ঢাকা, বুধবার 11 July 2018, ২৭ আষাঢ় ১৪২৫, ২৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষেধাজ্ঞা

এ যেন হঠাতই সামরিক শাসনের অধীনে কার্ফিউ বা সান্ধ্য আইন জারি করার মতো উদ্ভট সিদ্ধান্ত! হ্যাঁ, সিদ্ধান্তের আড়ালে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞাই জারি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রক্টরের পূর্বানুমতি ছাড়া বহিরাগতরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ, অবস্থান ও ঘোরাফেরা করতে এবং কোনো ধরনের কার্যক্রম চালাতে পারবে না। সোমবার তথা ৯ জুলাই জানানো হলেও প্রভোস্ট কমিটি নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তটি নিয়েছে গত ৫ জুলাই। কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ‘অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা’ এবং ‘সার্বিক অবস্থার’ কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া হবে বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে জনসংযোগ দফতর।
প্রভোস্ট কমিটির সিদ্ধান্তে আরো বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য ও চরমপন্থীরা যাতে কোনো অবস্থাতেই ক্যাম্পাস এলাকায় বা কোনো আবাসিক হলে প্রবেশ ও অবস্থান করতে এবং কোনো কার্যক্রম চালাতে না পারে সে ব্যাপারে সকল হল প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও তৎপর থাকতে হবে। তাছাড়া ছাত্রী হলগুলোতে সম্প্রতি রাতের বেলায় স্লোগান দেয়া ছাত্রীদের প্রত্যেককে আবাসিক হলে বসবাসের নিয়ম, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ও যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি পাঠানোর জন্য প্রভোস্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ জানাতে গিয়ে প্রভোস্ট কমিটি বলেছে, কোটা সংস্কারের দাবিতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় গভীর রাতে ছাত্রী হলগুলোতে স্লোগানসহ মিছিল করার ফলে সাধারণ ছাত্রীদের মধ্যে ভীতি ও আতংক ছড়িয়ে পড়েছে এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন বিঘ্নিত হয়েছে। এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না বলেই প্রভোস্ট কমিটির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহিরাগতদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার সংবাদে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ক্যাডেট কলেজ কিংবা ক্যান্টনমেন্ট নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরং একটি আলোকিত মুক্ত এলাকা হিসেবেই সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছে। অমন একটি আলোকিত ক্যাম্পাসকে কথিত বহিরাগতদের অজুহাতে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের জন্যই নিষিদ্ধ করার হীন চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে সাবেক দুই ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমদ (১৯৯২-৯৬) ও প্রফেসর এ কে আজাদ চৌধুরী (১৯৯৬-২০০১) বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে বেমানান অর্থাৎ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় সবার জন্য উন্মুক্ত থেকেছে। বলা হতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোরাফেরা করলেও মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধির স্তর বাড়ে। অন্যদিকে জঙ্গিদের তৎপরতার দোহাই দিয়ে এখন যা কিছু বলা হচ্ছে সেসব আসলে অসুস্থ চিন্তাপ্রসূত। প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থতার ওপর গোটা জাতির সুস্থতা নির্ভর করে। প্রফেসর এ কে আজাদ চৌধুরী বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার এ সিদ্ধান্ত থেকে কর্তৃপক্ষের দ্রুত সরে আসা দরকার। সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে যতো দেরি হবে ততই অস্বস্তি বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকসহ শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আমরাও মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তটি বাস্তব অবস্থা এবং যুক্তির আলোকে কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান যে আন্দোলনকে নিষেধাজ্ঞার অজুহাত বানানো হয়েছে সে আন্দোলনের কোনো পর্যায়ে কথিত বহিরাগতরা অংশ নিয়েছে কিংবা গভীর রাতে ছাত্রীদের হলে ঢুকে কথিত বহিরাগতরাই স্লোগান দিয়েছে- এমন কোনো তথ্যের পক্ষে এ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাস্তবে বরং এ অভিযোগই প্রতিটি উপলক্ষে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে। পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারপিটের কারণে আন্দোলনকারীরা এমনকি পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করতে পারেননি। হামলায় গুরুতর আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেয়া হয়নি। ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি করার পর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। সেখানেও ‘জাহান্নাম’ই দেখেছেন আক্রান্ত ছাত্রী। মূলত এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদেই ছাত্রী হলগুলোতে প্রতিবাদী মিছিল হয়েছে। হামলা-নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির বিচার দাবি করেছেন ছাত্রীরা। এসব ঘটনা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কোনো কোনো ঘটনা ‘ভাইরাল’ পর্যন্ত হয়েছে।
অন্যদিকে কোনো একটি ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত করাসহ সামান্য ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাথা ব্যথা কমানোর জন্য মাথাই কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিষেধাজ্ঞাও এমনভাবেই আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে জরুরি কোনো কাজেও কারো পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাওয়া-আসা সম্ভব হবে না। অথচ সার্টিফিকেট ওঠানো এবং ছেলেমেয়েদের কাছে টাকা ও বইপুস্তক পৌঁছানোর মতো অনেক কাজেই প্রাক্তন ছাত্র এবং অভিবাবকসহ সাধারণ মানুষকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে হয়। এত বিভিন্ন ধরনের মানুষ কিভাবে প্রক্টর ও প্রভোস্টসহ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগেই অনুমতি নেবেন  এবং এভাবে পূর্বানুমতি নেয়াটা আদৌ সম্ভব কি না সে প্রশ্নেরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি প্রকাশিত কোনো খবরে।
আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী সকলকে ঢালাওভাবে জঙ্গি বা চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বরং বিশেষ করে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া উচিত। সরকারকে কোটা সংস্কারের দাবির যৌক্তিকতা সম্পর্কে বোঝানো উচিত। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে ছাত্রলীগের পক্ষে যেমন হামলা ও শ্লীলতাহানিসহ ন্যক্কারজনক কর্মকান্ড চালানো সম্ভব হবে না, তেমনি দরকার পড়বে না কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করারও। আমরা আশা করতে চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকার মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে অনতিবিলম্বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ