ঢাকা, বুধবার 11 July 2018, ২৭ আষাঢ় ১৪২৫, ২৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঘুরে এলাম ঐতিহ্য ঘেরা দিল্লী

আসাদুজ্জামান আসাদ : পৃথিবীতে জানার আছে আনেক কিছু। মানুষ অজানাকে জানার নিমিত্তে প্রতি নিয়ত ছুটছে অজানা পথে। ভারতের দিল্লী শহর, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ঘেরা। এখানে স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বিশাল সমারোহ রয়েছে। শহরসহ আশে পাশের রয়েছে বিশ্বের সপ্তাশ্চার্যের অন্যতম নিদর্শন তাজমহল। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ডে হেরিটেজ স্বীকৃত প্রাপ্ত অসংখ্য নান্দনিক স্থাপনা। এখানে সারা বছরেই পর্যটকদের মহা ভিড়। দিল্লী শহরে তাজমহল, কুতুব মিনার, হুমায়ুন মমমাকবারা, লোটাস টেম্প, অক্ষরধামে দেশী বিদেশী পর্যটকদের ভিড়।  প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দল বেধে অথবা একা একা ঘুরে প্রাচীন স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, বংশ নির্বিশেষে নানা সভ্যতা, সাংস্কৃতি, ও নানা দেশের হাজার হাজার পর্যটক এ সব ঐতিহ্যবাহী দুর্গ দেখতে আসেন। ঠিক তেমনি ভাবে, আমি চলতি বছরের এপ্রিল মাস (২০১৭) চিকিৎসার জন্য ভারতে আসি।  আমার শ্যালক ভারতের নাগরিক ওসমান গনি সাথে ছিল । চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কাজ শেষে দু’জনে চলে আসলাম শহর দিল্লীতে। দিল্লীর বড় বড় দালান আর চাকচিক্যময় মনোরম দৃশ্য দেখে আমি মুগ্ধ। প্রথমে গেলাম লাল কেল্লায়। লাল কেল্লা, সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত একটি দুর্গ। এটি নির্মাণ করেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান। বিশাল প্রাচীর বিশিষ্ট একটি দুর্গ। এই দুর্গটি ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মুঘল সমাজ্যের অধিনে ছিল। তারপর ব্রিটিশ শাসকরা ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত লাল কেল্লা সামরিক ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহার করেন। মুঘল শাসনামলে সামাজ্যের অন্যতম নির্দশন ছিল লাল কেল্লা। এ দুর্গটি অপুর্ব নির্মাণশৈলী লাল রঙের ইট দ্বারা তৈরি। দেখতে আকর্ষণীয় বটে।  লাল কেল্লা ভারতের সমৃদ্ধ প্রাচীন স্থাপত্যকলার অন্যতম একটি দুর্গ। এ কেল্লার সাথে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জড়িত। লাল কেল্লার ১ম নাম ছিল কিলা-ই মুবারক। এ কেল্লার অবস্থান ছিল যমুনা নদীর তীরে। এ দুর্গে সম্রাটের পরিবার বর্গ বসবাস করত। উত্তর-পূর্ব কোনের প্রাচীরটি সলিম গড় দুর্গ নামে অন্য একটি প্রাচীরের সাথে সংযুক্ত ছিল। ১৫৪৬ সালে ইসলাম শাহ সুরি এ দুর্গটি নির্মাণ করেন। এ দুর্গটির পরিকল্পনা, অঙ্গসাজ, সৌন্দর্য্য মুঘল স্থাপত্য ও চিত্র কলার উৎকর্ষের গুরুত্ব পুনঃনিদর্শন বটে। লাল কেল্লা টি ছিল সপ্তম নগরী সম্রাট শাহজাহানের নতুন রাজধানীর রাজ প্রসাদ। তবে পরবর্তীকালে সম্রাটের রাজ প্রসাদ আগ্রা শহরে স্থানান্তরিত করা হয়।
লাল কেল্লায় সর্বশেষ মুঘল সম্রাট ছিলেন, দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর। তিনি ১৮৫৭ সালে মহা বিদ্রোহে ব্যর্থ হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর লাল কেল্লা ত্যাগ করেন এবং ১৮৫৮ সালের ২৭ শে জানুয়ারি তার বিচার করে ৭ই অক্টোবর তাকে নির্বাসন দেয়া হয়। এভাবে ভারতের লাল কেল্লাটি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনা বাহিনীর হাতে চলে যায়। লাল কেল্লার গঠন আকৃতি, অলংকরণ, শিল্প কর্ম অতি উন্নত ও চমৎকার। ইউরোপ, পারসিক এবং ভারতীয় শিল্পকলার সংমিশ্রণে তৈরীকৃত এই অভিনব শিল্পকলাটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবীদার। এ দুর্গের প্রধান দুটি দরজা রয়েছে। একটি দিল্লী গেট অপরটি লাহোর গেট। লাহোর গেটে প্রবেশ করলেই একটি লম্বা আচ্ছাদিত বাজার পড়ে। যেই বাজারের নাম চট্রা চক। চট্রাচক থেকে সোজা উত্তর-দক্ষিণের পথ পাওয়া যায়। এ পথের পশ্চিমে সামরিক ও রাজ প্রসাদের সীমানা। এ পথের দক্ষিণ প্রান্তে দিল্লী গেট। দিল্লী গেটের বাইরে একটি বড় মুক্তাঙ্গন। এক সময় এটি দিওয়ানে ই-আম হিসাবে ব্যবহার হতো। এখানে ঝরোকা নামে একটি অলংকৃত সিংহাসন ছিল। সেখানে বসে সম্রাট জনসাধারণের সাথে দর্শন দিতেন। এই স্তম্ভগুলো সোনায় চিত্রিত ছিল। সোনা- রুপার রেলিং দিয়ে জনসাধারণ কে সিংহাসন থেকে আলাদা করা হতো। আর দিওয়ানে-ই- খাস ছিল শ্বেত পাথরে মোড়া একটি কক্ষ। যা ছিল পুস্প চিত্রে সজ্জিত। ভিতরে অলংকরণের কাজে মহা মুল্যবান ধাতু ব্যবহার করা হতো। এ অভিনব দুর্গটি প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক অবলোকন করে।
কুতুব মিনারঃ তারপর আমি আসলাম কুতুব মিনার। কুতুব মিনার হলো দিল্লীতে অবস্থিত একটি স্তম্ভ বা মিনার। যা সারা বিশ্বের সর্বোচ্চ ইটনির্মিত মিনার হিসাবে পরিচিত।  লাল বেলে পাথরের তৈরী মিনারটির উচ্চতা ৭২.৫ মিটার বা ২৩৮ ফুট। মিনারটির ব্যাস ১৪.৩২ মিটার বা ৪৭ ফুট। শীর্ষাংশের ব্যাস ২.৭৫ মিটার বা ৯ ফুট। এটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয়। কুতুব মিনারের প্রাঙ্গনে আলাই দরজা, মিনার, কুওয়ত-উল-ইসলাম মসজিদ, ইলতুতমিশের সমাধি এবং একটি লৌহ স্তম্ভ আছে।
কুতুব মিনার প্রাঙ্গণে ৭.০২ মিটার বা ২৩ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট চকচকে লৌহ স্তম্ভ আছে। যা এখন পর্যন্ত কোন প্রকার মরিচা বা জং ধরেনি। লৌহ স্তম্ভের উপর সংস্কৃত ভাষায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের একটা লেখা আছে। কুতুবউদ্দীন আইবেক ১১৯২ সালে এই মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং সুলতান ইলতুত মিশের রাজত্বকালে (১২১১-৩৮ সালে) কুতুব মিনারের কাজ সমাপ্ত হয়। আলাউদ্দীন খিলজী ১২৯৬ -১৩১৬ সালে কুতুব মিনারের প্রাঙ্গণ  নির্মান কাজ সম্পন্ন করেন। কিন্ত বজ্রপাতে মিনারটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরবর্তী সম্রাটগণ তা সংস্কার করেন। ফিরোজ শাহ এর শাসনামলে মিনারের দুই শীর্ষতলা বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু ফিরোজ শাহ তা সংস্কার করেন। কুতুব মিনারের আশেপাশে বেশ কিছু প্রাচীন ও মধ্যেযুগীয় স্থাপনা এবং ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যা একত্রে কুতুব মিনার কমপ্লেক্স হিসাবে পরিচিতি। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী  স্থাপত্য এবং শিল্প কৌশলের এক অন্যবদ্য প্রতিফলন হিসাবে মর্যদা লাভ করে। স্থাপত্য জগতে কুতুব মিনার দিল্লীর জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। একটি জরিপে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিদর্শিত সৌধ পর্যটকের সংখ্যায় ৩৮.৯৫ লাখ, যা তাজমহলের চেয়েও বেশী। কুতুব মিনার মুলত আফগানিস্তানের জাম মিনারের অনুকরণে নির্মিত একটি মিনার। যা অপরুপ, নান্দনিক সাজে সু-সজ্জিত।কুতুব মিনার পাচ তলা বিশিষ্ট একটি মিনার। মিনারের প্রতি তলায় রয়েছে ব্যালকনি বা ঝুলন্ত বারান্দা। কুতুব মিনার বিভিন্ন নকশা ও নলাকার শ্যফট দিয়ে ঘঠিত এবং বারান্দা দিয়ে পৃথককৃত। তাছাড়া মিনারটি লাল বেলে পাথর দিয়ে তৈরী। যার আচ্ছাদনে পবিত্র  কোরআনের আয়াত খোদাই করা রয়েছে। কুতুব মিনারের নামকরণ কুতুব মিনার কেন? এর জবাবে দু’টি অভিমত পাওয়া যায় । একটি হলো- সুলতান কুতুবউদীন আইবেক  এর প্রথম নির্মমাতা অপরটি হলো- ট্রান্সঅক্্িরয়ানা হতে আগত বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর সম্মানার্থে কুতুব মিনার নির্মিত হয়েছে। যার ফলে কুতুব মিনারকে  কুতুব মিনার নামে নামকরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, বিগত ১৫০৫ সালে কুতুব মিনারটি একটি ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সিকান্দার লোদী তা সংস্কার করেন। তবে কুতুব মিনারের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে ২৫ ইঞ্চি একটি ঢাল রয়েছে যা, নিরাপত্তা সীমানার অর্ন্তভুক্ত। কুতুব মিনারকে কেন্দ্র করে একটি মনোরম কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে। কমপ্লেক্সের আয়তন প্রায় ১০০ একর জমি। এখানে রয়েছে, কুওয়াতুল মসজিদ, আলাই মিনার, আলাইগেট, সুলতান ইলতুসমিশ, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী ও ইমাম জামিনের সমাধি ও লৌহ পিলার। ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের ১ম মুসলিম শাসক কুতুবউদ্দীন আইবেকের কুতুব মিনারে ১ম ও ২য় তলা নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন বিরতির পর সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ এর শাসনামলে ৩য় ও ৪র্থ তলা এবং সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে ৫ম তলা নির্মাণের মাধ্যেমে কুতুব মিনারের কাজ সমাপ্ত করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ