব্যাকরণিক মিলও আছে। মূল সাঁওতালী ভাষায় শব্দান্তে প্রত্যয় যোগের কোন প্রক্রিয়া নেই। সাঁওতালীতে প্রাণী ও অপ্রাণী বাচক সর্বনাম ভিন্ন ভিন্ন। সাঁওতালী, কোল, মুন্ডা ইত্যাদি ভাষা বাংলা থেকে তো বটেই ভারতীয় আর্য ভাষা থেকেও প্রাচীনতর। বাংলায় ও আঞ্চলিক উপভাষায় বহু সাঁওতালী শব্দ রূপান্তরিত অবস্থায় আজও বিদ্যমান।
৯। খুমি ভাষা : পার্বত্য চট্টগ্রামের রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়িতে খুমিদের বাস। ২০০৬ সালের বেসরকারী জরিপে খুমিদের জনসংখ্যা প্রায় তিন হাজারে উঠে এসেছে। খুমিরা টিবেটান-বার্মিজ-কুকিচীন দলভুক্ত। এই ভাষার স্বরযুক্ত বর্ণমালার সংখ্যা ২৫টি। খুমি থেকে ইংরেজী ভাষায় একটি অভিধান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
১০। কোচ ভাষা : কোচ ভাষা সাইনো-টিবেটান পরিবারের এই ভাষাটিতে প্রচুর বাংলা, উড়িয়া, হিন্দী, অহমিয়া ও ছোট নাগপুরী ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে। কোচদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণমালা নেই। কোচ জনসংখ্যা এখন ছয় হাজারেরও বেশি কোচ ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। কেবল প্রাচীন লোকেরাই কোচ ভাষায় ভাব বিনিময়ে করতে পারে।
১১। হাজং ভাষা : জমিদারদের বিরুদ্ধে টঙ্ক আন্দোলনখ্যাত হাজং পরিবারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে। বর্তমানে হাজংয়ের সংখ্যা বারো হাজারের মতো। হাজংদের নিজস্ব ভাষায় বর্তমানে বহু বাংলা শব্দ ঢুকে গেছে।
১২। চাক ভাষা : বাংলাদেশে চাক জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের কাছাকছি। উখিয়া, আরাকান, রামু, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামায় চাকদের বাসস্থান। চাকদের ভাষা আছে বর্ণমালা নেই। তবে মংমং চাক ধ্বনি অনুসরণ করে এগারোটি স্বরবর্ণ ও চৌত্রিশটি ব্যঞ্জনবর্ণ তৈরি করা হয়েছে।
১৩। খাড়িয়া ভাষা : বাংলাদেশে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে প্রায় ৬ হাজার খাড়িয়া রয়েছে। অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারভুক্ত খাড়িয়া ভাষা রোমান হরফে লিখিত হতে থাকে পরবর্তীকালে বাংলা ও দেব নাগরী হরফে ও লেখা খাড়িয়া ভাষার চর্চা শুরু হয়। বাংলাদেশে কেবল প্রবীণ খাড়িয়ারাই তাদের মাতৃভাষা ব্যবহার করতে জানে।
১৪। খিয়াং ভাষা : ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে এক হাজার নয় শ’জন উল্লেখ করা হলেও খিয়াংদের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের জনসংখ্যা আমুমানিক তিন হাজার পাঁচ শ’জন। খিয়াং সিনো-টিবেটান ভাষা পরিবারভুক্ত। খিয়াংদের নিজস্ব কোন বর্ণমালা নেই। কিন্তু কথ্য ঐতিহ্যে অনেক ছড়া-কবিতা ওগান রয়েছে। খিয়াং ভাষাটি মিয়ানমারেও প্রচলিত।
১৫। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা : তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী মোট বাংলাদেশে একান্ন হাজার পাঁচ শ’র কিছু বেশি। জার্মান ভাষা বিজ্ঞান গিয়ার্সনের সমীক্ষায় ১৯০৩ সালেই স্পষ্ট করে বলা হয় তঞ্চঙ্গ্যা একটি পৃথক ভাষা, যা ইঙ্গো ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে এবং এ ভাষাটির সাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ।
উপজাতীয় ভাষাসমূহ অস্ট্রো-এশিয়, ইন্দোচীন, চীন-তিব্বতি, তিব্বতি-বর্মণ, ইঙ্গো-ইউরোপীয় ও দ্রাবিড়ীয় ভাষা পরিবারের কোন না কোনটির অন্তর্ভুক্ত। বাংলা ভাষা গঠনের যুগে উপজাতীয় ভাষাসমূহের অবদান অপরিহার্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ