ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাখাইনে কাজ করতে ব্যাপক বাধা আসে মিয়ানমার থেকে

৭ জুলাই, রয়টার্স : নতুন করে দেওয়া এক প্রতিবেদনে রাখাইনে নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে আনান কমিশন। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিশন গত ৮ জুন ‘সঞ্চিত অভিজ্ঞতা’ ( ) শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কমিশন গঠনের পর থেকেই মিয়ানমারের বিরোধী রাজনৈতিক শিবির থেকে বাধা আসতে শুরু করে। সেনাপ্রধান কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত কমিশনটি বিলোপ করার নানা রকম চেষ্টা করা হয়। এক পর্যায়ে আগস্টে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে সংঘাত ব্যাপক মাত্রা পায় এবং কমিশনের জন্য কাজের পরিসর জটিল রূপ ধারণ করে। কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছিল আরসা-র মতো গ্রুপগুলোর সঙ্গে কথা না বলায়। তবে নতুন প্রতিবেদনে আনান কমিশন দাবি করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গেলে কমিশনের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তো।

গঠনের পর থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল বাধার মুখে পড়েছে কফি আনানের নেতৃত্বাধীন রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন। এই বিরোধিতায় বিশেষ সরব ছিল সাবেক ক্ষমতাসীন ও সামরিক-বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ও রাখাইনভিত্তিক আরাকান ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি)। উগ্র জাতীয়তাবাদী গ্রুপ মাবা থা-এর কাছ থেকেও শক্ত বিরোধিতার মুখে পড়ে রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন। ‘বিদেশি প্রভাবের’ কমিশন দেশের ‘নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে’ দাবি করে তারা এই কমিশন ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানাতে থাকে। একই ধরনের বক্তব্য আসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তরফ থেকেও। তবে আনান কমিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাং কমিশনের কাজে সহায়তা করবেন বলে কফি আনানকে আশ্বস্ত করেন।

২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এই কমিশনের বিলুপ্তির জন্য ইউনিয়ন পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল। এএনপি, ইউএসডি ও সামরিক বাহিনীর নিয়োগ করা আইন প্রণেতাদের সমর্থন সত্তে¦ও ওই পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়।

আনান কমিশন কাজ শুরুর এক মাসের মধ্যেই ২০১৬ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইনের মংডু শহরতলী এলাকায় বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) তিনটি চেকপোস্টে সমন্বিত হামলা চালায় আরসা সদস্যরা। হত্যা করা হয় ৯ বিজিপি কর্মকর্তাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনী মাসব্যাপী ওই অঞ্চলে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালায়। ওই সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের ধারণা ওই সময়ে হত্যা করা হয় প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে।

রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন বলছে, ওই সহিংসতার মধ্য দিয়ে রাখাইন সংঘাতের ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। অনেক বছর পর প্রথমবারের মতো রাখাইনের মুসলিম সম্প্রদায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিরুদ্ধে সুসমন্বিতভাবে সশস্ত্র আক্রমণ চালাতে পেরেছিল সেসময়। রাখাইন সংঘাতে এ পরিবর্তন আনান কমিশনের কাজকে মারাত্মক জটিল করে তোলে।

প্রথমত, সামরিক বাহিনী এবং সরকারের বেসামরিক অংশ রাখাইনের সংঘাতকে ক্রমাগতভাবে সন্ত্রাসবাদ ও পাল্টা সন্ত্রাসবাদের দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো। দ্বিতীয়ত, অন্য অংশে সহিংসতা না ছড়ালেও রাখাইনের প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়ে পড়ে, যদিও রাজ্যের অন্য অংশে সহিংসতা ছড়ায়নি। আর তৃতীয়ত, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সম্পর্ক ব্যাপকভাবে খারাপ হতে থাকে।

সহিংসতার পর জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেছিল রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন। আর সে উপলব্ধি থেকে ২০১৭ সালের মে মাসে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা। ওই প্রতিবেদনে প্রাথমিক কিছু সুপারিশ করা হয়। তবে ওই বছরের আগস্টে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার আগে পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি সুপারিশই বাস্তবায়ন করা হয়।

২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট ইয়াঙ্গুনে সংবাদ সম্মেলন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন। তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনের করা ৮৮টি সুপারিশই অনুমোদন করেন অং সান সু চি। নিন্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে না দিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কথাও বলেন তিনি। তবে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল বলে জানিয়েছে কমিশন। ২৫ আগস্ট এক বিবৃতিতে সেনাপ্রধান প্রতিবেদনে ভুলত্রুটি আছে বলে দাবি করেন।

আনান কমিশন বলছে এই সমালোচনার শিকার হওয়ার আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের দশ দিন আগে কমিশন সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করেছে। খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাং-এর সঙ্গেও আলাপ হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। এসব বৈঠকে সেনাবাহিনী প্রতিবেদনের কয়েকটি বিষয় নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল। এর বেশিরভাগই ছিল ঘটনার বর্ণনা নিয়ে। এছাড়া নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতা এবং আরসার হুমকিকে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না দাবি করেও প্রতিবেদনের সমালোচনা করা হয়।

রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশের আট ঘণ্টার মাথায় মংডুর ৩০টি নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে সমন্বিত হামলা চালায় আরসা। অনেক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের ধারণা ওই হামলার কারণে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। ওই হামলার জবাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ওই এলাকায় ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু করলে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনকে নিন্দিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের কাজ দেওয়া হয়নি। নতুন প্রতিবেদনে কমিশন বলছে, ওই দায়িত্ব না দেওয়াই ভালো হয়েছে, কারণ এই ধরণের তদন্ত অন্য কারও করাটাই ভালো।

নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক কোনও কোনও পক্ষ কমিশনের বিস্তারিত সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণে একটি আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি তৈরির কথা বলছেন। তবে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়ার পক্ষে আনান। তিনি মনে করেন, পর্যবেক্ষণ ম্যাকানিজম তৈরির চেয়ে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে অগ্রগতির ওপর নজর রাখা যেতে পারে।

কমিশন বলছে, সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ, ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কমিশনের পর্যাপ্ত জনবল নেই। আর এর কোনও বিকল্প তৈরি হলে মিয়ানমার সরকার এবং কমিশনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় অনাস্থা তৈরি করতো। কমিশন বলছে, রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার কাছে রিপোর্ট করার নীতির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা নিন্দিষ্ট করে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত আর সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।

কমিশন বলছে রাখাইনের কেউ কেউ বর্জন সত্তে¦ও তারা সেখানকার সমান সংখ্যক বৌদ্ধ ও মুসলিম স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করতে সমর্থ হয়েছে। কমিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধুমাত্র নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের জাতীয় কমিশনারদের ঢাল হিসেবেও কাজ করেছে এই ভারসাম্য। কারণ আনান কমিশনকে প্রবেশাধিকার দেওয়ায় তাদের কেউ কেউ স্থানীয় সংসদীয় আসন থেকে চাপের মুখে ছিলেন।

নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপুলসংখ্যক স্টেকহোল্ডারের বক্তব্য নিতে গিয়ে কমিশন আরসা ও আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে বাদ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বাস্তবে এটা কখনোই কোনও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতো না। যদি কোনও যোগাযোগ চ্যানেল প্রতিষ্ঠিত হতো আর আরসা যদি কয়েকটি কারণে প্রকাশ্যে আসার সিদ্ধান্ত নিতো তাহলে তাতে কমিশনের মৃত্যুঘণ্টা বেজে যেত।’

সরকার সম্ভবত একে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচনা করতো আর মিয়ানমারের জনমত আবশ্যিকভাবে কমিশনের বিরুদ্ধে চলে যেত।

তবে রিপোর্টে কমিশন বলেছে, কমিশনের আরও অন্তত একবার মংডু এবং বুথিডং শহরতলী সফরে যাওয়া উচিত। কারণ হিসেবে দাবি করা হয়েছে, ওই এলাকায় তাদের কার্যকালে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরসার আক্রমণের পর রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাটকীয় পরিবর্তন সত্তে¦ও কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করে কমিশন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ