ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 July 2018, ২৮ আষাঢ় ১৪২৫, ২৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

উন্নয়ন এবং রাজনীতির চালচিত্র

জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এ নিয়ে বৈঠক হয়েছে গত বৃহস্পতিবার (৫ জুলাই)। বৈঠকে তিনি ঘোষণা দেন, একজন মন্ত্রী একটি গাড়িই ব্যবহার করতে পারবেন। একাধিক গাড়ি ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ কমানোর জন্য মন্ত্রী ও দফতরের অফিসাররা কীভাবে খরচ কমাতে পারেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু নির্দেশাবলী জারি করেন মমতা। নির্দেশনায় বলা হয়, বেসরকারি হোটেলের বদলে সরকারি হল বা স্টেডিয়ামে করতে হবে সভা-সমাবেশ। সরকারি অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে সাদামাটা। অফিস রুম, গেস্ট হাউস সাজানোর খরচ কমাতে হবে। সরকারি অনুষ্ঠানে উপহার ও খাওয়ার খরচ কমানোরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সব অতিথিকে ফুলের তোড়া দেয়ার প্রথাও বন্ধ হচ্ছে। রাজ্য ও জেলা সদরে বৈঠকে গাড়ির খরচ কমাতে ভিডিও কনফারেন্সের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নতুন গাড়ি কেনা ও গাড়ি ব্যবহারের খরচেও লাগাম টানার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এসি লাগানো ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেয়া হয়েছে সতর্কবার্তা। সরকারি অফিসারদের বিদেশ সফরেও জারি হচ্ছে বিধিনিষেধ। সরকারি কর্মকর্তাদের প্লেনে ইকোনমি ক্লাসে যাওয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে নবান্নে ডাকা বৈঠকেও ছিল ব্যয় সংকোচনের ছাপ। দুপুরের খাওয়ার মেন্যু থেকে বাদ দেয়া হয় ইলিশ, চিংড়ি, মাটন, ফিশ ফ্রাই, কাবাব। লাঞ্চে এদিন পোনা মাছ ছাড়া আর কোনো আমিষ পদ ছিল না।
জি নিউজ পরিবেশিত খবরটিতে ভেবে দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। আমরা জানি, যে কোনো সরকারেরই প্রধান কর্তব্য হলো দেশ ও জনগণের উন্নয়ন। দেশের উন্নয়নও আসলে জনগণের স্বার্থেই। কাক্সিক্ষত উন্নয়ন না হলে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই কাজটি না হলে সরকারের তেমন কোনো গুরুত্ব থাকে না। অথচ নানা অপচয় ও গণস্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের কারণে প্রতিনিয়ত সরকার ও সরকারি কর্মকর্তারা নিন্দিত হচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে খুব কম সরকারই এই নিন্দাবাদকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে একসময় গুরুত্ব দিতে হয়, কিন্তু শেষ সময়ের ওই বোধোদয়ে পতন রোখা যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার হয়তো বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন। তাই দেশ ও জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে অপচয় রোধের পদক্ষেপ নিয়েছেন, মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের খরচ কমাতে বলেছেন, বলেছেন বিলাসী মানসিকতা ত্যাগ করতে। আমরা তার পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই এবং কামনা করি সাফল্য।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে আমরা এমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখেছি আর এক নেতাকে। তিনি মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ। শেষ বয়সে ক্ষমতায় এসে তিনি মন্ত্রীদের বেতন ১০ ভাগ কমিয়ে দিলেন। জনগণকে মুক্ত করলেন করের বোঝা থেকে। ফলে মালয়েশিয়ায় এখন পণ্যদ্রব্য এঝঞ মুক্ত। এসব বিষয় থেকে উপলব্ধি করা যায় মাহাথির মোহাম্মদের বিজয়ের রহস্য।
কিন্তু আমাদের সরকার যেন চলছে উল্টো পথে। জনগণের ওপর করের বোঝা বেড়েই চলেছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কমছে অথচ সুবিধা বাড়ছে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের। কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়, ব্যবহার এবং ফোন চর্চার ক্ষেত্রে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তাতে জনগণ বিস্মিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সাথে তা মানায় না। জনগণের উন্নয়ন গতির সাথেও তা মানায় না। সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।
রাজনীতিবিদরাও স্বীকার করে থাকেন যে, জনগণের জন্যই রাজনীতি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, জনকল্যাণের কথা বলে ক্ষমতায় এসে রাজনীতিবিদরা অনেক ক্ষেত্রেই সে কথার মান রাখতে পারেন না। তখন তারা আত্মকল্যাণে, দলের কল্যাণে মত্ত হয়ে ওঠেন এবং তা করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন কায়েমী স্বার্থরক্ষার নীতিহীন রাজনীতিতে। এমন অবস্থায় আদর্শ ও জনকল্যাণকে জলাঞ্জলি দিয়ে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে গ্রহণ করে থাকেন চাতুর্যপূর্ণ ফ্যাসিবাদী কৌশল। পরিণতিতে দেশ থেকে বিদায় নিতে থাকে পরমত সহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও যৌক্তিক বিবেচনাবোধ। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দেয় অস্থিরতা, জনমনে দেখা দেয় হতাশা। জনগণ তখন রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা হারায়, রাজনীতির প্রতিও হারায় আগ্রহ। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি কখনো কাম্য হতে পারে না। কারণ এতে প্রকৃত প্রগতির পথ বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণ তিতবিরক্ত। বিশ্লেষকরাও কোন সুখবর দিতে পারছেন না। বিরাজ করছে নানা প্রশ্ন।
গত ৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি’ শীর্ষক এক গণবক্তৃতার আয়োজন করা হয়। রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়। তবে দেখার বিষয় হলো, সরকার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ওই বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেন এবং সংকটকে কতটা উপলব্ধি করেন।
আলী রিয়াজ তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, অতীতে বাংলাদেশ যত ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করেছে, এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন এবং গভীর। এখন দেশের রাজনীতিতে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা আসলে হাইব্রিড রেজিম বা দোআঁশলা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু কিছু উপাদান থাকলেও সেগুলো প্রধানত শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। ফলে রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্রগুলো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, এক সময় যে প্রাণবন্ত সিভিল সোসাইটি ছিল এখন তার চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। গত এক দশকে সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে নির্বাচনকে জবাবদিহির একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আলী রিয়াজ আরো বলেন, যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু আর সব ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা চূর্ণ করে ফেলাই হচ্ছে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উপায়। বাংলাদেশের সমাজে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, সহিংসতা ব্যাপক বিস্তারের যে সব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা এখানেই। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় মুদ্রিত তার বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের প্রভাব বিষয়েও কথা রয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি দুইভাগে বিভক্ত। তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল এবং সংস্কারপন্থী। গত কয়েক বছরে তুলনামূলকভাবে সংস্কারপন্থী ধারা দুর্বল হয়েছে। তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা রাজনীতির এজেন্ডা নির্ধারণের মতো ক্ষমতা রাখেন। ক্ষমতাসীন দল গত দুই তিন বছরে এই শক্তিকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
আলী রিয়াজ সংক্ষিপ্তভাবে হলেও তার বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্রের উপাদান, শক্তি প্রয়োগ, রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্র, দায়মুক্তি, সিভিল সোসাইটি প্রসঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়েছেন। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহির সব ব্যবস্থা চূর্ণ করে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার উপায় প্রসঙ্গে তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থে তা সংশ্লিষ্ট সবার গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কারণ দেশের চাইতে দল বা ক্ষমতা বড় হয়ে উঠলে জাতীয় সংকট ঘনীভূত হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ও নাগরিকদের কাম্য হতে পারে না। হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধস্পৃহা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে ইতিমধ্যে আমাদের রাজনীতিতে অনেক ভুল হয়ে গেছে। ওই সব ভুলের পুনরাবৃত্তি তো জাতিকে পিছিয়ে দেবে। জাতীয় স্বার্থের নিরিখে কি সঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের রাজনীতিবিদরা সমর্থ হবেন না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ