ঢাকা, শনিবার 14 July 2018, ৩০ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবে অনিয়ম

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজকাল যেখানেসেখানে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ল্যাব গড়ে উঠছে। মানসম্মত হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতার জন্য একশ্রেণির অসৎ ব্যক্তি এবং চিকিৎসাবণিক রোগীদের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত। এমন অভিযোগ পুরনো হলেও সাম্প্রতিক এদের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শুধু মেট্রোপলিটন সিটি ঢাকাতেই নয়, এর বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, রংপুরসহ অন্য মফস্বল শহরগুলোতেও এদের দাপট বেড়েছে বলে সংবাদ ও টিভি রিপোর্টে প্রকাশ। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবে প্রায়শ র‌্যাব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করলেও চিকিৎসাবণিকদের লাগাম টেনে ধরা যেন সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি এপোলো, স্কোয়ার, ইউনাইটেডের মতো বিশেষায়িত হাসপাতালেও অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, মেডিকেল পরীক্ষার রিএজেন্ট, কেমিকেল পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে ঢাকা মহানগরীর ধানম-ির পপুলার ডায়াগনস্টিক ল্যাবে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এজন্য সংশ্লিষ্টদের ২৫ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। এরপরও এসব হাসপাতাল বা চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রের অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।
বন্দরনগরী চট্টলাতেও চিকিৎসাসেবার নামে জমজমাট বাণিজ্য চলছে। ম্যাক্স হাসপাতাল নামক একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় এক সাংবাদিকের আড়াই বছর বয়সের শিশু মারা যায়। সামান্য গলাব্যথা আর ঠা-াকাশি নিয়ে শিশুটিকে ম্যাক্সে ভর্তি করা হয়। আউটডোরে উপযুক্ত চিকিৎসা দিলেই যেখানে ঠা-াকাশি ভালো হয়ে যাবার কথা, সেখানে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করেও সুচিকিৎসা দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। শেষমেষ শিশুটি মারাই যায়। এনিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্টসহ থানায় মামলা হলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা ক্ষুব্ধ হন এবং কোনও সাংবাদিকের সন্তানের চিকিৎসাই করবেন না বলে হুমকি দেন। কোনও চিকিৎসকের ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে রোগীর আত্মীয়স্বজনের ক্ষুব্ধ হবারও যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। এমনকি মামলা হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। আবার রোগীর ক্ষুব্ধ আত্মীয়স্বজনদেরও বাড়াবাড়ি হতে পারে। সবই আপেক্ষিক ও তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই বলে কোনও কমিউনিটির সন্তানের চিকিৎসা বন্ধ করে দেবার হুমকি কোনও ডাক্তার দিতে পারেন না। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে কোনও ডাক্তারের এমন হুমকি প্রদান শুধু অনকাক্সিক্ষত নয়, অমানবিকও। এর তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা আবশ্যক। উল্লেখ্য, আলোচ্য ঘটনার বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টেও সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের অবহেলা চিহ্নিত হয়েছে। হাইকোর্ট মন্তব্য করেছে, ‘ভুলের বৈধতা দিতে ধর্মঘট ডাকা অন্যায় এবং ডাক্তারি এখন দুর্বৃত্তের পেশায় পরিণত’। এমনই দুর্ভাগ্য আমাদের! তবে সব ডাক্তার, হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক ল্যাবকে আমরা দোষ দিতে পারি না। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও ভালো চিকিৎসা হয়। অনেক রোগী সেরে ওঠেন। এমন উদাহরণও যথেষ্ট আছে দেশে।
শিশু রাইফার অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু নিয়ে হৈচৈ থামতে না থামতেই র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে নানা অনিয়ম পায়। হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদও দুই বছর আগে শেষ হয়েছে। তা আর নিয়মমাফিক নবায়ন করা হয়নি। এসব কারণে ম্যাক্স কর্তৃপক্ষকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে আদালত। এর প্রতিবাদে প্রাইভেট হাসপাতালের মালিকরা ধর্মঘট ডেকে বন্দরনগরীর সকল প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন। পরে অবশ্য প্রশাসনের আশ্বাসে ধর্মঘট সাময়িক স্থগিত করা হয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে কি আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে না? বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সবগুলোই অনিয়ম করছে এমন প্রমাণ কেউ পায়নি। সবগুলোকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেছে এমনও নয়। তাহলে কি লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ল্যাব সবই চলবে? হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কি অনুমোদন ও নিয়মনীতি ছাড়া চলতে পারে? নিশ্চয়ই না। এ ছাড়া আলোচ্য ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনও অণুঘটনা আছে কি না, থাকলে তারও রহস্য উদঘাটন করে বন্দরনগরী চট্টলার চিকিৎসাবিষয়ক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির আশু নিরসন দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ