ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অতিরিক্ত দালাল নির্ভরতায় বেড়ে যাচ্ছে অভিবাসন ব্যয়

ইবরাহীম খলিল : অতিরিক্ত দালাল নির্ভরতার কারণে বেড়ে যাচ্ছে অভিবাসন ব্যয়। মফস্বল এলাকা থেকে কয়েক দালালের হাত হয়ে মূল এজেন্সির কাছে আসতে হয় বিদেশ গমনেচ্ছুকদের। একারণে প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে শ্রম অভিবাসনে ইচ্ছুক প্রবাসী শ্রমিকরা আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হন।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবির সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকরা সবচেয়ে কম মজুরি পান মধ্য প্রাচ্য ও মালয়েশিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়। বাড়তি অভিবাসন ব্যয়ের কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা। আরব আমিরাত বা কুয়েত যেতে একজন শ্রমিকের যে ব্যয় হচ্ছে, তা আয় করতে সময় লাগছে নয় মাস থেকে এক বছর। এতে শুধু অভিবাসী নন, ভুগতে হচ্ছে তার পরিবারকেও। বিশেষত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণ নিয়ে যারা বিদেশ যাচ্ছেন-সুদ পরিশোধ বাবদ তাদের ব্যয় হচ্ছে বেশি।
এতে বলা হয়, তদারকির দুর্বলতায় বিদেশ গমনেচ্ছুদের ব্যয়িত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে দালাল ও জনশক্তি রফতানিতে নিয়োজিত এজেন্সিগুলোর পকেটে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন,অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির ওপর নিভরশীলতা, দালাল-নির্ভর  সেবাব্যবস্থা, সকল দেশের জন্য সরকারিভাবে ভিসার মূল্য নির্ধারিত না থাকার ফলে ভিসা/ অভিবাসনের প্রকৃত ব্যয় সংক্রান্ত দালিলিক প্রমাণের ঘাটতি; ভিসার অতিরিক্ত চাহিদা; ভিসা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভিসা ব্যবসায়ীদের অসাধু প্রতিযোগিতা এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়াও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ভিসার মূল্য বেশি, অভিবাসী কর্মীর শিক্ষা, দক্ষতা ও সচেতনতার ঘাটতি; সামাজিক যোগাযোগের কারণে দালালদের ওপর আস্থা ও নির্ভরতা; কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ; তৃণমূল পর্যায়ে উপস্থিতি; তথ্য সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা; বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার ও প্রকাশে ঘাটতিকেও দায়ী করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি বলছে, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে ১৬ ধরণের দুর্নীতি করা হয়। এসব অনিয়ম অবসানে ৯টি সুপারিশ করা হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
অভিবাসন ক্ষেত্রে আইনি ও প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই আইনে শ্রম অভিবাসন খাতে সক্রিয় দালালদের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; আইনের অনেক ধারা নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক নয়। যেমন- অভিযোগ উত্থাপন, কর্মী বাছাই, ক্ষতিপূরণ আদায়; এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিবাসনকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। অন্যদিকে মোবাইল কোর্টে বিচারের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদানে এখতিয়ার সংক্রান্ত অস্পষ্টতা, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসীর ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা না রাখা, ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ ও ডেটাবেইজ থেকে কর্মী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বাস্তবসম্মত নয়।
এখাতে সুশাসনের অভাবকে দায়ী করে বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা; বাজেট ও জনবল, বিএমইটি, টিটিসি, গন্তব্য দেশে শ্রম উইং স্বল্পতা; প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণের ঘাটতি,ভিসা প্রক্রিয়াকরণ, গবেষণায় শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার ভিসা সংগ্রহ, ভিসা সত্যায়ন, কর্মীর কাছে ভিসা বিক্রি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সহ সকল পর্যায়ে নানাবিধ সমস্যা, দুর্নীতি ও অনিয়ম রয়েছে। এরমধ্যে দেশে নিয়োগদাতাদের পক্ষ থেকে / তাদের অজ্ঞাতসারে অবৈধভাবে ভিসা বিক্রি; অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কর্মীর চাহিদাপত্র তৈরি ও বিক্রি; গন্তব্য দেশ থেকে ভিসা কেনার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়; গন্তব্য দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে চাহিদাপত্র অনুযায়ী নিয়োগদাতা সম্পর্কে তথ্য যাচাই না করে ও অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে চাহিদাপত্র সত্যায়নের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অভিবাসী কর্মীর কাছে দালালদের ভিসা বিক্রি; ভিসার জন্য অতিরিক্ত মূল্য আদায়; নারী অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা আদায়; স্বাস্থ্য পরীক্ষায়  কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্থ ব্যক্তিকে আনফিট ঘোষণা করা, পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে ফিট বলে সনদ দেওয়া, পুলিশি ছাড়পত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, অতিরিক্ত দালাল নির্ভরতা, সক্ষমতার ঘাটতি, চাহিদার তুলনায় অধিক গমনেচ্ছু এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে শ্রম অভিবাসনে ইচ্ছুক ও প্রবাসী শ্রমিকরা আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তিনি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শ্রমশক্তি রপ্তানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে দালাল ও এজেন্টদের মাধ্যমে বিদেশে গমনেচ্ছুদের প্রতারণার শিকার ও নিঃস্ব হওয়ার বিষয়ের ওপর নজর দেওয়াসহ একটি দীর্ঘ মেয়াদী জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন, দালাল নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ, প্রতারণা ও অনিয়মের সাথে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহবান জানান।
অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন আরেক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। তিনি মনে করেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব না। এজন্য তিনি বিশেষ ট্রাস্কফোর্স গঠন করা;মন্ত্রণালয়ের সেবা নিশ্চিত করা; দক্ষ কর্মী প্রেরণ করা; সিন্ডিকেটের তৎপরতা বন্ধ করাসহ অভিবাসন খাতে বাজেট বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ