ঢাকা, সোমবার 16 July 2018, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান : [চার]
র‌্যাবের অভিযানে এ সময় পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ৪ হাজার ২৩ জন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ৩ হাজার ২৭৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। মোট অভিযান পরিচালনা করা হয় ৭২৪টি। র‌্যাব ৫৯ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার করে। র‌্যাবের সঙ্গে গুলি বিনিময়কালে ২৫ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।
অভিযান জোরদারের পর ১৫ মে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রথম দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। একদিন পর ১৭ মে নিহত হয় আরও দু’জন। পরের দিন ১৮ মে তিনজন ও ২০ মে নিহত হয় ছয়জন। ২১ মে সারাদেশে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় নয় মাদক ব্যবসায়ী। পরের দিন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২, ২৩ মে আট, ২৪ মে ১১ জন, ২৫ মে ১০, ২৬ মে ১০, ২৭ মে ১১, ২৮ মে ১৩ ও ২৯ মে নিহত হয় ১১ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, নিহতের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৬২ জন ও র‌্যাবের সঙ্গে ২৫ জন। আর নতুনভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে কথিত গোলাগুলির কথাও বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যাতে ২৯ মে ২০১৮ পর্যন্ত ২১ জন নিহত হয় বলে দাবি করছে পুলিশ।
‘বন্দুকযুদ্ধে’ সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে কুমিল্লায়। সেখানে ২৯ মে পর্যন্ত মারা গেছে ১২ জন। যশোরে আটজন, ঢাকায় তিনজন, কক্সবাজারে কাউন্সিলর একরামুল হকসহ চারজন, কুষ্টিয়ায় ছয়জন, দিনাজপুরে চারজন, চট্টগ্রামে চারজন, ময়মনসিংহে পাঁচজন ও নারায়ণগঞ্জে তিনজন রয়েছে। এ ছাড়া নীলফামারী, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, জামালপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, বাগেরহাট, মাগুরা, টাঙ্গাইল, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের ৩৯টি জেলায়ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, ‘দেশকে মাদকমুক্ত করতে অভিযান করতে হবে। আগামী প্রজন্মের কাছে মাদকমুক্ত দেশ রেখে যেতে হলে এর বিকল্প নেই। তবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে হবে। ‘‘বন্দুকযুদ্ধে’’ যাতে কোনো নিরপরাধ লোক ‘‘ভিক্টিমাইজ’’ না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’
রিয়াজুল হক আরও বলেন, ‘যে কোনো মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। সেটা যাতে অহেতুক বিপন্ন না হয় সেদিকে নজর রাখা দরকার। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাদক সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যাদের তালিকা করেছেন সেটা অনুসরণ করেই অভিযান চলতে পারে। আবার এটাও খেয়াল রাখতে হবে, যাতে কেউ বিনা অপরাধে মাদকের তালিকায় জায়গা না পায়। একই সঙ্গে অপরাধী কেউ যাতে তালিকা থেকে বাদ না পড়ে সেটাও লক্ষ্য রাখা উচিত। অভিযানের পাশাপাশি মাদকবিরোধী প্রচারও চালাতে হবে। যুবসমাজ ও তাদের অভিভাবকদের মাদকের কুফল সম্পর্কে আরও সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেছেন, এখনও মাদকবিরোধী অভিযানে রাঘববোয়ালদের গ্রেফতার করা যায়নি। যারা ধরা পড়ছে, তাদের অধিকাংশই মাদক বহনকারী বা মাদকসেবক। আর অভিযানে অনেকে মারা যাচ্ছে। এতে মাদক-সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামত আমরা হারাচ্ছি। বিচারের বাইরে কোনো নিরপরাধ লোক মারা গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা প্রশ্নের মুখোমুখি হবো।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা সমকালকে বলেছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ একমাত্র সমাধান নয়। মাদকের সঙ্গে কারা কী পর্যায়ে জড়িত সে ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। যারা এরই মধ্যে মাদকসেবী হয়েছেন তাদের চিকিৎসাসহ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ৩০ মে ২০১৮)
সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর আত্মগোপনে চলে গেছেন মাদকের শীর্ষ গডফাদাররা। তারা ভয়ে এখন গাঢাকা দিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়িতে তালা দিয়ে পালিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকা তালিকায় টেকনাফের ৬০ গডফাদারের অনেকে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তারা তাদের পৃষ্ঠপোষক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আশ্রয় চাচ্ছেন। তবে মাদকের প্রতি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানের কারণে তাদের পৃষ্ঠপোষকরাও তাদের আশ্রয় দিচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সংস্থার তদন্তে যেসব গডফাদার, প্রভাবশালী আশ্রয়দাতা, বিনিয়োগকারী ও পৃষ্ঠপোষকের নাম এসেছে তাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে মাদকের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়।
মাদক নির্মূলে গডফাদার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত অবস্থানে আছে-এমনটিই জানান দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ‘ঢাকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করা হবে।’
ইয়াবার গডফাদার হিসেবে সর্বত্রই আলোচনায় কক্সবাজারের স্থানীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম। তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও মুখ খোলেনি। বিভিন্ন সময়ে সংস্থাগুলোর করা মাদকের গডফাদারদের তালিকায় দেখা যায় ঘুরেফিরে আবদুর রহমান বদির পরিবারের লোকজনের নামও এসেছে। এ ছাড়া গডফাদারের তালিকায় টেকনাফের ফয়সাল, সফিক, আল আমিন, আবদুস শুক্কুর, টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা সাহেদুর রহমান, মুজিবুর রহমান, আকতার ও শাহেদ, কামরুল হাসান, মারুফ, সাইফুল করিম, আবুল কালাম, নুরুল হুদা, জাফর আহমেদ, নুরুল আমিন, শামসুল আলম, দিদার মিয়া, মোস্তাক, আজিজসহ কক্সবাজার এলাকার অন্তত ৬০ জন রয়েছেন এই তালিকায়। এ ছাড়া ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ইয়াবার গডফাদার হিসেবে কড়াইল বস্তির বাবা কাসেম; গেন্ডারিয়ার রবিন, রহিমা বেগম; গুলশান এলাকার সালাউদ্দিন ও রাজু, বাড্ডার পিচ্চি মোশাররফ, খিলক্ষেতের নাজমা ইসলাম, নিউমার্কেট এলাকার আসমা আহমেদ ডালিয়া, নাছির উদ্দিন; ভাসানটেকের জামাল সরদার, উত্তরার মহসিন, মিরপুরের জাহানারা বেগম, খিলগাঁওয়ের নূর মোহাম্মদ ও সাফিয়া আক্তার শোভা; পল্টনের ইফতেখার জামান জয়, লালবাগের মহসিন আজাদ, কাঁঠালবাগানের জাহিদ ওরফে টাইগার বাবুর নাম রয়েছে। এ ছাড়া গডফাদার ও তাদের সহযোগীদের তালিকায় বেশ কয়েকজন ওয়ার্ড নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামও রয়েছে।
সর্বশেষ ডিএমপি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে তৈরি করা পৃথক প্রতিবেদনে রাজধানীতে মাদকের ৮২ গডফাদারের নাম উঠে আসে। সেখানে তিন পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকার দলীয় ৮ নেতার নাম রয়েছে। তিন পুলিশ কর্মকর্তা হলেন-বনানী থানার এসআই আবু তাহের ভুইয়া, পল্লবী থানার এসআই বিল্লাল ও মাজেদ। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দেন ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি জামাল মোস্তফার ছেলে রুবেল, সবুজবাগের ওহাব কলোনির স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা ওরফে বাবরী মোস্তফা, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামান পপি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে টেকনাফের মাদকের গডফাদারদের তালিকায় আছেন সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির চার ভাই। তারা হলেন মো. আব্দুস শুক্কুর, আব্দুল আমিন, পৌর কাউন্সিলর মৌলভী মুজিবুর রহমান ও মো. সফিক। গডফাদারের ওই তালিকায় জনপ্রতিনিধির মধ্যে আছেন টেকনাফের উপজেলার চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ ও তার পুত্র সদর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ শাহজাহান। এসব গডফাদারদের তালিকা ধরে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গডফাদারদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় আট নম্বরে থাকা আকতার কামাল মারা গেছেন। ২৫ মে ২০১৮ কক্সবাজারে মেরিনড্রাইভ সড়কে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আকতার কামাল উখিয়া টেকনাফের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির বড় বোন শামসুন্নাহারের দেবর এবং টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আহমদ এর বেয়াই। এছাড়া শীর্ষ ওই মাদক গডফাদার টেকনাফের বিএনপি নেতা সুলতান আহমেদ এর শ্যালক। তিনি টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। চেয়ারম্যান জাফর আহমদ নিজে এবং তার তিন ছেলে ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান, মোস্তফা মিয়া, দিদার মিয়া মাদকের গডফাদারের ওই তালিকায় আছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ