ঢাকা, রোববার 15 July 2018, ৩১ আষাঢ় ১৪২৫, ১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সমন্বিত পরিকল্পনাই পারে দেশকে বসবাস উপযোগী করতে

স্টাফ রিপোর্টার: পরিকল্পনা সংলাপে বক্তারা বলেন, দেশকে বসবাস উপযোগী করতে হলে পরিকল্পনা একান্তই দরকার। তা না হলে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো পরিকল্পনার অভাবে অন্যান্য শহর, নগর, অঞ্চল, জেলা, উপজেলা ও পৌসরসভাগুলো ঘিঞ্জি ও বসবাস অনুপযোগী হয়ে উঠবে। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, প্রতিদিনই কোথাও কোথাও জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে। আবার কোথাও অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে দিন দিন কমছে খালি জায়গার পরিমাণ। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলো খেলার মাঠ ও পার্কের অভাবে এক ঘরে হয়ে যাবে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লেনার্স (বিআইপি) আয়োজিত, প্লেনার্স টাওয়ারে নগর পরিকল্পনা ও সেবা: পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ ও পেশাজীবীদের ভূমিকা শীর্ষক পরিকল্পনা সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মোহাম্মদ খান-এর সঞ্চালনায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন বিআইপির সভাপতি আবুল কালাম। এছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন, বিআইপির সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুর রহমান, যুগ্ন সম্পাদক মাযহারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনাবিধ রেজাউল করিম, ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম, বিআইপির প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান, বিআইপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম মোর্তজা, আতিকুল খালিদ  ও বিভিন্ন পৌরসভা থেকে আসা পরিকল্পনাবিদরা।
সংলাপে বক্তারা আরো বলেন, বিশ্ব ব্যাংক সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে ঢাকার বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে পূর্ব দিকে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ন করার যে পরামর্শ দিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, ওই এলাকা কিভাবে গড়ে উঠবে সে ব্যাপারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে। আর বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত ঢাকার সমস্যার সমাধানে দেশের অন্যান্য মহানগর, জেলা ও উপজেলা শহরকে গড়ে তুলতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। এজন্য ঢাকাকে কেন্দ্র করে আর কারো কোন পরিকল্পনা না করলেও চলবে।
প্রসঙ্গত, বিশ্ব ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার পূর্বাঞ্চল পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে। সেখানে নতুন করে ৫০ লাখ মানুষের আবাসন ও ১৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। আর ঢাকাশহরের মানুষের মাথাপিছু আয় ৮ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ৯ হাজার ২০০ ডলারে উন্নীত হবে। এজন্য বিশ্ব ব্যাংকের তিন সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পরামর্শ দিয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-বন্যার হাত থেকে ঢাকার পূর্বাঞ্চল রক্ষা করতে এবং পানির গতি ঘোরাতে বালু নদীতে তীরে বাঁধ দিতে হবে, ক্রমবর্ধমান সাধারণ ট্রান্সপোর্ট ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চলাচলে কার্যকর সমন্বয় করতে হবে এবং ঢাকার পূর্বাংশে একটি পরিকল্পিত বড় বাণিজ্যিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। আর এ সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা। যে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বিশ্ব ব্যাংক।
রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশোধিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে তুলতে পরিকল্পনাবিদদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে সেটা বাস্তবায়ন হয়। তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের কাছেও পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। টেকসই উন্নয়ন করতে হলে আগে পরিকল্পনা করতে হবে। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঠিক সময় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সমস্যাবহুল ঢাকাশহরকে নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের পরিকল্পনা কোন ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে না। আমরা এখন দেশব্যাপী পরিকল্পনার বিষয়ে ভাবছি। তিনি আরও বলেন, ঢাকামহানগর ও আশপাশের এলাকা নিয়ে রাজউকের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেই ঢাকার পূর্বাঞ্চলও পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠবে। বিদ্যমান অবস্থার মধ্যে বিশ্ব ব্যাংকের পরিকল্পনা অগ্রহণযোগ্য।
চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রেজাউল করিম বলেন, দেশে এখন পরিকল্পনাবিদের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জন। অথচ এই সময়েও পরিকল্পনাবিদদের বাদ দিয়ে শহর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মিউনিসিপাল টাউন প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আতিকুল খালিদ বলেন, দেশে ৩২৯ পৌরসভা রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ২৭টি পৌরসভায় পরিকল্পনাবিদ রয়েছে। বিধিমোতাবেক ১৭৬টি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটা করা হ”েছ না। অন্যদিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর পৌরসভায় পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের কোন পদই নেই।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৭ সালের অডিন্যান্সের আলোকে প্রণীত ১৯৯২ সালের বিধিমালা দিয়ে চলছে দেশের পৌরসভাগুলো। অথচ স্থানীয় সরকার পৌরসভা আইন-২০০৯ প্রণীত হলেও কোন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। এ আইন মোতাবেক পৌরসভা সার্ভিস কমিশন গঠনের বিষয়ে বলা থাকলেও সেব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পৌরসভাগুলোতে পরিকল্পনা বিভাগ বলে কোন বিভাগ নেই। একই গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলীদের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে। প্রথম শ্রেণীর একটি পৌরসভায় একজন নগরপরিকল্পনাবিদ দিয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এটা কোনভাবেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মইনুল ইসলাম বলেন, দেশের ১১টি সিটি কর্পোরেশনে ১১ জন পরিকল্পনাবিদ কর্মরত রয়েছেন। এই স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে শহরের উন্নয়নে কাজ করা সম্ভব নয়। ১২ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে একাই নগর পরিকল্পনা বিভাগে কাজ করছি। এরপরও ৭৬০ বর্গ কিলোমিটারের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৮টি খাল, ৩৮টি পুকুর ও উন্মুক্ত স্থান নির্ধারণ করতে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে অল্প সময়ের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জ গণপরিসরে নগরীতে রূপান্তরিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ