ঢাকা, শুক্রবার 13 July 2018, ২৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশে দেশে ছাত্র আন্দোলন

মুহাম্মদ নূরে আলম : কোটা আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয় এটা দেশের ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তাই প্রত্যেক আন্দোলনের সময় কবির নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় বারবার ফিরে আসে স্বৈরসরকারের পতনের প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে। সাধারণ ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম কাহিনী নিয়ে। তাইতো কবির কবিতা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বারবার ফিরে ফিরে আসে আমাদের মাঝে।

“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

মিছিলের সব হাত

কন্ঠ

পা এক নয়।

সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,

কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার।

কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার.....

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়” 

কবি হেলাল হাফিজের নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় আবারও আমাদেরকে দেশে সাধারণ ছাত্রদের হাতে গড়ে ওঠা বৈষম্যমূলক কোটা বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দিলো। এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। ২০১৮-র কোটা সংস্কার আন্দোলন, বাংলাদেশে সব ধরনের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সংগঠিত একটি আন্দোলন বা বিক্ষোভ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর চালু হওয়া কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে চাকরি প্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিলে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে।

গণতন্ত্রের জন্য একদম সাধারণ মানুষও কম ত্যাগ স্বীকার করেনি। সে আন্দোলনে রয়েছে নূর হোসেন নামের এক যুবকের নাম, আরও আছে তাঁর সহপাঠী রাশেদ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ঊর্ধ্ববাসবিহীন পেটানো শরীর, শক্ত দুই হাত মাথার পেছনে আলগোছে বাঁধা, তামাটে পিঠে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। সামরিক সরকারের স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটানোর আন্দোলনে অংশ নিয়ে সেই যুবক সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, সেদিন এই নূর হোসেন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, তাঁর মতো আরও অনেকে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন, সে কারণেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছিল। তবে নানা দৃষ্টিভঙ্গির গড়ে ওঠার পশ্চাতে রয়েছে পুজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী প্রচার মাধ্যমের পরিকল্পিত চক্রান্ত। কেন না, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং তারুণ্যের শক্তি সঠিক করণীয় ঠিক করে যাতে বিশ্ব জুড়ে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে সে জন্য মিডিয়ার এ ধরনের পরিকল্পিত প্রয়াস চলছে। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। সে সময় মেধাতালিকা ২০ শতাংশ বরাদ্দ রেখে, ৪০ শতাংশ জেলাভিত্তিক, ৩০ শতাংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এবং ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার এই কোটা ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশের বেশি কোটা রয়েছে যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলাভিত্তিক কোটা ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ। তবে নিয়ম অনুসারে এসব কোটায় যোগ্যপ্রার্থী না পাওয়া গেলে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। অথচ বর্তমান কোটা ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯ (১), ২৯ (১) ও ২৯ (২) অনুচ্ছেদসমূহে চাকরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত কোটা প্রথা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী।

এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে দেশের সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে টনক নড়েনি সরকারের কিংবা বুদ্ধিজীবী মহলের। এরপর নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটে এ নিয়ে। দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ যাবতকালের সব থেকে বড় প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রমাণ দেয়। উপাচার্যের স্ববিরোধী বক্তব্য, প্রক্টরের প্রশাসনিক দুর্বলতা, সব শেষ কবি সুফিয়া কামাল হলের নাটকীয় ঘটনা এবং প্রভোস্টের অদক্ষতা তাদের এ দুর্বলতার প্রমাণ দেয়। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গোটা জাতির কাছে সম্মানিত ব্যক্তি, কিন্তু জাতির বিবেকদের এহেন অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতা তাদের ‘বুদ্ধিজীবী’ ও ‘জাতির বিবেক’ খ্যাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই শিক্ষকদের যেভাবে মেরুদ-হীন বলছে সবাই, তাতে কেবল তাদের সম্মান নয়, আমাদেরও লজ্জা লাগছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আড্ডায় আজ তারা হাসি-তামাশার বিষয়।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে সচেতন শিক্ষকদের ব্যানারে যারা মানববন্ধন করেছেন সেখানে শিক্ষকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এখন প্রশ্ন হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮ শত শিক্ষকের মাঝে মাত্র ২০ জনই কি সচেতন? নাকি সাদা-কালো-নীল আর গোলাপি রঙের শিক্ষকরা সচেতন নন? আমি দেখেছি যখন কোন শিক্ষক অন্যায়ভাবে নির্যাতিত হন তখন সাদা-কালোর বিভেদ থাকে না, সবাই শিক্ষক হয়ে যান। কিন্তু যেই শিক্ষার্থীদের জন্য তারা শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের দিনে তারা সাদা-কালোর রাজনীতি করেন!

পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে জাতির নানা ঐতিহাসিক বাঁকে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনায় ছাত্ররা সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার তুলনায় গত ৪৬ বছরে রাজনীতিতে ছাত্রসমাজের ভূমিকা অনেকটাই ম্লান। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্রসমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। একটি নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এই অর্জনেই ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে, জাতির আকাঙ্কার প্রতীক হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আইয়ুব-ইয়াহিয়া-মোনেমের উত্তরাধিকাররা চালু করে কারফিউ গণতন্ত্র। তারা ক্ষমতার হালুয়া-রুটি বিলিয়ে দল গঠন করে, প্রতিষ্ঠা করে লুটপাটের অর্থনীতি, চালু করে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বন্দুকের জোরে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসীন হন। সেই সময়ই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ছাত্রসমাজ রাজপথে নামে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জয়নাল, জাফর, দীপালি সাহা, সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেনসহ অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর ছাত্রনেতা নাজিরউদ্দীন জেহাদ শহীদ হন। জেহাদের লাশ অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে রেখে ডাকসুর নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠন করার মধ্য দিয়ে আমরা শপথ গ্রহণ করি স্বৈরাচার এরশাদের পতন ছাড়া আমরা রাজপথ থেকে ঘরে ফিরব না। সেদিন ডাকসুর সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছিল ছাত্রনেতারা। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৭ নভেম্বর ডা. মিলন শহীদ হন। ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয় এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামরিক শাসনের প্রথম প্রহর থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এ দেশের সংগ্রামী ছাত্রসমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিক্ষানীতিসহ জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সেদিনকার ক্রিয়াশীল সব কটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। এই জোটের মূল চেতনাই ছিল স্বৈরশাসনের চির অবসান। ছাত্রদের শপথ ছিল স্বৈরশাসনের অবসান না ঘটিয়ে ঘরে ফেরা নয়। এ দেশের যা কিছু গৌরবের, দেশের যা কিছু অহংকারের, সব কিছুতেই আছে ছাত্রসমাজের অবদান।

ভারত: সময়টা ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল। ভারতের স্বনামধন্য জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (ডিএসইউ) কিছু প্রাক্তন সদস্য একটি সাংস্কৃতিক সভার আয়োজন করে। সভার উদ্দেশ্য ছিল, উদ্যোক্তাদের ভাষায়, ‘মকবুল ভাট এবং আফজল গুরুর বিচার বিভাগীয় হত্যার প্রতিবাদে এবং কাশ্মীরী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ’। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ছাত্র সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের ক্যাম্পাসে মাইক ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং শেষমেষ পুলিশ দিয়ে তাদের উচ্ছেদ করে।

ডিএসইউ সাহায্য চায় জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (জেএনইউ-এসইউ) সাথে অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো, এসএফআই, এআইএসএ- এরা একজোট হয় গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা করার অধিকার রক্ষায়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেফতার করা হয় জেএনইউ-এসইউ’র সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে। অভিযোগ দেয়া হয় ‘কাশ্মীরের স্বাধীনতা চাওয়া জনগণকে সমর্থনের’। ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কুমারের মুক্তি দাবির আন্দোলন। প্রথমে সেই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, তারাও শিকার হয় পুলিশি ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হামলার। এভাবে রাজধানী দিল্লিসহ বেঙ্গালুর, চেন্নাই, জয়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে কানহাইয়া কুমারের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন হয়।

এই ঘটনাটি বলার কারণ হলো, এই আন্দোলনের সাথে ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতা সাধারণ বিষয়, কিন্তু এই ন্যায়ের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষকগণের ভূমিকা ভারতের ছাত্র আন্দোলনকে আজ অবধি স্মরণীয় করে রেখেছে। কলকাতায় শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলার পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস বলেন, “দরজা বন্ধ করে, ফোর্স দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা যায় না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হলো মুক্ত চিন্তার জায়গা।” গণতন্ত্রে সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সুরঞ্জন দাস। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ছাত্র আন্দোলন করে জেএনইউ’র সমর্থনে প্ল্যাকার্ড ছাপিয়ে মিছিল করে। অন্যদিকে ছাত্রদের আন্দোলন থামাতে মরিয়ে হয়ে উঠে প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে বলা হয় উপাচার্যকে। কিন্তু সুরঞ্জন দাস সাফ জানিয়ে দেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না এবং পুলিশ ডেকে তিনি ক্যাম্পাস শাসন করবেন না। সেরকম কিছু হলে পদত্যাগ করবেন। উপমহাদেশর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমিলা থাপারসহ প্রায় ১২০ জন শিক্ষক তখন ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ায়। রমিলা থাপার বক্তব্য দেন জেএনইউ ক্যাম্পাসে। ‘দ্যা নেশন এন্ড হিস্ট্রি- নাউ এন্ড দেন’ প্রবন্ধে তুলে ধরেন সমকালীন রাজনীতি, বাক স্বাধীনতা ও ইতিহাসের আলোকে উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদকে স্মরণ করিয়ে দেন। কানহাইয়া কুমারকে দলিত তথা নি¤œ বর্ণের হিন্দু বলে সীমাহীন নির্যাতন করা হয়। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের কারণে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। 

প্যারিস: সময়টা ১৯৬৮। প্যারিসে ছাত্র আন্দোলন তখন মধ্যগগনে। প্রতিদিন রাস্তায় ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের খন্ডযুদ্ধ চলছে। এরকম এক সন্ধ্যারসময় রাজপথে তৈরি করা অস্থায়ী ব্যারিকেডের উপর দাঁড়িয়ে ছাত্রদের সামনে ধর্মঘটের সপক্ষে বক্তব্য রাখছিলেন বেলজিয়ামের মার্ক্সবাদী দার্শনিক আর্নেস্ট ম্যান্ডেল। বক্তৃতা শেষ করে নেমে এসেই তিনি দেখতে পেলেন সামনে একটি গাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে। ওই রাজপথেই শিশুর মতো আনন্দে নেচে উঠে চেঁচাতে লাগলেন ম্যান্ডেল, “কী অপূর্ব! কী সুন্দর! বিপ্লব তা হলে এসেই গেছে।” যারা দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখল, তাদের মধ্যে হাতেগোনা  কিছু ছাত্র ছিল। একমাত্র তারাই জানত ওই গাড়িটা ছিল প্রফেসর ম্যান্ডেলের নিজের!

আজ, প্যারিসের ছাত্র আন্দোলনের অর্ধশতবর্ষ পূর্তিতে ফিরে দেখতে গেলে উপরের ঘটনাটির থেকে বেশি ব্যঞ্জনাময় গল্প আর কিছু হতেই পারে না। নিজের গাড়ি পুড়তে দেখে আনন্দে নাচার জাদুবাস্তবতা তো আসলে একটা অভ্যুত্থানের আকাশ ছুঁতে চাইবার রূপক মাত্র। কে না জানে, আন্দোলনরত প্যারিসের দেওয়ালে তখন সবচেয়ে বেশি যে স্লোগানটা চোখে পড়ত তা হল, ‘বাস্তববাদী হও, অসম্ভবের দাবি করো’!

অসম্ভবের দাবি ফিরে ফিরে আসে। বহু বছর পরে যখন ‘হোক কলরব’ স্লোগানে কলকাতা কেঁপে উঠবে, যখন কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদদের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে সমগ্র ভারত জুড়ে ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নামবে। বস্তুত, নাগরিক অধিকারের আন্দোলন কীভাবে রাজনৈতিক রূপ পেয়ে যায় তার একটা উদাহরণ হতে পারে ’৬৮-র প্যারিস। ছাত্রী-আবাসনে অবাধ প্রবেশের দাবিতে বিক্ষোভ চলছিলই। ১৯৬৮-র মার্চ মাসে এই বিক্ষোভে যোগ দিল অন্যান্য বামপন্থী ছাত্ররা, স্লোগান তুলল ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে। মে মাসের শুরুতে নঁতের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিল প্রশাসন। বিদ্রোহী ছাত্ররা প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র লাতিন কোয়ার্টারে অবস্থিত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘাঁটি গাড়ল। 

৫ মে থেকেই শহরের সিনেমা হল এবং নাট্যশালাগুলিকে ছাত্ররা দখল করে জনসমাবেশ করছিল। এরকমই একটি সভায় এক মাওবাদী নেতা তাঁর রাষ্ট্রবিরোধী বক্তৃতায় বললেন, ‘দ্য গলের (তৎকালীন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট) স্বৈরাচার জনগণের সংসদকে বুর্জোয়া নাট্যশালায় পরিণত করেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে ছাত্রনেতা ওয়ালি রোজেল বলে উঠলেন, ‘‘আর ঠিক এই কারণেই বুর্জোয়া নাট্যশালাগুলোকে দখল করে তাদের আমরা জনগণের সংসদে পরিণত করব।’’ সরকার আন্দোলনকে দাগিয়ে দিল মাওবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে। দেশকাল নির্বিশেষে রাষ্ট্রক্ষমতা সম্ভবত একই রকমের ভূত দেখে!

ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ, গায়ক, কবি, অধ্যাপক এবার আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এলেন। তত দিনে ফ্রান্সের সরকার প্রায় নিষ্কিয় হয়ে গিয়েছে। কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ সবকিছুরই দখল সাধারণ মানুষের হাতে। এবার চার্লস দ্য গল যেটা করলেন সেটা প্রায় অভাবনীয়। মন্ত্রিসভাকে অন্ধকারে রেখে দেশ ছেড়ে নিরুদ্দেশ হলেন। যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীকে বলে গেলেন, ‘‘আমার দিন শেষ’’। সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশ ফেটে পড়ল প্রবল উল্লাসে। অভ্যুত্থানের ভয়ে প্রেসিডেন্ট ভাগলবা হয়েছেন! কয়েকদিন বাদে অবশ্য ফিরেও এলেন। নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হল রাজবন্দীদের। জুন মাসে সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হল। এরপর আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসল অভ্যুত্থান। কিন্তু দ্য গল আর কখনও তাঁর হৃত জনপ্রিয়তা ফিরে পাননি। নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও ১৯৬৯ সালে পদত্যাগ করেন তিনি। আর্নেস্ট ম্যান্ডেল ভুল ভেবেছিলেন। বিপ্লব আসেনি। কিন্তু বিপ্লবের থেকেও বেশি বিপজ্জনক হল বিপ্লবের ভূত, যা ভবিষ্যতের পৃথিবীকে তাড়া করে বেড়ায়। নতুন রূপে ফিরে আসে বারবার। জেএনইউ থেকে যাদবপুর, তাহিরির স্কোয়ার, শাহবাগ, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট... বিপ্লব মানেই তো সমগ্র পৃথিবীর মানুষের অধিকার আদায়ের মহাউৎসব!

কানাডা: ২০০৯ সালে কানাডার ছাত্র -শিক্ষকরা অর্থনৈতিক মন্দার দোহাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সংকোচনের প্রদেশিক সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন। অনেক শিক্ষক নির্ধারিত ক্লাস বাতিল ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটও ছাত্রদের এই কর্মসূচির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে।

জার্মান: ২০০৯ সালে জার্মানে ‘টিউশন ফি’ প্রথার বিরুদ্ধে শত শত ছাত্র বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী ছাত্রদের সমাবেশকে ঘিরেরাখে। পরে তাদের দাবি মানতে বাধ্য হয় সরকার। 

আয়ারলান্ড: আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ১৫ হাজার ছাত্র ‘টিউশন ফি’ প্রথা পুনঃপ্রবর্তণের প্রতিবাদে নানা প্লাকার্ড ও বাদ্য যন্ত্র নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ছাত্রদের এই টিউশন ফি বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে শ্রমিকরাও সামিল হয়। নানা শ্লোগানমুখর এই বিক্ষোভের মূল বক্তব্য ছিল অর্থের বিনিময়ে কোন শিক্ষা নয়। ‘আইরিশ টাইম’ ৫ ফ্রেব্রুয়ারি ২০০৯ এই ছাত্র বিক্ষোভ সম্পর্কে মন্তব্য করে....Dublin came to a standstill today as about 15,000 students marched through the city centre in protest against the reintroduction of third-level fees.

যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে  Tennessee রাজ্যের বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা রাজধানীতে সরকারের শিক্ষা বাজেট সংকোচন ও শিক্ষার্থীদের উপর শিক্ষা ব্যয় বোঝা বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। বিক্ষোভ সমাবেশে কফিন বহন করে বুঝাতে চেয়েছে টিউশন ফি বৃদ্ধির মাধ্যমে ছাত্রদের ভবিষ্যৎ মৃত্যুবরণ করবে’। বিস্তারিত পড়ুন: Tennessee Students Protest Tuition Increases at Governor’s State of the State Address. 

দক্ষিণ আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকার ‘এলিস’ এ অবস্থিত Fort Hare University  এর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বৃদ্ধি ও আবাসিক হলের ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কর্মসূচী ব্যহত হয়। বিস্তারিত পড়ুন: Students protest rent, registration fees.. 

বুরুন্ডী: আফ্রিকার বুরুন্ডীর বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাদের শিক্ষা অধিকার সপ্তাহ  University of Burundi পালনের জন্য ক্যাম্পাসে মিলিত হয়। শিক্ষা অধিকার সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় সকলের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সমবেত ছাত্ররা শ্লোগান তোলে (শিক্ষাকে শক্তিশালি কর; দেশের নেতাদের আমাদের কথা স্মরণ রাখতে হবে!)। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদের রাজনীতি ও সাংগঠনিক তৎপরতার বিরুদ্ধে যারা যুক্তি করেন ; তারা অন্যতম যুক্তি দেখান যে পৃথিবীর অন্য কোন দেশে ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্বত্ত নেই। বিশ্বের কোথাও ছাত্ররা শিক্ষাঙ্গনে মিছিল সমাবেশ করে না। এ ধরনের যুক্তি যারা করেন তার কতটুকু জেনে-শুনে খোঁজ খবর নিয়ে তা করেন ....তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

পরিশেষে ফিরে আসি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে। মূলত কোটা আপনাকে কী দিচ্ছে? একটা মেধাবী সৃষ্টিশীল রাষ্ট্র আপনি কখনো কোটা দিয়ে গড়তে পারবেন না। যে শিক্ষার্থী দিন-রাত পরিশ্রম করে, শিক্ষার মূলধারায় এসে যখন দেখল, তার চেয়ে মেধাহীন তরুণটি কোটার কারণে তার স্থান দখল করে নিচ্ছে, তাহলে সে কী করে তার মেধার পরিচর্যা করবে? সংগত কারণেই, সে আগ্রাসী হয়ে উঠবে, তার মেধার মূল্য চাইবে, আন্দোলন করবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাকে আপনি বিএনপি-জামায়াত কিংবা ছাত্রলীগের ইস্যু বলে চালিয়ে দিতে পারেন না। সব আন্দোলন বিএনপি-জামায়াত বা ছাত্রলীগের নয়। সাধারণ জনগণেরও কিছু চাওয়ার থাকে। তাহলে কোটা আপনি কোথায় রাখবেন? আপনি পাবলিক বাসে কোটা রাখতে পারেন কিংবা অন্য যেকোনো জায়গায় রাখতে পারেন। কিন্তু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা মেধা মূল্যায়নের জায়গায় নয়। মেধার অভাব মেধা দিয়ে পূরণ করতে হয়, কোনো কোটা দিয়ে নয়। আর যদি সেটা না করা হয়, তাহলে রাষ্ট্র একসময় ভয়াবহ মেধাহীনতার চক্রে পড়ে যাবে, এটা নিশ্চিত। সত্যকে বুলেট-টিয়ারশেল দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় না, সত্যকে প্রতিরোধ করতে হয় সত্য দিয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হোক, তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হোক, সেটা সবাই চায়। কিন্তু নাতি-নাতনি পর্যন্ত মেধার জায়গা কোটা নিয়ে থাকবে সেটা অযৌক্তিক। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে গিয়ে তাদের সমাজের চোখে ঘৃণিত করে তুলবেন না। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করবেন না। কোটা থাকবে, কোটা থাকুক। কিন্তু তা কখনো সাধারণ মানের চেয়ে বেশি না। মেধার জায়গায় মেধাকে মূল্যায়ন করুন, কোটাকে নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ