ঢাকা, শুক্রবার 13 July 2018, ২৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আল মাহমুদের ছড়া

ড. আশরাফ পিন্টু : আল মাহমুদ (জন্ম:১৯৩৬ খ্রি.) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ এবং  চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ তার কবিতায় অবলম্বন করেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

কবি আল মাহমুদ বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও অনেক গল্প ও ছড়া লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি ছড়াগ্রন্থের নাম “পাখির কাছে ফুলের কাছে” ও “আয়রে পাখি লেজঝোলা”। তাঁর ছড়ায় ফুটে উঠেছে শিশুমনস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিক। এ ছাড়াও তাঁর ছড়ায় পাওয়া যায় দেশপ্রেম ও প্রতিবাদীচেতনা। এখন আমরা তাঁর ছড়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব।

 

মানুষের এক অনিন্দ্য সুন্দর সময় হলো তার শৈশব বা শিশুকাল। শিশুমন বড়দের মনের সাথে কিছুতেই যেন মিল খায় না। তাদের চিন্তা-চেতনা একান্তই আলাদা। তাই বড়রা কোনো কিছু বললে সহজে তাদের মন বসে না; ভাললাগে না। যখনÑ

আম্মা বলেন, পড়রে সোনা

আব্বা বলেন, মন দে;

তখন তারÑ

...কেবল ইচ্ছে জাগে

নদীর কাছে থাকতে,

বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে

পাখির মতো ডাকতে।

(পাখির মতো)

শুধু তাই নয়, সে ‘শালুক পাতার চাদরে” আর ‘শাপলা ফুলের শীতল সবুজ পালিশে’ ঘুমিয়ে থাকতে চায়। পড়তে বসলেই তাকে যেন গ্রাম-প্রকৃতি হাতছানি দেয়। তার মাথায় আসে নানান চিন্তাÑ

অঙ্ক নিয়ে বসলে আমার কখন কী যে হয়

টেবিলটাও পর হয়ে যায় বইগুলো সব ভয়।

ভয়ের চোটে ভাবতে থাকি শহর ভেঙে কেউ

দালান-কোঠা বিছিয়ে দিয়ে তোলে ক্ষেতের ঢেউ।

রাস্তাগুলো নদী এবং গলিরা সব খাল

ইলেকট্রিক খাম্বাগুলো পাল্টে হলো তাল।

(ভয়ের চোটে)

 

শিশুরা যখন একটু বড় হয় অর্থাৎ শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করে তখন তাদের মনে নানা চিন্তা এসে ভর করে। চাঁদনি রাত তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বেরিয়ে পড়ে প্রকৃতির মাঝেÑ হয়ে ওঠে এক উদাস কবিÑ

দীঘির কথায় উঠলো হেসে

ফুলপাখিরা সব

কাব্য হবে কাব্য

জুড়লো কলরব।

(না-ঘুমানোর দল)

মা যেমন শিশুকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে তেমনি শিশুও মা বলতে আত্মহারা। মা ছাড়া তার কাছে ধরা যেন তলা শূন্য পাত্র। তাই তার কাছে কোনো কিছু ভাললাগে না; কোনো কাজে মন বসে নাÑসব সাধ-আহ্লাদ যেন উবে যায়। এমন শিশুর মুখে শোনা যায়Ñ

ঈদের দিনে জিদ ধরে না আরÑ

কানে আমার বাজে না সেই

মায়ের অলঙ্কার।

 কেউ বলে না খাও

পাতের ভেতর ঠা-া হলো

 কোর্মা ও পোলাও।

(গৃহলতা)

মায়ের প্রতি তার এ ভালোবাসা নিখাঁদ-অকৃত্রিম। তাই মায়ের কোনো ক্ষতি হলে কিংবা কিছু হারিয়ে গেলে সে ব্যাকুল হয়ে ওঠেÑ

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে

হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।

(নোলক)

 

কবি আল মাহমুদের ছড়ায় যেমন শিশু মনস্তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে তেমনি তাঁর বেশকিছু বিখ্যাত ছড়া রয়েছে যেগুলোতে  ফুটে উঠেছে মাতৃভাষা, মাতৃভূমি তথা দেশপ্রেমের এক অনন্য রূপ। তাঁর নি¤েœাক্ত ছড়াটিতে মাতৃভাষা এবং ভাষাশহিদদের স্মরণের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে বৃটিশ শাসনামলে যাঁরা স্বাধীনতার জন্য শহিদ হয়েছেন তাঁদের কথাÑ

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে

ছড়াও ফুলের বন্যা

বিষাদগীতি গাইছে পথে

তিতুমীরের কন্যা।

চিনতে না কি সোনার ছেলে

ক্ষুদিরামকে চিনতে ?

রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে

মুক্ত বাতাস কিনতে ?

(একুশের কবিতা)

ঊনসত্তরের গণ অভ্যত্থান নিয়ে তাঁর এমন আরো একটি দেশপ্রেম ও প্রতিবাদীচেতনামূলক ছড়াÑ

ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!

শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে

দুয়োরে বেঁধে রাখ।

কেনো বাঁধবো দোর-জানালা

তুলবো কেনো খিল?

আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে

ফিরবে সে মিছিল।

(ঊনসত্তরের ছড়া)

আল মাহমুদ যেমন একজন শক্তিশালী কবি, গল্পকার তেমনি তিনি একজন শক্তিশালী ছড়াকারও বটে। তাঁর ছড়ার ছন্দের গাঁথুনি যেমন আটসাট তেমনি তাঁর ছড়ায় আমরা খুঁজে পাই শিশুমনস্তত্ত্বের এক ভিন্নতর জগৎ। সেই সাথে পাওয়া যায় দেশপ্রেম ও প্রতিবাদীচেতনা।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ