ঢাকা, শনিবার 14 July 2018, ৩০ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে

এইচ এম আকতার : যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে বাকযুদ্ধ এখন রুপ নিয়েছে বাণিজ্যিক যুদ্ধে। ছড়িয়ে পড়ছে এ বাণিজ্যযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় শক্তিগুলো যখন অর্থনৈতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে তখন সবার মতো বাংলাদেশকে যথেষ্ট হিসাব করে এগোতে হবে। কারণ বিশ্ব শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক লড়াই প্রভাব ফেলতে পারে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে। এ রাজনীতিতে যুক্ত হলে বড় ধরনের মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশকে।
বিশ্ব অর্থনীতির দুই পরাশক্তি চীন-যুক্তরাষ্ট্র। দেশ দু’টির কথার লড়াই এখন রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক লড়াইয়ে। সেই সাথে জারি আছে বিশ্বকে নিজেদের মতো ভাগ করার প্রতিযোগিতাও। একক দেশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানির বাজার যুক্তরাষ্ট্র। আর পদ্মা সেতু, কর্ণফুলির টানেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল অবকাঠামো নির্মাণে বড় বিনিয়োগ চীনের। তাছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেন-দেনের সম্পর্কও ছোট নয়। ফলে উভয় দেশের সাথেই ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রক্ষা জরুরি বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, তা না হলে সুখকর হবে না বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা।
যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, চীন থেকে আমদানি করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়েছে এবং শুল্ক আরও বিস্তৃত করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা বেশকিছু পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে।
বেইজিং অভিযোগ করেছে, অর্থনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে এ নিয়ে অভিযোগও করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকায় যেসব চীনা পণ্য রয়েছে, তার একটি সিএফ মোটর সাইকেল। চীনের কোম্পানি সিএফ মটরের তৈরি করা এক রকম বারো হাজার মোটর সাইকেল এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে।
এ ব্যাপারে কোম্পানির অন্যতম ব্যবস্থাপক গাও চিং বলেন, অতিরিক্ত পঁচিশ শতাংশ ট্যাক্স অবশ্যই আমাদের ব্যবসায় অনেক প্রভাব ফেলবে। এটা আমাদের মুনাফা অনেকাংশে কমিয়ে দেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য আমেরিকানদের চাকরির সুযোগ নষ্ট করে দিচ্ছে।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটা মনে করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, নিয়মনীতি ভেঙ্গে চীনের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন চীনের প্রধান শিল্পনীতি নিয়ে, যাকে চীনারা বলছে ‘মেড ইন চায়না টুয়েন্টি টুয়েন্টি ফাইভ।’ এটা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে একটি বড় ধরনের পরিকল্পনা, যার উদ্দেশ্য বিশ্বের অর্থনীতিতে চীনের এক নম্বর হয়ে ওঠা। যার প্রধান উপাদান হবে রবোটিক্স এবং ইলেকট্রিক ভেহিকেলসের মতো প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। এদিকে মার্কিন নীতি- নির্ধারকরা মনে করেন এই সমস্ত প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার মানে ভবিষ্যতে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ প্রযুক্তিপণ্যের বাজার হারাতে হবে। আর এমনটি হতে দিতে নারাজ ট্রাম্প প্রশাসন। চীনের হাত থেকে এই সমস্ত ব্যবসায়ের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে রাখতে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিশিল্পে চীনা বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হোয়াইট হাউজ।
এদিকে চীনে ব্যবসায় পরিচালনাকারী অধিকাংশ মার্কিন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য যুদ্ধ এবং পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের বিরোধিতা করেছেন। চীনে ব্যবসায় পরিচালনাকারী আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স সাংহাই এর সদস্য আমেরিকান ব্যবসায়ীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে এমন চিত্রই দেখা যায়।
রয়টার্স জানায়, এই জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৩৪ জন ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বের ৬৯ শতাংশই বাণিজ্য যুদ্ধ এবং শুল্কের বিরোধিতা করেন। এই জরিপে অংশগ্রহণকারী মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশই বাণিজ্য শুল্ককে সমর্থন করেন। এবং বাকিরা কোনো পক্ষে অবস্থান নেয়া থেকে বিরত থাকেন। তারা মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমেই বাণিজ্যে এমন অচলাবস্থার অবসান করা উচিৎ।
এদিকে চীনে ব্যবসায় পরিচালনাকারী অধিকাংশ মার্কিন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য যুদ্ধ এবং পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের বিরোধিতা করেছেন। বৃহস্পতিবার, চীনে ব্যবসায় পরিচালনাকারী আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স সাংহাই এর সদস্য আমেরিকান ব্যবসায়ীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে এমন চিত্রই দেখা যায়।
এদিকে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের কৌশল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ২০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণার পর আগামী সপ্তাহে আমিরাত সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ১৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়ে তা দাঁড়িয়েছে ৫৩ বিলিয়ন ডলারে। আমিরাতের তিন দিনের সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং দেশটির নেতৃবৃন্দ ছাড়াও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রেসিডেন্ট শি’র সফরসঙ্গী হিসেবে আমিরাত যাচ্ছেন।
গত বছর চীন ও আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। আমিরাতের বিদেশী বাণিজ্যের ১৪ দশমিক ৭ ভাগ হয়ে থাকে চীনের সঙ্গে। তেল ছাড়া অন্যান্য পণ্যের মধ্যে ইথিলিন পলিমার ও গাড়ি প্রধান পণ্য হিসেবে দুটি দেশ আমদানি ও রফতানি করে থাকে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হবার পর আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধের নিস্পত্তি করবার লক্ষ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করেননি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ না নেয়া হলে তারা আর উপযাচক হয়ে বাণিজ্য বিরোধ মিমাংসার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেবেন না। বৃহস্পতিবার, চীনের বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এমন কথা বলা হয়।
এ সময় মন্ত্রণালয়টি বরাবরের মতোই জানায়, চীন বাণিজ্য যুদ্ধ চায়না আবার তাকে ভয়ও পায়না। তবে আমাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এমন যুদ্ধে আমরাও লড়াই করব। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র গাও ফেং এক নিয়মিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন। এদিকে চীনের আরো ২০ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপের হুমকির পরপরই গাও ফেং এমন কথা বলেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুটি পরাশক্তি মধ্যে যে বানিজ্য যুদ্ধ চলছে তাতে তৃতীয় বিশ্বের দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ যুদ্ধে আমাদের কারো পক্ষে অবস্থান নেয়া ঠিক হবে না। নিরপেক্ষ না থাকার কোন বিকল্প নেই।
তিনি মনে করে,বাংলাদেশে একক বড় পোশাক রফতানি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। আর উন্নয়ন অগ্রগতি অন্যতম অংশিদার হলো চীনে। এই দুই শক্তির দুটির আমাদের জন্য অপরিহায্য। এখানে বাংলাদেশকে কৌশল অবলম্বন করে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। কোন এক দিকে ঝুঁকলে  অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন হবে।
সাবেক কূটনৈতিক হুমায়ুন কবির বলেন, এই লড়ায়ে আমরা নেই। বিশ্ব বাণিজ্য দখলের এই লড়ায়ে নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমান করতে হবে। এই রাজনীতিতে কোনভাবেই জড়ানো যাবে না। নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন,চীনের সাথে আমাদের অনেক বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এ সুযোগে চীনের বাজারে আমাদের পণ্যের প্রবেশাধিকার চাইতে হবে। রফতানিতে একক বড় দেশ যুক্তরাষ্ট্র হওয়াতে এ বাজার হাত ছাড়া করা যাবে না।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সামনে সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোও এই বাণিজ্যযুদ্ধে  জড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ