ঢাকা, বুধবার 11 July 2018, ২৭ আষাঢ় ১৪২৫, ২৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভুটানিদের মরিচপ্রীতি

আখতার হামিদ খান : ভুটান দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট একটি পাহাড়ি দেশ। এর তিনদিকে ভারত ও একদিকে তিব্বতের অবস্থান। ভুটানিরা নিজেদের দেশকে ‘ড্রুক’ সম্বোধন করে। ভুটানে রাজতন্ত্র প্রচলিত। ভুটানের আয়তন ৪৭ হাজার ১শ’ বর্গকিলোমিটার। এর রাষ্ট্রভাষা জংথা। অন্যান্য প্রচলিত ভাষার মধ্যে আছে নেপালি ও ইংরেজি। ভুটানের মুদ্রার নাম নুলট্রাম। তাপমাত্রা গ্রীষ্মে ১৩ ডিগ্রি থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতে ০.২ ডিগ্রি থেকে ১২ ডিগ্রি সেলিসিয়াস। ভুটান ভ্রমণের উপযুক্ত সময় মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
ভুটান ড্রুক রাজার দেশ বলে পরিচিত। এ দেশের জাতীয় প্রতীক ড্রাগন। ভুটানের রাজধানী থিম্পু। ছবির মতো সাজানো-গোছানো শহর থিম্পু। পাহাড়ে ঘেরা ও চিরসবুজ বনানীতে ঢাকা মনলোভা পরিবেশে সুপরিকল্পিতভাবে রাজধানী শহর থিম্পুকে গড়ে তোলা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে থিম্পুর উচ্চতা প্রায় ৮০০০ ফুট। থিম্পুর দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তাশি চো জং। উপত্যকার একান্তে এক সময় গড়ে তোলা হয়েছিল স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের এক অনন্য নিদর্শন। সম্প্রতি একে দুর্গ হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকায় এতে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। রাজদরবার ও রাজাসন এখানেই। এখানেই বসে সংডু। থিম্পুতেই ধর্মগুরুর গ্রীষ্কাবকাশস্থল। সংডু হলের গায়ে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু বুদ্ধের মূর্তি এবং তার সিদ্ধিলাভের বহু ঘটনা চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া থিম্পুতে দেখার মতো আর যা কিছু আছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য উচী মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির, ড্রকপাদের দেবতা ফাগচেপো, খোর সুং, নামথোসি আর চেন সিজাং। থিম্পুতে প্রতি বছর আড়ম্বরে সাথে উৎসব পালিত হয়। জং এর লাগোয়া, বাইরেই রাজপ্রাসাদের অবস্থান। থিম্পুর চারুশিল্পের সংগ্রহশালাটি বাস্তবিকই উল্লেখযোগ্য। থিম্পু এলাকায় আরও রয়েছে ফাজু দিং গুম্ফা, তাংগু গুল্ফা, চেরী গুম্ফা, প্রাক্তন রাজা জিগমে দোরজী ওয়াংচুকের স্মৃতিসৌধ। থিম্পু থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ১৬১৬ সালে নির্মিত সীসতোসা জং। আজিজের প্রাসাদ, চিকেন-চোলিং ও হারবেলিয়ামও দেখার মতো।  থিম্পুর বাসস্ট্যান্ডটি লুঙ্গটেন জামপা সেতুর গায়ে। ওখান থেকে ভুটানের বিভিন্ন দিকে যাওয়ার বাস ছাড়ে। থিম্পুতে সরকার অনুমোদিত বেশক’টি ট্রাভেল এজেন্সি আছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই এদের অফিস। থিম্পু ও এর আশপাশের আকর্ষণীয় স্থানগুলো দেখার জন্য যে কোনও ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ভুটান গভর্নমেন্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের বাসের সাহায্যও নেয়া যেতে পারে। থিম্পুতে কুলির খুব অভাব। তাই লটবহর নিজেকে টানার জন্য আগেভাগেই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ছোট্ট দেশ ভুটানে মরিচ শুধু খাবারের স্বাদ বর্ধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় না যেমনটি দক্ষিণ এশিয়া এবং পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়।
ভুটানে মরিচ সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং ভুটানের জাতীয় খাবার হলো ‘চিলি চিজ কারি’। এই খাবারটিকে ‘এমা দাৎসি’ বলা হয়। এখানে এমা অর্থ মরিচ এবং দাৎসি অর্থ পনির।
প্রশ্ন জাগে, ভুটানিদের অদ্ভুত এই মরিচ প্রীতির উৎস কি? ভুটানি সংস্কৃতির সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। ভুটানিদের মরিচপ্রীতি নিয়ে বই লিখেছেন ভুটানের নাগরিক দোর্জিদদ ওহম। তিনি বলেন, ভুটানে মরিচের তরকারি সম্ভবত এই কারণে জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, ভুটান একটি শীতপ্রধান এলাকা। সেখানকার মানুষ এই ধরনের উত্তেজনাপ্রবণ এবং মসলাদার খাবার খেলে এটা তাদের শরীরের তাপ বাড়ায়। দোর্জি ওহম বলেন, ‘আজকল যদিও খাবর গরম রাখতে হিটার ব্যবহৃত হয়, তবুও এমা দাৎসি এখন আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে গেছে। কোনও ভুটানি পরিবার আপনাকে খাবারের জন্য নিমন্ত্রণ করলে তারা অবশ্যই আপনাকে এমা দাৎসি পরিবেশন করবে।
বিবিসি’র সাংবাদিকদ গীতা পান্ডেকে একদিন ওহম থিম্পুতে যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি দফতর সংলগ্ন একটি ক্যান্টিনে দুপুরের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ওহম ওই ক্যান্টিনে নিয়মিত আসেন এবং সব মধ্যাহ্নকালীন অতিথিরা যারা ওই ক্যান্টিনে আসেন তারা একে অপরকে চেনেন ও জানেন। ওই ক্যান্টিনে বাবুর্চি চেনচো। তার বয়স পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি। এ মহিলা খুব ভাল এমা দাৎসি তৈরি করে। রান্নাঘরে চেনচো সাংঘাতিক বড় এবং ঝাল জাতীয় মরিচ কাটছিল। তিনি তখন পান্ডেকে জিজ্ঞাসা করেন- তুমি কি এসব খাবার খেতে পারবে? কিছুটা উদ্বেগ, অস্থিরতা ও পরবর্তী উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে পান্ডে বলেন, ‘সামান্যতম’। ওহম জানান, আসল এমা দাৎসি তৈরি হয় শুধু মরিচ ও পনির দিয়ে।
কিন্তু গীতা পান্ডের খাতিরে ক্যান্টিনের লোকজন ঝালের পরিমাণ একটু কম দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এই বলে চেনচো টমেটো, পেঁয়াজ এবং কিছু ফুলকপি কাটা গুড়ো করে খাবারটিতে দেয়ার জন্য। ওহম বলেন, ভুটানি রান্নার প্রায় সবগুলোতেই মরিচ থাকে- তাদের প্রায় সব তরকারিতেই থাকে অধিক পরিমাণ মসলা। এবং ছোটবেলা থেকেই ভুটানি বাচ্চাদের মরিচ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। ওহম আরও জানান, ছোটবেলা থেকেই আমরা মরিচের স্বাদ নিয়ে অভ্যস্ত- এটাকে আমরা ভয় করি না।
ঝাল মরিচ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে ওহম বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমাদের মায়েরা আমাদের খাবারে একটি করে ছোট্ট মরিচ দেয়। এবং সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে মরিচের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, প্রতিবার যখন আমি মরিচ নিতাম খাওয়ার জন্য, আমার বাবা-মা আমাকে ‘সাহসী মেয়ে’ বলে উৎসাহিত করত। ভুটানে অনেক এমা দাৎসির হিতাকাক্সক্ষী আছে। ‘এটা একটা দারুণ খাবার’- ক্যান্টিনের একজন ভোজনকারী বলেন, ‘আমি এটা দারুণ ভালবাসি। আমি তার তৈরি এই খাবার খেয়েই বড় হয়েছি এবং আমি মনে করি এটা সত্যিই অতুলনীয়।
এমা দাৎসির কট্টর সমর্থকদের জন্যও মাঝে মাঝে এটা খাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। থিম্পুর ক্যান্টিনে গীতা পান্ডেরা যখন খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তখন পাশের টেবিলে বসে থাকা এক তরুণী হঠাৎ গীতা পান্ডেদের দিকে ঘুরে তাকায়। অশ্রু তার চোখ বেয়ে পড়ছে এবং সে বলে ওঠে ঝাল ওহ ঝাল প্রচ- ঝাল!
এই বলে তরুণীটি যখন ঠা-া পানির গ্লাস চেপে ধরে, ওহম তখন বলেন, যদি তুমি এমা দাৎসি খাওয়ার সময় কোনও গরম কিছু খাও, তাহলে এটা আরও মারাত্মক হয়ে যায়।
ভুটানে যেসব রোগ এখন বাড়ছে তন্মমধ্যে একটি হলো পাকস্থলীর আলসার। এ থেকে মরিচের প্রতি ভুটানের লোকদের ভালবাসার কথাই প্রকাশ পায়। ডাক্তাররাওদ মরিচের এই অত্যধিক ব্যবহারকে এই রোগের কারণ হিসেবে দায়ী করেন। ওহম জানান, এই কারণ হিসেবে দায়ী করেন। ওহম জানান, এই কারণে ভুটানের শিক্ষিত মা-বাবারা তাদের বাচ্চাদের খাবারে মরিচ না দেয়ার চেষ্টা করছেন। এক সময় ক্যান্টিনে লাঞ্চ তৈরি হয়, খাবার দিয়ে টেবিল সাজানো হলো- যেখানে আছে এমা দাৎসি, কিছু পরোটা এবং কিছু লাল চালের ভাত। যেহেতু খাবারের ঝাল কিছু দরকার ছিল, সেজন্য অন্য মেন্যু হিসেবে টেবিলে ছিল গ্রীন চিলি সালাদ এবং লাল মরিচের সস। ওহম বলেন, অধিকাংশ ভুটানী এখন রান্নায় কিছু নরম এবং অমসলাদার খাবার খোঁজে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার লোকেরা সর্বপ্রথম ক্যাপসিকামের প্রচ- এক ঝাল প্রজাতির মরিচের চাষ করে। কলম্বাস ১৯৪৩ সালে ইউরোপের এর বীজ নিয়ে আসেন এবং সেখান থেকেই সারা পৃথিবীতে রন্ধন প্রণালীতে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। প্রিহিসপেনিক আমেরিকানদের বিশ্বাস ছিল যে মরিচের ঔষধি গুণ আছে এবং আধুনিককালে বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে এতে পুষ্টিগুণ আছে এবং আরও আছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং বি ১-৩। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং জৈব প্রযুক্তির সুবাদে বিভিন্ন প্রজাতির মরিচ উৎপাদন করা হয়েছে, যেগুলো স্বাদ এবং আকার-আকৃতিতে ভিন্ন এবং লাল, হলুদ ও সবুজসহ বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকবে। এগুলো টাটকা কাঁচা অবস্থার, আচার বানিয়েও অথবা রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত মরিচ হলো জালাপিনো, যেগুলো সবুজ ও মোটা প্রজাতির, জন্মে মেক্সিকো উপকূলের জালাপা শহরে।
চিলপটল মরিচ হচ্ছে এক ধরনের শুষ্ক প্রজাতির জালাপিনো, যা সবুজ প্রজাতির থেকেও অতিরিক্ত ঝাল এবং যেটা সচরাচর আচার বানিয়ে খাওয়া হয়। মরিচের অন্যান্য জনপ্রিয় প্রজাতির মধ্যে আছে প্রচ- ঝালের হেবেনিরো, দ্যা বার্ডস আই, দ্য থাই এবং ছোট্ট পিকুইন, যেটা টাবাস্কো সসের গুরুত্বপুর্ণ উপাদান।
ঝাল মরিচ অনেক জাতের আছে। উল্লেখযোগ্যগুলো হলো: অ্যামি সিভরি, অ্যাজি ব্রাউন, অ্যাজি অ্যাল মাপাপরিকা, অ্যানাহিউম, অ্যান্ডু, অ্যাসিয়ান, অ্যাজর, বাহামিয়ান, বিগ জিম, বার্ডস আই, ক্যাবাই বুরং, ক্যারোলিনা, ক্যাইন্নি, ক্যাসকাবেল, চেরী, চিলি ডি আরবোল, চিলটেকপিন, চিলট্রিকপিন চেরী, চিলটেপিন, চিমায়ু, চিপোলটি, কোবানিরো, মাইয়ান লাভ, কোবরা, কোরোনাডো, ডেগার পোড, ডেশরে, অ্যাশ পাসো, এসপানোলা, গোয়াজিল্লো, হ্যাবানিরো, হ্যাইম্যান, হিডালগো ইত্যাদি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ