ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসছে পুরো ফ্রান্স

 

স্পোর্টস রিপোর্টার : অবশেষে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে রাশিয়া বিশ্বজয় করল ফ্রান্সই। তবে এটাই ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ জয় নয়। এর আগেও একবার বিশ্বকাপ জয় করেছিল দলটি। সেটা ১৯৯৮ সালে। প্রথম বিশ্বসেরা হওয়ার ২০ বছর পর ইতিহাস গড়ে আবার বিশ্বকাপ জয় করল দলটি। আর বিশ্বকাপের ইতিহাসে উরুগুরে আর আর্জেন্টিনার পাশে থাকল ফ্রান্স। এ নিয়ে বিশ্বকাপের ২১টি আসরে ঘুরে ফিরে ৮টি দেশই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তার মধ্যে ব্রাজিল সর্বোচ্চ ৫ বার, ইতালি ও জার্মানি ৪ বার করে, ২ বার করে জিতেছে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। আর ইংল্যান্ড ও স্পেন জিতেছে একবার করে। ফলে এই জয়ে দলটির আনন্দ বেড়ে গেছে অনেক বেশি। তবে বিশ্বজয়ের আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ঘটেছে লুটপাটের ঘটনাও। রাশিয়া বিশ্বকাপে বিশ্বসেরা আর ফেভারিটদের পিছনে ফেলে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ফ্রান্স। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ক্রোয়েটদের ৪-২ গোলে হারায় ফরাসিরা। এর মধ্য দিয়ে একাধিকবার বিশ্বকাপ জয়ী চ্যাম্পিয়নদের এলিট ক্লাবে ঢুকে যায় তারা। ফ্রান্স এবার বিশ্বসেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় বিশ্বকাপের ধারাবাহিক একটি ইতিহাসও ভেঙ্গেছো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রতি ২০ বছর পর নতুন চ্যাম্পিয়ন দেখেছে বিশ্ব। ১৯৩৮ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কারণে ১২ বছর অনুষ্ঠিত হয়নি বিশ্বকাপ ফুটবল। যুদ্ধ শেষে ১৯৫০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আসরে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। তারপর ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। মানে তৃতীয় আসরের ঠিক ২০ বছর পর সেবার নতুন চ্যাম্পিয়ন পায় বিশ্ব। তার ২০ বছর পর ১৯৭৮ সালে বিশ্ব দেখে আরেক নতুন চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। এর ঠিক ২০ বছর পর ১৯৯৮ সালে ফরাসিরা নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসাবে বিশ্বের বুকে আবির্ভূত হয়। সে হিসাবে এবারও নতুন কোন  দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা। অবশ্য ফাইনাল পর্যন্ত সম্ভাবনাটা সেদিকেই গড়াচ্ছিল। কারণ ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ ছিল ক্রোয়েশিয়া। তাই ফরাসিদের ভয়টা একটু বেশি ছিল। কারণ ক্রোয়েটরা কখনও বিশ্বকাপ জেতেনি। কিন্তু বিশ্বকাপের সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে দিয়ে ফরাসিরাই দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে। তাই আনন্দ-উল্লাসের মাত্রাটাও ছাড়িয়ে গেছে আগের বিশ্বকাপ জয়ের চেয়ে। ফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্সের গতিশীল ফুটবলের কাছে আর পেরে উঠেনি ক্রোয়েশিয়ার পজেশনাল ফুটবল। ফ্রান্সের এই গতিশীল ফুটবলের অন্যতম কান্ডারি হলেন তরুণ তুর্কি কাইলিয়ান এমবাপে। মূলত এক গতির কাছেই যেন খাবি খাচ্ছিল বিশ্বকাপের ফ্রান্সের বিপক্ষে নামা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়েরা। অবশ্য তার স্বীকৃতও পেয়েছেন এমবাপে। পেয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যকে পেছনে  ফেলে এমবাপে এখন ব্যস্ত বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে। জয়ের আনন্দ উৎসবে মাঝে সাংবাদিকদের এই স্ট্রাইকার জানান, ‘আমি খুব খুশি। এখানে  পৌঁছাবার রাস্তাটা খুব বড় ছিল, তবে এটা আমাদের প্রাপ্য। আমরা নিজেদের খুব ভাগ্যবান মনে করছি যে আমরা আমাদের  দেশবাসীকে আনন্দিত করতে পেরেছি। আমাদের যেই কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল আমরা ঠিক সেটাই করেছি তাদের জন্য।’ এমবাপে আরও বলেন, ‘তবে আমি এর চেয়েও আর ভালো কিছু করতে চেয়েছিলাম। তবে বিশ্বকাপ জয়ের ওপরে তো আর কিছু হতে পারে না। তাই এখন আমরা শুধু জয়োৎসব করবো। এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল। আর আমি তা করতে পেরেছি। আমি গোল করতে পেরে খুশি। তবে আমার মূল আনন্দ হলো আমার সতীর্থরা। আজ আর আমি ঘুমাতে পারবো না, কেননা এটা জয়োৎসবের সময়।’ স্বাভাবিক ভাবে এমন দিনে জয়ের উল্লাসে মাতে ফ্রান্স। তবে এই উল্লাসই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ালো ফরাসি সমর্থকদের। বিজয় উৎসবের দিনে সমর্থকরা লুটপাটে  মেতেছে। ফ্রান্সের জয় দেখতে হাজার মানুষ জড়ো হয় চ্যাম্পস-এলিসি’তে। কিন্তু জয়ের পর সমর্থকদের উল্লাস রূপ নেয় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে। আইফেল টাওয়ারে জমায়েত হয়েছিলেন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ। চারটি বড় পর্দা সেখানে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। কিন্তু জয়ের পর আতশবাজির শহর প্যারিস রুপ নেয় ভয়ংকর ভাবে। সমর্থদের উল্লাসের সুযোগে একদল সমর্থক স্কি মাস্ক পরে প্রবেশ করে পাবলিসিজ ড্রাগস্টোরে। সেখান থেকে ওয়াইন, শ্যাম্পেনের বোতল নিয়ে বেরিয়ে এসে যোগ দেয় উৎসবে। এরপরেই শুরু হয় তাদের কান্ড। বিশৃঙ্খল আচরণ কাঁদানে গ্যাস এবং জলকামান ব্যবহার করে ঠেকায় পুলিশ। পরে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ঠা-া হয়। প্যারিস ছাড়াও ফ্রান্সের অন্য শহরে এ ধরনের সংঘর্ঘ হয়েছে। ফ্রান্সের স্থানীয় পত্রিকা দ্য লোকাল জানাচ্ছে, ফ্রান্সের বিজয় উল্লাসের দিনে এ ধরনের সংঘর্ষ প্যারিসের বাহিরে অন্যান্য শহরেও হয়েছে। এতে ৫০ জনের মতো আহত হয়েছেন। তিনজনের অবস্থা গুরুতর। এছাড়াও বিজয় উদযাপনের সময় মারা যান দুই ফরাসি সমর্থক। তাদের একজন উদযাপনের সময় দ্রুতগামী গাড়ি নিয়ে রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারা গেছেন। অন্যজন পুলিশের সংঘর্ষের সময় মারা যান। ঘটনা দুটি ঘটে দুটি ভিন্ন জায়গায়। একটি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, অপরটি তার পাশের জায়গা সেন্ট-ফেলিক্সে। ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এবার তাদের দ্বিতীয় শিরোপা জয়। অবশ্য ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠেও ইতালির কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল তাদের। এবার আর তা হয়নি, সোনালি প্রজন্মের ক্রোয়েশিয়াকে  বড় ব্যবধানে হারিয়েই শিরোপা জিতে নেয় তারা। ক্রোয়েশিযার বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে অবশ্য ম্যাচের ১৮ মিনিটে আত্মঘাতী গোলে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। বক্সের বাইরে থেকে আতোয়োন গ্রিজম্যানের চমৎকার ফ্রি-কিকে বিপদমুক্ত করতে গিয়ে নিজেদের জালে জড়িয়ে দেন বল মারিও মান্দজুকিচ। তাঁর মাথা ছুঁয়ে বল চলে যায় জালে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে গোলটি ১-১ সমতায় নিয়ে আসে ক্রোয়েশিয়া। ঠিক ১০ মিনিট পর চমৎকার গোলে দলকে  খেলায় ফেরান ইভান পেরিসিচ। বক্সে ঢুকেই তাঁর চমৎকার প্লেসিং বল ঠিকানা খুঁজে পায় জালে। খেলার ৩৮ মিনিটে আবার এগিয়ে যায় ফ্রান্স (২-১)। পেনাল্টি থেকে গোল করে দলের ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আতোয়োন গ্রিজম্যান। বক্সের মধ্যে ক্রোয়েশিয়া ডিফেন্ডার পেরিসিচের হাতে বল লাগলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ফ্রান্সের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন পল পগবা। ৫৯ মিনিটে বক্সের সামনে থেকে আচমকা শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই ফরাসি মিডফিল্ডার। ছয় মিনিট পর দলের ব্যবধান আরো বড় করেন (৪-১) এমবাপে। মাঝমাঠ থেকে পাওয়া একটি বল নিয়ে বক্সে ঢুকে দারুণ শটে গোল করেন তিনি। ৬৯ মিনিটে মারিও মান্দজুকিচ ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কিছুটা কমান (২-৪)। ফ্রান্স গোলরক্ষকের সমানে থেকে বল নিয়েই জালে জড়ান তিনি। মান্দজুকিচের এই গোলে ব্যবধান কিছুটা কমলেও ক্রোয়াটদের হার এড়ায়নি। তাই প্রথমবার ফাইনালে উঠে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাদের। ক্রোয়েশিয়া পুরো আসরে দারুণ খেলেও ফাইনালে গিয়ে আর পারেনি তারুণ্য-নির্ভর ফ্রান্সের সঙ্গে। অবশ্য ফাইনালে যে তারা খারাপ খেলেছে সেটা বলা যাবে না। তবে ফ্রান্সের কৌশলি ফুটবলের কাছে হেরেছে ক্রোয়েশিয়া। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ