ঢাকা, রোববার 15 July 2018, ৩১ আষাঢ় ১৪২৫, ১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সিপাহী বিপ্লবের জ্বলন্ত সাক্ষী ঐতিহাসিক ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ১৮৫৭ সালে সংগঠিত সিপাহী বিদ্রোহের বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সিপাহী বিপ্লবের জ্বলন্ত সাক্ষী ঐতিহাসিক ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। ইংরেজদের শাসন-শোষণের ইতিহাস ও ইংরেজ সরকারের শোষণ নীপিড়নের বিরুদ্ধে সেনাদের আত্মত্যাগের সাক্ষী এ পার্কটি। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা গ্রহন করে ইংরেজরা। ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকেই ইংরেজদের শোষণ নীপিড়ণ বন্ধের প্রশ্নে অসংখ্যবার বিদ্রোহ করে বীরসেনানী স্বাধীনতাকামি জনগণ। মৃত্যুঞ্জয়ী তেমনি একটি বিদ্রোহ হল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব। দুর্বল ও বয়োবৃদ্ধ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে সিপাহীরা বিদ্রোহ শুরু করে। সিপাহি বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসাবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।  মূলত এ আন্দোলনের শুরুতে নাম ছিল আযাদী সংগ্রাম। আযাদী সংগ্রামকে ইংরেজরা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ নামে উল্লেখ করলেও এই বিদ্রোহের পেছনে আযাদী পাগল বেসামরিক মুসলিম বিপ্লবীদের ভূমিকাই মুখ্য ছিল। একথা কোনো কোনো ইংরেজ লেখকও স্বীকার করেছেন। স্যার জেমস আউটরামের মতে, বিপ্লবী মুসরমানগণই ছিলেন এই বিদ্রোহের মূল শক্তি। এই বিদ্রোহ দমন করা হয় নির্মমভাবে। বহু নিরপরাধ নরনারী, শিশু বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। সিপাহী বিদ্রোহের শুরুর দিকে বিদ্রোহী সিপাহীরা দিল্লীর লালকেল্লায় প্রবেশ করে নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ভারত স্বাধীন করার শপথ নেন। বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহিদের বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এ সংবাদে কানপুর, লক্ষনৌ, বিহার, ঝাঁসি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সর্বত্র সিপাহিরা গর্জে ওঠে, ‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহি’, অর্থাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশাহর রাজ্য, সিপাহির হুকুম। এরপর একের পর সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে। ১৮৫৮ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমন করার পর ইংরেজরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে রেঙ্গুনে (বর্তমান বার্মা) নির্বাসিত করে এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তার নাম অনুসারে এ পার্কটির নাম করণ করা হয়। ১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি স্মৃতির মিনাররূপে তা আজও আমাদের পূর্বপুরুষদের মহান আত্মদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইতিহাসবিদদের বর্ণনানুযায়ী, সিপাহী বিপ্লব মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ইংরেজদের রাজধানী কলকাতার ব্যারাকপুরে শুরু হয় এবং  শীঘ্রই তা মিরাট, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এটা সারা বাংলাদেশ জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের খন্ডযুদ্ধসমূহ বাংলাদেশকে সতর্ক ও উত্তেজনাকর করে তুলেছিল। ১৮৫৭ সালের ১৮ নবেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য বিদ্রোহে মেতে ওঠে এবং জেলখানা হতে সকল বন্দিদের  মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ দখল করে নেয়, কোষাগার লুণ্ঠণ করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হয়।
চট্টগ্রামে সিপাহিদের মনোভাব ঢাকার রক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। সিপাহিদের আরও অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ৫৪তম রেজিমেন্টের তিনটি কোম্পানি এবং একশত নৌসেনা ঢাকায় প্রেরণ করে। একই সাথে যশোর, রংপুর, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের আরও কয়েকটি জেলায় একটি নৌ-ব্রিগেড পাঠানো হয়। প্রধানত ইউরোপীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠিত করে ঢাকা রক্ষা করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নৌ-বিগ্রেড ঢাকা পৌঁছে সেখানে নিয়োজিত সিপাহিদের নিরস্ত্র করতে গেলে অবস্থা চরমে ওঠে। ২২ নভেম্বর লালবাগে নিয়োজিত সিপাহিগণকে নিরস্ত্র করতে গেলে তারা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। এছাড়া ঢাকার তৎকালীন নওয়াব খাজা আবদুল গনি ইংরেজদের পক্ষ নেয়। তাঁর ছিলো ঢাকাবাসীর উপর প্রবল প্রভাব। ফলে এই দুপক্ষ মিলে ঢাকার সিপাহীদের বিপ্লব খুব সহজেই দমন করে ফেলে। সংঘটিত খন্ডযুদ্ধে বেশ কিছু সিপাহি নিহত (এক বর্ণনায় ৬০ জনের হত্যার কথা উল্লেখ আছে) ও বন্দি হয় এবং অনেকেই ময়মনসিংহের পথে পালিয়ে যায়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই অধিকাংশ পলাতক সিপাহীকে গ্রেফতার করা হয় এবং অতিদ্রুত গঠিত সামরিক আদালতে সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য তাদের সোপর্দ করা হয়। অভিযুক্ত সিপাহিদের মধ্যে ১১ জনকে আন্টাঘর ময়দানে (বর্তমানে বাহাদুর শাহ পার্ক) এনে জন সম্মুখে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়। বিপ্লবকামী জনগণকে আতঙ্কিত করার জন্য এবং স্থানীয় লোকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে লাশগুলো মাসের পর মাস এখানকার গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত এই ময়দান এর চারপাশ দিয়ে হাঁটতে ঢাকাবাসী ভয় পেত, কারণ এ জায়গা নিয়ে বিভিন্ন ভৌতিক কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছিল। সিপাহীদের হত্যার পর ইংরেজরা তাদের সেনাদের বীরত্বের জন্য আন্টাঘর ময়দানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে। এছাড়া পার্কটির চার কোণায় বসানো হয় সীমানা নির্দেশক চারটি ব্রিটিশ কামান। অন্যদিকে ১৮৫৭ সালে লালবাগের যে স্থানটিতে সেদিন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রক্ত ঝরেছিল, সে স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য ইংরেজরা সেখানে কারাগার নির্মাণ করে, যা এখনো বিদ্যমান।
রাজধানীর পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় ঢুকতেই লক্ষ্মীবাজারের ঠিক মাথায় অবস্থিত এক সময়ের আন্টাঘর ও ভিক্টোরিয়া পার্কটিই এখন ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। এ পার্কটি বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ডিম্বাকৃতি এ পার্কটি লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। এর পূর্ব এবং পশ্চিম পাশে দু’টি প্রধান ফটক বা গেট রয়েছে। পার্কটির ভেতরে রেলিং এর পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা করা হয়েছে। পার্কটিকে ঘিরে ৭টি রাস্তা একত্রিত হয়েছে। এর চারপাশে সরকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সহ বেশ কিছু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এটি পুরনো ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। পার্কের উত্তর পাশে রয়েছে সেন্ট থমাস চার্চ, উত্তর পাশেই অবস্থিত ঢাকার প্রথম পানি সরবরাহ করার জন্য তৈরি ট্যাংক। উত্তর-পূর্ব কোনে আছে ঢাকার অন্যতম কলেজ কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং ইসলামিয়া হাই স্কুল, পূর্ব পাশে রয়েছে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয় সরকারী মুসলিম স্কুল, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পার্কের ঠিক উত্তর পশ্চিম পাশেই রয়েছে ঢাকার জজ কোর্ট। এছাড়া বাংলা বাজার, ইসলামপুর, শাখারী বাজারের মত ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু এলাকা থেকে বর্তমান ঢাকার নতুন এলাকায় আসতে এ পার্ক এলাকার রাস্তাটিই প্রধান সড়ক।
ইতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, আঠার শতকের শেষের দিকে এই স্থানটিতে ঢাকার আর্মেনীয়দের বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল। ক্লাবটিতে বিলিয়ার্ড খেলা ছাড়াও র‌্যাকেট, টেনিস, ব্যাডমিন্টন খেলতো এবং আড্ডা দিতো। এখানে পার্টি-ফাংশনও আয়োজন করা হত। বিলিয়ার্ডের সাদা গোল বলগুলো ডিমের মতো দেখতে বলে-স্থানীয় বাঙ্গালিদের চোখে ছিলো অদ্ভুত রকমের 'ডিম’ যা আবার লাঠি দিয়ে ঠেলে খেলতে হয়! সুতরাং তারা এই ক্লাবের নাম দিল ‘আন্ডাঘর’! ধীরে ধীরে অপভ্রংশ হয়ে আন্ডাঘর উচ্চারিত হয় ‘আন্টাঘর’ নামে! পরবর্তীকালে অর্মেনীয়রা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লে তারা ক্লাবটা বিক্রি করে দেয় ইংরেজদের কাছে। ইংরেজরা ক্লাব ঘরটা ভেঙ্গে একে খোলা পার্ক বানিয়ে ফেলে, তখন এটা পরিচিত হয়ে ওঠে ‘আন্টাঘর ময়দান’ নামে। সেখান থেকেই এসেছে ‘আন্টাঘর’ কথাটি। এর চারদিকে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে দিয়ে এর চার কোণায় চারটি দর্শনীয় কামান স্থাপন করা হয়। তখনো এর চারপাশে অনেক আর্মেনীয় বাস করত। আন্টাঘর ময়দানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জেমস টেলরের বর্ণনা অনুযায়ী ১৮৪০ সালেও এই স্থানটি ছিল কয়েকটি রাস্তার মাঝে এক টুকরো খালি জায়গায় বৃত্তাকার একটি বাগান। আন্টাঘরের পাশেই ছিল খোলামেলা একটি মাঠ। সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে ভারতে কোম্পানি-শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশরা সেনাবাহিনী, অর্থব্যবস্থা ও ভারতীয় প্রশাসন পুনর্গঠনে বাধ্য হয়। ভারত প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটেনের রানির শাসনের অধীনে আসে। রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করার পর এই ময়দানেই সেই সংক্রান্ত একটি ঘোষণা পাঠ করে শোনান তৎকালীন ঢাকা বিভাগের কমিশনার। তারপর থেকে আন্টাঘর ময়দানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। ১৯৫৭ সালের আগে পর্যন্ত পার্কটি ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’ নামে পরিচিত ছিল। পার্কের এক পাশে রয়েছে একটি ওবেলিস্ক, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞী হিসেবে রানী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহন মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও স্থানটির নাম স্থায়ী হয়নি।
পরবর্তীকালে ১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৬১) সিপাহি বিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (ডি আই টি) এর উদ্যোগে এই স্থানটিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। স্মৃতিসৌধটি চারটি পিলারের ওপর দাঁড়ানো চারকোনা একটি কাঠামো। উপরে রয়েছে গোলাকার গম্বুজ। সিপাহী বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংরেজ শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে মুঘল স¤্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ এর শাসন পুনরায় আনার জন্য। তাই তাঁর নামানুসারে এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। বাংলাদেশের সিপাহীদের স্মৃতির সাথে যেমন এ পার্কটি জড়িত তেমনি ভারতের লক্ষনৌর ‘রেসিডেন্সিতে’ এখনো সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিচিন্থগুলোও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
খাজা হাফিজুল্লাহ স্মৃতিস্তম্ভ : খাজা হাফিজুল্লাহ ছিলেন গরিব প্রজাদের আস্থাভাজন ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ঢাকার নবাব খাজা আহসানুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি ঢাকার পরববর্তী নবাব হবেন এমনটি চিন্তা করে সবাই তাকে সমীহ করতেন এবং যত্নের সঙ্গে লালন করতেন। কিন্তু ১৮৮৪ সালে খাজা হাফিজুল্লাহর হঠাৎ অকাল মৃত্যুতে নবাব পরিবারসহ সারা ঢাকা শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে। পুত্রশোকে নবাব আহসানুল্লাহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুত্রশোকের কারণে ইংরেজদের বিনোদনের পৃষ্ঠপোষক নবাব আহসানুল্লাহ তাদের আমোদ ফুর্তির জন্য কোন আয়োজন করতেন না। তখন ইংরেজরা নবাবকে স্বান্তনা দেওয়ার জন্য এবং খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতিকে জীবিত রাখতে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তার পরিচিতিমূলক একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে গ্রানাইট পাথরের তৈরি বৃহদাকার স্মৃতিস্তম্ভ জাহাজে করে আনা হয়। স্তম্ভটির চারপাশ মসৃণ এবং চক চক করে তৈরি। গোড়ার দুই দিকে পরিচিতমূলক লিপি খোদাই করা রয়েছে। ১৮৮৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গের ছোট লাট সাহেব এক আড়ম্বরপূর্ণ অন্ষ্ঠুানে খাজা হাফিজুল্লাহ স্মৃতি স্তম্ভটি উদ্ভোধন করেন। আরেক বর্ণনামতে গ্রানাইট পাথরের এই সৌধটি ঢাকার খাজা হাফিজুল্লাহ মারা গেলে তার বন্ধুরা চাঁদা তুলে সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া এ পার্কে একটি স্মৃতিসৌধও রয়েছে। যা চারটি পিলারের ওপর দাঁড়ানো চারকোণার একটি কাঠামো। উঁচু বেদির ওপর নির্মিত চার স্তম্ভের গোলাকার আচ্ছাদনে ঘেরা স্তম্ভটি। পার্কের মাঝখানে আছে একটি পানির ফোয়ারা।
ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন বাহাদুর শাহ পার্কে : ছুটির দিনে অলসভাবে বসে না থেকে ঘুরে আসতে পারেন পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে। পুরান ঢাকার মানুষ সকাল-বিকাল এখনো বাহাদুর শাহ পার্কে আসেন হাঁটতে। কেউ আবার হাতে সময় থাকলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নেন। নাগরিক জীবনের শত রূঢ় বাস্তবতার ক্লান্তি ও অবসাদ কাটাতে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে বাহাদুর শাহ পার্কে আসেন অনেকে। কংক্রিটের জঞ্জালে ঘেরা রাজধানীর ঢাকার মানুষের জন্য একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা এক চিলতে এই পার্কটি। ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৬১ অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনাভুক্ত স্থাপনা হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় বাহাদুর শাহ পার্ককে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার বন্ধ রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকেরটা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। জানা যায়, এই পার্ক এক সময় অনেক পামগাছ ছিলো। সেই পামেগাছের সারিতেই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় ঢাকার ধরা পরা বিদ্রোহীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো! সেই বিদ্রোহীদের মধ্যে একজন নারীও ছিলো! এখন অবশ্য সেই পুরাতন গাছগুলোর কোনটাই আর অবশিষ্ট নেই। সব কেটে ফেলা হয়েছে। সময় হাতে নিয়ে গেলে এ জায়গা ছাড়াও এর আশপাশে পুরানো ঢাকার অনেক ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান দেখে আসা যাবে।
যেভাবে যাবেন : আপনি দেশের যেখানেই অবস্থান করেন না কেন আপনাকে প্রথমে রাজধানী ঢাকায় আসতে হবে। তারপর ঢাকার যে কোন স্থান হতে সদরঘাটগামী বাসে উঠতে হবে। এবং আপনাকে জনসন রোডে পৌঁছাতে হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চেনা থাকলে আপনার জন্য বাহাদুর শাহ পার্কটিকে খুঁজে পেতে সুবিধা হবে কেননা পার্কটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই অবস্থিত এ পার্কটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ