ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাসুলুল্লাহ (স.) এর আদর্শ

-মনসুর আহমদ
॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
মানবিক যুক্তির স্থায়ী কোন মান নেই। সময় বা ব্যক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে তার পরিবর্তন ঘটে। এ কারণে যুক্তি ভিত্তিক আইন সর্বদা কল্যাণকর হয় না। কিন্তু ইসলামী আইন মানবিক যুক্তিকে পরিবর্তনীল উপাদান এবং ওহীকে স্থায়ী উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে। তাই ইসলামী আইন মানুষের জন্য কল্যাণের স্থায়ী  উৎস।
বিশ্বের যাবতীয় বস্তু পরস্পরের সাথে সম্পর্ক যুক্ত এবং এই সম্পর্কের মধ্যে একটা নিয়ম শৃঙ্খলা বিদ্যমান যা প্রাকৃতিক আইন বলে পরিচিত। বিশ্বপ্রকৃতির বিভিন্ন বস্তুর মতো মানুষ ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত।  যেহেতু মানুষ আত্মসচেতন ও স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী, তাই সে প্রাকৃতিক জগতের মতো কোনো স্বতঃস্ফুর্ত নিয়মের অধীন নয়। কাজেই তার আচরণে শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজন অন্য এক নিয়ম। এই প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ্য রেখেই মানুষের জন্য আল্লাহ  ইসলামী আইন প্রদান করেছেন। 
সমাজ ও রাষ্ট্র পত্তনের অনেক পূর্বেই এসেছে আল্লাহর আইন। এ আইন বাস্তবায়নের জন্যই হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন। ‘আল্লার আইনের অস্তিত্ব মানুষের উপর নির্ভর করে না। প্রাকৃতিক নিয়মের ভিত্তিগুলো যেমন প্রকৃতিতে বিদ্যমান রয়েছে এবং বুদ্ধিমত্তা দ্বারা বোধগম্য হয়, তেমনি ইসলামী আইনের নীতিগুলো আল্লাহর পয়গম্বরের কাছে নাযেল হয়- এবং অনুরূপভাবে ইসলামী ভাবাদর্শের মধ্যেই এর তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। এ আইনের মূল সার বস্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে উম্মুল কিতাবে (মৌলিক গ্রন্থ বা প্রকৃতিতে) লিপিবদ্ধ রয়েছে ও  রসুলে আক্রাম হজরত মুহম্মদের (সঃ) প্রতি  কাল বা অবস্থা অনুযায়ী ধীরে ধীরে নাজিল হয়েছে। (৭)’ যা পবিত্র আল কোরআন  নামে পরিচিত।
ইসলামী আইনের প্রধান ও শ্রেষ্ঠতম উৎস হচ্ছে পবিত্র কোরআন।  সর্ব ধর্মবেত্তা ও আইনবিদ এ সম্বন্ধে একমত পোষণ করেছেন যে, আল কোরআনই আইনের অবিসংবাদিত উৎস। পবিত্র কোরআন পরিষ্কার ভাষায় রাসুলুল্লাহ (সঃ)কে অন্যান্য দায়িত্বের সাথে আইন প্রণেতা, বিচারক ও প্রশাসক সাব্যস্ত করেছে। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- “ তিনি তাদেরকে ন্যায়ানুগ কাজের আদেশ করেন, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখেন, তাদের জন্য পাক জিনিস সমূহ হালাল এবং নাপাক জিনিস সমূহ হারাম করেন। আর তাদের উপর থেকে সেই বোঝা সরিয়ে দেন যা তাদের উপরে চাপান ছিল। এবং সেই বন্ধন সমূহ খুলে দেন যাতে তারা বন্ধী ছিল । (আরাফ-১৫৭)
আরও ইরশাদ হচ্ছে- “রসুল (সঃ) তোমাদের জন্য যা কিছু দেন তা গ্রহণ কর, আর যে জিনিস থেকে বিরত রাখেন (নিষেধ) করেন তা থেকে বিরত থাক। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তি দাতা। (হাশর -৭)  
উল্লেখিত আয়াত সমূহ থেকে এ বিষয় সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তা’আলা নবীকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (Legislative Power) প্রদান করেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল করা আদেশ নিষেধ ছাড়াও মহানবী (সঃ) যা কিছু হালাল হারাম ঘোষণা করেছেন অথবা কোন ব্যাপারে আদেশ বা নিষেধ করেছেন তা তাঁর প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। যে কারণে তাও আল্লাহর আইনের অংশ বিশেষ। কালামে পাকের ভাষণের ভিত্তিতে আসহাবে কেরামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সকল মুসলমান  ঐক্যবদ্ধভাবে স্বীকার করেন যে মহানবী (সঃ) কর্তৃক প্রদত্ত বিধান কোরআন মজিদের পরে আইনের দ্বিতীয় উৎস। 
আইন শাস্ত্রের একটি স্বতঃসিদ্ধ মূল নীতি হল এই যে,  ‘আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা যার রয়েছে  তিনি যদি একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশ প্রদান করেন, অথবা একটি কাজের নির্দেশ প্রদান করেন, অথবা একটি  নীতি নির্ধারণ করে নিজের অধীনস্থ কোন  ব্যক্তি বা সংস্থাকে তার বিস্তারিত কাঠামো সম্পর্কে নীতিমালা প্রণয়নের এখতিয়ার  প্রদান করেন, তবে তার প্রণীত নীতিমালা  আইন -বিধান  থেকে স্বতন্ত্র কোন জিনিস নয়, বরং তা ঐ  আইনের অংশ হিসেবে গণ্য হয় (৮)’। আল্লাহ তা’আলা আইন প্রণয়নে এই নিয়ম ব্যবহার করেছেন। কোরআন মজিদ সংক্ষিপ্তাকারে বিধান পেশ করেছে, আর রসুল (সঃ)ঐ আইনের বিস্তারিত রূপ কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এ কারণেই রসুলের বক্তব্যমূলক ও কর্মমূলক বর্ণনা কোরআনের আলোকে আইনের একটি অংশ।
সুন্নাহর পরে ইসলামী আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয় ইজমাকে। ইজমা কি? ইজমা এক জনের অভিমত নয়, বরং একাধিক আইন তত্ত্ববিদের সম্মিলিত ঐক্য মত ভিত্তিক সর্বজন সিদ্ধান্ত। কোন কোন আইনবিদ বলেন, কতিপয় আইনবেত্তা যদি ঐক্যমতে পৌঁছেন এবং তার বিরুদ্ধে কোন রূপ ওজর আপত্তি না থাকে (ইজমা আসসবুত) অথবা যদি অধিক সংখ্যক আইনবিদ একটি মত প্রকাশ করেন এবং মাত্র কয়েক জন এর বিরোধিতা করে থাকেন তবে সেই ঐক্যমতই  ইজমা মুসলিম সমাজের উপর সর্বতো ভাবে প্রযোজ্য হবে। যেহেতু হজরত মুহম্মদ (সঃ) -এর পরে কোন নবী আসবেন না এবং ওহী ও আসবে না,  তাই সর্বযুগের চাহিদা মিটাবার জন্য ইজমার মাধ্যমে ইসলামী পদ্ধতিতে আইন প্রণয়ন সম্ভব। প্রকৃত পক্ষে আল কোরআনের ও হাদিসের বহু নির্দেশ ও উপদেশ রয়েছে,  যা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে আল্লাহর আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের অধিকার ও দায়িত্ব সমস্ত সমাজের, আর ইজমাতে অংশ গ্রহণকারীদের পক্ষে অবশ্যই মুজতাহিদ হওয়া প্রয়োজন।
বহুল উদ্ধৃত একটি হাদিস ইজতেহাদ তথা ইজমাকে সমর্থন দান করে। হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) গভর্ণর নিযুক্ত হওয়ার পর যখন বললেন যে, কোরআন ও সুন্নাহ থেকে তিনি যদি কোন সমাধান খুঁজে না পান তবে  ‘আজতাহাদু বি রাই’ অর্থাৎ আমি ইজতেহাদ করব। তখন রসুল সঃ) হাত তুলে বলেছিলেন, আল হামদু লিল্লাহ(৯)।  এ হাদিস ইজমা বা ইজতেহাদের ব্যাপারে সমর্থন জোগায়। সেই ইজমাকে আইনের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা দানের গৌরব প্রকৃপক্ষে রসুলুল্লাহ (সঃ)র ।
ইসলামী আইনের চতুর্থ উৎস কিয়াস। কিয়াস হল কোন প্রতিষ্ঠিত সূত্র থেকে যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। যে আইন ওহী বা ইজমার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার পরিপুরক রূপে কিয়াসকে গ্রহণ করা  হয়ে থাকে। তাই বলা চলে, কিয়াস নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করে না। বরং প্রতিষ্ঠিত আইনকে একটি বিশেষ সমস্যা সমাধান কল্পে বিস্তৃত করে। এই দৃষ্টিকোন থেকে ইজমা যেমন আল্লাহর আইন, কিয়াসকে তেমনি আল্লাহর আইন বলা যায়। ইজমা যেমন অবশ্য প্রতিপাল্য, কিন্তু  কিয়াস তদ্রুপ নয়। যদি দেখা যায় প্রত্যাদিষ্ট আইন বা ইজমার সাথে কিয়াস ভিত্তিক আইনের সংঘর্ষ আছে, সে ক্ষেত্রে কিয়াস ভিত্তিক আইন স্বাভাবিক ভাবে অগ্রাহ্য হবে। সকল আইন তত্ত্ববিদ এমত পোষণ করেন যে,  মূল বিধি হতে কিয়াসের মাধ্যমে গৃহিত বিধির অবরোহন যুক্তিবহ হবে।
আইনের বিধি নির্মানে প্রথা ও রীতির অবদান প্রচুর। রসুল (সঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকে জীবনের শেষ কাল পর্যন্ত আরব দেশের বহু প্রথাকে অবিকল চালু রেখে ছিলেন যা কোরআন বা হাদিস রদ করেনি। অনেক গুলি সম্পর্কে রসুল নীরব ছিলেন। এ সব প্রথা ও রীতি নীতিকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রত্যাদিষ্ট বা ইজমা ভিত্তিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক প্রথাকে আইন বলে গ্রহণ করা হয় না। এ দিক দিয়ে প্রথাভিত্তিক আইন কিয়াস ভিত্তিক আইনের সমমর্যাদা সম্পন্ন। রসুল (সঃ) প্রথাকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করে পরবর্তী যুগের মানুষের জন্য আইন প্রণয়নের এক উন্মুক্ত পথ রেখে গেলেন।
ষ্টোয়িক ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ষোড়শ শতাব্দীর ব্যরণ দ্য মঁতেসকিউয়ে প্রচলিত প্রথাকে আইনের সমমর্যাদা প্রদান করেন। তিনি বলে, আইন এবং নির্দিষ্ট ও প্রচলিত প্রথার মধ্যে কোন অসংগতি নেই।  তিনি মনে করেন, সংবিধান তৈরীর ব্যাপারে আইন প্রণেতাকে জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তার মূলে যে সব সামাজিক ও প্রাকৃতিক প্রভাব বিরাজমান সে গুলি বিশেষ ভাবে অনুধাবন করতে হবে। ইসলামী অইনে বিশেষ শর্তে প্রথাকে  যেমন আইনে পরিণত করা হয়েছে, তেমনি বোঁদাও  প্রথা ও আইনের মধ্যে পার্থক্য নিরুপন করেছেন।  তিনি বলেন, সার্বভৌমের নির্দেশই আইন। আইন প্রথার অবসান ঘটাতে পারে কিন্তু আইনের অবসান প্রথা দ্বারা সম্ভব নয়।
পশ্চিমা আইনের উপরে ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব কেন তা পশ্চিমা আইনতত্ত্ববিদ ও দার্শনিকগণ নিজেরাই ব্যাখ্যা করেছেন। পশ্চিমা আইন তত্ত্বে সার্বভৌম ইচ্ছাই হচ্ছে রাষ্ট্রের আইন। এই সার্বভৌম নিয়ে তাদের চিন্তার ঐক্য আজও সৃষ্টি হয়নি। তারা মনে করেন, সার্বভৈৗম ক্ষমতা হল চরম, অসীম ও অনিয়ন্ত্রিত ।  যা কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির মধ্যে থাকা  সম্ভব নয়। পশ্চিমা আইনতত্ত্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন প্রতিক্রিয়া সংসদ তথা জনগণের অংশ গ্রহণের উপর ন্যাস্ত । কিন্তু জনগণ বা সংসদ  মানুষের জন্য কল্যাণকর ও অভ্রান্ত আইন প্রণয়ন করতে পারে না। তার ব্যাখ্যা করে জ্যাঁ জাক্ রুশো যে মন্তব্য করেছেন তা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, “সাধারণের ইচ্ছা সর্বদাই অভ্রান্ত  এবং জনকল্যাণমুখী ; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জনগণের আলাপ আলোচনা সর্বদাই সমভাবে বিশুদ্ধ হবে। আমাদের ইচ্ছা সর্বদাই আমাদের মঙ্গলের জন্য, কিন্তু সেটা যে কি সব সময় আমরা তা’ উপলব্ধি করতে পারি না; মানুষ কখনও দুর্নীতিগ্রস্ত নয়, কিন্তু প্রায়শঃই বিভ্রান্ত হয় এবং কেবল এইসব ক্ষেত্রে যা খারাপ তা ইচ্ছা করতে দেখা যায়।”(১০) Blind multitude common herd Legislator
তিনি মনে করেন, যে মঙ্গল তারা  উপলদ্ধি করে, তা তারা অনুসরণ করে না। আবার জনগণ যে মঙ্গল ইচ্ছা করে তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না, কাজেই উপলব্ধি এবং ইচ্ছার মধ্যে সামঞ্জস্য দরকার।  গণতন্ত্রের উপাসক হয়েও রুশো জনগণকে “অন্ধ জনতা” (Blind multitude, “অভিন্ন যুথ” (common herd) ইত্যাদি আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, লক্ষ্য দেখতে পায় কিন্তু লক্ষ্যে উপনীত হবার উপায় সম্বন্ধে তাদের কোন ধারণা নেই। এখন প্রয়োজন তাদের লক্ষ্যের পথ দর্শানো।  পথ দেখানোর জন্য প্রয়োজন বিধায়ক (Legislator)। তাঁর বিধায়ক সাধারণের ইচ্ছার সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ মাত্র।  তিনি মোজেস, মোলন বা লাইকারগ্যাসের মতো ব্যক্তিকে বিশেষজ্ঞের প্রতীক রূপে উপস্থাপিত করেছেন। রুশোর বিধায়ক আইনের খসড়া রচনা করতে পারেন, আইনের কার্যকর ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়নি।
ইসলামী আইনতত্ত্বের সংস্পর্শে আসতে না পেরে পশ্চিমা আইনতত্ত্ববিদগণ সার্বভৌম, সংসদ ও বিধায়কের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। ইসলামী আইন রসুল (সঃ) কে সার্বভৗম ও বিধায়কের মর্যাদা প্রদান করেছে। ইসলামী আইনে একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই সার্বভৌম। কিন্তু তিনি রসুলকে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন; যে কারণে আল্লাহর পরেই রসুল হলেন সার্বভৌম । রুশো যদি মোজেস বা মোলনের পাশাপাশি রসুল (সঃ)কে বিধায়ক বা (Legislator) হিসেবে উল্লেখ করতেন তা হলে মানবতার কল্যাণের জন্য আইন অন্বেষণে কোন সংকট থাকত না।
রুশো সহ বিভিন্ন আইনতত্ত্ববিদদের আইনের ব্যাখ্যা বিভিন্ন এবং তাঁদের প্রদত্ত অইনও মানব কল্যালের জন্য ব্যর্থ। যদি আমরা পশ্চিমা আইনের ব্যর্থতার দিকে তাকাই, তাহলে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সংসদ বা অন্ধ জনতা নির্ভুল অইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে না। যেমন অবৈধ হত্যার জন্য ইসলামী আইনে শাস্তির বিধান মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু মানবতাবাদীরা শাস্তি হিসেবে প্রাণদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। যে কারণে মৃত্যুদণ্ড রহিত করা বাঞ্ছনীয় কি না তা অনুসন্ধান করার জন্য ১৯৪৯ সালে গ্রেট ব্রিটেনে একটা রাজকীয় কমিশন নিযুক্ত করা হয়, যারা মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে রিপোর্ট পেশ করে।  নিউজিল্যাণ্ডে প্রাণদণ্ড প্রথাকে  রহিত করা হয় ১৯৪১ সালে এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা  হয়েছে  ১৯৫০ সালে। সিংহল ১৯৫৭ সালে প্রাণদণ্ডাদেশ প্রথা বাতিল করে। আবার  ১৯৫৯ সালে সিংহলে মৃত্যদণ্ড প্রথাকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। (১১)
মানবীয় আইনের বিরাট ব্যর্থতার উদাহরণ মার্কিন শাসনতন্ত্রের অষ্টাদশ সংশোধনীর মদ্য নিবারণ আইন। উক্ত আইন কার্যকরী করণে মোটামুটি ব্যয়ের পরিমান ছিল ৬৫ কোটি পাউণ্ড। এ ছাড়া উক্ত আইন কার্যকরী করার ব্যাপারে দু’শ ব্যক্তি নিহত, ৫লক্ষ ৩৪ হাজার ৩শত ৩৫ জন কারারুদ্ধ, এক কোটি ষাট লক্ষ পাউণ্ড জরিমানা এবং ৪০ কোটি ৪০ লক্ষ পাউণ্ডের মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু আইনটি বাস্তবে ব্যথর্ হওয়ায় ১৯৩৩ সালে আইনটি বাতিল করা হয়। (১৩) কিন্তু মদ্য পান নিবারনেরজন্য ধাপে ধাপে অবতীর্ণ ইসলামী আইন দেড় হাজার বছর ধরে চালু রয়েছে। এ ভাবে মানবীয় আইনের মোকাবেলায় খোদায়ী আইনের সার্থকতার প্রচুর উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। যা প্রমাণ করে যে আইন প্রণয়নকারী হিসেবে রসুল(সঃ)-ই বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি।
আইন প্রণয়নকারী হিসেবে রসুলের মর্যাদা গোটা বিশ্বের ও সমগ্র কালের যে কোন আইনপ্রনয়ন কারী ব্যক্তি বা সংস্থার ঊর্ধ্বে। আইনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত বা সমাজগত ভাবে মানবের কল্যাণ সাধন করা। ইসলামী আইন মানবকল্যাণকে শুধুমাত্র ইহলোকেই সীমাবদ্ধ রাখতের  চায় না। এ ব্যাপারে কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “ আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের নিকট এক নূরও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় এর দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন।” (মায়েদা) ইসলামী আইনের চিরন্তনতা ও ব্যাপকতা স্থান-কালের সীমার ঊর্ধ্বে। ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্র তামাম দুনিয়ার কল্যাণেই নিয়োজিত। আইনের বা রাষ্ট্রের এই বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন রাষ্ট্র, ধর্ম বা ব্যক্তিতে নেই ; যে কারণেই ইসলামী আইন প্রণয়নে রসুলের মর্যাদা সমগ্র আইন প্রণয়নকারী সংস্থার ঊর্ধ্বে।
আল্লাহর নির্দেশেই রসুল (সঃ) প্রতিষ্ঠা করেন আল্লাহর আইনানুগ সরকার। এই আইনানুগ সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন স্বয়ং রসুল (সঃ)। ইসলামকে সার্বজনীন ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। নিজ প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রসুল(সঃ) নিজকে ঘোষণা দেননি বা বা জনসাধারণ নির্বাচন করে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান বানান নি। তিনি ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা রেসালতের মর্যাদা থেকে আলাদা নয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রসুলের আনুগত্য প্রকারন্তরে আল্লাহরই আনুগত্য। যে কারণে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রসুলের আনুগত্য অস্বীকার করা বাস্তবে ইসলাম থেকে বহিস্কার হয়ে যাওয়া। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মর্যাদার অধিকারী রাষ্ট্রপ্রধান দ্বিতীয় কেউ নেই।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রসুল (সঃ)- এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রচলন। আধুনিক কালে সরকারী কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের ফলে সরকারী প্রশাসক তথা আমলাদের সংখ্যাই কেবল নয়, তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির ব্যাপক প্রসার ঘচেছে। সাথে সাথে প্রশাসকদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটিও অত্যন্ত জরুরি হয়ে দেখা  দিয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থেই প্রশাসনিক জবাবদিহিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রায় দেড় হাজা বছর পূর্বে এই প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও তা অর্জনের উপায় সম্পর্কে রসুল (সঃ) মৌলিক তত্ত্ব প্রদান করেছে।সে তত্ত্ব বর্তমান প্রশাসনিক  জবাবদিহিতা অর্জনের উপায় হিসেবে রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা Political Accountability আইনগত দায়িত্বশীলতা Legal Accountability ও পেশাগত দায়িত্বশীলতা Professonal Accountability সমূহের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। (১৪) এই জবাবদিহিতা (Accountability) যা একটি রাষ্ট সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার  জন্য একান্ত প্রয়োজন সে সম্পর্কে সম্পর্কে রসুল (সঃ) বহু শতাব্দী আগে ঘোষণা করেন, “আলা কুল্লুকুম রায়েন ওয়া কুল্লুকুম মাস্উলুন আন রাইয়াতিহি”- তোরা জেনে রেখ যে, তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রক্ষক বা রাখাল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তত্ববধায়ক হিসেবে তার অধীনস্থ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব যিনি নেতা এবং মানুষের উপরে নেতৃত্ব করছেন তাকে তার অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে । পুরুষ তার পরিবারের সদস্যদের উপরে কর্তৃত্ব করে, সুতরাং তাকে পরিবারের অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী হচ্ছেন গৃহের কর্ত্রী, এবং সন্তানদের দায়িত্বশীলা, সুতরাং তাকে এদের সকলের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (১৪) রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে এই জবাবদিহিতার চর্চা রসুলের সর্বোত্তম রাষ্ট্র নায়কের বৈশিষ্ট্যের প্রমান। সুষ্ঠু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এই জবাবদিহিতার চর্চা বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইনসাফ ও ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম আদর্শ রসুল  (সঃ) ।পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রপ্রধানই এমন সুন্দর ভাবে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার উদাহরণ পেশ করতে পারবে না। বর্তমান কালের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসকগণ ইনসাফও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা ও দাবি করেন কিন্তু নিজেরা ন্যায়নীতি পালনে প্রস্তুত নন। যে কারণে আজ বিশ্বময় ন্যায়নীতির এমন বিপর্যয়।
ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সফলতার পিছনে যে বিষয়টি বর্তমান ছিল তা হল খোদা ভীতি ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস। বর্তমান কালে আইনের পেছনে যে সার্বভৌমের কল্পনা করা হয় তার অস্তিত্ব সাময়িক ও ইজগতের সথে সম্পৃক্ত। রাসুল (সঃ) ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইহলৌকিক বিশাল আয়োজনের সাথে পরকালের প্রতি গভীর প্রত্যয় বোধ সংযোজন কিেছলেন  যে কারণে বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান কালের রাষ্ট্র প্রধানগণ যদি প্রশাসনকে পারলৌকিক বিশ্বাস উদ্ভুত রুচি বোধের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন তবে প্রশাসন ক্ষেত্র থেকে অন্যায়, দুর্নীতি দূর হবে এবং রাষ্ট্র কল্যাণময় রূপ লাভ করবে।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রসুল (সঃ) সার্ববৌমত্বের যে ধারণার উপরে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রশাসন কার্য প্রতিষ্ঠিত করেন তা- ই বিশ্ববাসীর জন্য মঙ্গলময়। তিনি আসমানী বিধান হিসেবে শরিয়তের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে কোন রাষ্ট্র জনগোষ্ঠীর সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ইসলাম বিঘোষিত ন্যায় বিচার ও অধিকারের পথে বাধা সৃষ্টিকারী কোন মতামত ইসলাম সমর্থন করে না। এক জাতি অন্য জাতির স্বার্থ নষ্ট করতে পারে না। বা অন্য জাতির কল্যাণ উপেক্ষা করে কোন জাতি তাদের আইন প্রয়োগ করতে পারে না। অনুরূপ ভাবে সংখ্যাগরিষঠ দল অন্যায় ভাবে সংখ্যালঘিষ্ট দলের স্বার্থ বিরোধী আইন প্রণয়ন করতে পারে না যদিও তা সাধারণ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বলে গন্য করা হয়। রসুলের সার্বভৌমত্বে ধারণা ব্যাপক ভাবে বিশ্বমানবের কল্যাণের সাথে জড়িত। তাই বর্তমান অশান্ত বিশ্বের প্রয়োজন রসুলের সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করা।
শুধু আইনের মূলনীতি প্রণয়নই নয় বরং রসুল (সঃ) রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মদীনায় ইহুদী ও পৌত্তলিকদের সাথে যে চুক্তি করে ছিলেন তা ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের কল্যাণ ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্র ভিত্তিক চুক্তি।  প্রকৃত পক্ষে এ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমেই মুসলমানরা একটি আলাদা জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং একটি ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়।
মদীনার এ চুক্তি ছিল একটি মূল্যবান আন্তর্জাতিক চুক্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী মুসলমানর ভিন্ন ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রের সাথে জোট ভুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক কালের লীগ অব নেশনস। এ চুক্তি সম্পাদন করে রসুল (সঃ) একটি সার্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম করে ছিলেন। এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নয়া ভিত্তি স্থাপন করেন। (১৫) আধুনিক রাষ্ট্র নায়কদের জন্য এতে রয়েছে এক বিরাট আদর্শ।  রসুলের সম্পাদিত চুক্তি ভালকরে করলে দেখতে  পাওয়া যাবে যে এ চুক্তির মধ্যে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট মহৎ উদ্দেশ্য।  এই উদ্দেশ্য হল স্বাধীন ভাবে ধর্মমত প্রচার এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে ধমর্  পালন করার অধিকার প্রতিষ্ঠা । এ ভাবেই তিনি সর্বকালের রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য রখে গেলেন স্থায়ী বিশ্বশান্তিপ্রতিষ্ঠার নীতি ও উদাহরণ।
রসুলের শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্য এই নয় যে বিজিত জাতিকে চিরদিন অধীনস্ত  রাখা, বঞ্চিত রাখা এবং তাদেরকে অপমানিত করা।বরং ইসলামে শান্তি চুক্তির অর্থ হচ্ছে শত্রু বা বন্ধু উভয়ের জন্যই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রসুল (সঃ) যে সমস্ত চুক্তি পরিচালনা করেছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল ন্যায় বিচার ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বৈরাচার দমন করা। আধুনিক বিশ্বনেতৃবৃন্দ দাবি করেন যে, যুদ্ধের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল  ন্যায় বিচার, সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচার দমন। কিন্তু তাদের এ দাবি আল্লাহর প্রাতি বিশ্বাসের  শক্তিতে বলীয়ান নয়, যে কারণে ইউরোপীয় শক্তি সমূহের ১৮৭০ সালের যুদ্ধ, ১৯১৪ সালের যুদ্ধ এবং  ১৯৩৪ সালের যুদ্ধের  কারণ হতো না। 
চুক্তি প্রণয়নই নয়, চুক্তির কার্যকারীতা রক্ষার বিরাট আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন রসুল (সঃ)। চুক্তি সম্পাদন করার পর তার শর্তাবলী ভঙ্গ করা অশান্তির কারণ। নিজ স্বার্থের বিপক্ষে  চুক্তির শর্তাবলী যতই ক্ষতিকর হোক না কেন তা ভঙ্গ করা অন্যায়। এ সত্য প্রতিষ্ঠায় সন্ধির মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে আবু জান্দালকে রসুল (সঃ ) শত্রুদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আর এ ভাবেই তিনি উত্তম রাষ্ট্রপ্রধানের আদর্শ হিসেবে সন্ধির মূল প্রতিশ্রুতি পালন  করলেন শত অসুবিধা ও বেদনা থাকা সত্ত্বেও। রসুলের  হোদায়বিয়ার চুক্তি ও বিভিন্ন চুক্তির অনুসরণই বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস হতে পারে। 
একজন উত্তম রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে রসুলের আইন প্রয়োগ নীতি সর্ব কালের জন্য উত্তম আদর্শ। আইনের ক্ষেত্রে তিনি ধীরে ধীরে উন্নয়নে পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রথমে তিনি মানুষের মনে ইসলামের মর্মবাণী পৌঁছাবার ও তা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন।  পরবর্তী কালে মদীনায় তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ধীরে ধীরে জাহেলিয়াতে যুগের আইন সমূহ পরিবর্তন করে তদস্থলে ইসলামী আইন স্থাপন করেন। যেমন উত্তরাধিকারী আইন  তৃতীয় হিজরীতে, বিবাহ ও তালাকের আইন সপ্তম হিজরীতে, ফৌজদারী আইন অষ্টম হিজরীতে এবং সূদ সম্পর্কিত আইন নবম হিজরীতে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। রসুলের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ ছিল মানুষের নির্ভেজাল কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে, সে কারণে ইসলামী আইন বাস্তবায়নে শাসক ও শাসিতের মাঝে কখনই জটিলতা সৃষ্টি হয়নি।
ইসলামী আইন কতিপয় আদেশ নিষেধের স্বেচ্ছচার নয়, বরং মানুষের অধিকার ও কর্তব্য বর্ণনা ও তা প্রতিষ্ঠা ইসলামী আইনের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে তিনি সমাজকে এমন নৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদান করলেন যেন সব মানুষ খোদার কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতিতে বিনম্র হয়। তাদের রুচি ও সংস্কৃতি গড়ে উঠল পরকালের গভীর প্রত্যয় বোধের উপরে। ফলে ইসলামী আইন সহজ ভাবে সমাজ কর্তৃক গৃহিত হল।
আইন প্রণয়নের পূর্বে একটি জাতির মাঝে আইন গ্রহণের এমন মনোবৃত্তির নজির সৃষ্টি পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। পৃৃথিবীতে আইনের প্রতি উপেক্ষা গ্রহণের অনীহা ও আইন ভঙ্গের প্রবণতা আজ চরমে উপনীত, কারণ অইন গ্রহণের ফলে ব্যক্তি -সমাজে কল্যাণ ও মঙ্গল সৃষ্টির প্রতি মানব মনের সন্দেহ। যে কারণে যতই সুন্দর আইন প্রণয়ন হোক না কেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেঁচে যাবার চতুরতা অবলম্বন মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা ও সামাজিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন বাস্তবায়নে আজ তাই রসুলের আদর্শে মানব মনোভাব প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
রসুল (সঃ) একদিকে যেমন ছিলেন আইন প্রণয়নকারী, প্রয়োগকারী সার্বভৌম সত্তা, অন্যদিকে ছিলেন আইনের ব্যাখ্যাকারী আদর্শ বিচারক। বিচারকের অবহেলা দুর্বলতার কারণে আইন বর্তমান থাকা সত্ত্বেও আইনের সুফল থেকে সমাজ বঞ্চিত হয়। ন্যায় বিচার আইনকে মহীমান্বিত করে তোলে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ