ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 July 2018, ২৮ আষাঢ় ১৪২৫, ২৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আহ্বান

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। গত ১০ জুলাই বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিষয়ক এক বিশেষ সভায় পার্লামেন্ট সদস্যসহ বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা আরো বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে যাতে সব দল অংশ নিতে ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চালাতে পারে এবং ভোটাররা যাতে প্রভাবমুক্তভাবে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেয়ার সুযোগ পায়- এসবও নিশ্চিত করতে হবে। ইইউ পার্লামেন্টের প্রতিনিধিরা প্রসঙ্গক্রমে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, দৃঢ়চেতা এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন থাকা দরকার। তেমন কমিশন গঠনের দায়িত্ব সরকারকেই পালন করতে হবে।
উল্লেখ্য, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এই সভায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনির নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নিলেও দেশের ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত বিরোধী দল বিএনপি কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। আমন্ত্রণের জবাবে বিএনপি বলেছে, প্রধান উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভূমিকা পালনের প্রমাণিত অভিযোগ রয়েছে। আর সে কারণেই দলটি ইউ-এর সভায় অংশ নেবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল।
বিএনপি যে অকারণে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেনি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিশেষ কয়েকজনের বক্তব্যে। যেমন দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক কথিত বিশেষজ্ঞ সিগফ্রেড উলফ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। উলফ এবং আরো কয়েকজন এমপি ও রাজনীতিক যুক্তিসঙ্গত কারণ এবং প্রমাণযোগ্য তথ্য ছাড়াই বলে বসেছেন, বাংলাদেশে কথিত জঙ্গিবাদী কর্মকান্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামীই নাকি প্রধানত দায়ী! তারা এমনকি একথা পর্যন্ত বলেছেন যে, জামায়াতই নাকি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মতাদর্শ প্রচার করে বেড়াচ্ছে! জামায়াতের কারণেই দেশে নাকি জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও বিস্তার ঘটতে থাকবে! বিরোধিতা করলেও সিগফ্রেড উলফসহ বক্তারা তাই বলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের কথা অস্বীকার করতে পারেননি। তাদের বরং বলতে হয়েছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন না পেলেও জামায়াত আগামী নির্বাচনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করবে।
জামায়াতে ইসলামী বিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি অন্য কিছু বিশেষ কারণেও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আলোচ্য সভাটি ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়েছে। এ ব্যাপারে সুচিন্তিত ভূমিকা রেখেছেন অজিত সাহা এবং পুষ্পিতা গুপ্ত নামের দু’জন বাংলাদেশি। দু’জনই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ব্যাপারে গভীর আশংকা প্রকাশ করেছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এ ধরনের একটি সভায় কোন যোগ্যতায় তথা কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে এই দু’জন অংশ নেয়ার ও বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন তা নিয়ে দেশের সচেতন সকল মহলে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠেছে। এর কারণ, ‘মাইনরিটিজ’ যুক্ত দুটি অপরিচিত সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সুযোগ পাওয়া দু’জনেরই বক্তব্য ছিল যথেষ্ট উসকানিমূলক। তারা বলেছেন, নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে নাকি সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরা নাকি নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা নাকি তাদের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং তারা নাকি দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়!
লক্ষ্যণীয় যে, হিন্দু দুই বাংলাদেশি কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উচ্চারণ করেননি। একথাও জানাননি যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই হিন্দুরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। তাদের অর্থ-সম্পদ ও সম্পত্তিও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই দখল করে নেয়- যেমনটি বর্তমান সরকারের আমলেও নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্যাতিত হিন্দুরা যে তথ্য-প্রমাণসহ মামলা-মোকদ্দমা করেও কোনো বিচার পায় না এবং এখনো যে পাচ্ছে না- এসব বিষয়েও মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন প্রতিনিধি নামের ওই দু’জন হিন্দু বাংলাদেশি।
ডা. দীপু মনিসহ আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদের কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্যের পাশাপাশি কথিত জঙ্গিবাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে চরম মিথ্যাচার এবং দু’জন হিন্দু প্রতিনিধির কল্পিত সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশংকার মতো বিশেষ কিছু কারণে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আলোচ্য সভার নির্বাচন সংক্রান্ত আহ্বান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে করার কোনা কারণ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর মধ্য দিয়ে আরো একবার একটি কঠিন সত্য প্রকাশিত হয়েছে। সে সত্যটুকু হলো, ইউরোপসহ বিশ্বের সব দেশই বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন দেখতে চায়। তারা আরো মনে করে, এ ধরনের নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, দৃঢ়চেতা এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন থাকা দরকার।
জাতীয় নির্বাচন শুধু নয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনেও যে সহিংসতা ঘটে সে বিষয়েও আলোচ্য সভায় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট উদাহরণসহ বক্তব্য রেখেছেন ইইউ পার্লামেন্টের বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রুপের প্রধান মিস জ্যাঁ ল্যামবার্ট। তিনি এবং তার সঙ্গে অন্য কয়েকজনও সন্ত্রাস ও সহিংসতা সৃষ্টির জন্য দায়ী দলীয় যুব গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ডা. দীপুমনির নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণকারীরা কিন্তু সহিংসতার ব্যাপারে কোনো কথাই বলেননি। তারা এমনকি একথাও বুঝতে দেননি যে, দলীয় যুব গোষ্ঠী বলতে আসলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের কথাই বোঝানো হয়েছে। ডা. দীপুমনিরা একই সঙ্গে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের সদিচ্ছার কথা তুলে ধরেছেন এবং সেভাবেই ইইউ পার্লামেন্টকে আশ্বস্ত করেছেন। তা সত্ত্বেও ডা. দীপুমনিদের আশ্বাস ও সরকারের কথিত সদিচ্ছা সম্পর্কে সন্দেহের অবসান ঘটানো যায়নি। কারণ, সভায় একটি স্বাধীন, দৃঢ়চেতা এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের যে আহ্বান জানানো হয়েছে তার জবাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিরা কোনো কথাই বলেননি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও ইইউ পার্লামেন্টের বাংলাদেশ বিষয়ক সভায় সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে আহ্বান জানানো হয়েছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের উচিত বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া এবং সে লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে তৎপর হয়ে ওঠা। শুধু মুখে বললে চলবে না, বাস্তব ক্ষেত্রেও সব দল যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে এবং ভোটাররা যাতে প্রভাবমুক্তভাবে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেয়ার সুযোগ পায় তার আয়োজন অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং ২০ দলীয় জোটের দাবি অনুযায়ী নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এমন একটি নির্বাচন কমিশনও গঠন করতে হবে, যে কমিশন হবে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন, দৃঢ়চেতা এবং শক্তিশালী।
আমরা আশা করতে চাই, নির্বাচনের সময় যেহেতু দ্রুত এগিয়ে আসছে সরকারও সেহেতু সকল বিষয়ে দ্রুতই তৎপর হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ