ঢাকা, সোমবার 16 July 2018, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

টাকা ব্যাংক ও জাতীয় অর্থনীতি

আশিকুল হামিদ : ছোট বেলায় অংকে খুব কাঁচা ছিলাম না। কীর্তিমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে তুলনায় যেতে না পারলেও এখনো যোগ-বিয়োগ-পূরণ আর ভাগের মতো বিষয়গুলো মোটামুটি বুঝতে পারি। সমস্যায়ও পড়েছি একই কারণে। বিগত মাত্র মাস দেড়-দুইয়ের মধ্যে ব্যাংক খাতসহ দেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে কতবার যে লিখেছি সে হিসেব করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতে হচ্ছে। এজন্য আমি নিজে একাই অবশ্য দায়ী না। বৃহত্তর অর্থে সরকারকে তো টেনে আনতে হবেই, বিশেষ করে বলতে হবে অর্থমন্ত্রীর নাম। পাঠকরা তাই বলে ভাববেন না, আবারও ‘কিছু মানুষ’ এবং ‘রাবিশ’ ধরনের কিছু বলে বসেছেন তিনি। না, তেমন কোনো আক্রমণাত্মক বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য বেরিয়ে আসেনি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মুখ থেকে। কিন্তু সারকথায় একেবারে পিছিয়েও পড়েননি তিনি।
মিস্টার মুহিত এবার ‘ডিফেন্ডিং পজিশনে’ গেছেন। নিজের জন্য নয়, গেছেন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, সরকার সকল ব্যাংককে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার এক ডিজিটে তথা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। গত ১ জুলাই ছিল এই নির্দেশ বাস্তবায়নের নির্ধারিত তারিখ। অন্যদিকে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এমন কিছু চাতুরিপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছে, যার ফলে সমস্যা উল্টো আরো জটিল হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী ও মেয়াদী হিসাবে সুদের হার কমিয়ে এমনকি তিন থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত নামিয়ে আনা এরকম একটি চাতুরিপূর্ণ কৌশল। এ ব্যাপারে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় সংগঠন এবিবি’র যুক্তি হচ্ছে, সরকারই তো সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনতে বলেছে। আসলেও কি সরকার সেরকম কিছু বলেছে বা নির্দেশ দিয়েছে? বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনার মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যসহ অর্থনীতির মন্দা দূর করাই ছিল সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলো সম্ভাবনাময় সে পথে পা বাড়ায়নি। কাগজেপত্রে সুদের হার এক ডিজিট তথা ৯ শতাংশের নামিয়ে আনার কথা বললেও প্রতিটি ব্যাংককেই বেশি তৎপর দেখা গেছে সাধারণ মানুষের আমানতের বিপরীতে সুদের হার কমানোর ব্যাপারে। কোনো কোনো ব্যাংক এই হার এমনকি তিন শতাংশেও নামিয়ে এনেছে। বড় কথা, সেটা কার্যকরও করে ফেলেছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হারের ব্যাপারে সে একই ব্যাংকগুলো কিন্তু ধীরে চলো নীতি- কৌশল নিয়েছে! 
এমন অবস্থাকে আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুদসহ খেলাপি ঋণের অর্থ আদায়, অর্থ পাচার ও ব্যাংকের মূলধন আত্মসাত এবং জালিয়াতির মতো প্রমাণিত বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী ও মেয়াদী হিসাবে সুদের হার কমানোর কারণে স্বাভাবিক নিয়মেই ব্যাংকে টাকা জমানোর ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক কমে গেছে। সেজন্যই ব্যাংকগুলোতে মারাত্মক তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে এবং পরিশোধের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোর পক্ষে তাই আর নতুন ঋণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন এবং আমদানি-রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংক তো বটেই, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতিও।
এই সংকট কাটিয়ে উঠে ব্যাংক খাতকে স্বাভাবিক ও লাভজনক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে হলে জাল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনার এবং কঠোর শাস্তি দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পরামর্শও আবার বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় দেয়া হয়েছে। বর্তমান ও সাবেক ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বভিন্ন ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে সে অর্থ অবশ্যই ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের মালিক ও বড় কর্মকর্তারা জড়িত থেকে থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবেই ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষ তথা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে তারল্য সংকট যেমন কাটিয়ে ওঠা যাবে তেমনি সম্ভব হবে নতুন পর্যায়ে ঋণ দেয়ার কার্যক্রম চালু করা। সে লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সকল ব্যাংককে এই মর্মে নির্দেশ দেয়া, ব্যাংকগুলো যাতে সুদসহ ঋণের অর্থ আদায়ের ব্যাপারে বেশি চেষ্টা চালায় এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী মুহিত কিন্তু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ব্যাপারে সামান্য আগ্রহও দেখাননি। তিনি বরং বলে বসেছেন, বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনাটা ‘অত্যন্ত কঠিন টার্গেট’। এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে ব্যাংকগুলোর ‘আরো কিছু সময় লাগবে’। এজন্যই কয়েকটি ব্যাংক কার্যকর করলেও অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকই ১ জুলাই থেকে এ ব্যাপারে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়নি। এমন অবস্থায় ব্যাংক খাতে বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা  প্রকাশ করা হলে তার জবাবে মিস্টার মুহিত বলেছেন, সেটা হবে না। কারণ, সমগ্র বিষয়টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘দেখভাল’ করবে।
সরকারের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক কেন এখনো আগের মতোই নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী সুদ আদায় করার সাহস পেয়েছে সে কথাটাই আসলে একটু ঘুরিয়ে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বলেছেন, ৯ শতাংশে নামিয়ে আনাটা ‘অত্যন্ত কঠিন টার্গেট’ এবং ‘ব্যাংকগুলোর আরো কিছু সময় লাগবে’।  এর মধ্য দিয়ে আরো একবার পরিষ্কার হয়েছে, জনগণ এবং জাতীয় অর্থনীতির সর্বনাশ ঘটলেও মিস্টার মুহিতের কিছুই যায়-আসে না। তিনি বরং সব কিছুর বিনিময়ে তথাকথিত ‘ব্যাংক বান্ধব’ হিসেবেই থাকতে চান। এখানেও কিন্তু কথা আছে। তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, বেসরকারি ব্যাংকের আড়াল নিয়ে অর্থমন্ত্রী আসলে জালিয়াত চক্রকেই পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাচ্ছেন।
তারা বলেছেন, ৯ শতাংশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই সবদিক চিন্তা করা দরকার ছিল। তাছাড়া মাননীয় মন্ত্রী ‘দেখভাল’ করার কথা যতোই বলুন না কেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা মেনে চলে না সে বিষয়ে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক তো এমনকি তার মূলধনও সাবাড় করে দিয়েছে। সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চিত অর্থও লোপাট করেছে অনেক ব্যাংক। এরই পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের আড়াল নিয়ে আত্মসাত করার অনেক অভিযোগও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এ ধরনের কোনো একটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধের কারণে কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যর্থ ও অক্ষম সে একই ব্যাংকের ওপর অর্থমন্ত্রী যখন ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব দেয়ার কথা বলেন তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।
প্রাসঙ্গিক অন্য কিছু বিষয়ও উল্লেখ ও লক্ষ্য করা দরকার। সরকার বাণিজ্যিক ঋণের বিপরীতে সুদের হার এক ডিজিটে তথা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো ওই নির্দেশের দোহাই দিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক এই হার এমনকি ৩ থেকে ৫ শতাংশেও নামিয়ে এনেছে। বলা বাহুল্য, এর ফলে ব্যাংকের সঞ্চয়ী ও বিভিন্ন মেয়াদী হিসাবে সাধারণ মানুষ আর আগের মতো টাকা রাখতে আগ্রহী হবে না। বহু আমানতকারী এরই মধ্যে তাদের টাকা উঠিয়ে নিতেও শুরু করেছেন বলে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে।
এমন অবস্থায় তারল্য সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সংকটও আরো ঘনীভূত হবে। বাস্তবে হতে শুরুও করেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত মতবিনিময় সভায় নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টির যে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে সেটাই সত্যে পরিণত হবে। কারণ, ওই মতবিনিময় সভায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন এবং এটাই সত্যও যে, আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে উঠিয়ে নেয়ার পরিবর্তে আমানতকারীরা ব্যাংকে বেশি পরিমাণে টাকা জমাবেন। এর ফলে একদিকে ব্যাংকের তারল্য সংকট কেটে যাবে এবং অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক ঋণ দেয়ার সক্ষমতা বাড়বে। এভাবে সব মিলিয়েই দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।
কিন্তু অতি সহজ এ কথাটাই সরকার তথা অর্থমন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। বুঝলে প্রথমত তিনি সুদের হার ঢালাওভাবে এক ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ জারি করতেন নাÑ যার বাস্তবায়ন করা তার নিজের কথায়ই ‘অত্যন্ত কঠিন টার্গেট’। একই সঙ্গে তিনিই আবার সবকিছু ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংককে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না এবং পারবেও নাÑ তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে এরই মধ্যে। এ ব্যাপারে সর্বশেষ কিছু কথা শুনিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। গত ১৪ জুলাই রাজধানীতে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রমে জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। এটা ব্যাংকগুলোর জন্য অশনি সংকেত। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হবে এবং প্রতিটি ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের বক্তব্যে অর্থ পাচার এসেছে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। হুন্ডি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তো বটেই, তিনি এমনকি আমদানির আড়ালেও বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে বলে ইঙ্গিতে জানিয়েছেন। বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি কমলেও তার তুলনায় আমদানি বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর ফজলে কবির। 
অর্থমন্ত্রী যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সবকিছু ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন সে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিজেই যখন আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের ব্যাপারে আশংকা প্রকাশ করেন তখন নিশ্চয়ই উদ্বিগ্ন হতে হয়। উল্লেখ্য, সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়ার সুখবর শোনানো হলেও রফতানি আয় যেমন অনেক কমে গেছে তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় প্রধান রেমিট্যান্সেও আশংকাজনক পতন ঘটেছে। এ বিষয়ে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো- ইপিবি’র সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, একমাত্র তৈরি পোশাক তথা গার্মেন্ট ছাড়া সকল পণ্যের রফতানির ক্ষেত্রেই দেশ পিছিয়ে পড়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। অন্যদিকে আয় হয়েছে তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চাইতে দুই দশমিক ২২ শতাংশ কম। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে আট কোটি ৩১ লাখ ডলার।  একইভাবে পতন ঘটে চলেছে রেমিট্যান্সেও। কথাটা জানিয়েছেন স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। ব্যবসায়ী নেতাদের তিনি বলেছেন, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের তথা রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে গেছে।
এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারের একদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের কারণে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। সে কারণে ওই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে। ‘ডিজিটাল হুন্ডি’র কথাও এসেছে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার একটি বিশেষ কারণ হিসেবে। দেশের ভেতরে ব্যাংকগুলোর কড়াকড়ি ও জটিলতার পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে বহুদিন ধরেই প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। এতে সুবিধা হলো, বিদেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে টাকা পৌঁছে দেয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশে অবস্থানরত স্বজনরা টাকা পেয়ে যাচ্ছে। সবই হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এজন্যই পন্থাটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ডিজিটাল হুন্ডি’। এভাবে প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে পারলেও এবং সে টাকা স্বজনদের হাতে পৌঁছে গেলেও লাফিয়ে কমে যাচ্ছে আইনসম্মত পথে দেশের আয়। রেমিট্যান্সের হিসাবও এভাবেই করা হয়েছে।
এভাবে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার কমানোর আড়ালে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করার পদক্ষেপ থেকে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়া, আমদানির নামে বিপুল অর্থ পাচার এবং ব্যাংকের প্রতি মানুষের সন্দেহ ও অবিশ্বাস পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের পর্যালোচনায় দেখা যাবে, দেশের অর্থনীতি আসলেও সর্বনাশের মুখোমুখি এসে পৌঁছেছে। একই কারণে ব্যবসা ও বিনিয়োগে আগ্রহীদের মধ্যেও ভীতি-আতংক কেবল বেড়েই চলেছে। তারা তাই দেশ থেকে অবৈধ পথে পাচার করছে লক্ষ হাজার কোটি টাকা। পাচারকারীদের দলে যোগ দিয়েছেন ক্ষমতাসীনদের অনেকেও। এজন্যই সব মিলিয়ে শিল্প-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাতে সংকট ক্রমাগত আরো মারাত্মক হয়ে উঠছে।
এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। ব্যাংক খাতসহ জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হলে সরকারের উচিত অবিলম্বে জালিয়াতি প্রতিহত করা এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনাসহ সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত কঠোর নজরদারি করা। ব্যাংকগুলো যাতে সুদের হার কমানোর নামে সাধারণ আমানতকারীদের বিপুল মুনাফাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না করতে পারে সে বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার কমানো হলেও সাধারণ আমানতকারীরা যাতে বঞ্চনার শিকার না হন। সব ধরনের প্রতারণা ও চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে খেলাপি ঋণের বিষয়টি তো স্থায়ী হবেই, ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং অবিলম্বে ইতিবাচক ব্যবস্থা নেয়া দরকার সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ