ঢাকা, শনিবার 7 July 2018, ২৩ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মোঙ্গলদের জাপান অভিযান

আখতার হামিদ খান : বিশ্বের ইতিহাসে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের। দ্বাদশ আর ত্রয়োদশ শতক জুড়ে ইতিহাসে মোঙ্গল আধিপত্যের সূচনা হয়েছিল তারই হাত দিয়ে। এশিয়া আর ইউরোপের বিশাল এক অংশ জুড়ে হত্যা, ভীতি আর ধ্বংসের মাধ্যমে চেঙ্গিস যে সাম্রাজ্যের পত্তন করেছিলো তার পরবর্তী উত্তরাধিকাররা তা আরো এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। এদের হাতেই ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ নগরীর ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। চেঙ্গিস এর সময়েই, চীনের বেশ কিছু অঞ্চলে মোঙ্গল আধিপত্য কায়েম হলেও তারই উত্তরাধিকারী কুবলাই খানের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা ১২৭৯ সাল নাগাদ পুরোটা চীন দখল করে নেয়। চীনে শুরু হয় একশো বছর, ১৩৬৮ সাল পর্যন্ত। পুরোটা চীন দখল করেও কুবলাই  খানের রাজ্য দখলের নেশা পূরণ হয়নি। তার কানে আসে দ্বীপদেশ জাপানের বৈভব, বিশেষ করে সঞ্চিত সোনার কথা। ব্যস্, ফরমান গেলো জাপানে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজেতা, ঈশ্বরের প্রতিনিধি চেঙ্গিসের বংশধর কুবলাইকে নজরানা দিতে হবে, অবনত হয়ে স্বীকার করতে হবে মোঙ্গলদের প্রভূত্ব।
জাপানে তখন হোজো শাসনামল (১১৯৯ থেকে ১৩৩৩) চলছে। হেজো সম্রাটরা মোঙ্গল অধীনতা মেনে নিতে অস্বীকার করলে মোঙ্গল স¤্রাট কুবলাই খান ১২৭৪ ও ১২৮২সালে দু’দু’বার জাপান আক্রমণ করে। বিশাল নৌবহর নিয়ে কুবলাই খান জাপান অভিযান পরিচালনা করলেও দু’বারই তা ব্যর্থ হয়। কিন্তু মোঙ্গলদের পরাজয়ের পেছনে জাপানিদের বীরত্বের চেয়েও প্রধান ভূমিকা রেখেছিল ঝঞ্ঝাবহুল জাপান সাগরের ‘কামিকাজি’ বা স্বর্গীয় হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত ঝড়টি। এই ঝড়ের কবলে পড়েই মোঙ্গলদের বিশাল রণবহর বিধ্বস্ত হয়েছিল, পরিত্যক্ত হয়েছিল জাপান জয়ের অভিলাষ।
প্রচুর ধনরতœ আর সম্পদ নিয়ে জাপান সাগরের অতলে লুকিয়ে থাকা মোঙ্গল জাহাজগুলো ঘিরে গত সাতশ’ বছরে অনেক কল্পকাহিনী ডাল-পালা মেলেছে। কিন্তু কল্পকাহিনী বাদ দিয়ে প্রকৃত ঘটনা জানতে পুরাতাত্ত্বিকরা ত কয়েক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু পুরাতাত্ত্বিকদের কাছে অনেকগুলো প্রশ্ন এতদিন অজানা ছিল। কামিকাজি বা স্বর্গীয় ঝড়ের গতিপ্রকৃতি বা বায়ুপ্রবাহের দিক সম্পর্কে অনেক কিছুই তারা জানতেন না। এমনকি মোঙ্গলদের জাহাজগুলো কত বড় ছিল বা সেগুলো কীভাবে ডুবে গেল সে প্রশ্নের উত্তরও তাঁদের জানা ছিল না। কিন্তু প্রায় সাতশ’ বছর পরে এসে জাপানের পুরাতাত্ত্বিকরা এসব প্রশ্নের কিছু কিছু উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। অতি সাম্প্রতিক এক পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কার টোকিওর দক্ষিণ-পশ্চিমে ইমারি উপসাগরের মুখে অবস্থিত টাকসিমা নামের ছোট্ট দ্বীপের অদূরে সংঘটিত সাতশ’ বছর আগের নৌ-যুদ্ধের অনেক অজানা তথ্য তুলে ধরেছে।
গভীর সাগরের তলা থেকে মোঙ্গল জাহাজের অবশেষ তুলে আনার কাটা ছিল অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য। ১৯৮০ সালে এই অনুসন্ধান কাজ শুরু হলেও সাফল্য এসেছে অতিসম্প্রতি। অনুসন্ধান কার্যক্রমের বর্তমান পরিচালক কিউসু ও ওকিনাওয়া আন্ডার ওয়াটার আর্কিওলোজির প্রেসিডেন্ট কেনজো হায়াসিদা নেতৃত্বে অনুসন্ধানী দল ডুবে থাকা মোঙ্গল জাহাজ থেকে সিরামিকের বেশ কিছু জার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব জার মধ্যযুগে তরল পদার্থ পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর সাগর তল থেকে উদ্ধারকৃত দ্রব্যের মধ্যে আরো রয়েছে মোঙ্গলদের বিখ্যাত ‘পাত্র-বোমা’, তরবারি, বড় আকারের নোঙ্গর এবং চাইনিজ ধাঁচের একটি পাত্র যার গায়ে খোদিত লেখা এটিকে ‘একশ জনের প্রধান’ ওয়াং নামের এক চীনা যোদ্ধার ব্যক্তিগত পানপাত্র হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে।
এ বছরের জুলাই মাসে তীর থেকে প্রায় ৭০ মিটার দূরে এবং সমুদ্র তলের চেয়েও প্রায় ১৩ মিটার গভীরতায় একদল বিজ্ঞানী ও ডুবুরি ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। হোস পাইপের সাহায্যে পানি পাম্প করে এবং বালি সরিয়ে তারা মানুষের কঙ্কালের অংশ বিশেষ, পশুর হাড়, ডুবে যাওয়া জাহাজের কাঠের টুকরা এবং একটি নোঙ্গরের দড়ি উদ্ধার করে। উদ্ধারকারী দল অবশ্য কোনও জাহাজের পুরো কাঠামো এখনো খুঁজে পায়নি। দীর্ঘকাল সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকা এসব টুকরোগুলো ‘শিপ ওয়ার্মে’র কবলে পড়ে এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, কোন কাঠের টুকরোটা কোন জাহাজের তা সনাক্ত করাও অত্যন্ত কঠিন। অনুসন্ধানী দলের অন্যতম সদস্য টেক্সাসের আর্কিওলজি এন্ড মেরিন ইউনিভার্সিটির ছাত্র র‌্যান্ডেল সাসাকির মতে, ‘এসব কাঠের টুকরোগুলো মিলানো আর ধাঁধার ৪০০০ বিভিন্ন সেট মিলানো সমান পরিশ্রম আর অনিশ্চয়তার বিষয়। কিন্তু তারপরও অনুসন্ধানী দলের তুলে আনা প্রায় একশ কাঠের টুকরো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে হায়াসিদা অনুমান করছেন যে মোঙ্গলদের এসব জাহাজগুলোর মধ্যে কোনও কোনওটা প্রায় ৪০ মিটারের মতো দীর্ঘ ছিল এবং এসব জাহাজ সম্ভবত চীনা বা কোরিয়ান বন্দরগুলোতে নির্মিত হয়েছিল। টোকিওর প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সবুজ পাইন বনানীতে ঘেরা টাকাসিমা নামের শান্ত, ছোট্ট দ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র দু’হাজার আটশ’ জন। দ্বীপের জেলেরা তাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে এটাই জানে যে, দ্বীপটির চারপাশে স্বাদু ব্লোফিস পাওয়া যায়। তারা জানে না এই ছোট্ট দ্বীপের কাছে সাতশ’ বছর আগে দু দুটি বড় নৌ-যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আর এই যুদ্ধ দু’টি ইতিহাসের গতি প্রকৃতিকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছিল। ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১২৭৪ সালে মোঙ্গলরা ৯০০ জাহাজ আর প্রায় ৪০ হাজার সেনা নিয়ে উত্তর কায়াসু তে আক্রমণ চালায় এবং টাকাসিমাদের পুরো গোষ্ঠিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।
অজ্ঞাত কারণে মাত্র দু’সপ্তাহ পরই মোঙ্গলরা পাল তুলে বাড়ির পথে রওনা দেয়। কিন্তু ফেরার পথে তারা পড়ে স্বর্গীয় ঝড় কামিকাজি’র কবলে। বিজয়ী সেনাবাহিনী প্রকৃতির রুদ্র রোষের কাছে হার মেনে সলিল সমাধি লাভ করে। সে যাত্রায় জাপান দখলের প্রস্তুতি নেয়। ১২৮১ সালে মোঙ্গলরা এক লাখ ৪০ হাজার সেনা আর ৪ হাজার ৪০০ জাহাজ নিয়ে জাপান অভিমুখে রওনা দেয়। এই বিশাল শক্তির মোকাবেলা করার সামর্থ্য জাপান স¤্রাটের ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল আবারো জাপানকে মোঙ্গল দখলদারীর কবল থেকে রক্ষা করে। অমিত শক্তিধর এক টাইফুনের কবলে পড়ে আগ্রাসী বাহিনী তলিয়ে যায় অতল সাগরে। ওই টাইফুনের কবলে  পড়ে মোঙ্গলদের প্রায় ৩ হাজার জাহাজ আর একলাখের মতো সৈন্য সাগরে ডুবে যায়। বেঁচে যাওয়া অবশিষ্ট বাহিনী আর হামলা চালানোর সাহস না পেয়ে ঘরে ফিরে যায়। পরপর দু’বার বিপুল ক্ষতির কারণে কুবলাই বা পরবর্তী মোঙ্গল শাসকরা আর জাপান অভিযানের সাহস পায়নি।
নাগাসাকির আর্কিওলোজিস্ট সিনজি তাকানো’র মতে টাইফুন আসতে দেখে মোঙ্গল জাহাজগুলো সম্ভবত সঙ্কীর্ণ উপসাগরে আশ্রয় নিয়েছিল। আর ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজগুলো যাতে পরস্পর থেকে বিছিন্ন না হয়ে যায় তা ঠেকাতে সেগুলোকে সম্ভবত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ থেকে আসা প্রবল ঝড়ের ঝাপটাও জলোচ্ছ্বাস জাহাজগুলোকে খেলনার মতো পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ায়। এই পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা ধাক্কির কারণে কাঠের জাহাজগুলো সহজেই ভেঙ্গে পড়ে এবং ডুবে যায়। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় সাঙ্গ বংশের শাসনের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় কুবলাই খানের সমসাময়িক যেসব যুদ্ধ জাহাজের মডেল পাওয়া গিয়েছে সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এসব কাঠের জাহাজ ভেঙ্গে ফেলতে ঘণ্টায় দু’শ কিলোমিটার বেগের ঝড়ই যথেষ্ট। জাপান সাগরের টাইফুনের শক্তি আরো বেশি হওয়ায় মোঙ্গল জাহাজগুলো ঝড়ের কবলে সাগরের টাইফুনের শক্তি আরো বেশি হওয়ায় মোঙ্গল জাহাজগুলো ঝড়ের কবলে পড়ে অসহায়েরমতো ডুবে যায়। এসবই তথ্যভিত্তিক প্রাথমিক অনুমান মাত্র। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো অনেক দিন।
হায়াসিদার অনুসন্ধানকারী দল এ পর্যন্ত এই যুদ্ধ ক্ষেত্রের মাত্র এক শতাংশের মতো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। পুরোদস্তুর অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে আরো অনেক টাকা আর জনবল দরকার। এগুলো জোগাড় হলেই হয়তো আমাদের সামনে মোঙ্গলদের ব্যর্থ জাপান অভিযানের রোমাঞ্চকর অনেক অজানা কাহিনী উঠে আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ