ঢাকা, শুক্রবার 13 July 2018, ২৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবি আল মাহমুদ এবং আমার স্মৃতিসাম্পান 

শাহিদ উল ইসলাম : আজ হতে প্রায় আঠারো বছর আগেকার কথা। কবিধ্বনি কবিতা পত্রিকার প্রকাশনা উৎসব নিয়ে তোরজোড় চালাচ্ছি। পত্রিকা ছাপা হয়ে গিয়েছে এখন বাকী কেবল মোড়ক উম্মোচন। কবি আবদুল হাই শিকদার আমার পার্শ্ববর্তী মহল্লার বাসিন্দা ছিলেন। তাকে আমি বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করি।  সে হিসেবে তাকে দিয়ে কবিধ্বনি কবিতা পত্রিকার মোড়ক উম্মোচন করাবো বলে সিদ্ধান্ত নেই। মনের কথাটি তাকে বলতেই তিনি কবি আল মাহমুদ এর কথা বললেন। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম! যা কোনদিন কল্পনাও করি নাই তাই যেন ঘটতে যাচ্ছে। কবি আল মাহমুদ মানে বিশাল কিছু। আল মাহমুদ মানে বাংলা কবিতার প্রবাদ পুরুষ। অনেকে তাকে বর্তমান বাংলা কবিতার প্রধান কবি হিসেবেও বলে থাকেন। তিনি কি আসবেন আমাদের এই ছোটখাটো অনুষ্ঠানে? সংশয় নিয়ে কথাটি কবি আবদুল হাই শিকদারকে জানাতেই তিনি বললেন, " তুই আগে তাকে দাওয়াত দিয়েই দ্যাখ না বাকীটা আমি দেখবো। আমি যেন সাহস ফিরে পেলাম এবং বললাম, " দাওয়াতের কাজটি আপনাকেই করতে হবে।" তিনি রাজি হয়ে গেলে আমার যেন আর আনন্দের সীমা রইলো না। লোক লোকান্তর, কালের কলস ও সোনালী কাবিন এর মতো বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থের রচয়িতা আমাদের অনুষ্ঠানে আসবেন, এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য ব্যাপার। যাই হোক আমি রীতিমত তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। কিভাবে তার সান্নিধ্য লাভ করা যায় মনে মনে এর ফন্দিফিকির আঁটছি। কিভাবে তার সাথে একটি ছবি তোলা যায় একথাও ভাবছি। যদিও এই বরেণ্য কবি আল মাহমুদকে ইতোপূর্বে আমি অনেক অনুষ্ঠানে দেখেছি কিন্তু কাছে ভিড়তে সাহস করি নাই। সাহসের অভাবে তার সাথে ফটোসেশনও সম্ভব হয়ে উঠেনি। কিন্তু এবার মনে হয় সে আকাক্সক্ষাটি পূর্ণ হতে চলেছে। এবার আর আমাকে পায় কে? স্বপ্ন সত্যি হলো। যথাসময়ে কবি আমাদের অনুষ্ঠানে এসে হাজির হলেন। বিশাল কোন অনুষ্ঠানও নয়। একদম সাদামাটা ডেকোরেশনে সাজানো হয়েছে মিরপুর মাজার রোডে অবস্থিত হযরত শাহ্ আলী মডেল হাই স্কুলের মিলনায়তন কক্ষ। দিনটি ছিল ২৩ জুলাই ২০০০ রবিবার। হাল্কা ছিপছিপে গড়নের সাদা দাড়িতে মুখম-ল যেন উজ্জ্বল থেকে উজ্জলতর হয়ে উঠেছে, গায়ে ক্রিম কালার পাঞ্জাবী এককথায় কবিকে বেশ সুন্দর লাগছিলো। তাকে মঞ্চে আহবান করলে তিনি তার আসনটিতে বসলেন। কবি মতিউর রহমান মল্লিক এর সভাপতিত্বে আবদুল হাই শিকদার বিশেষ অতিথি এবং প্রধান অতিথি আমাদের প্রাণপ্রিয় কবি আল মাহমুদ। মঞ্চে সভাপতির পাশেই আমার আসনটি ছিলো। কিন্তু আমি কিছুতেই সচ্ছন্দ অনুভব করছিলাম না। আমার কেবলি মনে হচ্ছিলো এখানে বসার যোগ্য আমি নই। সেদিন কবি আল মাহমুদ তার ভাষণে বলেছিলেন," বর্তমান সময়ে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ভয় নেই। আমাদের চারিদিকে চলছে বিরতিহীন সন্ত্রাস, শঙ্কা - এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন শুকুমার বৃত্তির চর্চা করা, কবিতার কাছে আত্মসমর্পণ করা।" অতঃপর তিনি তার নোলক কবিতাটি পাঠ করে শুনালেন " আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে / হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে......।" হল রুমের মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ভাষণ ও কবিতা শুনলেন। শেষে তিনি আমার বাসায় পদছাপ রাখলেন এবং তার সাথে ইচ্ছেমত ফটোসেশন করে নিলাম। আমার কাছে আরব্য রজনীর রাজহাঁস নামে তার একটি কাব্যগ্রন্থ ছিলো। তিনি তাতে অটোগ্রাফ দিলেন। শুধু একজন কবি নয়, কবি আল মাহমুদ এর সাথে ফটোসেশনের লোভ এখনো আমার মাঝে সমান মাপেই বিদ্যমান। এই যে তার সাথে আমার সম্পর্ক হল তা আজো বহাল আছে। এই সম্পর্ক আরো গভীর হল বাংলাদেশ টেলিভিশনের কথামাল ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে। কথামালার একটি পর্ব ছিলো স্বরচিত কবিতা পাঠ। এই পর্ব উপস্থাপনা করতেন কবি আল মাহমুদ আর আমি ছিলাম এর সমন্বয়কারী। সে হিসেবে প্রতি মাসে একবার তার সাথে আমার কথা হতো ও আড্ডা হতো। তার বয়স যখন ৬৪ তখন আমার বয়স ৩১ কিন্তু আমাদের সম্পর্ক ছিলো সম বয়সীর মতো। চির তরুণ এই কবি তরুণদের সাথে মিশতেন যেন তরুণ হয়েই। তার ভেতর কখনোই খুঁজে পাইনি অহঙ্কার। তিনি শুধু বড় মাপের একজন কবিই নন একজন বড় মাপের মানুষও। তিনি যে বড় মাপের মানুষ তার প্রমাণ পেলাম আরো একটি ঘটনায়, যা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। কবি শামসুর রাহমানের সাথে কবি আল মাহমুদের বিরোধ যুগ অবধি ছিলো। কবি আবদুল হাই শিকদার দুইজন বরেণ্য কবিকে আবার একত্রিত করার চেষ্টা করলেন। ঘটনাটি ঘটালেন ২০০৪ এ কবিতা পত্রের ২য় বৎসর পূর্তি অনুষ্ঠানে। কিভাবে কেমন করে তারা আবার একত্রিত হলো এ বিষয়ে কবি আবদুল হাই শিকদার আমার চেয়ে ভাল বলতে পারবেন। ঢাকা প্রেসক্লাব এর ক্যান্টিনে কবি আল মাহমুদ ও আমি কবি শামসুর রাহমানের অপেক্ষায় বসা ছিলাম। কবি শামসুর রাহমান এলেন, কবি আল মাহমুদ নিজে এগিয়ে যেয়ে কবির সাথে করমর্দন করলেন। অতঃপর তারা আধা ঘণ্টাব্যাপী গল্প গুজবে মেতে রইলেন। আমি তখন ক্যান্টিনের উত্তরপূর্ব জানালা ঘেঁষে বসা। দুই বরেণ্য কবিকে আড়চোখে দেখছি। তারা একসাথে দুপুরের খাবারও খেলেন। তাদের মধ্যে যে একটি বিরোধ প্রবাহমান ছিলো তা কে আর বলবে! যতদূর জানি এরপর তাদের আর কোন অনুষ্ঠানে একসাথে দেখা যায়নি। কিন্তু সেদিনের সেই দৃশ্য আজো আমার মন কার্নিশে ভেসে ওঠে। আমার খুব ভালো লেগেছিলো দুই কবিকে একসাথে দেখে। কবি আল মাহমুদকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, কবি শামসুর রাহমান ভালো লিখেন আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। এই যে কথা এতে কি কেউ বলবেন কবি আল মাহমুদের অহঙ্কার ছিলো।

ভালোবাসার টানেই কবি আল মাহমুদের কাছে বারবার ফিরে যাই। কিছুদিন আগে তার বাসায় গিয়েছিলাম তার সাথে কিছু গল্প করার জন্য। কিন্তু গল্পপ্রিয় মানুষটির আর যেন গল্প করার সময় নেই। তার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার সাথে কথা বলতে হয় উচ্চস্বরে, তাও কখনো শোনেন কখনো শোনেন না। ক্লান্তিতে অবসন্ন তার দেহ মন। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন শুধু। চোখেও কম দেখেন। সারাদিন বিছানাতেই থাকেন। তার এমন অবস্থা দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তাকে দেখলে এখন কেবল পূর্বেকার স্মৃতিগুলোই চোখে ভাসে। 

তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শেষ করলাম আমার স্মৃতিসাম্পান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ