ঢাকা, শুক্রবার 13 July 2018, ২৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

একের পর এক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে সরকার  ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার পাঁয়তারা করছে

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশে একের পর এক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার পাঁয়তারা করছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন বাংলাদেশে এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই বিষয়গুলো অনেকবার বলেছি কিন্তু সরকারের কর্ণগোচর হয়নি। বরং সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া। তাই তারা সবিংধান, আইন কানুন উপেক্ষা করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করছে চাইছে। ‘রাইট টু লাইফ এ ফার ক্রাই ইন বাংলাদেশ ২০০৯-জুন ২০১৯’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর লেক শোর হোটেলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএনপি।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মানবাধিকার বিষয়ক সচিব মাইক ক্রেমার ((MIKE CRAMER), ফ্রান্স দূতাবাসের উপ-প্রধান জ্যঁ-পিয়ের পঁশে, ভারতের রাজনৈতিক বিভাগের শান্তনু মুখার্জী (SHAWTANU MUICHERJTE) সহ কানাডা, সুইডেন, পাকিস্তান, ইরান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের কূটনীতিকরা অংশ নেন।

গোলটেবিলে আমন্ত্রিত বিদেশি প্রতিনিধি ও সদস্যদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করছে সরকার। এর বড় উদাহরণ হচ্ছে খালেদা জিয়ার জেল। যিনি তার জীবনের বড় অংশ গণতন্ত্রের জন্য উৎসর্গ করছেন তাকে একটি মিথ্যা মামলায় আটক করা হয়েছে।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, সাত বার খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য আবেদন করা হলেও সরকার কর্ণপাত করেননি। এমনকি, সর্বশেষ ১১ দিন ধরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি কারাগারে অসুস্থ। বিদেশিদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের দলের তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী হারিয়ে গেছে, ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। সারাদেশে ৭৮ হাজার মামলায় ১৮ লাখ নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করে আসামি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনুরোধ জানাবো- বাংলাদেশে এখন কী হচ্ছে তা নোট করুন। আমরা একটি গণতান্ত্রিক জাতি। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি বিএনপিকে ছাড়া কোনো নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। শুধু তাই নয়, বিগত তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কী হয়েছে তা আপনারা সকলেই অবগত রয়েছেন। এ অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ তাদের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে।

গোলটেবিল আলোচনার শুরুতেই বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ জানান, আলোচনা সভায়  উপস্থিত রয়েছেন জাতিসংঘ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র্র,  ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিগণ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত  দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ‘রাইট টু লাইফ: এ ফার ক্রাই ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১৫ মিনিটে প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে বর্তমান সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার তালিকা ও সংখ্যার আলোকে একটি তথ্য চিত্র প্রর্দশন করা হয়। 

এ তথ্য চিত্রটি দেখানোর পরে মির্জা ফখরুল ফখরুল বলেন, তথ্যচিত্র প্রদর্শনের পর বলার কিছু থাকে না। প্রতিদিন আমরা পত্র পত্রিকায় দেখছি দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে নামে লাশ পরে থাকে। নারীরা তাদের সম্ভ্রম হারাচ্ছে, শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর কত কী নির্যাতন করা হচ্ছে। ভিন্নমত পোষণকারীদের হাতুড়ি পেটা করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নানা কৌশলে সম্পূর্ণভাবে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে ফলাফলকে নিজের করায়াত্ব করছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, এখন ভোটারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না, বিরোধী দলের এজেন্টরা কেন্দ্রে যেতে পারে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনসমূহের ভোট অনিয়মের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারকে দানবীয় শক্তি আখ্যা দিয়ে এর হাত থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দানবীয় শক্তিকে রুখে দিতে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। একমাত্র জাতীয় ঐক্যই পারে সত্যিকার অর্থে ভূলণ্ঠিত গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করে জনগণের অধিকার জনগণকে ফিরিয়ে দিতে।

তিনি বলেন, আমি আশা করি আজকের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। যদিও জানি তারা সবটুকু দেখাতে কিংবা লিখতে পারবে না তারপরও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানাই।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার জনগেণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলেই মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে। তবে বিএনপির টার্গেট হচ্ছে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যে নির্বাচনে দেশের মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, দেশে এখন মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে যার কোন রিপোর্ট হচ্ছে না। গণতন্ত্র মৃত্যুর পথে। অথচ এই দেশের মানুষ ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে।

তিনি বলেন, আজ জুডিশিয়ারী সম্পূর্ণ ফেল, যার ফলেই  মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা বিচারবিভাগের সুবিধা পাচ্ছে। নিম্ন আদালতের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মোট কথা নিম্ন আদালত সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রীত হচ্ছে, তাদের পদোন্নতি, বদলীসহ সকল কিছুই আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর, সুপ্রীম কোর্টের নয়। আমরা বিশ্বাস করি যদি বিচারবিভাগ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতো তাহলে অবশ্যই মানবাধিকার লংঘন বন্ধ হতো

গণস্বাস্থ্য ট্রাস্ট্রি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে রক্ষী বাহিনী যেভাবে হত্যাকা- চালিয়েছে বর্তমান সময়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ, র‌্যাব একইভাবে হত্যাকান্ড চালাচ্ছে। যা কখনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞা থেকে অনুধাবন করছি যে, বাংলাদেশ ভারত দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে একটি ভিত্তিহীন মামলায় পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। এমনকি তার আইনজীবী লর্ড কারলাইনকে বাংলাদেশে আসতে ভিসা বাতিল করা হয়েছে। বিদেশী প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, আমরা বড় কারাগারে আছি। প্রত্যেকের জীবন বিপন্ন । আপনারা বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরুন।

এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং জনগণের সরকার ছাড়া দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে না। 

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কমিশনার একরামের গোঙ্গানি, গাড়ীতে রেপের বিচার ধীর গতিতে হয়। কিন্তু অন্য বিচারগুলো ঠিকই দ্রুত গতিতে হয়ে যাচ্ছে।

সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ বলেন, দেশে স্বাধীনতার চেতনা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। মিডিয়াকে কন্ট্রল করা হচ্ছে। সাংবাদিকরা আজ অসহায়। 

বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামানের পরিচালনায় গোলটেবিল আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন সাবেক রাষ্ট্রদূত সিরাজুল ইসলাম, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ। 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সেলিমা রহমান, রুহুল আলম চৌধুরী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, জয়নুল আবেদীন, এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, আবদুল কাইয়ুম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামা ওবায়েদ, সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফাহিমা মুন্নী, রুমিন ফারাহানা, মীর হেলাল উদ্দিন, সারোয়ার হোসেন, সৈয়দ এজাজ কবীর, জি-নাইন এর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ান্থ, আহাদ আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদার প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ