ঢাকা, সোমবার 16 July 2018, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানবিক মর্যাদাবোধের দৈন্য

ভারসাম্যগুণেই টিকে আছে মহাবিশ্ব এবং আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীও। মানব জীবনে আমাদের শরীর বৃত্তেও ভারসাম্য রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি, কর্মক্ষম থাকি না। প্রান্তিকতার বদলে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা রাজনীতি, অর্থনীতি, শাসন-প্রশাসন সবক্ষেত্রেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দার্শনিক বিবেচনায় ভারসাম্যের বিষয়টিকে ন্যায় ও স্থিতি হিসেবেও বর্ণনা করা যায়। এ কারণেই হয়তো দেশে দেশে কালে-কালে আমরা ভারসাম্য তথা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে দেখেছি মনীষীদের এবং নিপীড়িত জনতাকেও। প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, শাসন প্রশাসন, উৎপাদন, বন্টন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তথা মানব সভ্যতায় ভারসাম্য তথা ন্যায় কতটা প্রতিষ্ঠিত আছে? এমন প্রশ্ন আমাদের দেশেও উচ্চকিত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেছেন, প্রতিবাদ করলেই স্টিমরোলার চলবে, চলতেই থাকবে। এই ভয়ে আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামার আহ্বান জানান তিনি। ১৪ জুলাই রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আয়োজিত ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার : কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। হাফিজউদ্দিন খান আরো বলেন, আজ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। কেন নেই এ প্রশ্নের উত্তর আমি সরকারি দলের সমর্থক বন্ধুদের কাছে পাই না। বাঙালির প্রতিবাদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ’৫২, ’৬৬’তে আমরা প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এখন কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না। আমি এর জবাব কোথাও পাই না। যারা আন্দোলন করছেন তাদের কাছেও পাই না। এটি আমার দুঃখ। সবকিছু এভাবে চলতে দেওয়া যায় না, মন্তব্য করে তিনি বলেন, আর দেরী করা যাবে না। আমাদের জোরালোভাবে মাঠে নামতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ। কেবল সেমিনার নয়, মাঠের আন্দোলনও প্রয়োজন।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য দাবি আদায় প্রসঙ্গে হাফিজউদ্দিন খান যে বক্তব্য রেখেছেন তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, আজ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, প্রতিবাদও নেই, কিন্তু কেন নেই তার জবাব আমি কোনো পক্ষ থেকেই পাই না। তবে একটি জবাব তো হতে পারে, ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে দমন-অবদমন তথা স্টিম রোলারের কৌশল অবলম্বনের কারণে সৃষ্ট ভীতিকর পরিবেশ। আর একটি কারণ কি এটা হতে পারে যে, সৃষ্টি জগৎ, মানবজীবন, সমাজ, শাসন-প্রশাসন স্বাভাবিক ও সুষমভাবে পরিচালনার জন্য ভারসাম্য তথা ন্যায় চেতনার সূত্রটি ধরতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। সরকারি দল, বিরোধী দল নির্বিশেষে সবাই কি ভারসাম্য তত্ত্বের গভীরতর সত্য ও ব্যঞ্জনা উপলব্ধিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে না? এ কারণেই হয়তো একদিকে চলছে নিপীড়নের স্টিমরোলার, আর অন্যদিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে উচ্চতর মানবিক উপলব্ধি ও মর্যাদাবোধের ক্ষেত্রে দৈন্য। এ দৈন্য দূর না হলে সুশাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষা পূরণ হবার নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ