ঢাকা, বুধবার 11 July 2018, ২৭ আষাঢ় ১৪২৫, ২৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঢাবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা

মেধাবী শিক্ষার্থী মাসুদ রানার উপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ রানার ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে বিভাগের শিক্ষার্থীরা। হামলার তদন্ত ও বিচার শুরু না করা পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এ দিকে ঢাবিতে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে কাজ শুরু করেছে প্রক্টরিয়াল টিম। সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলেননি দাবি করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। তিনি বহিরাগতের ব্যাপারে বিশ^বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের কথা পুন:ব্যক্ত করেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে অপরাজেয় বাংলার সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে। এতে শিক্ষার্থীরা বলেন, গত ২ জুলাই শহীদ মিনার এলাকায় কোটা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা। ওই ঘটনার সময় মাসুদ রানার ওপর অমানবিক হামলা চালানো হয়। কিন্তু হামলার পরও প্রক্টর বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চুপ ছিল। প্রক্টর গোলাম রব্বানী বলেছেন, হামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, যে শিক্ষকদের কাছে আমরা মানবিক শিক্ষার দীক্ষা নেই। তারাই আমাদের কোনো খবর নিলেন না। এ ধরনের হামলার মাধ্যমে শহীদ মিনার ও বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। এভাবে যেন আর কাউকে নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।
এই নির্যাতনের বিচার চেয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিচার বা তদন্ত শুরু না হওয়া আরও বেশি দুঃখজনক। শিক্ষকেরা আমাদের অভিভাবক, তাঁরা পাশে না দাঁড়ালে কে আমাদের পাশে দাঁড়াবে? তাই বিচারের তদন্ত শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনার্স ও মাস্টার্সের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করছি।
মানববন্ধনে হামলায় আহত মাসুদ রানা বলেন, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই আমাকে এ ধরনের হামলার শিকার হতে হলো। এটা আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টের। বিচার চাইলে আমাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি আমার ওপর এ ধরনের অমানবিক হামলার তদন্ত ও বিচার চাই।
শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলিনি, দুঃখিত বললেন ভিসি: সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলেননি দাবি করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। গত রোববার কোটা আন্দোলনের সঙ্গে জঙ্গিবাদকে তুলনা করে মন্তব্য করেন ভিসি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সমালোচনার মুখে তিন দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, আমি কোটা আন্দোলনকারীদের জঙ্গি বলিনি। আমি বলেছি শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম উগ্রপন্থী জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে যায়। এর মানে এই নয় যে আমি শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলেছি।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান তার বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় যেভাবে বক্তব্য এসেছে তার জন্য আমি দুঃখিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো বহিরাগত ক্যাম্পাসে এসে ক্লাসপরীক্ষা বিঘ্নিত করে এমন কার্যক্রম করা যাবে না।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ক্যাম্পাসে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। ওই সময় তিনি বলেন, কোটা আন্দোলনকারীরা ফেসবুক লাইভে এসে জঙ্গিদের মতো করে ভিডিওবার্তা দিয়ে কর্মসূচি বা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তাদের এমন মনোভাবের সঙ্গে জঙ্গি কর্মকা-ের মিল আছে। তারা কারা? কোন রাজনৈতিক অশুভ শক্তি, আমরা তা জানি না। সেটা বের করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের সহায়তা করব আমরা।
তিনি বলেন, অনেক সুস্পষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, একটি বড় অপশক্তি ক্রিয়াশীল আছে। উদাহরণ হিসেবে বলব- ফেসবুক লাইভে তাদের ভিডিওবার্তার কথা। আমার কয়েকজন সহকর্মী একটি লাইভ ভিডিও দেখিয়েছেন। সেটি দেখলাম। দেখার পর মনে হল- জঙ্গিগোষ্ঠী তালেবান ও বোকো হারাম যেমন ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বিভিন্ন উসকানি ও নাশকতার অপপ্রয়াস নেয়, কোটা আন্দোলনকারীদের ভিডিওতেও ঠিক তেমন একটি প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি।
উপাচার্য আরও বলেন, ভিডিওতে দেখা গেল আন্দোলনকারীরা একটি চেয়ারে বসা। সেখান থেকে বিভিন্ন কর্মপন্থার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কর্মসূচি পালনের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এ বার্তায় একটি কথা আছে- ‘আমরা মৃত্যুকে ভয় পাবো না।’ এটি খুব উগ্র চরমপন্থী। এ ধরনের মতাদর্শ-ভাবাদর্শ প্রচারের ভিডিও আমি নিজে দেখেছি। এমন ভিডিও দুই-তিন ঘণ্টা পর পর ছাড়া হচ্ছে। জঙ্গি কর্মকা-ের আরেকটি বহিঃপ্রকাশ হল- তারা অশুভ কাজ সম্পাদনের জন্য নারীদের ব্যবহার করে। একইভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলনে মেয়েদের হলগুলোতে গভীর রাতে ২০-২৫ ছাত্রীকে দিয়ে উচ্চস্বরে চিৎকারের মাধ্যমে মিছিল করানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পরিপন্থী কোনো ধরনের কাজ আমরা বরদাশত করব না।
ভিসির এ ধরনের বক্তব্যের পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যম তরুণ প্রজন্ম তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। অনেকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের জন্য ভিসির পদত্যাগও চেয়েছেন।
বসছে নিরাপত্তা চৌকি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আখতারুজ্জামান বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হবে। নিরাপত্তা চৌকিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করবে। কোটা আন্দোলনের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন কিছু অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশের ফলে নষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রক্টরের অনুমতি ছাড়া বহিরাগত ব্যক্তিরা ক্যাম্পাসে অবস্থান ও ঘোরাফেরা করতে পারবেন না। একই সঙ্গে বহিরাগতরা কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রক্টরের অনুমতির প্রয়োজন। গত সোমবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কমিটির সভার এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
আখতারুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বাজারঘাটের জায়গা নয়। এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জায়গা। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান এখানে সম্মিলন ঘটে। যেহেতু এটি গণতন্ত্রের সূতিকাগার এখানে সকল প্রকার কর্মসূচি পালিত হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, কবিতা, গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালিত হবে এ সকল কাজে এখানে সবাই আসবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীদের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের সাধারণ জীবন বিঘ্নিত হয় এমন বহিরাগতদের অযথা অবস্থান এখানে কাম্য নয়। এখানে বহু মানুষ এসে জায়গাটিতে নষ্ট করবে এটি করতে দেওয়া যায় না।
আখতারুজ্জামান বলেন, বহিরাগত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা শিগগিরই কিছু নিরাপত্তা চৌকি বসাব। যাতে ভ্রাম্যমাণ মানুষ অন্য কোনো গোষ্ঠী এখানে এসে হঠাৎ করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে। কেউ এসে হঠাৎ করে মাইক দিয়ে আওয়াজ তুলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবেÍএটি আমরা বরদাশত করব না। শিক্ষা সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় স্বাগত জানায়। স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটায় ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নষ্ট করে এমন বহিরাগতদের এখানে অবস্থান আমাদের কাম্য হতে পারে না। আমরা দেখেছি, অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি প্রবেশ করে। এটা বন্ধ করা হবে। আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনা করব। যেমন ফুলার রোডে দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালানো রোধে সড়ক গতিরোধক বসিয়েছি। শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস তারা যেন নিরাপদ থাকে আমরা সেই চেষ্টা করব। নিরাপত্তা চৌকি মানে ক্যান্টনমেন্ট না, পুলিশ পোস্ট না, এখানে আমাদের সিকিউরিটি গার্ড থাকবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকটি যাতে বসতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে।
কাজ শুরু করেছে প্রক্টরিয়াল টিম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে কাজ শুরু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে আমরা কাজ শুরু করেছি। ভিসি মহোদয়ের বাসভবনের সামনে আমরা নিরাপত্তা বেরিকেড তৈরি করেছি। এছাড়াও আমাদের প্রক্টরিয়াল টিম সর্বক্ষণ কাজ করছে।
মুন্সীগঞ্জে মানববন্ধনে পুলিশের বাধা: মুন্সীগঞ্জে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন করতে দেয় নি পুলিশ। গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে শহরের জুবলী রোডে মুন্সীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে এ ঘটনা ঘটে। সকালে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধনে দাঁড়ায় শিক্ষার্থীরা। তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তি, নিখোঁজদের সন্ধান ও হামলাকারীদের বিচারের দাবি জানায়।
এ সময় পুলিশ এসে তাদের মানববন্ধনে বাধা দেয়। পুলিশের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী। এ সময়পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পুলিশ মানববন্ধন থেকে চার শিক্ষার্থীকে পিকআপ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রীরাও ছিল।
 মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসাইন জানান, গাড়িতে তোলার পর শিক্ষার্থীরা দাবি করে, তারা সরকারি হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষার্থী। তারা আসলেই শিক্ষার্থী কি না জানতেই তাদের পিকআপ ভ্যানে করে কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কলেজের অধ্যক্ষ তাদের নিজের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় নিশ্চিত করলে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ