ঢাকা, সোমবার 9 July 2018, ২৫ আষাঢ় ১৪২৫, ২৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমাদের রাজনীতি কোন্ পথে

গত ৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি’ শীর্ষক এক গণবক্তৃতার আয়োজন করা হয়। রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়। তবে দেখার বিষয় হলো, সরকার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ওই বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেন এবং সংকটকে কতটা উপলব্ধি করেন।
আলী রিয়াজ তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, অতীতে বাংলাদেশ যত ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করেছে, এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন এবং গভীর। এখন দেশের রাজনীতিতে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা আসলে হাইব্রিড রেজিম বা দোআঁশলা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু কিছু উপাদান থাকলেও সেগুলো প্রধানত শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। ফলে রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্রগুলো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, এক সময় যে প্রাণবন্ত সিভিল সোসাইটি ছিল এখন তার চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। গত এক দশকে সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে নির্বাচনকে জবাবদিহির একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আলী রিয়াজ আরো বলেন, যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু আর সব ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা চূর্ণ করে ফেলাই হচ্ছে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উপায়। বাংলাদেশের সমাজে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, সহিংসতা ব্যাপক বিস্তারের যে সব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা এখানেই। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় মুদ্রিত তার বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের প্রভাব বিষয়েও কথা রয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি দুইভাগে বিভক্ত। তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল এবং সংস্কারপন্থী। গত কয়েক বছরে তুলনামূলকভাবে সংস্কারপন্থী ধারা দুর্বল হয়েছে। তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা রাজনীতির এজেন্ডা নির্ধারণের মতো ক্ষমতা রাখেন। ক্ষমতাসীন দল গত দুই তিন বছরে এই শক্তিকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
আলী রিয়াজ সংক্ষিপ্তভাবে হলেও তার বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্রের উপাদান, শক্তি প্রয়োগ, রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্র, দায় মুক্তি, সিভিল সোসাইটি প্রসঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়েছেন। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহির সব ব্যবস্থা চূর্ণ করে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার উপায় প্রসঙ্গে তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থে তা সংশ্লিষ্ট সবার গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কারণ দেশের চাইতে দল বা ক্ষমতা বড় হয় উঠলে জাতীয় সংকট ঘনীভূত হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ও নাগরিকদের কাম্য হতে পারে না। হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধ স্পৃহা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে ইতিমধ্যে আমাদের রাজনীতিতে অনেক ভুল হয়ে গেছে। ওই সব ভুলের পুনরাবৃত্তি তো জাতিকে পিছিয়ে দেবে। জাতীয় স্বার্থের নিরিখে কি সঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের রাজনীতিবিদরা সমর্থ হবেন না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ