ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ক্র্যাকডাউন

#    স্বাধীনতার এত বছর পর মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকা উচিত নয় -অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
#    ১০ ভাগের বেশি কোটা থাকা উচিত নয় -অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
#    পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন উদ্ভট সিস্টেম নেই    - ড. আকবর আলি খান
#    পদ্ধতি বাতিল না করে এর সংস্কার করতে হবে     - সা’দাত হুসাইন
#    ৫৬ শতাংশ কোটা এটা অযৌক্তিক: ড. এএসএম আমানুল্লাহ
সামছুল আরেফীন : কোটা সংস্কারের আন্দোলন করতে গিয়ে কেউ হাসপাতালে কেউ বা জেলে। কেউ বা মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত। পালিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকে। তারা কোটা বাতিল নয়, চেয়েছে সংস্কার। গত ১১ এপ্রিল সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। গেলো সপ্তাহে এ নিয়ে একটি কমিটি হয়েছে মাত্র। গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই যেন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হঠাৎ করেই চড়াও  হয় সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। সে দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে। এরপর সপ্তাহ জুড়েই শিক্ষার্থীদের ওপর চলে ছাত্রলীগের নৃশংসতা। তাদের হাত থেকে রেহায় পায়নি ছাত্রীরাও। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের নেতা তারিকুল ইসলাম তারিকের পা হাতুরি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের কোথাও বাংলাদেশের মতো এতো কোটা নেই। দীর্ঘ সময় ধরে মেধার চাইতেও বেশি কোটা বিরল ঘটনা। তবে এ পদ্ধতি একেবারে বাতিল করা উচিত নয়। দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়ে এখন আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্র্যাকডাউনে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কোটা সংস্কার নিয়ে মত দিয়েয়েছেন দেশের অধিকাংশ মানুষ। তারপরও কেন এই সময় ক্ষ্যাপণ?
কোটা পদ্ধতি কীভাবে এলো? বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন, বিক্ষোভ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে কী এই কোটা ব্যবস্থা এবং কেন এটা নিয়ে বিক্ষোভ? কোটা ব্যবস্থা কেন এবং কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল?
১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সন্তানদের সুবিধা দেবার জন্য প্রথমে এ কোটা চালু করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে প্রথম এই কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এই কোটার পরিধি বেড়েছে। এখন মুক্তিযোদ্ধাদের নাতী-নাতনীদের জন্য এ কোটা প্রযোজ্য হচ্ছে। ৬৪টি জেলার জন্য কোটা আছে। মূলত দেশের অনগ্রসর মানুষকে সুবিধা দেবার জন্যই কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সূত্র মতে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে মোট পাঁচটা ক্যাটাগরিতে কোটার ব্যবস্থা রয়েেেছ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায়।
প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা
#    মুক্তিযোদ্ধা কোটা: ৩০ শতাংশ
#    জেলা কোটা: ১০ শতাংশ
#    নারী কোটা: ১০ শতাংশ
#    উপজাতি কোটা: ৫ শতাংশ
#    প্রতিবন্ধী কোটা: ১ শতাংশ
কোটা সংস্কারের দাবিগুলো কী? ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র সংরক্ষণ পরিষদ’এর ব্যানারে যে পাঁচটি বিষয়ে  কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে সেগুলো হল-
#    কোটা-ব্যবস্থা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা।
#    কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া
#    সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়স-সীমা (মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরির বয়স-সীমা ৩২ কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০)
#    কোটায় কোনও ধরনের বিশেষ পরীক্ষা নেয়া যাবে না ( কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকরির আবেদনই করতে পারেন না কেবল কোটায় অন্তর্ভুক্তরা পারে)।
#    চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।
আইন কী বলে: সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।
এই অনুচ্ছেদের ২৯ এর (৩) এর (ক) তে বলা হয়েছে, নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে, রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।
কোটা পদ্ধতি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিলেও, এখনো কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। তবে গত ১১ এপ্রিল কোটা বাতিলের ঘোষণার পর গত ২ জুলাই বিকেলে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা/সংস্কার/বাতিল করার জন্য সরকার একটি কমিটি ঘোষণা করেন। এ দিন দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, কোটা সংস্কার বা বাতিলের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, কোটা সংস্কারকে যতটা সহজভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, অতটা সহজ নয়, জটিলতা আছে। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত ১১ এপ্রিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এই ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গত ৩০ জুন আবারো মাঠে নামার ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা।
এ দিকে কোটা পুরোপুরি বাতিল সম্ভব না বলে মন করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংবিধানের ২৮(৪) এবং ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে কোটা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। দেশের পিছিয়ে পড়া কোনও জনগোষ্ঠী, কোনও এলাকার জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় যদি সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের সুযোগ দিতে সংবিধান সরকারকে ক্ষমতা দিয়েছে। এই ক্ষমতা বলেই কোটা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। বিভিন্ন সময় যৌক্তিক কারণেই বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মানুষের জন্য এই কোটা পদ্ধতির সৃষ্টি হয়েছে। সেই কারণগুলো এখনও সমাধান হয়নি বলে কোটা পুরোপুরি বাতিল করা যাবে না বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী যেমন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী, তারপর বিশেষ ভৌগলিক এলাকার বিশেষ মানুষ এমন বিভিন্ন ধরনের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আছে। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। শাহদীন মালিক বলেন, আমরা শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা করে যে অস্বাভাবিক সমাধান করেছিলাম, ঠিক সেভাবেই কোটা শূন্যে নামিয়ে আনাও আমার দৃষ্টিতে একটা অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তিনি মনে করেন, কোটা শূন্য হলে বিভিন্ন বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী করা হবে, যা ১৯৭২ সালের সংবিধানের চেতনা ও ধারণার পরিপন্থী।
ভারতে কোটা পদ্ধতি আছে। আগে অনেক বেশি ছিল, এখন কিছুটা কম। এখন খাতগুলো কমে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে সিডিউল কাস্ট, সিডিউল ট্রাইব এবং অন্যান্য পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা। আগে এটা চাকরির ক্ষেত্রেও প্রবলভাবে ছিল। কিন্তু এ নিয়ে ভারতের আদালত একাধিকবার তাদের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে, ফলে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একবার বলেছে, এই কোটা পদ্ধতিটি সরাসরি সংবিধানবিরোধী। পরে ভারত সরকার অবশ্য এ কারণে তাদের সংবিধানেও কিছু পরিবর্তন এনেছে। তখন সুপ্রিম কোর্ট কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোটাকে বৈধ বললেও এর পরিমাণ যাতে ৫০ শতাংশের বেশি না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলেছে।
মেধার মূল্যায়ন সম্পর্কে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় হয়েছে এবং তাতে বলা হয়েছে, কোটাভিত্তিক নিয়োগ কখনও-ই মেধার চেয়ে বেশি হতে পারবে না।
এ বিষয়ে ড. আকবর আলী খান ও কাজী রকিবউদ্দীন আহম্মদ (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) একটি গবেষণা করেছেন। তাতে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে বর্তমানে ২৫৮ প্রকারের কোটা আছে, যা ঐতিহাসিক এবং বিশ্বে বিরল ঘটনা। এ জাতীয় কোটার হিসেব-নিকাশ অতি জটিল একটি প্রক্রিয়া এবং তাতে ভুল হতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে সুবিধা দেয়ার সুযোগও থাকতে পারে।
বিশেষ করে পাবর্ত্য চট্রগ্রাম এলাকায় কোটা নির্ধারণে এমনটি বেশি হওয়ার কথা শোনা যায়। এছাড়াও  জলা কোটা হিসেবের ক্ষেত্রে জনসংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দেখা যায়, মেধা থাকা সত্বেও বা বেশি নম্বর পেয়েও কম জনসংখ্যার অধিবাসী, যেমন মেহেরপুর, লক্ষীপুর, লালমনিরহাট জেলার প্রার্থীরা চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসবই হচ্ছে সংবিধান-বিরোধী এবং সমসুযোগ প্রদানের ব্যতয়।
শিক্ষার্থীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন হয়: ছাত্রলীগ কর্মীর হাতুড়ির আঘাতে পা ভেঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের কোটা আন্দোলনের নেতা তরিকুল ইসলাম। ছাত্রলীগের হামলার কথা বলতে গিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তরিকুল বলছিলেন, ওদেরকে অনুরোধ করছিলাম, আর যেন না মারে। কেউ আমার কথা শুনলো না। যাদের হাতে লাঠি ছিল সবাই পেটাচ্ছিল। খুব কাছ থেকে যেন দেখছিলাম মৃত্যুকে। কী নির্দয়ভাবেই না পেটাচ্ছিল আমাকে! কোনো মানুষ মানুষকে পেটাতে পারে এভাবে, কল্পনাও করিনি কোনোদিন।
কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভের সময় গত সোমবার তরিকুলকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে রাস্তায় ঘিরে ধরে পেটায় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন মিলে যখন লাঠি নিয়ে তরিকুলকে পেটাচ্ছিল তখন ছাত্রলীগের কর্মী আবদুল্লাহ আল মামুন লোহার হাতুড়ি দিয়ে তার পিঠে ও পায়ে আঘাত করে। সেই তরিকুলকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ছাড়তে হয়েছে। তার স্বজনরা জানিয়েছে, তাদের জোর করে ছাড়পত্র দেয়া হয়।
শুধু তরিকুলই নন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুর। তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে অনেকটা গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা পাননি দাবি করে নুর জানিয়েছেন, তিনি এখন যে হাসপাতালে ভর্তি আছেন সেখান থেকেও বের করে দেয়া হয়েছিল। তারা তার চিকিৎসা করতে অপারগতা প্রকাশ করে। হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর তারা আবার আমার চিকিৎসা দিচ্ছে। কোটা আন্দোলনের দুই যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হাসান ও রাশেদ খান গ্রেফতার হয়ে কারাগারে। রাশেদ খানকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সামনের সারির অন্য নেতারা আছেন গ্রেফতার ও হামলার আতঙ্কে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা বলছেন, আন্দোলনে জড়িত সামনের সারির নেতারা কেউ হাসপাতালে, আবার কেউ কারাগারে। বাইরে যারা আছেন তারা আছেন আতঙ্কে। এমন অবস্থায় সবাই একটা অনিশ্চিয়তা নিয়ে সময় পার করছেন।
কোটা পদ্ধতি নিয়ে যা বলেন দেশের বিশিস্টজনেরা: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের ক্যাডার নিয়োগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কোটা সিস্টেম। এর কারণে মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছে না। কোটাকে অনেকে খারাপ, ভালো নয়, বাদ দেওয়া উচিত- এরকম বললেও এর বেশি কিছু বলেন না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশনে ২৫৭টি কোটা রয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন উদ্ভট সিস্টেম নেই। বাংলাদেশের সংবিধানে কোটা চালু হয়েছে দরিদ্রদের উপরে তুলে নিয়ে আসার জন্য, কাউকে পুরস্কৃত করার জন্য নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা সিস্টেম চালু হয়েছিল কারণ তাদের অবস্থা তখন খারাপ ছিল। কিন্তু এখন মুক্তিযোদ্ধার নামে যে কোটা দেওয়া হয় তা নিতান্তই অমূলক।
সাবেক চেয়ারম্যান পিএসসি ড. সা’দাত হুসাইন বলেন, কোটা পদ্ধতি বাতিল না করে এর সংস্কার করতে হবে, সেই সঙ্গে বদলাতে হবে পরীক্ষা পদ্ধতিও। কোটা পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে তার বক্তব্য, কোটার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই, তারপরও এটি একটি জাতীয় ইস্যু। এর জটিলতা এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে এর সমাধান দুরূহ হয়ে পড়েছে। কোটা সংস্কার প্রক্রিয়া কেমন হবে, সে সম্পর্কে তিনি বলেন,  শুধু সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল এটার সমাধান দিলে হবে না। সব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটা সমাধানে আসতে হবে। কোটার একগুচ্ছ চালক আছে। সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। এক সাইড দেখলে অন্য সাইডে প্রবলেম দেখা দেবে। মাথার মধ্যে বিসিএস ঢুকালে হবে না, অন্য অংশ নিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যথায় বহু জটিলতার কোটায় নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এটা পরিষ্কারভাবে অগ্রহণযোগ্য। আমলারা দেশ চালাতে বড় ভূমিকা রাখেন। সেখানে যদি কোটার সাহায্যে মেধাবীরা না গিয়ে কম মেধাবীরা যায় তাহলে গোটা ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে যায়। অন্যদিকে যারা মেধাবী ছাত্র, যারা পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাবে বলে আশা করেন তাদের মধ্যে একটা হতাশা তৈরি হচ্ছে। অথচ কোটার মাধ্যমে কম মেধাবীরা ভালো জায়গায় চলে যাচ্ছে। আর দেশের পশ্চাদপদ এলাকা যেমন, পাহাড়ি এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য কোটা থাকুক কিন্তু এরপরে অন্য কোনো বিষয়ে কোটা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি না। মুক্তিযোদ্ধা কোটা এক সময় ছিল সেটা ঠিক আছে। কিন্তু স্বাধীনতার এতদিন পরে এখন আর এই কোটা থাকা উচিত না। এখন মেধার ভিত্তিতে নেয়া উচিত। মেয়েরাও এখন অনেক এগিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করছে। তাই এখন নারীদের সংরক্ষিত কোটারও দরকার নেই।
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মনে করেন সরকারি চাকরিতে ১০ ভাগের বেশি কোটা সংরক্ষণ করা উচিত না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় যে ৫৬ ভাগ  কোটা রয়েছে তা অন্যায়। তবে কোটা সংস্কারের নামে কোনো সহিংস আন্দোলন গ্রহণযোগ্য নয়। আলাপ- আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সমপর্যায়ে আনার জন্য কোটা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে কোটা ব্যবস্থায় নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষত মেধা তালিকার তুলনায় কোটার পরিমাণ বেশি হওয়ায় এবং কোটার জন্য বরাদ্দকৃত পদ পূরণ না হওয়ায় সেই পদগুলো শূন্য থাকছে। ফলে জটিলতা আরও বেড়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘকাল যাবৎ তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে বেকারত্বের হার বাড়ছে এবং মূল সেই সমস্যার দিকে নজর না দিলে চাকরি প্রার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়বে। কাজেই কোটা পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন। কোটাকে ৫০ শতাংশের ওপরে কোনোভাবেই নয়, পারলে আরও কমিয়ে আনা উচিত। বর্তমানে জেলা কোটা তুলে দেয়া উচিত কিন্তু গবেষণায় কতগুলো উপজেলা পশ্চাদপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ বলেন, চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা এটা অযৌক্তিক। নারী কোটা সম্পর্কে তার বক্তব্য, নারীদের উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও ওই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যে পর্যায়ে পৌঁছলে নারী কোটা তুলে দেয়া যায়। তাই নারীদের জন্য বর্তমানে ৫ শতাংশ কোটা রাখা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করে দেয়া দরকার যে, আগামী কত বছর এ কোটা থাকবে, ১০ বছর নাকি তারও বেশি। মুক্তিযোদ্ধা কোটা সম্পর্কে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ১০ শতাংশ রাখা যায় এবং নিয়ম করে দিতে হবে একটা পরিবার থেকে একবার এ সুবিধা নিতে পারবে। নাতি-পুতি, চৌদ্দগোষ্ঠী এ সুবিধা পাবে না, একবার পাবে। উপজাতি কোটা সম্পর্কে তার মত, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীরা এখনও পিছিয়ে তাই তাদের ৩ শতাংশ দেয়া যেতে পারে। জেলা কোটা সম্পর্কে তার বক্তব্য, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, গাইবান্ধার মতো আরও কিছু জেলা এখনও পিছিয়ে আছে, এগুলোর জন্য ২ শতাংশ জেলা কোটা রাখা যেতে পারে। প্রতিবন্ধী কোটা সম্পর্কে তার দাবি, প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তারা যদি লিখিত পরীক্ষায় পাস করে আসতে পারে তবে ২ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা রাখা যেতে পারে। বর্তমান কোটা ব্যবস্থার সংস্কার সম্পর্কে তার পরামর্শ, মোট ২২ শতাংশ কোটা দিয়ে বাকি ৭৮ শতাংশ যদি মেধায় নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে সমস্যাটা আপাতত সমাধান হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ