ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আগামী নির্বাচন অনেক কঠিন হবে -শেখ হাসিনা

গণভবনে ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -পিআইডি

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন অনেক কঠিন হবে। মনে রাখতে হবে আমরা যদি জিততে না পারি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ দরিদ্র হয়ে যাবে, সামাজিক নিরাপত্তার কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, শিক্ষার হার কমে যাবে। তাই মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোটের জন্য যেতে হবে।
গতকাল শনিবার  গণভবনে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় এসব কথা বলেছেন  প্রধানমন্ত্রী । আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের তৃতীয় ও শেষ বর্ধিত সভা গতকাল অনুষ্ঠিত হলো। এই সভার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ তৃণমূলে দলীয় কোন্দল ও বিভেদ দূর করে আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের সংগঠিত করার পরিকল্পনা করছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের মানুষের কাছে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘বলতে হবে আমাদের শক্তি জনগণ, জনগণের কল্যাণে আওয়ামী লীগ কাজ করে। যাঁকে নৌকা দেওয়া হবে, তাঁর পক্ষে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নৌকা যেন না হারে। একটি সিটে না জিতলে কী হবে এমন মনোবৃত্তি যেন কারও মধ্যে না থাকে। একটি আসনও হারানো যাবে না, সবাইকে এই মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করতে হবে।
 শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ করা মানে শুধু নিজের উন্নয়ন করা নয়, দেশ ও দশের জন্য কাজ করাই এই দলের মূল উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধু দলের জন্য সময় দিতে মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন। এই দলের জন্য কাজ করতে হলে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।
তিনি  বলেন, সামনে নির্বাচন। এই নির্বাচন কঠিন হবে। নির্বাচনে জয়ী না হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেমে যাবে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যেসব কর্মসূচি চলছে, তা বন্ধ হয়ে যাবে। উন্নয়নকাজ বন্ধ হয়ে যাবে। এর আগেও এ রকম হয়েছিল। তাই সব দ্বন্দ্ব নিরসন করে স্থানীয়ভাবে দলের জন্য কাজ করতে হবে।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সব দ্বন্দ্ব নিরসন করে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত নেওয়া হবে। তারপরও যাঁকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হবে, তাঁর পক্ষেই সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রতিটা আসন গুরুত্বপূর্ণ। একটিতে না জিতলে কী হয়, তা করলে হবে না। অনেক দিন ক্ষমতায় থাকলে এমন মনে হতে পারে, কিন্তু এটা করা যাবে না। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের একটি মানুষও অশিক্ষিত থাকবে না। না খেয়ে থাকবে না। মানুষ নৌকায় ভোট দিয়েছে, সুফল পেয়েছে। ভবিষ্যতেও নৌকায় ভোট পেতে জনগণের দোরগোড়ায় যেতে হবে।
বিএনপির সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা কখনোই এ দেশের উন্নয়ন চায়নি। জিয়াউর রহমান এ দেশে ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে দেননি। কিন্তু এই ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। বিশ্বের কোনো নেতার ভাষণ এতবার বাজানো হয়নি।
কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এতিমখানার জন্য টাকা এনে সেই টাকা কীভাবে লুটপাট করা হলো, আপনারা তা জানেন। বিএনপির এত জাঁদরেল আইনজীবী তাঁরা কী করলেন, তাঁরা তো প্রমাণ করতে পারলেন না যে খালেদা জিয়া দুর্নীতি করেনি। এই মামলা ১০ বছর ধরে চলেছে। এখানে আমার কী করার আছে? মামলায় দোষী প্রমাণিত হওয়ায় খালেদা জিয়ার জেল হয়েছে। এর আগেও তিনি ঠিকমতো কোর্টে হাজিরা দেননি। তাঁর দুই সন্তানও দুর্নীতি মামলার আসামী। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা সাড়ে তিন হাজারের মতো মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। গাড়ি পুড়িয়েছে। দুর্নীতি লুটপাট করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে করা গোয়েন্দা সংস্থার ৪৭টি ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে। এই ফাইলগুলোর তথ্যাবলী বই আকারে প্রকাশ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘মাত্র একজন নেতার বিরুদ্ধে ৪৭টি ফাইল হয়েছে। এই ফাইলগুলো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এসবি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার পাতার এই ফাইলগুলো ১৪টি ভলিউমে প্রকাশ করা হবে।’ 
ফাইলগুলোর তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে তিনি  জানান, ‘এগুলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অবমুক্ত করার আইন রয়েছে। ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অবমুক্ত করার অনুমতি নেওয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জেলায় নেতাকর্মীদের যেসব চিঠি লিখেছেন সেগুলোও আছে এসব ফাইলে। এগুলো প্রকাশ করা হলে বহু তথ্য জানা যাবে।’
এসব নথি প্রকাশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো প্রকাশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস সব জানা যাবে। এগুলো আওয়ামী লীগের জন্য, জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।’
বিদ্যুৎ ও পানি উৎপাদনে সরকার অনেক ভর্তুকি দিচ্ছে
এদিকে গতকাল অন্য একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকার বিদ্যুৎ ও পানি উৎপাদনে অনেক টাকা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। কাজেই এগুলোর ব্যবহারে সবাইকে যতœবান হতে হবে, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিজের হাতে বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ করবেন। পানির কলও বন্ধ করতে হবে, যাতে পানির অপচয় না হয়। এসব কাজ নিজের হাতে করায় কোনও লজ্জা নেই। আমি নিজেও এসব কাজ করে থাকি।
রাজধানীর আজিমপুর ও মতিঝিলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ১০টি বহুতল ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
নতুন ভবনগুলোতে অবস্থানকারীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের ফ্ল্যাট ও আশপাশের এলাকা, লিফট, সিঁড়ি ব্যববহারকারীর নিজেকেই পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকার সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরের বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্যও পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া ভবনের আশপাশে ও ব্যালকনিতে বৃক্ষরোপণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। কলোনির পুরনো ভবনগুলো ভেঙে এখানে হাঁটার জায়গা, পার্ক, জলাধার, খেলার মাঠ ও বাগান তৈরি করা হবে বলেও জানান তিনি।
মতিঝিল সরকারি কলোনিতে ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি চাই কর্মস্থল থেকে ফিরে এসে আপনারা যেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি ভালো জায়গায় থাকতে পারেন। সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন সমস্যা সমাধানে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জাতির পিতা আজিমপুর কলোনির ভবনগুলোর একটি করে তালা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।’
দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় আছে বলেই আজ উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে। জনগণ যখনই নৌকায় ভোট দিয়েছে তখনই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।’
সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১২৩ ভাগ বেতন বৃদ্ধিসহ কর্মস্থলে তাদের পদবীগুলোকে যুগোপযোগীকরণে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। সরকারের সাফল্যের জন্য সরকারি কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেন তিনি।
রাজধানীর মতিঝিল ও আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। এগুলোতে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিদ্যমান আবাসন সুবিধা ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত করার অংশ হিসেবে পৃথক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী এসব ভবন উদ্বোধন করেন। মতিঝিলে চারটি ২০ তলা ভবনে ৫৩২টি ও আজিমপুরে ৬টি ২০ তলা ভবনে ৪৫৬টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ