ঢাকা, রোববার 8 July 2018, ২৪ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যুদ্ধ নয় আলোচনাতেই সমাধান দেখছেন নতুন মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট

অভিযানে মেক্সিকোতে প্রাণ হারিয়েছেন আড়াই লাখ মানুষ

৭ জুলাই, রয়টার্স : মাদক আর অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন এক পরিকল্পনা হাজির করেছেন মেক্সিকোর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওবরাডোর। এই পরিকল্পনার আওতায় কারাদ-ের মেয়াদ কমানো ও অস্ত্রের ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে। সমন্বিত এই পরিকল্পনাকে বলা হচ্ছে ‘রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার’। মাদক নির্মূলে নিয়োজিত থাকা সেনাদের ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হবে। দারিদ্র্যের কারণ চিহ্নিত করে তা মোকাবিলাতেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হবে। লোপেজের প্রস্তাবিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওলগা সানচেজ ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত জানিয়েছেন।

এক দশকের বেশি সময় ধরে মাদকবিরোধী যুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে মেক্সিকো। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন দুই লাখেরও বেশি মানুষ। শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকে নিহত হলেও বন্ধ করা যায়নি মাদকের ব্যবহার। গত রোববারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আগামী ১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাওয়া মেক্সিকোর বামপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ লোপেজ এখন অন্য উপায় খুঁজে দেখায় মনোযোগ দিয়েছেন।

রোববারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া লোপেজ দেশটির মাদকবিরোধী যুদ্ধের নিয়ম-কানুন নতুন করে নির্ধারণ করতে চান। আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ও বর্তমানে নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকা অনেককে দায়মুক্তি দেওয়া হবে।

লোপেজ ওবরাডোরের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওলগা সানচেজ রয়টার্সকে বলেছেন, সরকারের সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হলো ‘রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার’। সাধারণত রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচারে অপরাধীরা খানিকটা প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। একটি ট্রুথ কমিশন তাদের অপরাধের ঘটনা তদন্ত করে আর তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু দায়মুক্তি হবে না বরং এতে জেলের মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া হবে।’

সানচেজ বলেন, ‘আমরা নিরাপরাধীকরণের প্রস্তাব করবো, ট্রুথ কমিশন গঠন করবো, দারিদ্র্যের কারণ হবে আমাদের লক্ষ্যবস্তু, তরুণদের বৃত্তি দেবো আর মাদক বাস্তবতা থেকে তাদের বাইরে আনার ক্ষেত্রে কাজ করবো।’

সানচেজ বলেন, নতুন নীতি হবে সমন্বিত একটি জননীতি। আর এটার লক্ষ্য হবে জাতিকে প্রশমিত করা। তাদের প্রশাসনের লক্ষ্য হবে পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার করার মাধ্যমে তিন বছরের মধ্যে রাজপথ থেকে সামরিক শক্তির বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া। তিনি জানান, ‘বন্দরে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই জোরদার করবে তাদের সরকার। এছাড়া অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে শুল্ক বিভাগের নজরদারি কঠোর করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়া বিবেচনা করতে সানচেজের দল কলম্বিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর বিস্তারিত গবেষণা শুরু করেছে। কলম্বিয়ার বৃহত্তম গেরিলা গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের শান্তি স্থাপনের ওই প্রক্রিয়ার আলোকেই মাদক নির্মূলের কথা জানিয়েছে লোপেজের দল। কলম্বিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ায় গেরিলা নেতাদের কারাবাস এড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সানচেজ বলেন, দায়মুক্তি পরিকল্পনার বিষয়ে গণভোট নেওয়া হবে। জনগণ সমর্থন দিলে প্রশাসন তা লোপেজের দল ও তার মিত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা কংগ্রেসে উত্থাপন করবে।

নতুন এই ধারণা ১৯৪০’র দশকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লাজারো কারডিনাসের নেওয়া কৌশলের মতোই হবে বলে জানান সানচেজ।

কারডিনাস মাদককে কিছু মাত্রায় বৈধতা দিয়েছিলেন। মাদকাসক্তদের জন্য চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে মাদক রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়, মাদকাসক্তদের জন্য ক্লিনিক খুলে দিয়ে তাদের অপরাধীর পরিবর্তে রোগী হিসেবে চিকিৎসার প্রস্তাব রাখা হয়। এই নীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সীমিত পরিমাণ মারিজুয়ানা, কোকেইন ও হেরোইনের মতো মাদক কেনাবেচাকে বৈধ করা হয়। নিম্ন পর্যায়ের অপরাধীদের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়।

মাদকের বিরুদ্ধে এই বিশাল পরিবর্তন টিকে ছিল মাত্র ছয় মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় কোকেইন আর মরফিনের যোগান কমে যাওয়ায় সরকার এই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়। আধুনিক যুগে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে মেক্সিকো। তবে লোপেজ ওবরাডোর বলছেন, এই যুদ্ধের নীতি মাদক চোরাচালান আর সহিংসতা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া এই নীতিতে মাদক বাণিজ্যের প্রধানতম কারণ দারিদ্র মোকাবিলায় কোনোকিছুই রাখা হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, মানবাধিকার গ্রুপ, ধর্মীয় নেতা ও জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তার নতুন পরিকল্পনাকে আরও উন্নত করা হবে।

সানচেজ বলেন, যুদ্ধ, সামাজিকনীতি, মাদকনীতি, সহিংসতাবিরোধী রাজনীতি সবকিছুতেই পরিবর্তন আসবে। লোপেজ ওবরাডোরের নেতৃত্বে দেশর জন্য খুবই এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ