ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 July 2018, ২৮ আষাঢ় ১৪২৫, ২৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বকাপ মিশনে ব্যর্থ আর্জেন্টিনা!

মোহাম্মদ সুমন বাকী : কোচ সাম্পাওলি ব্যর্থ সেটাও বলা যাচ্ছে না। কারণ সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন (১৯৭৮ ও ৮৬) আর্জেন্টিনার সমস্যা ছিলো অনেক। তা বার বার ফুটে উঠেছে ফুটবল লড়াইয়ের চলতি বৃহৎ আসরে। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা রানার্স আপ হয়েছে মোট তিন বার (১৯৩০, ৯০ এবং ২০১৪)। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। এই অবস্থায় শত শত দেশ এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উৎসবে মেতে উঠে। শুধুমাত্র সাফল্য পাবার প্রত্যাশায়। সেই বিশ্লেষনে আকাশি-সাদা জার্সীধারীদের পদচারনা ঘটে অন্য দলের মতো। যারা সবুজ-ঘাসের মাঠের লড়াইয়ে সাফল্যের শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান নেবার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে। কখনো সফল, কখনো ব্যর্থ এভাবে আর্জেন্টিনা ময়দানের যুদ্ধে শরীক হয় বার বার। তাদের শৈল্পিক নৈপূণ্য ফুটবল বিশ্বে অন্যতম উপহার। কি বলেন? ২ বার চ্যাম্পিয়ন ও ৩ বার রানার্সআপ বিশ্বকাপের ন্যায় বৃহৎ আসরে এই সাফল্যটাও কম নয়। এর স্বাদ নেয় ক্যাম্পাস, ম্যারাডোনা, বুরুচাগা, ভেলাডোনা, বর্তমান সময়ের মেসি, এ্যাগুয়েরা, ডি মারিয়া, রোমারেও, হিগুইনরা। যাদের নাম ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় শোভা পাচ্ছে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নৈপূণ্যের কারণে। তারা দেশ এবং বিভিন্ন ক্লাবের আস্থাভাজন মডেল প্লেয়ার। যা সকলের বোধগম্য। এমন ধারায় ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ (ফিফা) জয় করার মিশনে মাঠে নামে লিওনেল মেসির টিম আর্জেন্টিনা। যাদের বাছাই পর্ব ছিলো নানা সমস্যায় জর্জরিত উৎকন্ঠার মাঝে। যেখান থেকে আসল লড়াইয়ে তারা অংশ নিতে পারবে কি? এই প্রশ্ন বার বার উঁকি দেয়! অবশেষে আর্জেন্টিনা সফল হয়। চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয় সেরা ৩২ দলের তকমা লাগিয়ে। তবে বাছাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাজে সময় কাটায়। শেষ মুহুর্তে ঘুরে দাঁড়ায়। পর পর কয়েকটি ম্যাচ ড্র ও এক জয় নিয়ে ঢুকে যায় ২০১৮ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে। ‘ডি’ গ্রুপে স্থান পায় যারা।
তাদের প্রতিপক্ষ দল ছিলো আইসল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া এবং নাইজেরিয়া। গ্রুপ ততটা শক্তিশালী নয়। সেটা কি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে? অবশ্যই তা আর্জেন্টিনার নাম, ধাড়, ভাড় ও অগনিত সাফল্যের বিচারে। যা দেখা গেছে বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু সবুজ-ঘাসের পারফর্ম বিষয়টি মূখ্য কথা। অনেক সময় সেটা বুরি বুরি সাফল্যের ইতিহাসকেও পাত্তা দেয় না। অবাক করে সবাইকে তা। কারণ বর্তমান ফর্মটাই আসল কথা। তখন ফুটবল বোদ্ধাদের নানা যুক্তি, তর্ক-বিতর্কের মাঝে জড়িয়ে দেয় যা! শতভাগ সত্য সেটা। হ্যাঁ, এবার বিশ্বকাপে এমন ঘটনাই ঘটেছে ইতিমধ্যে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানী বিশ্ববাসীকে অবাক করে বিদায় নিয়েছে। জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পেরে। ‘ডি’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছে এ ভুবনের নয়া দল আইসল্যান্ডের। অভিজ্ঞতায় মেসিরা এগিয়ে ছিলো বহুদূর। তা কাজে লাগেনি। ইনজুরি আক্রান্ত টিম আর্জেন্টিনায় হঠাৎ ছন্দপতনের শংকা জাগে পারফর্ম সো করার বেলায়। এমন ইঙ্গিতে এগিয়ে থেকেও খেলা ১-১ গোলে ড্র হয়। সেই সঙ্গে ছন্দপতনের শংকা বাস্তবে রূপ পায়। যা ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগায়। এই ড্র তারকা খ্যাতির ন্যায় আইসল্যান্ডের নাম মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে দেয়। এর বিপরীত চিত্রে ডি মারিয়া, এ্যাগুয়ারা, হিগুইনরা হতাশার রাজ্যে আটকে থাকে। খেলেছেন শুধুমাত্র জার্সীতে নাম বহন করে। গোল শোধ হবার পর সবার ধারণা ছিলো আইসল্যান্ড চাপে পড়বে এ অবস্থা হতে এগিয়ে যাওয়া না পর্যন্ত। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা দখলে নিয়ে নিবে জয়ের জন্য। না, সেই দৃশ্য দেখা যায়নি। ক্রীড়া প্রেমীদের অভিমত কি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে? মনে হয়েছে মেসির দলের লক্ষ্য ছিলো আপোষে ড্র করা। অবশেষে ফলে সেটা। যাক সে কথা। দ্বিতীয় খেলায় সমান তালে যুদ্ধ হয় আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে। গোলকিপারের মহাভুলে গোল হজম করে মনোবল ভেঙ্গে যায় মেসির টিমের। দ্বিতীয়ার্ধের এমন ঘটনায় হতবাক হয় সবাই। ব্যাক পাশ সর্বনাশ ঘটায়। আর্জেন্টিনার জয়ের স্বপ্ন হাওয়ায় উড়ে যায়। শোধ করার পরিবর্তে উল্টো আরো দুই গোল খেয়ে বসে। শেষ পর্যন্ত খেলায় হারে ৩-০ ব্যবধানে! যা কেউ কী ভেবেছে!! অথচ মেসি, ডি মারিয়ার দল লজ্জার সাগরে ডুবেছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলতে হলে জয়ের বিকল্প নেই। তা বাস্তবায়নে কঠিন। সেটাও আবার নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। এমন সমীকরণে টিম আর্জেন্টিনা সফল হয় ২-১ গোলে ম্যাচ জিতে। নক আউট পর্বের এ আকর্ষনীয় লড়াইয়ে ফ্রান্সের গতি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যেখানে। সুন্দর ছক এবং শৈল্পিক নৈপূণ্যের বাহক আর্জেন্টিনা পারবে কি সেখানে? এই প্রশ্নের মাঝে মেসিদের বিদায় ঘটে। ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে তারা হারে। এমন বিদায়ের কারণ কি? আসলে আর্জেন্টিনা গোল খড়ায় ভুগে। তা বার বার ধরা পড়েছে বাছাই পর্বের খেলাগুলোতে। যা শোধরাতে পারেনি কোচ ও দলের সকল প্লেয়ার। তারা বিশ্ব স্টার! অথচ গোল খরা কাটাতে চেষ্টা করতে দেখা যায়নি তাদের। এর খেসারত দেয় চূড়ান্ত পর্বে। দ্বিতীয় রাউন্ডে খেললেও ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গোল সংখ্যা মাইনাসে রয়ে গেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত! দলের নামের বিচারে সেটা ক্ষমার অযোগ্য ব্যর্থতা!! ৩-৪-৩ আর্জেন্টিনার ফরমেশন এই রকম। এর ব্যাখ্যা রক্ষনভাগে ৩ জন, দুই উইংসহ মাঝে মাঠে ৪ জন (একটু কৌশল আকারে), স্ট্রাইকার পজিশনে ৩ জন। খেলতে পারলে ফরম্যাটটি সোনায় সোহাগায় পরিনত হতো। গোল দেবার ক্ষেত্রে দুই উইং হঠাৎ উপরে উঠলে আক্রমন ভাগে খেলোয়াড় সংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচ জন। এখানে কৌশলের একটু পরিবর্তন। এরপরও ফরম্যাশনের বিচারে আশানুরূপ গোল পায়নি আর্জেন্টিনা! আবার দুই উইং নীচে নামলে রক্ষণভাগে প্লেয়ার সংখ্যা হবে পাঁচ। ঘুরে ফিরে মধ্যমাঠে থাকবে দুই জন। প্রতিপক্ষ টিমের আক্রমন ঠেকাতে উইংদের নীচে নামার কৌশল। যা প্রয়োগে স্ট্যামিনারের প্রয়োজন। সেটা ছিলো না দুই উইংয়ের। তাই ব্যর্থ কোচ সাম্পাওলির দল। বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ফিফা বিশ্বকাপ (২০১৮) নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে প্রতিদিন। সেটা রীতিমতো উৎসবের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। তা সকলের মাঝে। সেখানে অতিথির তালিকায় লাল-সবুজ পতাকা দেশের সাবেক সুপার স্টার ফুটবলার ও কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর মুখটি বার বার ভেসে উঠে। একের পর এক আলোচনা-পর্যালোচনার বিষয়গুলোতে। এবারও বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জিততে আর্জেন্টিনা ব্যর্থ। সেটা কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে ফোনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আশরাফ উদ্দিন চুন্নু বলেছেন, এর জন্য বড় ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন নেই। আর্জেন্টিনা বড় দল। যা ঠিক। সবার সঙ্গে এমন অভিমত আমার। ফ্রান্সের গতির কাছেই তাদের হার। এটাই মূল কারণ। দ্বিতীয় রাউন্ডে মেসিরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। পারেনি সফল হতে। শুধুমাত্র স্ট্যামিনারের (দম) অভাবে। সেটা অবশ্যই মনে করি আমি। সাম্পাওলির দল অতিরিক্ত মেসি নির্ভর হয়ে উঠে। আমার মতে তা সঠিক ছিলো না। যা হিতে বিপরীত হয়ে যায়। একজন প্লেয়ার দলকে কত সার্ভিস দিবে? এতে করে তার ওপর পরিশ্রমের চাপ বেশি পড়ে। এর ফলে ক্লান্ত হয়ে যায় সে। মেসি এবার উদাহরন হয়ে দেখা দিয়েছে। টিমে অন্যদের গায়ে ঠিকই তারকার তকমা লেগে রয়েছে। তাতে কি? বয়সের ভাড়ে তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কি বলেন? তাই দলের গতি বৃদ্ধি করার জন্য ইয়ং স্টার খেলোয়াড় দরকার ছিলো। আর্জেন্টিনার ফরম্যাশন প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, এক কথায় দারুন। কোয়ালিটি মানের প্লেয়ার না থাকায় সেটা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় কোচ। দুঃখ এখানে, তা সত্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ