ঢাকা, সোমবার 9 July 2018, ২৫ আষাঢ় ১৪২৫, ২৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমদানির আড়ালে লাগামহীন পাচারে বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি

এইচ এম আকতার : আমদানির আড়ালে লাগামহীন পাচারে বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। আমদানি বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। একইভাবে বাড়ছে না রফতানি আয়ও। বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে আকাশচুম্বী। গত অর্থ বছরের ৯ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩২০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিদায়ী অর্থবছরে এ ঘাটতি ৭৮ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। যা গত ৪৭ বছরে সর্বোচ্চ অর্থাৎ স্বাধীনতার পর দেশে এত পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি আর হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লেও সেই হারে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ছে না। তাই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তবে আমদানির এ প্রভাব উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগে পড়লে তা হয় অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু আমদানির আড়ালে এই অর্থ যদি পাচার হয়ে যায় তাহলে তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সরকার তার বৃহৎ কয়েকটি প্রকল্পে দৃশ্যমান বিনিয়োগ করলেও এর বাহিরে কোন বিনিয়োগ নেই। নেই কর্মসংস্থানও। এতে করে বেড়েছে বেকারত্বের পরিমাণ। একইসাথে বেড়েছে বিলাস দ্রব্যের ভোগও। যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বিপদজনক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এপ্রির শেষে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ২ হাজার কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩২০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৩২০ কোটি ৩০ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ৮২ টাকা হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর শতাংশের হারে আলোচিত সময়ে আমদানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ২০ শতাংশ। কিন্তু রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।
এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে, ৯৯৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর ২০১১-১২ অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৩২ কোটি ডলার।
চলমান কয়েকটি বড় প্রকল্পের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বেশকিছু বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানিতে অনেক অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তাই আমদানি ব্যয় বাড়ছে। তবে তুলনামূলক সেই হারে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়েনি। তাই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে।
তবে এই আমদানির আড়ালে অর্থপাচার হচ্ছে কিনা তা অনুসন্ধান করা দরকার বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।
অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে হবে বেসরকারি খাতে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ।  প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরজুড়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। বৈদেশিক দায় পরিশোধে সরকারকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৪৮ কোটি ডলার ঋণাত্মক হয়। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের জানুয়ারি শেষে ৫৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণাত্মক ছিল ৮৯ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি ব্যয় বেড়েছে তবে সে তুলনায় রফতানি আয় হয়নি বলে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক কমে গেছে, ফলে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অফ পেমেন্ট বা বিওপি) ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ভালো নয়।
 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। কিন্তু গত কয়েক বছর উদ্বৃত্তের ধারা অব্যাহত থাকলেও গেল অর্থবছরে ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ইদানীং আমাদের সামগ্রিক বাণিজ্যিক লেনদেনের ঘাটতি বেড়েছে। একই সঙ্গে চলতি হিসাবেও বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি বেড়েছে। রফতানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক সাহায্য বাড়লেও ঘাটতি কমছে না। এর বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত আমদানি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বিভিন্নভাবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে করা আমদানির আড়ালে বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। নির্বাচনের বছরে পাচার আরো বেড়ে গেছে। এটি ঠেকাতে অনিয়ন্ত্রিত আমদানি তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রয়োজনে বাজেটে যেসব পণ্য শূন্য শুল্কে আসে এবং যে পণ্যগুলো আমদানির মাধ্যমে টাকা পাচারের আশঙ্কা বেশি, তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে আর্থিক খাত নিয়ে উদ্বেগ আছে, কিন্তু আতঙ্ক আছে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি নিয়ে। এর ফলে টাকার মূল্যমান কমতে থাকবে। এতে কিছু রফতানিকারক হয়তো সাময়িক খুশি হবে। তবে অবধারিতভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দেবে। ফলে মজুরি বাজারে চাপ সৃষ্টি হবে। টাকার মান অবনমনের ফলে যদি মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে, তবে অবধারিতভাবে সুদের হারও বাড়বে।
বৈদেশিক খাত এক ধরনের দুষ্টচক্রের মধ্যে ঢুকে গেছে মন্তব্য করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈদেশিক খাতের সঙ্গে আরো বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এখন যে প্রভূত ঋণ আমরা নিচ্ছি, তা হয়তো এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে। এটা আগামী চার বা পাঁচ বছরে একই রকম নিয়ন্ত্রণে থাকবে এমনটা বলা যাবে না।
সিপিডির নির্বাহী ড.মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেসব বুদ্ধিমান লোক ঋণকে খেলাপি করার পেছনে কাজ করছেন বা কারসাজি করছেন, তাদের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের এ আইনে নেই। তাই ২০০৩ সালের মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট এবং ১৯৯৭ সালের দেউলিয়াবিষয়ক আইনটি সংস্কার করে যুগোপযোগী করার সুপারিশ করেন তিনি।
 গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা পাঁচগুণ বেশি। এ ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে বিনিময় হারে চাপ পড়ার পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়ন আরও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের প্রতিবেদন মতে, আলোচ্য সময়ে পণ্য ও সেবা আমদানি-উভয়ই বেড়েছে ব্যাপক হারে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি রফতানি।
এদিকে ঘাটতির ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে খোলাবাজারে ডলার ছাড়তে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি চলতে থাকলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে পুরো বাজার ব্যবস্থার ওপর। বেড়ে যেতে পারে আমদানি পণ্যের দাম। তাছাড়া চলতি অর্থবছরে ব্যাপক হারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুর্বার গতিতে আমদানি বাড়ায় গত মার্চ পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি ১ হাজার ৩২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
 বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুুরোর (বিবিএস) হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বেশিরভাগ সময়েই চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ২২ হাজার ২৯৫ টাকা। এর পরের অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ছয় হাজার ২২৫ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা ছিল আট হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উদ্বৃত্তের হার ছিল যথাক্রমে ১৫ হাজার ২৩৩ ও আট হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরের পর প্রথমবারের মতো চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে। অর্থবছরটিতে ঘাটতি দাঁড়ায় আট হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছর তা আবারও উদ্বৃত্ত হয় ১৯ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এরপর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফের ১৮ হাজার ১১৬ কোটি টাকার ঘাটতি হয়। বিদায়ী অর্থবছর এ ঘাটতি ৭৮ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যে হারে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, তাতে অর্থবছর শেষে চলতি হিসাবে ঘাটতি বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবের চেয়েও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে চলতি হিসাবে ঘাটতির ফলে এরই মধ্যে টাকার বিনিময় হার কমতে শুরু করেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় মূল্য প্রায় তিন শতাংশ কমে গেছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি চলতে থাকলে এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংককে আইএমএফের দ্বারস্থ হওয়া লাগতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ