ঢাকা, সোমবার 16 July 2018, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন যুগোপযোগী করা সময়ের দাবী

জিয়া হাবীব আহ্সান : ২৮ বছরের পুরাতন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে একদিকে বেরিয়ে পড়ছে অপরাধীরা অপরদিকে ফেঁসে যাচ্ছে অনেক নিরীহ নাগরিক। বর্তমানে দেশে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনী দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্ট সকলের সমবেত প্রচেষ্টার অভাবে অপরাধটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ইয়াবার ভয়াবহ থাবায় দেশের যুব সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ধ্বংসের মুখোমুখি। বেড়ে গেছে খুন খারাবী। পুরানো মাদক আইনে এর নাম না থাকায় আইনের ফাঁকে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। আইনের দুর্বলতার কারণে ইয়াবা পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার সারাদেশে ব্যাপক অভিযান ও ধরপাকড় চালিয়েও এ অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমানে আদালত সমূহে হাজার হাজার মাদকের মামলা তদন্তাধীন ও বিচারাধীন আছে। এজাহার দায়ের, জব্দ তালিকা প্রস্তুত, সাক্ষ্য সাবুদ গ্রহণ, চার্জশীট প্রদান, বিচারকার্য পরিচালনায় প্রচুর অনিয়ম ও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, লোকবল এবং ইকুইপমেন্টস এর অভাবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক এককভাবে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা ও মাদক চোরাচালানের অপরাধ পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। মাদকের মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামীর বিরুদ্ধে এজাহার ও চার্জশীট দাখিলে নানা দুর্বলতার কারণে ও সাক্ষ্য সাবুদ উপস্থাপনে প্রসিকিউশনের ব্যর্থতা অপরাধ প্রমাণে অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধীদের পোয়াবরো হয়। বানের ¯্রােতের মত সীমান্ত পথে ইয়াবা সহ নানা মাদক দ্রব্য ঢুকছে। মাষ্টার মাইন্ড, গড ফাদার ও মাদক সিন্ডিকেট সমূহ ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
কেননা এই আইনে শুধুমাত্র যার পজেশনে বা হেফাজতে মাদক পাওয়া গেছে তারই শুধু জেল বা সাজা হয়। দেখা যায় শুধুমাত্র গরীব ক্যারিয়ার (বহনকারী) এরই শাস্তি হচ্ছে। কিন্তু এর মূল হোতা একেবারেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ১৯৯০ সালের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলেও তা মাদক স¤্রাট মাষ্টার মাইন্ড, গডফাদার ও মাদক সিন্ডিকেটদের বিরুদ্ধে এই আইন অনেকটা অকার্যকর। এ আইনকে সংস্কার করে তাকে যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। যাতে করে গডফাদারদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যায়। তদন্ত কালে দেখা যায় তদন্ত কর্মকর্তা জব্দ তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করেন, তাদের সঠিক নাম ঠিকানা ও পরিচয় না থাকার কারণে সাক্ষ্য সাবুদের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাদকের মামলার আসামীরা খালাস পায়। অনেক চাঞ্চল্যকর মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশীট দাখিলের পূর্বে সরকারী আইন কর্মকর্তা বা পাবলিক প্রসিকিউটার এর কোন মতামত গ্রহণ করেন না, (শুধু উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন) ফলে চার্জশিটেও ত্রুটি থেকে যায়। তদন্ত কাজে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির কোন ব্যবহার হয় না। অথচ মোবাইল ট্র্যাকিং, কললিষ্ট ও লোকেশন চিহ্নিত করে অপরাধীর যাওয়া আসার গতিপথ ও সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা যায়। এ জন্যে তদন্ত কর্মকর্তাদের উপযুক্ত আইটি প্রশিক্ষণ ও উন্নত যন্ত্রপাতি প্রদান করা জরুরী। মাদকের মামলা দুদক কিংবা, পরিবেশ আইনের মতো নিজ নিজ বিভাগীয় তদন্ত কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করা উচিৎ। মাদকের মামলা পুলিশকে তদন্তের ভার না দেয়া উচিৎ। কেননা এতে পুলিশের স্বাভাবিক কর্মকান্ডের ব্যত্যয় ঘটতে পারে। মাদকের মামলা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব মামলার দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত চালু করা দরকার।
অভিযোগ উঠেছে মাদকের মামলায় অনেক নিরীহ নাগরিককে ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে, এই ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনে এ ধরণের অভিযুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সাথে সাথে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে। আইন সংস্কারের জন্য শুধু ভালো ড্রাফটিংই যথেষ্ট না। এই জন্যে আইন কমিশনকে বিভাগীয় শহর বা জেলাসমূহে জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, মিডিয়া কর্মী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী সহ বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত গ্রহণ করতে হবে। জনমত গঠনের জন্য মসজিদ, মন্দির সহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়, সামাজিক সংগঠন, এনজিও এবং পাঠশালাকে কাজে লাগাতে হবে। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য দায়ী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান সম্পৃক্ত করতে হবে। অভিযোগ আছে এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা পান। সেই সাথে রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দেন। বিশেষ করে মাদক পাচারের রুটগুলো নিরাপদ রাখতে তারা ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ইয়াবা সহ মাদকের ব্যবসা রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ সদর দফতর থেকে সারা দেশের পুলিশের জন্য যে ১০ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, যেসব পুলিশ সদস্য মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেন, তাদের চিহ্নিত করে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা। একটি জাতীয় দৈনিকের খবর অনুযায়ী মাদকে জড়িত থাকার অভিযোগ ইতিমধ্যে ৬৭ জন পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের উক্ত আইনের আওতায় আনতে হবে। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোকেও আন্তর্জাতিক মানের করা দরকার।
জনসচেতনতার জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। মাদকের উৎস ও প্রবেশ পথ বন্ধ না করে শুধু আইনের কঠোরতা দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যেমন জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধী বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পপি ও কোকার চাষ কমে যাওয়ায় হেরোইন ও কোকেনের জায়গা দখল করছে এমফিটামিন, ক্যাটামিন, পাইপারজিনস, মেফিড্রিন, স্পাইস, এক্সটাসির মতো নতুন নতুন মাদক। যেমন ফেন্সিডিলের জায়গা এখন দখল করেছে ইয়াবা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নতুন প্রকারের মাদকগুলোকে মাদকের পর্যায়ে তালিকাভুক্ত না করার সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ১৯৯০ সালের আইনে মাদকদ্রব্যে বিদ্যমান আইনে ইয়াবা ট্যাবলেট মাদক হিসেবে তফসিলভূক্ত নেই। তবে এটি মাদক হিসেবে তফসিলভূক্ত না থাকায় ইয়াবা মাদক যে এমফিটামিন ব্যবহৃত হয়, তা উল্লেখ করে বিদ্যমান আইনের ১৯(১)এর ৯(ক) ও ৯(খ) ধারায় বিচার হয়ে আসছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের কারাদন্ড। সংশ্লিষ্টদের মতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনী দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যায় ইয়াবা কারবারিরা। ১৯৯০ সালের আইন যখন করা হয়, তখনও ইয়াবা ও সিসারও প্রচলন হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেনীর তফসিলভুক্ত মাদক হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবা ট্যাবলেটে এমফিটামিন ও ক্যাফেইনের মতো যে মিশ্রণ রয়েছে- তা ‘ক’ শ্রেনীর মাদক।
নতুন আইনে ২০০ গ্রাম ইয়াবা ট্যাবলেট বা ইয়াবার উপাদান সরবরাহ, পরিবহন বা সংরক্ষণ করলে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই খসড়ায় মরণনেশা ইয়াবাকে ভয়ংকর মাদক হিসেবে চিহ্নিত করে এটি মজুদ, বিক্রয়, পরিবহন, সংরক্ষণ তথা ব্যবসায় জড়িতদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কথিত অভিজাত নেশা সিসাকে প্রথমবারের মতো মাদক হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। আইনের অপব্যবহার এবং মিথ্যা মামলা প্রতিরোধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সংশোধিত আইনে অবশ্যই থাকতে হবে। নইলে আইনটি সাফল্যের চেয়ে অভিশপ্ত আইনে পরিণত হবে। অপরাধের ধরণ ও চরিত্র বদলে যাওয়ার কারণে ১৯৯০ সালের আইনের কার্যকারিতা হারিয়ে গেছে। ২৮ বছরে পুরানো আইনকে যুগোপযোগী না করলে এবং সমাজের সকলকে এই সংগ্রামে সম্পৃক্ত করতে না পারলে এই যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এই মুহূর্তে আমরা আশা করব একটি সুন্দর আধুনিক ও যুগোপযোগী মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রনয়ণ করা। যা সময়ের দাবী। মাদকে অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে এই ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। 
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ