ঢাকা, শনিবার 14 July 2018, ৩০ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাঙাল ভেতো তবে ভিতু নন

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আমিও খাস বাঙাল। তাই মনে কিছু নেবেন না। মনও খারাপ করবেন না। বাঙালের অভ্যাস নিয়ে কথা বলবোতো তাই আগেই কথাটা বলে রাখলাম। কেন না, অকারণে কেউ কেউ আমাকে বেজাত, বেজন্মা বলে গালমন্দ করতে পারেন। বাঙালের স্বভাব আর মুখ দুটোই বেশ হাল্কা। হঠাৎ যেমন কিছু করে ফেলতে বাধে না, তেমনই মুখ ফসকে অকথা আকথা বলতেও বাধে না।
বাঙালের দুটো বড় অভ্যাসের খ্যাতি আছে দুনিয়ায়। একটি ‘ভেতো’। অন্যটি একটু পরে বলছি। ভেতো মানে ভাতপ্রিয়। ভাতখোর। রুটিপরোটা, মাছ, গোশত, ডাল, ভাজি, চিকেন, বিরিয়ানি এসবই খান বাঙাল। এরপরও ভাতের প্রতি বাঙালের যে টান তা অতুলনীয়। একসময় এমনও ছিল যে তিনবেলাই অর্থাৎ সকাল, দুপুর, রাত এই তিন সময় আমরা অর্থাৎ বাঙালরা ভাতই খেতাম। ভাত ব্যতীত তেমন অন্য খাবার তৈরি হতো না বাঙালের ঘরে। হ্যাঁ, পিঠেপুলি তৈরি হতো। এখনও হয়। তবে তা বছরে দুই একবার। বিশেষত শীতে নতুন ধান উঠলে। আর এসবও কিন্তু ধান বা চাল থেকেই প্রস্তুত হতো। মানে সরাসরি ভাত না হলেও একই উপকরণ থেকে প্রস্তুত। মানে ভাতে যা থাকে পিঠেপুলিতেও তাই। বরং শ্বেতসার বা শর্করা ইংরেজিতে কার্বোহাইড্রেট বলতে যা বোঝায় সেটা পিঠেপুলিতে আরও বেড়ে যায়। কারণ এগুলোতে গুড়চিনি, নারিকেল ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটানো হয়। এছাড়া চিঁড়েমুড়ি তাওতো ভাতেরই অন্যরূপ। মানে সবদিক থেকে বাঙাল ভেতোই।
একসময় গম বা গেহুর আটা বাঙাল চিনতোই না। রুটি খাওয়াতো দূরের কথা। মুদির দোকানে এক বস্তা আটা এনে রাখলে ৬ মাসেও তা বিক্রি শেষ হতো না। দোকানে থেকে থেকে আটায় ফাংগাস পড়ে নষ্ট হয়ে যেতো। পাকিস্তান আমলের শেষদিকে ১ টাকায় দুই-আড়াই সের চাল পাওয়া যেতো। আটার রুটি খাওয়াকে অনেকেই মর্যাদার মনে করতো না। ভাবা হতো রুটি গরিবের খানা। তবে মালদা, মুর্শিদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে চাল-কলাই মিশ্রিত আটা দিয়ে রুটি হয়। হাতপাকানো এ রুটি শেকা হয় মেটে খোলায়। চাল-কলাইয়ের রুটি ওই অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষত সকালের নাস্তা হিসেবে খুব চলে ওই অঞ্চলে। তবে এ রুটি কলাইর রুটি নামে খ্যাত হলেও চালের আটাই লাগে বেশি। এক কেজি চালের সঙ্গে আড়াই-তিনশ’ গ্রাম কলাই হলেই চলে। অন্যথায় রুটি ভালো হয় না। অর্থাৎ এ রুটির সিংহভাগও চাল মানে ভাতই। কাজেই এমন ঐতিহ্যবাহি ‘ভেতোবাঙাল’ খ্যাতি ঘুচবে কেমনে? এবং আমি এখ্যাতি ঘোচাবার পক্ষে নই। আর এটা শুধু খ্যাতি নয়। ‘সুখ্যাতি’ বলতে পারেন। বাঙাল ভেতো বলে কষ্টসহিষ্ণু। ভাতের জন্যই দেশ ছেড়ে আজকাল লাখ লাখ বাঙাল বিদেশ গিয়ে কাজ করছেন। কষ্ট সহ্য করছেন। আমেরিকা-ইউরোপের মতো দেশে গিয়ে বসবাসও করছেন। তবে অনেক বাঙালকে বিদেশে গিয়ে যারপরনেই দুর্ভোগও পোহাতে হচ্ছে।
আমার এককালের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে জার্মানি ভেগে যায় ভালো ভাতের আশায়। প্রায় চার দশক কাল সেখানে তাকে কাটাতে হচ্ছে। এখন তার সেখানে ভাত জুটলেও অনেক কিছুই তার সেখানে জোটেনি। প্রথম দিকে আলু খেয়ে তার জীবন বাঁচাতে হয়েছে। এছাড়া ঘর ভেঙেছে বারবার। তবে সাহস হারায়নি। তাছাড়া আলু খাওয়াও খারাপ কিছু নয়। ইউরোপের বহু দেশের মানুষের প্রধান খাবার আলু। আর এতে ভাতের চাইতে খাদ্যগুণ কম নেই। বরং বেশিই। বিশেষত আলুতে ভিটামিন ‘সি’ আছে, যা ভাতে নেই। কাজেই ভাত মানুষকে খেতেই হবে এমন নয়। তবে বাঙাল বলে কথা। আমরা অনেক কিছু ছাড়তে পারি। কিন্তু ভাত নয়। হ্যাঁ, ঠেলার নাম বাবাজি। ঠেলায় পড়লে বাঙাল লোহা গেলে বলে কথা আছে।
যারা ভেতো মানে ভাতখোর তাদের জন্য দুঃসংবাদ আছে। চালের দাম হু হু করে বাড়ছে বলে নয়াদিগন্ত খবর দিয়েছে গত ৬ জুলাই। বাজেট ঘোষণার আগে চালের দাম একটু কমে এসেছিল। কিন্তু ঘোষণার পরপরই বাড়তে শুরু করে। এটা হয়েছে বাজেটে আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ প্রস্তাব করবার ফলে। বাজেট পাসের পর আবারও বাড়ছে। অথচ দেশে চালের উৎপাদন ভালো হয়েছে। মজুতও আছে যথেষ্ট। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চালের দাম কমেছে। তাই চালের দাম বাড়বার কথা নয়। অর্থমন্ত্রী মাল সাহেবও তেমনটাই বলেছিলেন। কিন্তু কথার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের মিল থাকে না কখনই। এবারও হয়েছে তাই। কেজিতে ইতোমধ্যে ৬ থেকে ১০ টাকা চালের দাম বেড়ে গেছে। আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেকের ধারণা চালের দাম অল্পদিনের মধ্যে ১০০ টাকা ছোঁবে। তাই বলছিলাম, ভেতোদের জন্য এটা দুঃসংবাদ।
ধান যখন কৃষকের হাত থেকে মহাজন বা মিলারদের কাছে চলে যায় তখনই নানা অজুহাতে দাম বাড়ানো হয়। কৃষকদের অবস্থা যেইসেই। তাঁরা কষ্ট করেন। কিন্তু লাভ খান মহাজন বা মিলাররা। লাভের গুড় পিঁপড়া খায় বলে একটা কথা আছে না? ওইরকম আর কী! কৃষক সবসময় কৃষক। ওদের গোলায় ফসল থাকতে দাম থাকে না। খালি হলেই দাম বাড়ে ফসলের।
ভাতের মতো বা এর চাইতে খাদ্যমান সম্পন্ন গমের আটা একসময় ভেতোবাঙাল খেতে পছন্দ করতেন না। অনেক বাঙাল রুটি খাওয়াকে সম্মানজনক মনে করতেন না। এখন কিন্তু সেদিন নেই। গমের রুটি খেতে এখন বাঙালের ইজ্জত যায় না। তবে আলু খেতে এখনও পছন্দ করেন না তেমনটা। তরকারি বা সবজি হিসেবেই আলু এখনও গণ্য হয় বাঙালসমাজে। আলু প্রধানখাদ্য হতে পারে তা প্রায় নিরানব্বই শতাংশ বাঙাল ভাবতেই পারেন না এখনও। তবে অজান্তে আলুর তৈরি চিপস, চানাচুর, ক্রেকার্স প্রভৃতি খেয়ে ফেলেন দিব্যি। শুধু তাই নয় আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসা একশ্রেণির গাছআলু ‘কাশাবা’ থেকে তৈরি বিস্কুট, পাউরুটি, কেক ইত্যাদি ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে দিব্যি গলাধঃকরণ করেন বাঙাল তরুণরা। আর এই গাছআলুর চাষ হয় এখন দেশেই। এছাড়া রাঙা আলু বা মিষ্টি আলু থেকেও মানসম্পন্ন খাবার প্রস্তুত হয় দেশে। বাঙাল খানও। কিন্তু বাসায় তা খেতে চান না। অবশ্য এসব মজাদার খাবারের প্রস্তুতপ্রণালিও জানেন না আমাদের গৃহিণীরা। বাঙাল যেমন ভাত খেতে খেতে হয়ে পড়েছি ভেতো, তেমনই বউঝিরাও ভাত আর চিরাচরিত পদ্ধতিতে রান্নাবান্নায় প্রায় তেতো। তবে এখন দেশের প্রচলিত খাদ্যখাবার, শাক-সবজির দাম প্রচুর। সামনে এসবের দাম আরও বাড়বে। তাই চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির খবরটি ভেতোদের জন্য দুঃসংবাদই।
অনেকেই মনে করেন ভেতো মানে যারা ভাতখোর তাঁরা ভয় করেন বেশি। ভেতো মানে ভিতুও। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করি সবসময়। ভাতখোর মানে ভেতোবাঙাল ভিতু হবেনই এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ভেতোরা ভিতু হয় এমন কেউ কি কখনও রাসায়নিক পরীক্ষা চালিয়েছেন? মনেতো হয় না। পরীক্ষার জন্য আমেরিকার নাসায় বাঙালের রক্ত পাঠাতে পারেন, ভেতোরা কেউ ভিতু কি না তা নিশ্চিত হতে।
তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যারা ভাত খান, তাঁরা ভিতু নন। বরং দুঃসাহসী। দুর্বিনীত। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না। স্বাধীনতাযুদ্ধে এর সফল প্রমাণ দিয়েছেন এই ভেতোরাই। পরাজিত করেছেন পাকিস্তানের আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র সেনাবাহিনীকে। অন্যায় যুদ্ধবিগ্রহ দমন করতে গিয়েও বাঙাল সেনা ও পুলিশ সদস্যরা বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রয়োজনে জীবনও বিলিয়ে দিচ্ছেন সাহসিকতার সঙ্গে। এমনকি মিথ্যে অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে আজীবন জেল খাটছেন কিংবা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে যাচ্ছেন নির্দ্বিধায় এবং নির্বিঘে। কিন্তু মিথ্যে অভিযোগ স্বীকার করছেন না কেউ। মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাচ্ছেন ফাঁসির মঞ্চে বীর সেনানীর সাহস নিয়ে। জীবনের মায়া, পরিবার পরিজন, জায়া, জননী, পুত্রকন্যার স্নেহমমতা সত্যের সৈনিকদের কাছে একদমই তুচ্ছ। এমন ঘটনা বেনিয়া শাসনকালে প্রত্যক্ষ করেছি। এখনও দেখছি। বৃটিশ বেনিয়াদের দেয়া কালাপানির মতো নির্বাসন মেনে নিয়েছেন ভেতোবাঙাল বলে খ্যাতরাই সেসময়। বাঙাল ভাত খান বলে ভেতো হতে পারেন, কিন্তু ভিতু নন। এর প্রমাণ মিলেছে বহুবার এবং বহুভাবে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে গেলে কালাপানির সাজাপ্রাপ্ত ভেতোদের অনেক আলামত পাওয়া যায় আজও। ভেতোরা নির্বাসনে গেছেন। ফাঁসিতে ঝুলেছেন। কিন্তু অন্যায় ও জুলুমের কাছে মাথা নোয়াননি। এই হচ্ছে ভেতোবাঙালের কৃতিত্ব আর বীরত্বগাঁথা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ