ঢাকা, শুক্রবার 13 July 2018, ২৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাদুঘর হবে থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহা

থাইল্যান্ডের সেই ঐতিহাসিক গুহার ভিতরের অংশ

১২ জুলাই, বিবিসি, চ্যানেল নিউজ এশিয়া : থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের যে গুহায় ১২ কিশোর ও তাদের ফুটবল কোচ দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আটকা পড়েছিল তা জাদুঘরে পরিণত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান কীভাবে চালানো হয়েছে তা ওই গুহা জাদুঘরে প্রদর্শন করা হতে পারে এবং এটি থাইল্যান্ডের পর্যটনের একটি ‘বড় ধরনের আকর্ষণে’ পরিণত হতে পারে।

অন্ততপক্ষে দুটি কোম্পানি উদ্ধার অভিযানের গল্প নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা করেছে।

উদ্ধার পাওয়া ওই থাই কিশোর দল এখন হাসপাতালে আছে। তারা দ্রুত স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা ফিরে পাচ্ছে। পাহাড়ের নিচের ওই অন্ধকার গুহায় ১৭ দিন আটকা থেকে কোচসহ তারা গড়ে দুই কেজি করে ওজন হারিয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হাসপতালের বেডে বসা ও শোয়া অবস্থায় তাদের দেখা গেছে। তাদের শারীরিক অবস্থা ভাল আছে এবং ভিডিওতে তাদের উৎফুল্লও দেখা গেছে। এরপরও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এক সপ্তাহ তাদের হাসপাতালেই থাকতে হবে।

উদ্ধার অভিযানের নাটকীয় ফুটেজ প্রকাশ করেছে থাই নেভি সিল। ফুটেজে বিশেষজ্ঞ ডুবুরিরা কীভাবে ওয়াইল্ড বোয়ার ফুটবল দলের ওই সদস্যদের গুহা থেকে বের করে এনেছেন তা দেখানো হয়েছে।

 থাম লুয়াং গুহাটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গুহাগুলোর মধ্যে অন্যতম। গুহাটি মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ চিয়াং রাইয়ে অবস্থিত। এখানকার ছোট শহর মায়ে সাইকে ঘিরে থাকা পর্বতের নিচে গুহাটির অবস্থান। পর্যটনের সীমিত সুযোগসুবিধা থাকা ওই এলাকাটি অনেকটাই অনুন্নত।

এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক গভর্নর ও উদ্ধার অভিযানের প্রধান নারংসাক অসোততানাকর্ন বলেছেন, “অভিযান কীভাবে করা হয়েছিল তা প্রদর্শন করতে এলাকাটিকে প্রাকৃতিক জাদুঘরে পরিণত করা হবে। এটি থাইল্যান্ডের আরেকটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে।”

পর্যটকদের সুরক্ষার জন্য গুহার ভিতরে ও বাইরে পূর্বসতর্কতামূলক বিভিন্ন ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে বলে জানিয়েছে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান ওচা।

তবে জাদুঘরটি সারা বছরজড়ে চালু থাকবে কি না তা পরিষ্কার হয়নি। কারণ জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বর্ষাকাল। এ সময় দেশটিতে প্রায়ই ব্যাপক বন্যা হয়ে থাকে।

এই বর্ষাকালের ভারি বৃষ্টিপাতেই গুহাটির ভিতর ঘুরতে থাকা ওই কিশোরের দল ভিতরে প্রবেশ করা পানিতে রাস্তা বন্ধ হয়ে আটকা পড়েছিল।

২৩ জুন আটকা পড়ার নয় দিন পর দুই ব্রিটিশ ডুবুরি গুহার প্রায় ৪ কিলোমিটার ভিতরে ওই কিশোরদের সন্ধান পান। আটকা পড়ার ১৭ দিন পর গুহাটি থেকে ওই ১২ কিশোরকে তাদের কোচসহ বের করে নিয়ে আসা হয়।

অভিযানে নিহত ডুবুরির স্ত্রীর আর্তি

থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া শিশুদের উদ্ধার অভিযানের সফলতায় সারা বিশ্বে যখন আনন্দের বন্যা, তখন ওই উদ্ধার অভিযানে প্রাণ হারানো সাবেক থাই ডুবুরির জন্য কাঁদছেন তার স্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, স্বামী ছিলেন তার পরম ভালোবাসার মানুষ। তাকে হারিয়ে শূন্যতা অনুভব করছেন। তবে এ ঘটনার জন্য গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া কিশোর ফুটবল দলের সদস্যদের দোষারোপে রাজি নন নিহত ডুবুরির স্ত্রী। ছবি শেয়ারিং-এর সামাজিক মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করা এক ছবির ক্যাপশনে এসব কথা জানিয়েছেন তিনি। এতে সাড়া দিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। নিহত ডুবুরির বিরোচিত ভূমিকা স্মরণ করে তার স্ত্রীর জন্য শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে বিশ্ববাসী।

গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার থাম লুয়াং গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আটকা পড়ে। টানা ৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২ জুলাই গুহার ভেতরে জীবিত অবস্থায় ১২ কিশোর ফুটবলারসহ তাদের কোচকে শনাক্ত করেন ডুবুরিরা।

থাই নৌ বাহিনীর সাবেক সদস্য সামারান কুনান তাদের খোঁজে শুরু হওয়া অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন ১ জুলাই। ৫ জুলাই গত মধ্যরাতে অভিযান চলার সময় অক্সিজেন স্বল্পতায় পড়েন কুনান। নেভিসিল কমান্ডার জানান, আটকা পড়া শিশুদের বের করে আনতে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার রাতে গুহায় অক্সিজেনের ট্যাঙ্ক বসানো হচ্ছিলো। সেখানেই কাজ করছিলেন ৩৮ বছর বয়সী সামান কুনান। তবে অক্সিজেনের লাইন টানার সময় নিজেই অক্সিজেন স্বল্পতায় পড়ে অচেতন হয়ে পড়েন। শুক্রবারের প্রথম প্রহরেই তিনি মারা যান।

থাই নৌ বাহিনীর সাবেক সদস্য সামারান কুনান এখন ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে উদ্ধারকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এই সামগ্রিক উদ্ধার অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। তার স্ত্রী ভ্যালিপোয়ান ইন্সটাগ্রামে স্বামীর একটি সাদাকালো ছবি পোস্ট করে এর ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি’। ‘তোমার শূন্যতা অনুভব করছি। সমস্ত হৃদয় দিয়ে তোমাকে ভালোবাসি’। এখন থেকে ঘুম থেকে জাগার পর আমি কাকে আলিঙ্গন করব?’

উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা চিয়াং রাই’র ভারপ্রাপ্ত গভর্নর নারোংসাক ওসোটানাকর্ন উদ্ধার অভিযানের শেষ দিনে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সামারানের মৃত্যুর দিনে কিশোর ফুটবলারদের ওই পুরো দল শোকাহত ছিল। তবে সেই শোককে আমরা শক্তি বানিয়েছি। জীবন বাঁচাতেই তিনি জীবন দিয়েছেন। সামারান প্রকৃত বীর। বিশ্ব তাকে মনে রাখবে।’

একদিন আগে আরেকটি ছবি পোস্ট করেছিলেন কুনানের স্ত্রী ভ্যালোপিয়ান। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তার স্বামীর বিরোচিত মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তাকে সমবেদনা জানিয়েছেন মানুষ। ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম গুহায় বৃষ্টি সত্ত্বেও প্রবেশের কারণে অনেকেই কিশোর ফুটবল দলটিকে দুষেছেন। তবে ভ্যালিপোয়ান তাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘শোন ছেলেরা, কোনভাবেই নিজেদের দায়ী ভাববে না তোমরা’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ