ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুই বছরে শাহজালালে আগুন লেগেছে ৭ বার

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : গত দুই বছরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর ‘শাহজালাল’ এ অন্তত সাত বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মোটা অংকের না হলেও বিমান ওটা নামায় বিঘ্ন সৃষ্টির পাশাপাশি যাত্রীদের হয়রানি,আতংকিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সর্বশেষ,এক বছরের ব্যবধানে রোববার আবার অগ্নিকান্ড ঘটেছে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে; এবার বৈদ্যুতিক গোলযোগকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। রোববারের এই অগ্নিকান্ডে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। বিমান চলাচলেও কোনো বিঘ্ন ঘটেনি বলে বেসামরিক বিমান চলাচল (সিভিল এভিয়েশন) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১১ অগাস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ এ আগুন লেগেছিল। তাতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিমান উড্ডয়নসহ টার্মিনাল ভবনে কার্যক্রম বন্ধ থাকে। অগ্নিকান্ডে কোনো প্রাণক্ষয় না হলেও ৩৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
গত বছরের ওই অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সে সময় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের বৃহত্তম বিমানবন্দরটিতে আগুন নেভানোর অত্যাধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই।
গত বছরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেয়া প্রতিবেদন নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ও ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, “একটি আধুনিক বিমানবন্দরে আগুন নেভানোর জন্য যেসব যন্ত্রপাতি থাকার কথা, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেগুলো নেই।”
জানা গেছে,শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে দুই ডজনের বেশি বিমান সংস্থার দুই শতাধিক ফ্লাইট ওঠানামা করে। দেশের ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরের আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সুপারিশ করেছে ফায়ার সার্ভিস। এক্ষেত্রে বাহিনীর পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান।
গত বছরের ১১ অগাস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ এ এয়ার ইন্ডিয়ার কার্যালয়ে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে বেলা সোয়া ৩টার দিকে আগুন নেভায়। অগ্নিকান্ডের কারণে আন্তর্জাতিক পথের অন্তত ছয়টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েন সে সময়ের হজ¦যাত্রীসহ বিদেশগামী শতাধিক যাত্রী। প্রায় দুই ঘণ্টা বিমান উড্ডয়নসহ টার্মিনাল ভবনে কার্যক্রম বন্ধ থাকে। সে সময় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, অগ্নিকান্ডে কোনো প্রাণক্ষয় না হলেও ৩৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
তখন উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও ( বেবিচক) সংস্থার পরিচালক মো. সাইফুল ইসলামকে প্রধান করে আরেকটি কমিটি করে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা আধুনিক না। একটি আধুনিক ফায়ার স্টেশনে যেসব যন্ত্রপাতি থাকে, তা এই বিমানবন্দরে নেই।
তৎকালীন সময়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দেশের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর কেপিআই আওতাভুক্ত হলেও সেখানে একটি ফায়ার স্টেশন নেই। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উত্তরা ও তার আশে পাশের ফায়ার স্টেশন থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে বিমানবন্দরে আসেন।” ওই কর্মকর্তা জানান, গত দেড় বছরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছয় বার অগ্নিকান্ড ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরের বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ও রেস্তোরাঁগুলোয় আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থাই নেই। এ ছাড়া আগুন নেভাতে ফায়ার স্প্রিংকলার সিস্টেম, ফায়ার ওয়াটার পাম্প সিস্টেমের মতো অত্যাধুনিক ব্যবস্থা নেই।
বিমানবন্দরটিতে স্থায়ী একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপন, বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আগুন নেভানো ও প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল তদন্ত প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে রেস্তোরাঁগুলোকে ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি বিমানবন্দরের মূল ভবন, কার্গো ভিলেজ, অভ্যন্তরীণ টার্মিনালসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে তাদের প্রতিবেদন মহাপরিচালকে জমা দেয়। সেটি বেবিচকে পাঠানো হয়। বিমানবন্দরের পুরো এলাকাকে ফায়ার ডিটেকশনের আওতায় আনার পক্ষেও মত দেন তদন্ত কমিটির প্রধান।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরে বেবিচকের অগ্নিনির্বাপক কর্মী থাকলেও তারা উড়োজাহাজ ওঠা-নামার সময় অগ্নি নিরাপত্তায় কাজ করেন। উড়োজাহাজে আগুন নেভানোয় তারা দক্ষ হলেও বিমানবন্দরের অবকাঠামো রক্ষায় অভিজ্ঞ নন।
গত বছরের ১১ অগাস্টের ঘটনাটি নাশকতা ছিল না বলে তদন্তে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা দেবাশীষ বর্ধন। তিনি বলেন, টার্মিনাল-১ ভবনের তৃতীয় তলায় দুটি কক্ষ নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার অফিস। তারএকটি কক্ষে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুতের তারে শর্টসার্কিটে আগুন লাগে। এ আগুন কক্ষের উপরের অংশে ছড়িয়ে যায়।
সর্বশেষ রোববার ঘটে যাওয়া অগ্নিকান্ডকে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। ওইদিন বিকালে বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ এ দোতলার ইমিগ্রেশন অফিসের কাছে ধোঁয়া দেখার পর সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন; খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস যায় আগুন নেভাতে। বিকাল ৬টার দিকে এই আগুনের সূত্রপাত ঘটে বলে ফায়ার সার্ভিস ও ইমিগ্রেশন পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। ৬টা ১০ মিনিট থেকে তাদের সাতটি ইউনিট আগুন নেভাতে কাজ শুরু করে।
ওসি ইমিগ্রেশন (জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার) তাসমিন আশরাফ রোববার সোয়া ৬টার দিকে বলেন, “পুরো বিমানবন্দর ধোঁয়ায় ভরে গেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। ইমিগ্রেশনের কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।” কোথায় আগুন লেগেছে কিংবা কোন স্থান থেকে ধোঁয়া আসছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু তখন জানাতে পারেননি তিনি।
এরপর পৌনে ৭টার দিকে সিভিল এভিয়েশনের পরিচালক আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, “সব কিছু স্বাভাবিক। এয়ারলাইন্স চলাচল ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।”
আগুনের বিষয়ে তিনি বলেন, “ইমিগ্রেশন পর লবিতে যেখানে যাত্রীরা বসেন সেখানে ধোঁয়া দেখতে পেয়ে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কোথাও কোনো আগুন দেখা যায়নি। ধোঁয়ায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।”
এরপর সোয়া ৭টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, “বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে সিলিংয়ে আগুন লাগে, সেখান থেকে ধোঁয়ার উৎপত্তি হয়।”ভয়ের কিছু নেই, কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে,” বলেন তিনি।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন রাতে মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হকের বরাত দিয়ে বলেন, “বিমানবন্দরে ধোঁয়া উদগিরণ হওয়ার পরই নিরাপত্তার দায়িত্ব যারা পালন করেন তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন। সেখানে সত্যিকার অর্থে আগুন লাগার মতো কিছু ঘটেনি।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ