ঢাকা, সোমবার 16 July 2018, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এমপি’র কোটায় টিআর কাবিটা প্রকল্পে ‘নির্ভেজাল অনিয়ম দুর্নীতি’!

এম. কে. দোলন বিশ্বাস : গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচীর আওতায় টিআর ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটার) বিপরীতে নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছে দেশের বিভিন্নস্থানে। এমন অভিযোগ থেকে বাদ পড়েনি দেশের অনুন্নত জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা। সরকারি বরাদ্দের বিধিবর্হিভূত এমনই চিত্র ওঠে এসেছে জামালপুর-২ ইসলামপুর আসনের সরকার দলীয় এমপি আলহাজ্ব ফরিদুল হক খান দুলালের কোটায় বরাদ্দকৃত টিআর ও কাবিটা প্রকল্পে। ফলে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা ভাঙনকবলিত এ উপজেলায় সরকারি বরাদ্দের ওইসব প্রকল্পের সিংহভাগই ‘কাগজ-কলমে’ হচ্ছে বাস্তবায়ন।
গ্রামীণ অবকাঠামো রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মাটি ভরাট এবং সংস্কার, ক্লাব-সংগঠন, হাটবাজার উন্নয়নের নামে প্রকল্প দেখিয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকা তছরুপ হলেও দেখার যেন কেউ নেই। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পগুলো স্থানীয় এমপির কোটা হওয়ায় সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন অনেকটাই নির্বিকার।
জেলা ত্রাণ ও পুণর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ইসলামপুর আসনের এমপি ফরিদুল হক খান দুলালের নামে টিআর কর্মসূচীর আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৭২টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৮ লাখ, ৬৯ হাজার ২০৩ টাকা  ও  কাবিটার প্রথম পর্যায়ে ১৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ৫৭ লাখ, ৬২হাজার ৯৯৮ টাকা বরাদ্দ আসে। এমপি ফরিদুল হক খান দুলালের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংশ্নিষ্ট উপজেলার পিআইও, ইউএনও, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক যৌথ স্বাক্ষরে অনুমোদন করেন। এছাড়া একই অর্থবছরের টিআরের কর্মসূচীর আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০৫টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৮ লাখ, ৬৯ হাজার ২০৩ টাকা  ও  কাবিটার দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৪৭.৩৮৬ মেট্রিক টন চাউল বরাদ্দ আসে এমপি ফরিদুল হক খান দুলালের নামে। এমপি ফরিদুল হক খান দুলালের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে উপজেলার পিআইও, ইউএনও, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক যৌথ স্বাক্ষরে অনুমোদন হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকল্পের বরাদ্দের খবর সংশ্নিষ্ট এলাকাবাসী জানে না। যেসব স্থানে কাজ হয়েছে তা নামমাত্র। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্পের শুরু এবং শেষ প্রান্তে কাজের ধরন, বরাদ্দ ও প্রকল্প কমিটির নাম সংবলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও কোথাও এর কোনো চিহ্ন নেই। তাই কোনো প্রকল্পের কত বরাদ্দ, কে সভাপতি সেটিও জানে না এলাকাবাসী এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। অভিযোগ উঠেছে ফরিদুল হক খান দুলালের জামায়াত-বিএনপিসহ পছন্দের লোকদের নামে বেনামে বরাদ্দ দেওয়ায়  প্রকল্পের কাজের বারোটা বাজিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি থেকে যোগদানের নাম ভাঙিয়ে এমপির সাথে সমঝোতা করে বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, কাবিটা কর্মসূচীর আওতায় প্রথম পর্যায়ে ১ নং প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় কুলকান্দি হার্ড পয়েন্ট থেকে পাথর্শী সীমানা পর্যন্ত বাঁধ কাম রাস্তা নির্মাণ। ৬ লাখ টাকা বরাদ্দের এ প্রকল্পের সভাপতি কুলকান্দি ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান সনেট। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নও যথাযথভাবে হয়নি। ৩ নং প্রকল্প দেওয়া হয় বেলগাছা মধ্যপাড়া হতে সাধুর বাড়ী হয়ে পুর্বে জাহল বন্দের রাস্তার শেষ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। ৩ লাখ টাকার এ প্রকল্পটির কাজ করা হয়েছে মাত্র তৃতীয়াংশের এক ভাগ। একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় দক্ষিণ চিনাডুলী মরহুম বাহার আকন্দ সাহেবের পশ্চিম পার্শ্বে পাকা রাস্তা হতে খালেক মিয়ার দোকান হয়ে দেওয়ানপাড়া বালিকা দাখিল মাদরাসা পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ৬ নং প্রকল্পে। এ প্রকল্পের সভাপতি দেওয়া হয় চিনাডুলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নাফিকুল ইসলামকে। তার দাবি বিধিমত কাজ করা হয়েছে।
এছাড়া সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১১ নং প্রকল্প পচাবহলা ডিসিসিআর রাস্তা খালেকের বাড়ী হতে কেরামতের বাড়ী হয়ে বারেকের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়ন এবং ১২ নং প্রকল্প পাঁচবাড়ীয়া মরহুম আসাদুজ্জামানের বাড়ী হতে পাঁচবাড়ীয়া কাচিহারা ঈদগাহ্ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা  ও কাচিহারা ঈদগাহ্ মাঠে মাটি ভরাট। এ প্রকল্প দুটির কাজ করা হয়েছে বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম।
টিআরের প্রথম পর্যায়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাচিহারা কমিউনিটি ক্লিনিকের সম্মুখে মাটি ভরাট করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ৮ নং এ প্রকল্পটির নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। ৯ নং প্রকল্প দেওয়া হয় পচাবহলা জামেদ আলী দাখিল মাদরাসা হতে লেবু মিয়ার বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। ৪০ হাজার টাকার এ প্রকল্পটিরও কাজ করা হয়েছে নামমাত্র। এছাড়া অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া যায়নি ৪০ হাজার টাকার হারে বরাদ্দের গাইবান্ধা ইউনিয়নের নাপিতেরচর শাহপাড়া মোহাম্মদ আলীর বাড়ীর সামনে গর্ত ভরাট ও রাস্তা সংস্কার নামে ৩৩ নং প্রকল্প এবং মরাকান্দি পোড়াবাড়ী গ্রামে ফরহাদের বাড়ী হতে ছালামের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা মেরামত নামে ৩৭ নং প্রকল্পসহ অনেক প্রকল্পের।
কাবিটা কর্মসূচীর আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ নং প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় কুলকান্দি হার্ড পয়েন্ট হতে পাথর্শী সীমানা পর্যন্ত বাকী অংশ বাঁধ নির্মাণ। ১৬ মেট্রিক টন চাউলের এ প্রকল্পটির কাজ করা হয়েছে মাত্র অর্ধেক। ২ নং প্রকল্প দেওয়া হয় বেলগাছা ইউনিয়নের বরুল হাসমতের বাড়ী পিছনে রাস্তা  হতে ইদ্রিস মাস্টারের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। ১০ মেট্রিক চাউলের বিপরীতে এ প্রকল্পটির সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সরুজ শেখ। প্রকল্পটির সমদয় বরাদ্দ উত্তোলন করলেও কাজ করা হয়েছে আংশিক। ১০ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ৩ নং প্রকল্প ইসলামপুর গুঠাইল পাকা রাস্তা হতে ফৈলামারী মিন্টু মিয়ার বাড়ী হয়ে ফৈলামারী ঈদগাহ্ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়নে করা হয়েছে অনিয়ম। এ প্রকল্পের সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী। ১০ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ৪ নং প্রকল্প দেওয়া হয় সাপধরী মো. জহুরুল ইসলামের বাড়ী হতে চেঙ্গানিয়া ও আকন্দপাড়া সংযোগ রাস্তা পর্যন্ত উন্নয়ন। এ প্রকল্পটির সভাপিত সাপধরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহালম মন্ডল। একই পরিমাণ চাউলের বরাদ্দে ৫ নং প্রকল্প দেওয়া হয় কাজলা মোল্লা বাড়ী হতে হরিণধরা বাঁধ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। এ প্রকল্পের সভাপিতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ্জামান। এ দু’টি প্রকল্পেও আশানুরূপ কাজ করা হয়নি।কাজ সমাপ্ত করা হয়নি ১২ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ৬নং প্রকল্প পচাবহলা পাকা রাস্তার হালিমের দোকান হতে বক্করের বাড়ী হয়ে খোরশেদের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের।
এছাড়া ১০.৩৮৬ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ৭নং প্রকল্প কাচিহারা নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয় সংস্কার ও উন্নয়ন,  ১০ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ৮ নং প্রকল্প গংগাপাড়া চৌধুরী বাড়ীর কমিউনিটি ক্লিনিকের মাঠে মাটি ভরাট,  ১০ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ১১ নং প্রকল্প ইসলামপুর নেকজাহান মডেল হাইস্কুলের মাঠ উন্নয়ন ও ২৫ মেট্রিক টন চাউলের বিপরীতে ১২ নং প্রকল্প ইসলামপুর উত্তর দরিয়াবাদ গোরস্থান উন্নয়নের নামে এসব প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করার গুরুত্বর অভিযোগ ওঠেছে। 
ইসলামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া গণমাধ্যমে জানান, সরকারি বরাদ্দের ব্যাপারে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই পছন্দের লোকদের নামে বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারি বরাদ্দ নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে বদনাম হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং সরকারের। ইসলামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম গণমাধ্যমে দাবি করেন, সবকিছু এমপি সাহেবের একারপক্ষে দেখভালের সম্ভব নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ‘টাকা নিয়ে কাজ না করলে সে টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া হবে। অন্যথায় আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এমন বাহারি-রকমারি স্লোগান চারিদিকে চাউর করলেও প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করে তছরূপের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত  আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কোনো ধরনের হিম্মত দেখাতে পারেননি তিনি। বরং বাহারি-রকমারি স্লোগানেই উন্নয়ন প্রকল্পের ‘নির্ভেজাল অনিয়ম-দুর্নীতির’ সমাধান খোঁজছেন প্রজাতন্ত্রের ওই কর্মচারি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নায়েব আলী গণমাধ্যমে জানান, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার সর্বশেষ সময় ছিল গত ৩০ জুন। এখন অভিযোগগুলো তদন্ত হবে। কাজ না করে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামালপুরের সংরক্ষিত আসনের এমপি মাহজাবিন খালেদ জানান, উন্নয়নমূলক কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। তা না হলে সরকারি বরাদ্দ লুটপাটের সুযোগ থেকে যায়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি স্থানীয় এমপি ফরিদুল হক খান দুলাল জানান, আমার প্রতিটি প্রকল্পের কাজ ঠিকঠাক মতোই চলছে। তাছাড়া প্রকল্পের কাজের দেখভাল করেন পিআইও ও ইউএনও। কোনো অনিয়ম হলে দেখার দায়িত্ব তাদেরই।
দিন যায় কথা থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। এভাবেই সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্য দিয়ে প্রতিটি সরকার তার ক্ষমতাকালীন টিআর-কাবিখা প্রকল্পের কাজ শেষ করে থাকেন। মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের বছরেও এর খুব একটা ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। বরং বিশেষ করে গত ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে টিআর-কাবিখা বাস্তবায়নের অভিযোগের তুমুল হৈচৈ পড়ে দেশজুড়ে। ২০১০ সালে গাজীপুরে অনুষ্ঠিত এক জেলা প্রশাসক সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসক টিআর-কাবিখা নিয়ে সীমাহীন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যরা টিআর-কাবিখা নিয়ে অতিমাত্রায় নাক গলান। ফলে এসব প্রকল্পে অনিয়ম হলেও তাদের ভূমিকা রাখার সম্ভব হচ্ছে না। সম্মেলনে ওইসময় দায়িত্বপ্রাপ্ত গাজীপুরের জেলা প্রশাসক কামাল উদ্দিন তালুকদার টিআর-কাবিখার নানা দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে টিআর-কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়ে আসছে। এর ফলে এসব প্রকল্পের আওতায় অনেক সময় অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হচ্ছে। কৃষিজমি কমছে, বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি টিআর-কাবিখার ‘বিকল্প’ প্রকল্পের প্রস্তাব করেন।
তৎকালীন নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যরা স্পেশাল টিআর-কাবিখার ব্যাপারে বেশি তৎপর থাকেন। সংসদ সদস্য যুক্ত থাকার ফলে তারা টিআর-কাবিখার দুর্নীতির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। টিআর-কাবিখা নিয়ে সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়ে ওই সম্মেলনে তৎকালীন  খাদ্যও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘টিআর এবং কাবিখার উপজেলা পর্যায়ের কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে উপদেষ্টা রাখা হয়েছে। ফলে সংসদ সদস্যরা স্পেশাল টিআর বা কাবিখার খোঁজ খবর নেন। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার পদ্ধতি তদারকি করতে পারত না। বর্তমান সরকার একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। দুর্নীতি আর অনিয়ম কমাতে টিআরের খাদ্যশস্য বিক্রির যে নীতিমালা আছে, তার পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আর টিআরের খাদ্যশস্য কালোবাজারির কবল থেকে রক্ষার জন্য ওএমএস হিসেবে বিতরণের কথা সরকার ভাবছে বলেও তিনি জানান।’
টিআর বা কাবিখার দুর্নীতি কমাতে বর্তমান সরকার রাস্তা করার জন্য টিআর বিতরণে প্রাধান্য না দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে টিআর-কাবিখা বিতরণে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে তদন্ত চলছে বলেও মন্ত্রী জানান। তবে মন্ত্রীর ওইসব আশ্বাস আজও আলোর মুখ দেখেনি। ওই সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগের সচিব মোখলেছুর রহমান টিআর এবং কাবিখা নিয়ে কিছুটা দুর্নীতি হয়েছে বলে স্বীকার করে জানিয়েছিলেন যে, ‘দুর্নীতি-অনিয়ম ঠেকাতে চলতি বছরের টিআর-কাবিখা বিতরণের আগে বর্তমান নীতিমালা পরিবর্তনসহ টিআর-কাবিখা বরাদ্দের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা হবে। তিনি বলেন, টিআর বা কাবিখা দিয়ে শুধু রাস্তাঘাট আর প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করলেই চলবে না। এলাকার চাহিদা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে টিআর বা কাবিখার আওতায় আনা হবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি আরো বলেছিলেন, কাবিখার আওতায় সাতক্ষীরার আইলাদুর্গত এলাকায় পানি রিজার্ভার ও নদী খনন করা হয়েছে।’
তবে এখন পর্যন্ত ওইসব সম্মানিত মহোদয়দের প্রতিশ্রুতি অন্ধকারেই হাবুডুবু খাচ্ছে। গত ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে সারাদেশে টিআর খাতে বিতরণ করা হয়েছে সর্বমোট ৩ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন। ওই সময় চলতি বাজেটে কাবিখার জন্য ৪ লাখ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো। আর টিআরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪ লাখ ১০ হাজার টন।
বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসন্ধানে দেশব্যাপী টিআর-কাবিখা প্রকল্প নিয়ে যে হরিলুট খেলায় মেতে ওঠেছিলো ওই সময় জামালপুরের খন্ডচিত্রর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
জামালপুর জেলায় কাবিখা প্রকল্পের সরকারের বরাদ্দকৃত গম কাজে আসেনি। প্রকাশ্যে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সরকারের অর্থ চলে যায় সিন্ডিকেটের কবজায়। অভিযোগে প্রকাশ, প্রকল্পের দেওয়া গম সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে  সরাসরি ট্রাকে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে জেলা সদরসহ ৭ উপজেলাতেই টাকার বিনিময়ে অধিকাংশ প্রকল্পের নামমাত্র কাজ করানো হয়। শতভাগ কাজ করানো হয়েছে মর্মে ভুয়া-টিপসহ জাল মাষ্টাররোল পিআইও অফিসে জমা দিয়ে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা হরিলুট করেছে ক্ষমতাসীন দলীয় ক্যাডাররা। জেলার সবচেয়ে বেশি লুটপাটের ঘটনা ঘটে সরকার দলীয় হুইপ মির্জা আজমের নির্বাচনী এলাকা মেলান্দহ উপজেলায়। এ প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদেরও দেওয়া হয়নি তাদের পরিশ্রমের প্রাপ্ত মজুরী। ওই সময় এ নিয়ে প্রায় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে খবর প্রকাশ প্রায়। এমনটি ঘটেছে ইসলামপুর ও সরিষাবাড়ী উপজেলায়। ইসলামপুরে মস্জিদ-মাদ্রাসাতেও কাজ করা হয়নি। লুটপাটের কবল থেকে বাদ পড়েনি তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা। বকশীগঞ্জের নীলাখিয়ায় প্রতিষ্ঠিত অ্যাডভান্সড টেনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে কাবিখার দেওয়া বরাদ্দ কলেজ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই সমূদয় অর্থ আত্মসাৎ করেছে ওই সময়কার স্থানীয় এক মহিলা ইউপি সদস্য। পরে উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রৌফ তালুকদারসহ তার কার্যালয়ে দশ-বারোজন লোকের সামনে  করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে সরকারের বরাদ্দকৃত টাকা হজম করার পথ প্রশস্ত করে ওই দুর্নীতিবাজ মহিলা মেম্বার। এরপর আর ওই টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বলাবাহুল্য যে, বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য টিআর ও কাবিটা প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্পে ‘হরিলুট’ হলে উন্নয়নের কি অবস্থা হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়। সঙ্গত কারণেই আমাদের প্রশ্ন, দিন বদলের সরকারের আমলে এমন অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারলো। এই সরকারের নয় বছরব্যাপী দেশজুড়ে এই অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনাগুলো অতি গোপনে ঘটেছে এবং দায়িত্বশীলদের কেউ কিছুই জানে না, পুরো বিষয়টা তো তা নয়। প্রকাশিত খবরগুলোতেই বলা হয়েছে, এসব প্রকল্প নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের পাহাড় জমে উঠেছে। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা তো দূরের কথা, অভিযোগগুলো পড়ে দেখাও হচ্ছে না। ব্যতিক্রম নয় যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র ভাঙনকবলীত ইসলামপুর উপজেলা। এখানে যে সব প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি রয়েছেন তাদের অধিকাংশই নিজেদের আখের গোছাতে ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ বন্ধের ফাঁকাওয়াজ তুলে ফেসবুকসহ বিভিন্ন ভাবে বাহারি-রকমারি স্লোগান ফেরি করেন। যা দিয়ে ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ বন্ধ হবে এমনটি কোনো অন্ধের নিকটও বিশ্বাস হবার নয়। তবে একটি কথা এখানে না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে এ উপজেলায় একটি ইউনিয়নে ‘আসল ভিক্ষুক’ খুঁজে বের করতে আন্তরিকতার কোনো ধরনের খাটতি নেই, এমনটি প্রমাণ করে জনগণকে জানান দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
তিনি পবিত্র কোরআন শরীফ উপস্থাপনের কথা বলে ‘আসল ভিক্ষুক’ খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচী প্রকল্পের শ্রমিকদের দিয়ে কাজ না করিয়ে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করে তা তছরূপের ঘটনা ঘটলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন উপজেলা কমিটি’র সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের আইনগত পদক্ষেপ নিতে কোনো ধরনের গরজ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং হতদরিদ্রদের কর্মসৃজন কর্মসূচী প্রকল্পের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরায় গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর তার চটে যাওয়া খবর জাতীয় দৈনিকের।  তবে হাস্যোজ্জল কথালাপি মাননীয় এমপি আলহাজ্ব ফরিদুল হক খান দুলাল মহদোয়রের এলাকা উন্নয়ন করতে পরিশ্রমের কোনো ধরনের ঘাটতি অন্তত আমাদের নিকট পরিলক্ষিত হয়নি। শুধু এসবের অন্তরায় বিশেষ করে কতিপয় কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মী। যা এলাকার জন্য আত্মঘাতীর নামান্তর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ