ঢাকা, রোববার 15 July 2018, ৩১ আষাঢ় ১৪২৫, ১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান : [দুই]
এই মালামাল বহনকার্য এবং বিভিন্ন স্পটে মাদকদ্রব্যের প্রকাশ্যে বিকিকিনি সম্ভব হতো না, যদি পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এ কাজে সফল হতো না যদি সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ এর সাথে সম্পৃক্ত না থাকতো।
দুঃখের বিষয় শহরের প্রভাবশালী কিছু লোক এর সাথে সম্পৃক্ত থাকায় সাধারণ মানুষেরা অনেকে চোখের সামনে এসব দেখেও না দেখার ভান করে চলে। ঐ সম্পৃক্তরা সমাজে ও রাজনীতিতে এতই প্রভাবশালী যে, তাদের অবৈধ কাজের কথা কারো কাছে ফাঁস করে দেবে, কার ঘাড়ে এমন একাধিক মাথা আছে?
তথাকথিত প্রগতিশীলতা ধুয়া তুলে এবং পাশ্চাত্যের অনুকরণে অভ্যস্ত নাগরিক, বিশেষ করে শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে মাদক ব্যবসায়ীরা দেশের অভ্যন্তরে ক্রমশঃ মাদকাসক্তদের একটি সহযোগী ‘উপ-সংস্কৃতি’ গড়ে তুলতে অব্যাহতভাবে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। চাইনিজ রেস্তোরাঁ কেন্দ্রিক ‘সীসা’ পার্টি, ধনীর দুলাল-দুলালীদের ‘ইয়াবা’ পার্টি এই ধ্বংসাত্মক উপ-সংস্কৃতির পরিণাম।
ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল আর মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার আগ্রাসনে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুব সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। ভারত তার নিজ দেশে কাশির সিরাফ হিসেবে যে ফেনসিডিল ব্যবহার করে তা স্বাস্থ্য বিধি মেনে তৈরি করা হয়। ঐ সিরাপ বাংলাদেশে আসে না। কারণ তা স্বাস্থসম্মত। বাংলাদেশে যে ফেনসিডিল পাঠানো হয় তা উচ্চ মাত্রার কোডিন ফসফেট দিয়ে তৈরি করা হয়। আর এটা মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটা ভারত খায়না, আমাদেরকে খাওয়ায়, আমরা খাই। বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে তারা শত শত এ ধরনের কারখানা তৈরী করেছে যাতে প্রতিদিন তৈরি করছে ফেনসিডিল। আর তা বিএসএফের সহায়তায় পাঠানো হচ্ছে আমাদের দেশে। এই ফেনসিডিল আর ইয়াবা নামক মরন নেশা আমদানির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা কঠিন।
বর্তমানে গাঁজাসেবীদের পরেই অবস্থান নিয়েছে মরণনেশা ইয়াবা। ফেনসিডিল, হেরোইন পিছিয়ে বছরে ইয়াবা যেভাবে মহামারী রূপ নিয়েছে তাতে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা প্রতিরোধ করা না গেলে তরুণ প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। এখন ইয়াবার সুবাদে মাদক অভিজাত পাড়ায়ই নয়, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সাইবার ক্যাফ, ফাস্ট ফুট শপ, সেলুন সর্বত্র ডিলারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে গড়ে উঠেছে ইয়াবা আগ্রাসন। সঙ্গে গাঁজা চলছে সমানে। ইয়াবার মতো সিনথেটিক ড্রাগ, ছোট ট্যাবলেট আকারে ডিলাররা নির্বিঘেœ সরবরাহ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ট্র্যাক করতেও অসুবিধা হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষতঃ আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
বাস্তবতা হলো, নানা আনুকূল্যে মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায় বেড়ে গেলেও তা রোধে স্বাধীনতা-উত্তর ৪৭ বছরেও রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি। মুড়ি-মুড়কির মতো মাদকদ্রব্য বেচাকেনা ও এর প্রভাবজনিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাদক রোধে সংবিধান অমান্য করে রাষ্ট্রের কিছু লোভী কর্মকতা একরকম বেআইনী বাণিজ্যকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।
মাদক রোধের অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় অধীনস্থ এই অধিদফতরই একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত মাদক নিরোধ সংস্থা। মাদক চোরাচালানি ও অপব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় আনতে ডিএনসিকে সহায়তা করে থাকে পুলিশ-র‌্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড। সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনের ম্যান্ডেট থাকলেও আইনী দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা, মাদক মাফিয়াদের দোর্দন্ড দাপট, আইন প্রণেতাসহ অনেক বিশিষ্টজনেরাও মাদকাসক্ত হওয়া ইত্যাদি কারণে ডিএনসি প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই যুগেও ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে আছে। যদিও কিতাবী ঘোষণা অনুযায়ী, ডিএনসির ভিশন হচ্ছে মাদকাসক্তিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটির কাগজ-কলমে মিশন হলোÑ‘দেশে অবৈধ মাদকের প্রবাহ রোধ, ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহার্য বৈধ মাদকের শুল্ক আদায় সাপেক্ষে আমদানি, পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মাদকদ্রব্যের সঠিক পরীক্ষা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ, মাদকদ্রব্যের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরোধ শিক্ষা কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে নিবিড় কর্ম সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।’ কিন্তু জনবল সংকট, রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা সীমাবদ্ধতায় ডিএনসি মেরুদন্ডহীন সংস্থা হয়ে থাকার কারণে ভিশন মিশন বাস্তবায়নে আশানুরূপ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে অতীতেও পারেনি, বর্তমানেও পারছে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। ২০ মে ২০১৮ গণভবনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যেভাবে জঙ্গিবাদ দমন করা হয়েছে, তেমনি মাদক থেকেও দেশকে উদ্ধার করা হবে।
খুলনায় এক অনুষ্ঠানে ২৩ মে ২০১৮ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, সব গোয়েন্দা বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিয়েছে। কারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, কারা মাদকের ব্যবসা করেন। আমরা তাদের বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে যে তালিকা রয়েছে, সে অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনী তাদের খুঁজছে। কাউকে আমরা ক্রসফায়ারে দিই না। যখন চ্যালেঞ্জ করা হয়, তখনই নিরাপত্তা বাহিনী নিজেদের রক্ষা করতে গুলি করতে বাধ্য হয়। এ ঘটনায় আমাদের পুলিশ সদস্য, র‌্যাবের সদস্যও আহত হচ্ছেন।
র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। সে গডফাদার হোক বা অন্য কেউ। মাদকের বিরুদ্ধে জড়িতদের ব্যাপারে আইনের মধ্যে থেকেই সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, কারা সেখানে অর্থলগ্নি করেছে, কারা বাসা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছে তাদের তালিকা অচিরেই প্রকাশ করা হবে। মাদকের যারা গডফাদার, আইনের আওতায় নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করার আহ্বান জানানো হবে। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ২৪ মে ২০১৮)
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদকবিরোধী অভিযান ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশে র‌্যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের বহু ঘটনাও ঘটছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য মাদক নির্মূল করা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তাদের ঘোষণার মধ্য দিয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য তাদের কর্মতৎপরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে তৈরি মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় বেশ কয়েকজন গডফাদারের নাম উঠে এসেছে। এসব তালিকা এখন হালনাগাদ করা হচ্ছে। জোরেশোরেই খোঁজ নেওয়া হচ্ছে আগের তালিকায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাদক ব্যবসায় রয়েছেন কি-না বা তারা মাদক ব্যবসায় সহায়তা করেন কি-না। তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা তথ্য অনুসন্ধান করছে।
দীর্ঘদিন ধরেই মাদক বহনে জড়িতদের আইনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে মাদকের চিহ্নিত আখড়াগুলোও ধ্বংস করা হচ্ছে। চলমান অভিযানে মাদক বিশেষ করে ইয়াবার পাইকারি বিক্রেতাদের টার্গেট করে কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে ইয়াবার অনেক পাইকারি ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। অভিযানের মধ্যে গোলাগুলিতে অনেকে নিহতও হয়েছেন। এরপরই মাদকের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী এখন ‘হোম ওয়াক’ চলছে। এসব প্রভাবশালী গডফাদারের বিষয়ে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পৃথক তালিকা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এসব তালিকা যাচাই করে সমন্বয় করা হচ্ছে।
ঘোষণা দিয়ে ১ রমজান (১৮ মে ২০৮ ) থেকে ১০ দিনব্যাপী দেশজুড়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযানে ২৯ মে ২০১৮ পর্যন্ত ৯ হাজার ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিহত হয়েছে ৮৭ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। মামলা হয়েছে ৭০২৬টি। উদ্ধার করা হয়েছে ৪১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার মাদক। এরমধ্যে ১৭ লাখ পিস ইয়াবা, ২২৮৬ কেজি গাজা, ২৩ কেজি হেরোইন, ১৬ হাজার বোতল ফেনসিডিল, ১২১০টি বিয়ার, ৫৫ হাজার লিটার চোলাই মদ (দেশি)।
সারাদেশে মাদকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপারে তালিকা তৈরি করেছে পাঁচটি সংস্থা। সব তালিকা মিলে দেশে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার। সেখানে যাদের নাম রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে অভিযান। তবে ঢাকার কিছু বস্তি ও মাদকের আখড়ায় অভিযানের নামে ‘গণগ্রেফতার’ করা হয়। আবার কিছু জায়গায় আগাম ঘোষণা দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে আয়োজন করে অভিযান চালায় পুলিশ। এতে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা যায়নি। যারা গ্রেফতার হয়েছেন, তারা কেউ চুনোপুঁটি, না হয় মাদকসেবী। অভিযানে বড় ধরনের কোনো রাঘববোয়াল গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া যায়নি এখনও।
মাদক নির্মূলে সারাদেশে র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে ২৯ মে ২০১৮ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ১৩ হাজার ৫৩ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারী। নিহত হয়েছে ১১২ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ১০০ কোটি টাকার ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক। র‌্যাবের অভিযান শুরু হয় ৪ মে ২০১৮ থেকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ