ঢাকা, শনিবার 14 July 2018, ৩০ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বগুড়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা চাপে ফেলে আপস

বগুড়া অফিস : হেফাজতে শারিরিক নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী পুলিশের চাপে পড়েই প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। ফলে পুলিশ হেফাজতে অমানুষিক নির্যাতন করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশ নির্যাতনের শিকার মোস্তাফিজার রহমান কিরন বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া বটতলার মৃত সাইফুল আলমের ছেলে। গত ১ জুলাই কিরনের মা পারভীন আক্তার বাদী হয়ে বগুড়া শহরের বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলামসহ পুলিশ ফাঁড়ির অন্যান্য সদস্যদের আসামী করে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩ এ আদালতে মামলা করেন।
মামলা সূত্রে জানাযায়, মোস্তাফিজার রহমান কিরন একটি মুদি দোকানে কাজ করতো। গত ২০ জুন বিকেল ৪ টার দিকে বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ তরিকুল ইসলাম তাকে বাড়ি থেকে ধরে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান। এরপর পুলিশ কিরনকে ফাঁড়ির মধ্যে গ্রিলের সঙ্গে বেধে নির্যাতন করা হয়। সেদিন রাতে কিরনের মা ও বউ তাকে খাবার দিতে যান। এ সময় কিরনকে আহতবাস্থায় দেখেন তাঁরা। কিন্তু পুলিশের ভয়ে তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি। তারা ফাঁড়ি থেকে চলে আসার পর একই ভাবে কিরনকে নির্যাতন করা হয়।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, নির্যাতনের ফলে কিরন অসুস্থ হয়ে পড়লে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে চিকিৎসা করায় পুলিশ। পরের দিন২০১১ সালের একটি ছিনতাই চেষ্টা মামলায় (মামলা নং-১৯৭ তারিখ-২৯-০৫-১১, জিআর নং-৭২-/২০১৮) জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে কিরনকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিরন জেল হাজতে থাকা অবস্থায় তার মা পারভীন আক্তার জেলা দায়রা ও জজ আদালতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন -২০১৩ এর ৭ ধারার বিধান অনুসারে পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-০২পি/১৮) আদালত বাদীর অভিযোগ গ্রহন করেন এবং ৪ জুলাই শুনানী শেষে আদেশে জেলা ও দায়রা জজ উল্লেখ করেন যে, শাস্তিযোগ্য অভিযোগের সত্যতা আছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। তাই অভিযোগের বিষয়ে একটি মামলা রজু করার এবং একজন সহকারি পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্ত করার জন্য পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেয়া হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ি থানায় মামলা রেকর্ড করা হয় এবং সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্তবর্তী অভিযোগ তদন্ত শুরু করেন।
এদিকে, গত ১১ জুলাই সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন কিরন। ম্যাজিস্ট্রেট শরিফুল ইসলামের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে কিরন বলেন, ঈদের চারদিন পরে পুলিশ তাঁকে তার বাড়ি থেকে ধরে আনে। পরে তাকে বনানী পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার কাছ থেকে অস্ত্র চায় পুলিশ। কিরন জানান, তার কাছে তো কোনো অস্ত্র থাকার কথা নয়। তখন বনানী ফাঁড়ির ইনচার্জ তরিকুল ইসলাম কিরনকে হাতকড়া অবস্থায় দুই পায়ের হাঁটুতে মারধর করেন। এতে তার ডান হাঁটু মারাতক্বভাবে জখম হয়। এরপর তার পাগুলো বেঞ্চের হাতলে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। তরিকুল আসরের নামাজে যাওয়ার আগে কিরনকে ফাঁড়ির গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেন। এ সময় তার হতকড়া খুলে পুলিশের এক সদস্য কিরনকে গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। এরপর তরিকুল আবার এসে কিরনকে তার শরীরের পেছন দিক থেকে নির্যাতন করেন। এক পর্যায়ে তরিকুলের কাছে থাকা লাঠি ভেঙ্গে যায়। ওই লাঠির আঘাতে কিরনের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত বের হয়। এ সময় কিরনের মা তাকে জানালার সঙ্গে ঝুলতে দেখেন। কিরনকে নির্যাতনের কারণ জানতে চাইলে তার মাকেও গালিগালাজ করে পুলিশ। পরে আরও নির্যাতন করা হয় কিরনকে। এরপর তাকে মোহাম্মাদ আলী হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
জবানবন্দীর এক পর্যায়ে আদালতকে তার শরীরের আঘাতের চিহ্নগুলো দেখান কিরন। জবানবন্দীতে বিচারক উল্লেখ করেন, ‘জখমীর শরীর পরীক্ষা করে দেখা যায় যে-
১. তার ডান বাহুতে, কুনইয়ে, কবজিতে, আঙ্গুলের উল্টোপিঠে ও নখে বিভিন্ন মাপের জখমের চিহ্ন রয়েছে।
২. বাম বাহুতে, কনুইয়ে বিভিন্ন মাপের কালশিরা জখমের দাগ রয়েছে।
৩. কমরের ডান পাশে পিছনে প্রায় ৪ ইঞ্চি লম্বা আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
৪. বাম পায়ের গোড়ালী থেকে উরুর নিম্নাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন মাপের প্রায় ৮ থেকে ১০টি কালশিরা জখমের দাগ রয়েছে।
৫. ডান পায়ের হাঁটুতে ব্যান্ডেজ এবং হাঁটুর নিতে পায়ের পিছনে ৩/৪টি জখমের চিহ্ন রয়েছে।
৬. দুই পায়ের পাতায় পানি জমেছে।’
শুক্রবার কিরনের বাড়িতে গেলে তার মা পারভীন বেগম ও চাচাতো বোন গুলশানারা বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করায় কিরনকে পুলিশ বলেছে তাকে শ্যুট করা হবে। এছাড়াও বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় দুইজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা তাদের বাসায় যান। পুলিশ কর্মকর্তা মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধের পাশাপাশি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করে কয়দিন টিকে থাকবেন? পুলিশের বিপক্ষে সাক্ষী কোথায় পাবেন? একপর্যায়ে পুলিশের ভাড়া করা সিএনজিচালিত অটোরিক্সাযোগে তাদেরকে আদালতে বাদীর আইনজীবির চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদনে স্বাক্ষর করেন। পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তদন্ত করছেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সনাতন চক্রবর্তী। তিনি মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে বলেন, বাদীকে কোনো চাপ দেয়া হয়নি। তাকে অনুরোধ করায় তিনি স্বেচ্ছায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ