ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হাজীদের ভুল সংশোধন

-ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ
ইসলামের পাঁচটি খুঁটির মধ্যে হজ্জ হল গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরয এবাদত। জীবনে একবারই হজ্জ ফরয। হালাল পথের আয় থেকে সামর্থবান ধনী মুসলমানের উপর হজ্জ ফরয। এই ফরয হজ্জ আদায় করতে গিয়ে সদা সর্বদা হক পথেই আমল করতে হয়। হজ্জ করতে গিয়ে অনেকেই র্শিক বিদআতে জড়িয়ে পড়ে। নির্ভেজাল তৌহিদের কান্ডারী হিসেবে সব হাজীকে ভুল ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে নিষ্পাপ ও কবুলী হজ্জকারী হয়ে ফিরতে হবে।
নিম্নে হাজীদের দ্বারা কৃত ভুলভ্রান্তির উল্লেখ করা হল :
০১। হজ্জের নিয়তের পূর্বে কোন নামাযের নিয়ম নেই। যারা নিয়তের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়েন তারা বিদ’আত করেন। ওমরা বা হজ্জের জন্য মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করতে হবে।
০২। ইহরাম বাঁধার আগে নয় ইহরামের পরে তালবিয়া পাঠ শুরু করতে হবে।
০৩। এহরামের কাপড় পরিধান করলে আর বদলানো যাবে না মনে করা ঠিক নয়। যে কোন প্রয়োজনে এহরামের কাপড় বদল করা যাবে। তবে এহরামের কাপড়ের পরিবর্তে এহরামের কাপড়ই পরতে হবে।
০৪। সেলাইবিহীন দুই টুকরা সাদা কাপড় পরিধানকে এহরাম বলে না, হজ্জের নিয়ত করে হজ্জ্ব পালনের যে শর্তগুলো দেয়া হয়েছে তার বাহিরে না যাওয়াকে এহরাম বলে। হজ্জের সময় যেসব জিনিসকে হারাম করা হয়েছে ঐ সবকে হালাল না করাই এহরাম।
০৫। নিজে হজ্জ করে থাকলেই শুধু বদলি হজ্জ বা অন্যের হজ্জ করা যায়েজ।
০৬। জামরাতে পাথর মারা মানে শয়তানকে পাথর মারা নয়। জামরাহ হল লক্ষ্য বস্তু।
০৭। তাওয়াফের সময় অন্যকে ধাক্কা মেরে আগে যেতে চেষ্ঠা করা ঠিক নয়। পুরুষ বা মহিলাকে দেখে খুব সতর্কতার সাথে তাওয়াফ করতে হবে।
০৮। মসজিদুল হারামকে হারাম শরীফ বলা যায়। কিন্তু হেরেম শরীফ বলা যাবে না।
০৯। তাওয়াফে যিয়ারত হল ১০ই জিলহজ্জ। কিন্তু অনেকে মিনায় যাবার আগে তাওয়াফে যিয়ারত করে ফেলে। কুরবানীর পর তারা আর তাওয়াফে যিয়ারত করে না। বিশ্ব নবীর (স.) জীবনে এরূপ করেন নি।
১০। হজ্জের মধ্যে কোন ভুল হয়ে গেলে অতিরিক্ত কুরবানী দিতে হবে। অনেকে এমনিতেই অতিরিক্ত কুরবানী দিয়ে থাকে, যদিও জানামতে সে কোন ভুল করেনি। এটা ঠিক নয়। এটা বিদআত।
১১। আল্লাহর সাথে কাবা ঘরকে মিলিয়ে ফেলে অনেকে। মনে রাখতে হবে যে আমরা কাবা ঘরের সিজদা করিনা। সিজদা করি আল্লাহকে। কাবা ঘরের রবের জন্য আমাদের এবাদত। যারা বলে যেই কাবা সেই আল্লাহ, তারা র্শিক করে। ‘ওলি বা পীর বাবার ক্বলবের মধ্যে কাবা’ যারা বলে  তারাও র্শিক করে।
১২। কাবাঘরের গিলাফের অলৌকিক ফজিলত আছে মনে করা র্শিক। যারা কাবাঘরের গিলাফকে চুমু দেয়, ঘসাঘসি করে, মাথা ঠুকায়, গিলাফের কাপড় ছিড়ে ফজিলতের জন্য বাড়ীতে নিয়ে আসে, তারা র্শিক করে।
১৩। জামরাতে পাথর মারার সময় যারা উত্তেজিত হয়ে জুতা বা সেন্ডেল ছুড়ে মারে তারা ঠিক করে না। পাথর মারা হয় পিলারের গায়ে। পিলার গুলো শয়তান নয়।
১৪। ইহরাম অবস্থায় নিজের চুল বা অপরের চুল কাটা যায়। মহিলা বা পুরুষ সবার চুলই কাটা যায়।
১৫। ওমরার পর পুরুষগণ মাথার চুল ছোট করে কাটবেন। আর হজ্জের পর মাথা ন্যাড়া করবেন। ওমরার সময় চুল ন্যাড়া করে ফেললে হজ্জের সময় মাথায় চুল থাকে না।
১৬। জামরায় মারার জন্য সংগ্রিহিত পাথর ধৌত করার প্রয়োজন নেই।
১৭। নামায রোজা কুরবানী যাই করা হোক সবার সোয়াবই মক্কায় ১ লক্ষ আর মদিনায় ৫০ হাজার গুন বেশী মনে করা ঠিক নয়। শুধু নামাজের কথা হাদীসে বলা হয়েছে।
হাজীদের উত্তম আমল : যারা হজ্জ করতে যায় তারা আল্লাহর মেহমান। হাজীগণ অনেক উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। হাজীদের মন মিজাজ তাই অতি উন্নত মানের। তাই হাজীদেরকে হতে হয় চরম ধৈর্য্যশীল। তারা গীবত, পরচর্চা, হিংসা বা অহংকার সবই পরিত্যাগ করে। তারা অন্যের খারাপ ব্যবহারে রাগ করে না। কাউকে তারা ঘৃণা করে না। তারা কাউকে ভয় করে না। তারা সর্বদা আল্লাহর দাস ও আল্লাহর প্রেমিক হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদায় এবাদতে মশগুল থাকবে। তারা বৈষয়িক চাওয়া পাওয়া বা আরাম আয়েশের পাগল হবে না। হাজী সাহেব সর্বদা হাসিখুশিতে থাকবেন। তারা চেহারা সুরতে আভিজাত্য পূর্ণ ভদ্রবেশে থাকবেন। তারা অন্যের সাথে তর্ক বিতর্ক এবং ঝগড়ায় জড়িয়ে যাবেন না। কারো সাথে উত্তেজিত হবেন না। বেহুদা লোকজনকে এড়িয়ে চলবেন। মক্কা ও মদীনায় সারাক্ষণ অযু অবস্থায় থাকবেন।
- সবাইকে সম্মান দেখিয়ে চলতে হবে।
- মক্কা-মদীনা সম্পর্কে কোন খারাপ মন্তব্য করবেন না।
- সবার জন্য সবসময় হৃদয় থেকে দু’আ করবেন এবং সবসময় ভাল মন্তব্য করবেন।
- নিজের জন্য সব সময় দু’আ করুন, “হে আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো, আমার ভুল ত্রুটি দুর করে দাও, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত কর।”
- আপনার সাথীদের এবং অন্যান্যা হাজীদের সাহায্য সহযোগীতা এবং খিদমত করুন।
- সারাদিন কী কী করবেন সকালেই তার একটা প্লান তৈরী করে ফেলুন।
- হাসি ঠাট্টা কম করুন এবং আখিরাতের কথা বেশী বেশী স্মরণ করুন।
- মৃত্যু, কবর, কবরের আযাবের কথা স্মরণ করুন।
- নিজের পূর্বের কৃত গুনাহের কথা বেশী করে স্মরণ করুন। আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করুন। বেশী করে ক্ষমা চান।
- দেশে ফেরার আগে বেশী করে তাওবা ও ইস্তেগফার করুন।
হজ্জ ও উমরাহতে পরিত্যাজ্য বিদআত
হজ্জ ও ওমরাহতে আল্লাহর রাসুল (স.) প্রদর্শিত নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। রাসুলের সুন্নাহ মোতাবেক এ সব এবাদত করতে হবে। উহাতে নতুন কিছু সংযোগ করাই বিদআত। বর্তমানে হজ্জ ও উমরাহতে অনেক বিদআত চালু করা হয়েছে। নিম্নে ঐসব বিদআতের বর্ণনা দেয়া হলো: উহা পরিত্যাগ করতে হবে।
০১। প্রত্যেক তাওয়াফ বা সায়ীতে নির্দিষ্ট দু’আ পড়া।
০২। মক্কা-মদীনা, আরাফা, মুযদালিফা, ওহুদের ময়দান, বদরের ময়দান বা আশে পাশের মাটি, গাছ, পাথর ইত্যাদি সংগ্রহ করে বাড়ীতে নিয়ে আসা এবং ইহাকে বরকতময় মনে করা।
০৩। হজ্জ বা উমরাহের সময় ব্যতীত অন্য সময় মাথা কামানো সুন্নাত মনে করা।
০৪। হজ্জ করে এসে নিজের নামের সাথে আলহাজ্ব বা হাজী উপাধি সংযোগ করা।
০৫। রূহানী জগতের মাধ্যমে ঘরে বসেই হজ্জ হয়ে যায় এমন বিশ্বাস করা।
০৬। কাবাঘরে অবস্থান পীরের কলবের ভিতরেই অবস্থান এবং পীরের সেবা করলেই হজ্জ পালন হবে এমন বিশ্বাস করা।
০৭। টঙ্গীর বিশ্ব ইস্তেমাকে দ্বিতীয় হজ্জ বিশ্বাস করা এবং ইহরামের কাপড় পরে ইস্তেমায় হাজির হওয়া।
০৮। টঙ্গীর ইস্তেমাকে গরীবের হজ্জ মনে করা। ইহা বিদআত ও র্শিক।
০৯। ওহোদ পাহাড়ের মাটি এনে তা শিফা হিসেবে ব্যবহার করা বিদআত ও র্শিক।
১০। যমযমের পানি এনে তা পীর সাহেবের দ্বারা ফু দেয়াইয়ে বিশেষ উদ্দেশ্যে বিতরণ করা।
১১। পীর সাহেবের অনুমতি না হলে ফরয হজ্জ পালনে যাওয়া যাবে না এরূপ বিশ্বাস করা র্শিক। মহান আল্লাহর কোন ফরয হুকুম পালনের জন্য পীর আওলিয়ার কোন অনুমতির প্রশ্নই উঠে না।
১২। সওয়াবের উদ্দেশ্যে কাবা ঘর, মসজিদে নববী বা মসজিদে আকসা ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা বিদআত।
১৩। মদীনার সাত মসজিদে যিয়ারত করা বিদআত। মসজিদে কুবা, মসজিদে কেবলাতাঈন এসব মসজিদে নামাজ পড়া বিদআত নয়।
১৪।  মক্কার বিশেষ এলাকা সমূহ যিয়ারত করা সওয়াবের কাজ মনে করা বিদআত। ছুর পাহাড়, কবরস্থান সমূহ, মসজিদে জিন, আব্দুল মুত্তালিবের বাড়ী দেখতে যাওয়া কোন সওয়াবের কাজ নয়।
১৫। জাবালে রহমতের উপর অবস্থিত পিলারকে পুন্যকেন্দ্র মনে করা, উহাতে চুমু দেয়া, ওখানে নামায পড়া, মুনাজাত করা, কান্নাকাটি করা, পিলারের গায়ে মাথা ঠুকা, ইত্যাদি সবই র্শিক ও বিদআত।
১৬। সওয়াবের উদ্দেশ্যে তসবীহ ছড়া ব্যবহার করা বা হাতে তসবীহ ছড়া রাখা বিদআত।
১৭। রাসূল (স.) এর নামে কুরবানী করা বিদআত।
১৮। একই পশুতে কুরবানী ও আকিকার নিয়ত করা।
১৯। কুরবানীর সময় মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করা।
২০। কুরবানীর পশুর সামনে এসে কুরবানী দাতাদের নাম উচ্চারণ করা।
২১। কুরবানীর গোস্ত শুকিয়ে বা ফ্রিজে রেখে সওয়াবের কাজ মনে করে মহররম মাসে তা খাওয়া।
২২। রাসূল (স.) কে সৃষ্টি না করলে দুনিয়াতে কোন কিছু সৃষ্টি করা হতো না এমন আকিদা পোষণ করে সওয়াবের আশা করা।
২৩। মসজিদে নববীতে গিয়ে রাসূল (স.) এর কবরের দিকে মুখ ফিরিয়ে মুনাজাত করা।
২৪। রাসূল (স.) এর কবরের নিকটে না গিয়ে দুর হতে কবরের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে সালাম দেয়া।
২৫। রাসুল (স.) এর নামে হজ্জ বা উমরাহ করা।
২৬। রাসুল (স.) এর কবরের পাশে বার বার গিয়ে যিয়ারত করা অভ্যাসে পরিণত করা।
২৭। অন্য কারো মাধ্যমে রাসুল (স.) এর কবরে সালাম পাঠানো।
২৮। রাসূল (স.) এর কবরে গিয়ে উচ্চ স্বরে সালাম দেয়া।
২৯। রাসূল (স.) এর কবরে গিয়ে কান্নাকাটি করা।
৩০। মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজ দেখে মাত্র দুরুদ ও সালাম পাঠানো।
৩১। বালাগাল উলা বি কামালিহি -ইত্যাদি বলা বিদআত ও র্শিক।
(সূত্র : আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে হজ্জ ও উমরাহ।
-লেখক : আমির জামান, নাজমা জামান)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ