ঢাকা, রোববার 15 July 2018, ৩১ আষাঢ় ১৪২৫, ১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াইয়ে ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া আজ মুখোমুখি

রফিকুল ইসলাম মিঞা : ফুটবল বিশ্বে এখন একটাই প্রশ্ন। কে হবে রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন। রাশিয়া বিশ্বকাপে কি নতুন চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে নাকি আগের চ্যাম্পিয়ন দল আবার নিজেদের সেরা প্রমাণ করবে। তবে অপেক্ষার পালা শেষ। আজই সমাধান হচ্ছে এই প্রশ্নের। ফুটবলের বিশ্বসেরা হতে আজ রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স বনাম ক্রোয়েশিয়া। ফ্রান্স এর আগে একবার বিশ্বকাপ জয় করেছে। সেটা ১৯৯৮ সালে। ২০ বছর পর দলটির সামনে আবার সেই সুযোগ নিজেদের সেরা প্রমাণ করে দ্বিতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করা। অপর দিকে ক্রোয়েশিয়ার সামনে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে নিজেদের সেরা প্রমাণ করার সুযোগ। এর আগে ক্রোয়েশিয়া কখনও বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেনি। দলটির সর্বোচ্চ সাফল্যে ছিল সেমিফাইনাল খেলে ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করা। আর সেটাও সেই ১৯৯৮ সালে। এই ফ্রান্সের কাছেই হেরে সেবার ফাইনালে উঠতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। ২০ বছর পর এবার ফাইনালে দল দু’টি মুখোমুখি। এবার কোন দলটি নিজেদের সেরা প্রমাণ করতে পারে সেটাই এবার দেখবে বিশ্ববাসী। ক্রোয়েশিয়া কি পারবে ফ্রান্সকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করে রাশিয়া বিশ্বকাপে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে। নাকি ফ্রান্সই আরো একবার স্পর্শ করবে বিশ্বকাপ ট্রফি। বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে শুরু হবে ফাইনাল ম্যাচটি।
এদিকে ফাইনালের মাঠে নামার আগে শক্তি ও ফুটবল ঐতিহ্যে এগিয়ে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সই। অবশ্য ফুটবল ঐতিহ্যে পিছিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের একটি পরিসংখ্যানে এগিয়ে আছে ক্রোয়েশিয়া। আর সেটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রতি ২০ বছর পর পর নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেখেছে বিশ্ব। আরো একবার প্রমাণ হলে ক্রোয়েশিয়ার হাতেই উঠতে পারে রাশিয়া বিশ্বকাপের ট্রফি। ১৯৩৮ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১২ বছর অনুষ্ঠিত হয়নি বিশ্বকাপ ফুটবল। যুদ্ধ শেষ হলে ১৯৫০ সালে প্রথম আসরে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। তারপর ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। তৃতীয় আসরের ঠিক ২০ বছর পর সেবার নতুন চ্যাম্পিয়ন পায় বিশ্ব। তার ২০ বছর পর ১৯৭৮ সালে বিশ্ব দেখে আরেক নতুন চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। এর ঠিক ২০ বছর পর ১৯৯৮ সালে ফরাসিরা নতুন চ্যাম্পিয়ন হয়। সে হিসাবে এবারও নতুন কোনো দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ঠিকই আছে। যদিও এই পরিসংখ্যানের বাইরেও শিরোপা জিতেছে দুইটি নতুন দেশ। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড ও ২০১০ সালে স্পেন শিরোপা জিতেছিল। কিন্তু ২০ বছরের মাথায় নতুন চ্যাম্পিয়ন ধারাবাহিকভাবে ঠিকই এসেছে। তবে এবারের বিশ্বকাপে ফেভারিট দলগুলোর মধ্যে ফ্রান্স কিন্তু ছিল অন্যতম। অন্য ফেভারিটরা একে একে বিদায় নিলেও ফ্রান্স কিন্তু ঠিকই উঠেছে ফাইনালে। অন্যদিকে ১৯৯০ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রাতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৯৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় ক্রোয়েশিয়া। সে বছরই  সেমি ফাইনালে উঠে দলটি। আর এবার প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলছে ক্রোয়েশিয়া। আর প্রথম থেকে  হার না মানা এ দলটি এবার বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের শক্তি জানান দিতে চায়। তবে ফাইনালে আজ দ্রুতগতির এমবাপ্পে-গ্রিজম্যানের সাথে লড়াই হবে শিরোপার জন্য মরিয়া হয়ে উঠা লুকা মডরিচ-ইভান রাকিটিচরা। এবারের আসরের সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে ধরা হচ্ছে মডরিচকে। তারপরও অনেকের কাছে এটি হতাশার। কারণ ঐহিত্যগতভাবে যারা বিশ্বকাপে দাপট দেখিয়ে আসছে অথবা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের ফাইনালে না থাকায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ঘটতে যাচ্ছে, ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’র ফাইনালে নেই ব্রাজিল-জার্মানি-ইতালি ও আর্জেন্টিনা। ২০১০ সালে প্রথমবার এমনটি দেখা গিয়েছিলো। ঐ বার ফাইনাল খেলেছিলো স্পেন-নেদারল্যান্ডস। তারপরও এবারের আসর ল্যাটিন আমেরিকার সমর্থকদের কাছে বর্ণাঢ্য আয়োজনের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে দু’টি ইউরোপিয়ান দলের সেরা শক্তির প্রদর্শন দেখবে ফুটবল বিশ্ব। এই বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ের পাশে বসার সুযোগ আছে  ফ্রান্সের সামনে। কারণ আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে দু’বার করে বিশ্বকাপ জয় করে। ১৯৯৮ সালে প্রথম ও শেষবার বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পড়েছিলো ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্স দলের অধিনায়ক ছিলেন দিদিয়ের দেশম। এবার দেশম ফরাসিদের কোচ। আর এবার যদি বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করে ফ্রান্স, তবে বিশ্বের তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে অনন্য এক রেকর্ড গড়বেন দেশম। খেলোয়াড় ও ম্যানেজার হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়বেন তিনি। এর আগে ব্রাজিলের মারিয়ো জাগালো ও জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার এমন কীর্তি গড়েছিলেন।  স্বাভাবিকভাবে বিশ্বকাপের ফাইনালকে স্বপ্নের ম্যাচ বলছেন ফ্রান্সের মিডফিল্ডার ব্লাইস মাতুইদি। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের ফাইনাল, শৈশবের একটি স্বপ্ন সত্য হতে চলেছে। আমরা শিরোপার খুব কাছে, আমরা সেটি স্পর্শ করতে চাই। এটিই আমাদের জীবনের খেলা।’ ২০০৬ সালের ফাইনালে ইতালির কাছে ট্রাইব্রেকারে হারের পর শিরোপা জয়ের ক্ষুধা বেড়ে যায় ফ্রান্সের। সেটি আরও বড় আকার ধারণ করে ২০১৬ ইউরোর ফাইনাল শেষে। সেখানে পর্তুগালের কাছে ১-০ গোলে হারে ফরাসিরা। ঐ হার থেকেই দল শিক্ষা নেয় বলে জানান মাতুইদি। তিনি বলেন, ‘ঐ হার থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি এবং এর মানে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে ফাইনাল খেলতে হয়।’ তবে ফ্রান্স যতটা না সহজে ফাইনালের টিকিট পায়, তার চেয়ে বেশি ঘাম ঝড়িয়ে ফাইনালে উঠতে হয়েছে ক্রোয়েশিয়াকে। গ্রুপ পর্বের বাঁধা টপকাতে কোনো কষ্টই করতে হয়নি তাদের। সেখানে আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড ও নাইজেরিয়াকে বিধ্বস্ত করে ক্রোয়েশিয়া। তবে নক-আউট পর্বে ঘাম ঝড়ালেও দুর্দান্ত সব জয়ের স্বাদ নেয় ক্রোয়েশিয়া। শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে ১২০ মিনিটই লড়াই করতে হয়েছে তাদের। ডেনমার্ক ও রাশিয়ার সাথে টাইব্রেকারে জিতলেও, ইংল্যান্ডকে ১২০ মিনিটের মধ্যে হারিয়ে দেয় মডরিচ-রাকিটিচরা। তাই নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠে ক্রোয়েশিয়া। দলের কোচ জøাটকা দালিচ বলেন, ‘এটি জীবনের সবচেয়ে সেরা সুযোগ। এটি আমাদের জন্য কঠিন হয়েছে কিন্তু আমি নিশ্চিত, আমরা শক্তি ও প্রেরণা খুঁেজ পাবো। আমরা কঠিন পথে ছিলাম। সম্ভবত আমাদেরই বিশ্বকাপে একমাত্র দল চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে আমাদের আটটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে, যদি সব মিনিট একত্রিত করা হয়।’ রাশিয়া বিশ্বকাপে সি গ্রুপে ছিল ফ্রান্স আর ডি গ্রুপে ছিল ক্রোয়েশিয়া। দুটি দলই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাইনালে উঠে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ফ্রান্স গত আসরের রানার্স-আপ আর্জেন্টিনাকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স সাবেক দুই বারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে হারিয়ে নিশ্চিত করে সেমিফাইনাল। আর সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে ফ্রান্স। আজ ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করতে চায় দলটি। অপর দিকে ডি গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে ক্রোয়েশিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডে দলটি ডেনমার্ককে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া স্বাগতিক রাশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো সেমিফাইনালে উঠে। আর সেমিফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে। প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠা দলটি আজ বিশ্বকাপ জিতেই দেশে ফিরতে চায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ