ঢাকা, শুক্রবার 13 July 2018, ২৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যাংক খাতে নৈরাজ্যের আশংকা

সরকার সকল ব্যাংককে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ব্যাংক খাতে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বর্তমান ও সাবেক ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার ও ব্যাংকের মূলধন আত্মসাত, জালিয়াতি এবং সঞ্চয়ী হিসাবে সুদের হার কমানোর পাশাপাশি আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণার মতো বিভিন্ন কারণে ব্যাংকে টাকা জমানোর ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক কমে গেছে। সে জন্যই ব্যাংকগুলোতে মারাত্মক তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে এবং পরিশোধের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোর পক্ষে তাই আর নতুন ঋণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন এবং আমদানি-রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংক তো বটেই, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতিও।

এই সংকট কাটিয়ে উঠে ব্যাংক খাতকে স্বাভাবিক ও লাভজনক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে হলে জাল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনার এবং কঠোর শাস্তি দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বভিন্ন ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে সে অর্থ অবশ্যই ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের মালিক ও বড় কর্মকর্তারা জড়িত থেকে থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবেই ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষ তথা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে তারল্য সংকট যেমন কাটিয়ে ওঠা যাবে তেমনি সম্ভব হবে নতুন পর্যায়ে ঋণ দেয়ার কার্যক্রম চালু করা। 

সে লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সকল ব্যাংককে এই মর্মে নির্দেশ দেয়া, ব্যাংকগুলো যাতে ঢালাওভাবে সুদ মওকুফের সুবিধা দেয়ার পরিবর্তে সুদসহ ঋণের অর্থ আদায়ের ব্যাপারে বেশি চেষ্টা চালায় এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরে। অমন অবস্থায় সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাও সহজ হবে।  

ওদিকে আবারও চমকের সৃষ্টি করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারসহ বিশেষজ্ঞরা যেদিন বাস্তব পরিস্থিতি এবং তথ্য-পরিসংখ্যানের আলোকে সম্ভাবনাময় পরামর্শ দিয়েছেন সেদিনই অর্থাৎ বুধবারই অর্থ মন্ত্রণালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেছেন, কয়েকটি ব্যাংক কার্যকর করলেও অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকই ১ জুলাই থেকে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ব্যাপারে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়নি। অধিকাংশ ব্যাংক বরং এখনো আগের মতোই নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী সুদ আদায় করে চলেছে। যুক্তি দেখাতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বললেও ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন টার্গেট। এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে ব্যাংকগুলোর আরো কিছু সময় লাগবে। এমন অবস্থায় ব্যাংক খাতে বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা  প্রকাশ করা হলে তার জবাবে মিস্টার মুহিত বলেছেন, সেটা হবে না। কারণ, সমগ্র বিষয়টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘দেখভাল’ করবে।

অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা কিন্তু অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তারা বলেছেন, ৯ শতাংশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই সবদিক চিন্তা করা দরকার ছিল। তাছাড়া মাননীয় মন্ত্রী ‘দেখভাল’ করার কথা যতোই বলুন না কেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা মেনে চলে না সে বিষয়ে অসংখ্য উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক তো এমনকি তার মূলধনও সাবাড় করে দিয়েছে। সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চিত অর্থও লোপাট করেছে অনেক ব্যাংক। এরই পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের আড়াল নিয়ে আত্মসাত করার অনেক অভিযোগও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এ ধরনের কোনো একটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধের কারণে কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যর্থ ও অক্ষম সে একই ব্যাংকের ওপর অর্থমন্ত্রী যখন ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব দেয়ার কথা বলেন তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।

প্রাসঙ্গিক অন্য কিছু বিষয়ও উল্লেখ ও লক্ষ্য করা দরকার। সরকার বাণিজ্যিক ঋণের বিপরীতে সুদের হার এক ডিজিটে তথা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো ওই নির্দেশের দোহাই দিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের সুদের হারও কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক এই হার এমনকি ৩ থেকে ৫ শতাংশেও নামিয়ে এনেছে। বলা বাহুল্য, এর ফলে ব্যাংকের সঞ্চয়ী ও বিভিন্ন মেয়াদী হিসাবে সাধারণ মানুষ আর আগের মতো টাকা রাখতে আগ্রহী হবে না। বহু আমানতকারী এরই মধ্যে তাদের টাকা উঠিয়ে নিতেও শুরু করেছেন বলে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে। 

এমন অবস্থায় তারল্য সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সংকটও আরো ঘনীভূত হবে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত মতবিনিময় সভায়  নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টির যে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে সেটাই সত্যে পরিণত হবে। কারণ, ওই মতবিনিময় সভায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন এবং এটাই সত্যও যে, আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে উঠিয়ে নেয়ার পরিবর্তে আমানতকারীরা ব্যাংকে বেশি পরিমাণে টাকা জমাবেন। এর ফলে একদিকে ব্যাংকের তারল্য সংকট কেটে যাবে এবং অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক ঋণ দেয়ার সক্ষমতা বাড়বে। এভাবে সব মিলিয়েই দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। 

কিন্তু অতি সহজ এ কথাটাই সরকার তথা অর্থমন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। বুঝলে প্রথমত তিনি সুদের হার ঢালাওভাবে এক ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ জারি করতেন নাÑ যার বাস্তবায়ন করা তার নিজের কথায়ই ‘অত্যন্ত কঠিন টার্গেট’। একই সঙ্গে তিনিই আবার সবকিছু ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংককে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না এবং পারবেও নাÑ তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে এরই মধ্যে। এভাবে সব মিলিয়েই ব্যাংক খাতের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও সর্বনাশের শিকার হতে চলেছে।

এমন অবস্থায় আমরা মনে করি, সরকারের উচিত অনতিবলম্বে বাণিজ্যিক সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ প্রত্যাহার করা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সুদসহ ঋণ আদায়ের ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে বেশি তৎপর করে তোলা। কোনো ব্যাংকই যাতে সুদের হার কমানোর মাধ্যমে সাধারণ আমানতকারীদের বঞ্চিত করার পদক্ষেপ না নিতে পারেÑ তারও ‘দেখভাল’ সরকারকেই করতে হবে। না হলে দেশের ব্যাংক খাতকে বিশৃংখলার শিকার হতে হবে, যার পরিণতি জাতির জন্য নিশ্চিতভাবেই অশুভ ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ