ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জিয়ারতে মদিনা

-আলহাজ্ব মো. আ. ওয়াহেদ
মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টিকূলের শিরমনি, পৃথিবীর মত শ্রেষ্ঠ মহামানব নবীকরিম (সা.) যে পবিত্র স্থানটিতে শুয়ে আছেন সেই স্থান হলো মদিনা মুনাওয়ারা। অন্য কথায় রাসূল (সা.) এর পবিত্র মক্কা নগরী হতে হিযরত করে আরব উপদ্বীপের যে শহরে বসবাস করেছিলেন তার নাম মদিনা মুনাওয়ারা একটি শহর, পবিত্র মক্কা নগরীর পর এর স্থান। সকল ইমামের মতে, মদিনায় অবস্থিত রাসূল (সা.) এর রওজা পাক (সা.) ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি হজ্ব কিংবা উমরা করল যে আমার রওজা মোবারক জিয়ারত করল না সে যেন হজ্বই করল না। পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে হজ্ব বা উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মদিনা শরীফে যেসব ধর্মীয়স্থান রয়েছে তার মধ্যে যেমন মসজিদে নববী, জান্নাতুল বাকী, ওহুদ পাহাড়, মসজিদে কিবলাতাইন, মসজিদে কোবা, মসজিদে গামামা, মসজিদে বেলাল, মসজিদে আবু বক্কর, মসজিদে উমর, মসজিদে ওছমান, মসজিদে আলী (রা.), মসজিদে জুমুয়া। এ লেখার প্রথমে এসে যায় মসজিদে নববীর কথা। মসজিদে নববী না দেখলে বুঝানো যায় না। মক্কার কাবা ঘরে নামাজ পড়লে সাধারণ মসজিদের চেয়ে ১শ ভাগ ছোয়াব বেশি আর মদিনা মসজিদে নববীতে নামাজ পড়লে ৫০ ভাগ ছোয়াব বেশি হয়। মক্কার কাবার আশপাশে ৯ কি.মি. এর মধ্যে যত মসজিদ আছে, সব মসজিদ কাবার সমমর্যাদা লাভ করে। আবার মসজিদে নববীর আশপাশে আশপাশে ৯ কি.মি. এর মধ্যে যত মসজিদ আছে, যেসব মসজিদ মসজিদে নববীর সমমর্যাদা রাখে। হুজুর পাক (সা.) ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি কাবাঘরে হজ্ব কিংবা উমরা করল কিন্তু সে ব্যক্তি মদিনায় মসজিদে নববীতে অথবা আমার রওজা মোবারক জিয়ারত করল না, সে যেন হজ্বই করল না।
নবীজির মেহরাব : হযরত মোহাম্মদ (সা.) মদিনা আগমনের পর তিনি বেশ কিছু দিন পূর্বের ন্যায় বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করিয়া নামাজ পড়তেন। তারপর মসজিদুল হারাম বা কাবা ঘরের দিকে মুখ করিয়া নামাজ পড়িবার আয়াত নাজিল হয় এবং তিনি কাবার দিকে ঘুরিয়া যান এবং ১৩-১৪ দিন আয়েশাকে (রা.) সামনে রেখে নামাজ পড়তে থাকেন। ইহার পর এগিয়ে গিয়ে নিজ মহল্লায় নামাজ পড়েন।
রাসূল (সা.) এর যুগে বা খোলাফায়ে রাশেদিনের যোগে খুদানো মেহরাব ছিল না। ৯১ হিজরীতে উমর বিন আব্দুল আজিজ সর্বপ্রথম এ ধরনের মেহরাবে নববীর নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেন। রাসূল (সা.) এ স্থানে খেজুর গাছের গদির স্থানে একটি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে, যা মেহরাবের সঙ্গে লেগে আছে এবং এর উপর লেখা আছে আল উসতু আনাতুল মুখাললাক। সুতরাং যে ব্যক্তি এই মেহরাবের সামনে দাঁড়াবে রাসূলের মুসল্লা তার ডান দিকে পড়বে। সে জন্য যে ব্যক্তি ঠিক রাসূল (সা.) মুসল্লার নামাজ পড়তে চায় সে যেন বর্তমান মেহরাব হতে একটু ডান দিকে সরে যায়। মেহরাব তার বাম দিকে পড়ে তাহলে এ স্থানটি রাসূলের প্রকৃত মেহরাব হবে। রাসূল (সা.) যে খেজুর গাছের দিকে সুতরা করে নামাজ পড়তেন সে স্থানটি নির্ণয় করার জন্য ইবনে আবির বিনাদ বলেন, সেটি ছিল উসতাআনুতু মুখাল্লাকাহ স্থানে। আর এটি পড়বে মেহরাবের ডান দিকে। রওজাতুন মিন রিয়াজুল জান্নাত বা জান্নাতের টুকরা। ডানদিকে হুজুরে পাক (সা.)-এর মিম্বার যেখানে সে দাঁড়িয়ে তিনি খুৎবা দিতেন। বামে তার মিহরাব, যেখানে তিনি নামাজ পড়াতেন। মিহরাবের বামে তাঁর রওজা মোবারক এই পুরোটাই রওজাতুম মিন রিয়াজুল জান্নাত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আমার ঘর এবং মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটুকু বেহেস্তের বাগানগুলোর একটি। এমনিতেই সম্পূর্ণ মসজিদে নববীই কল্যাণ এবং বরকতের ভা-ার। কিন্তু এই অংশটুকুর বৈশিষ্ট্য ভিন্নতর। এ সীমারেখা নির্ধারণ করতে সেখানকার পীলারগুলো সাদা পাথর জড়ানো। বিছানার কার্পেটগুলোর রঙও অনুরূপ এবং ঝাড়বাতি ইত্যাদির ব্যবস্থাও পৃথক রূপ রয়েছে। ফলে জিয়ারতকারী তা সহজে অনুমান করতে পারে। বর্তমান রাসূল (সা.) এর পবিত্র ঘরেই তার রওজা মোবারক এ অংশে বর্তমান মেহরাবে নবী (সা.)সহ ছয়টি পিলার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে মর্যাদার ঐতিহাসিক ও বরকতের জন্য খ্যাত। এখানে নামাজ তেলাওয়াতকারীর অসংখ্য ভিড় লেগে থাকে। ওলামা মাসায়েখগণ বলে থাকেন, এ জায়গা বেহেস্তের অংশ। কিয়ামতের দিন এই স্থানকে সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হবে। রহমতে উস্তুওয়ালা বা খুঁটি (উস্তওয়ালা)
হুজুর পাক (সা.) এখানে একটি শুকনো গাছে হেলান দিয়ে খুতবা পাঠ করতেন। কাঠের মিম্বার তৈরির পর তাতে দাঁড়িয়ে খুতবা দেয়ায় শুকনো গাছটি রাসূল (সা.) এর বিচ্ছেদের কান্না শুরু করে দেয়। তিনি তখন মিম্বার থেকে নেমে গাছটির উপর তাঁর পবিত্র হাত রাখতেই এটির কান্না থেমে যায়। সেটিকে ঐস্থানে সমাহিত করা হয়। উস্তওয়ানা আয়শা (রা.) প্রিয় নবী (সা.) গোপনে এই পিলারের গোড়ায় ১০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছেন এবং তিনি বলেছেন, এর কাছে এমন একটি স্থান আছে যদি আমি প্রকাশ করে দেই তাহলে এখানে নামাজ পড়বার জন্য লোকের ভিড় লেগে যাবে যে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে লটারীর দরকার হবে না। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এর স্থান সম্পর্কে জানতেন, কতিপয় দুষ্ট ইহুদী মা আয়েশার বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র করলে তিন দিন তিন রাত এখানে অবস্থান করেন এবং নামাজ কুরআন তেলায়াত করতে থাকেন হুজুর পাক (সা.) এ দৃশ্য দেখে তাকে কিছু বলেননি। অতপর আয়েশা (রা.) বিষয়ে ওহি নাযিল হয়। সে জন্য এই পিলারকে আয়েশার পিলার বলা হয়। উস্তুওয়াসা আবী লুবাবা (রা.) হতে এ খুটি সংগঠিত হওয়াতে তিনি নিজেকে খুটির সাথে বেধে শপথ করেছিলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর নবী (সা.) পবিত্র বাঁধন খুলে না দিবেন ততক্ষণ পর্যন্ত বাঁধাই থাকবেন। তিন দিন পর তার সম্পর্কে ক্ষমার আয়াত নাযিল হলে দয়াল নবী তার বাঁধন খুলে দেন। এখানে নামাজ এবং দোয়া, তওবা কবুল হয়। আসহাবে ছুফফা। ছুফফার অর্থ ছাদবিহীন ভিটা ইহা মসজিদে নববী সংলগ্ন একটি ছোট ভিটা। অনেক সাহাবী দেশ-বিদেশ থেকে এসে এখানে নবী করিম (সা.)এর শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করতেন এবং ছাত্রাবাস হিসেবে এখানে অবস্থান করতেন। এ জন্য তাকে আসহাবে ছুফফা বা ভিটাবাসী বলা হয়। ইহা বর্তমানে বামে জিবরীল দিয়ে ঢুকতেই সামনে ও বামে এবং রাসুল  (সা.) এর রওজা শরীফের ঘেরার উত্তর সংলগ্ন একটা ভিটা, ইহা বরকতের স্থান। এখানে বেলায়ত, জিকির, মুরাকাবা তছবিহ ও নফল নামাজ পড়বেন। এখানেও রওজাতুল জান্নাতের মতই সর্বদা ভিড় লেগেই থাকে। জান্নাতুল বাকী মদিনা শরীফের জালি বিশিষ্ট প্রাচীর ঘেরা পবিত্র কবর স্থান। মসজিদে নববীর সীমানার পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত। বর্তমান মসজিদে নববীর প্রসারের দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এখানে সমাহিতদের ক্ষমার সুসংবাদ রয়েছে। এখানে ১০ হাজারেরও বেশি সাহাবী এবং তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানগনি (রা.), উত্তর পূর্বের মাঝখানে সমাহিত আছেন। উমৎ জননী হযরত খাদিজাতুল কুবরা ও মাইমুনা (রা.) ব্যতীত এদের প্রথমজনের রওজা মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায়, এর দ্বিতীয়জনের রওজা মক্কায় সারফি নামক স্থানে। অবশিষ্ট ৯ জন উম্মত জননী, তিন কন্যা ও পুত্র ইব্রাহীম, হযরত আব্বাস, ইমাম হাসান, আকীল ইবনে আবী তালিব, মালিক ইবনে আনাস, মা হালিমা, সাইদিয়া হুজুর (সা.) এর ফুফীগণ আবু ছাইদ খুদরী, ওছমান ইবনে মায়মুন, আঃ রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবী, ওয়াক্কাছ ইবনে আউফ, আবী ওয়াক্কাস ইবনে মাসুদ (রা.) প্রমুখ সাহাবী সমাহিত আছেন। এখানে সমাহিত আছেন উহুদ জেহাদের ৫ জন আহত মুজাহিদ যারা মদিনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। এছাড়াও আছেন অসংখ্য জানা-অজানা তাবিরীন, তাবে তাবিরীন, বুজুর্গানেদ্বীন ও হাজী সাহেবগণ। যেসব হাজী সাহেব মদিনায় মারা যায়, তাদেরকেও এখানে কবর দেয়া হয়। ওহুদ পাহাড় একটি ঐতিহাসিক দুঃখগাঁথা ও শিক্ষা গ্রহণের পাহাড়। মদিনা শহর হতে ৫ কি.মি. উত্তরে অবস্থিত। এই পাহাড়ের পাদদেশে ওহুদ জিহাদের মাঠ। এই জিহাদে রাসুল  (সা.) এর দন্ত মোবারক শহীদ হয়। আরো শহীদ হন ৭০ জন নামী-দামী সাহাবা। হুজুরের চাচা সাইয়েদুন শুহাদা হযরত হামজা (রা.)সহ ৬৫ জনের কবর এখানেই অবস্থিত এবং ৫ জনের কবর জান্নাতুল বাকীতে অবস্থিত। রাসুল  (সা.) এরশাদ করেছেন, ওহুদ পাহাড় আমাদেরকে ভালবাসে, আমরাও ওহুদ পাহাড়কে ভালবাসি। তোমরা যখন ওহুদে আসবে তখন সেখানকার বৃক্ষাদির ফল কিছু খাবে যদিও তা তিক্ত হয়। বৃহস্পতিবার দিন ওহুদ জিয়ারত করা উত্তম। হযরত হামজা, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও মোসায়াব ইবনে উমায়র (রা.)- এর মাজার ৩টি দেখতে পারেন। এবার ভক্তি ভয়ে তাদের প্রতি সালাম পেশ করুন। মসজিদে কোবা এই মসজিদটি মদিনা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে, মসজিদে নববী থেকে সাড়ে চার কি.মি. দূরে অবস্থিত। এটি মদিনার মুসলমানদের প্রথম মসজিদ মক্কা শরীফ হইতে মদিনা শরীফ হিযরত করে আল্লাহর নবী (সা.) এখানে বনু আউফ গোত্রে চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন।
সাথীদের নিয়ে পবিত্র হাতে প্রথম এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী এবং মসজিদুল আকসার পর পৃথিবীর সমস্ত মসজিদ হতে ইহা উত্তম। ইহার জিয়ারত সুন্নাত। ইহার ফজিলত অনেক বেশি। সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণিত আছে যে, নবী করিম (সা.) পদব্রজে এবং বাহনে চড়িয়া এই মসজিদে কোবা দর্শনে গমন করতেন এবং তথায় দুই রাকাত নামাজ পড়তেন। যে ব্যক্তি নিজ গৃহে অজু করে কোবা মসজিদে উপস্থিত হয়ে তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়বে তার জন্য উমরার সওয়াব অর্জিত হবে। নাসায়ী ও ইবনু মাজা মসজিদে জুমুমা এই মসজিদটি কোবার দিক থেকে রাস্তার পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত। নবী করিম (সা.) সর্বপ্রথম বনু সালিম গোত্রে এই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানে এই স্থানের নাম ওয়াদিয়ে রানুনাবা মসজিদে ওয়াদীবা আয়েশা মসজিদ।
মসজিদে গামামা ইহা মসজিদে নববী থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সন্নিকটে অবস্থিত। এখানে রাসুল (সা.) ঈদের নামাজ পড়াতেন। এখানেই বৃষ্টির জন্য ইস্তিমার নামাজ পড়েছিলেন। একবার রৌদ্রের প্রখর তাপের সময় একখ- মেঘ তার মাথার উপর ছায়াদান করছিল। সে জন্য এটা মসজিদে গামামা বা মেঘের মসজিদ নামে খ্যাত। এই মসজিদে পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ অনতিদূরে এবং পাশাপাশি মসজিদে আবুবক্কর, মসজিদে আলী, মসজিদে ওমর ফারুক অতীত স্মৃতি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আছে। এর দক্ষিণে গেলেই আন্তর্জাতিক খেজুর মার্কেট। তারই পূর্বদিকে সংলগ্ন মসজিদে উছমান গনি, এর কিছু দূরে মসজিদে বেলাল অবস্থিত। পায়ে হেঁটে এক সঙ্গে এসব মসজিদে জিয়ারত করতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ