ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যারা শিক্ষকদের আঙ্গুল তুলে শাসায় তারা মানুষ নয়

গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দের উদ্যোগে শিক্ষকদের উপর হামলার প্রতিবাদে মিছিল বের করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. তানজিমউদ্দিন খান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো দুই শিক্ষককে লাঞ্ছনার ঘটনায় মানববন্ধন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন থেকে লাঞ্ছনাকারী ‘ছাত্রলীগ’ নেতাকর্মীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন তারা। এসময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করে। যেখানে লেখা ছিল-‘শিক্ষকের মর্যাদা আজ কোথায়’, ‘এবার তোরা ছাত্র হ’, ‘শিক্ষক আজ লাঞ্চিত কেন?’ ‘আমার ক্যাম্পাস কার দখলে’, ‘মূল্যবোধ আজ কোথায়’ ইত্যাদি।
গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ’র ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান, প্রভাষক লামিয়া মোমেন এবং মো. আলী সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত রোববার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তানজিমউদ্দিন খান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান এবং কোটা আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন।
মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল মধুর ক্যান্টিন হয়ে ডাকসু, কলা ভবন, অপরাজেয় বাংলা প্রদক্ষিণ করে আবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করে।
আব্দুল মান্নান বলেন, রোববার শহীদ মিনারে যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। যারা শিক্ষকদের আগুল তুলে শাসায় তারা মানুষ নয়। এ জন্য তাদের, আবার নতুন করে মানুষ হওয়া দরকার। মোহাম্মাদ আলী সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষকদের ওপর আঙগুল তুলেছে সরকারদলীয় একটি বিশেষ সংগঠন (ছাত্রলীগ)। তারা ছাত্র কিনা বা তারা তাদের সংগঠনের নীতি-আদর্শ মানে কিনা তা আমার জানা নেই। আর যারা শিক্ষকদের উপর আঙ্গুল তুলেছে তারা যে গর্হিত কাজ করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা ছাত্র নামের কলঙ্ক। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
বিভাগের শিক্ষার্থী সৌমি বলেন, তানজীম স্যার আমাদের কাছে বাবার মতো। একটি ন্যায্য দাবিতে দাঁড়ানোর কারণে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। শুধু তার উপরে নয়; অন্যান্য যে সকল শিক্ষক ছিলেন তারাও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। তাদের উপর আঙগুল তোলার সাহস ছাত্রলীগ কোথা থেকে পায়? এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।
এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ প্রতিবাদ মিছিলও ভন্ডুল করতে চেয়েছে ছাত্রলীগ। মিছিলটির পিছনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দিদার মোহাম্মদ নিজামুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবুর নেতৃত্বে প্রায় ১০-১২জন নেতাকর্মীকে মিছিলের পিছনে পিছনে যেতে দেখা গেছে। এসময় তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখায়। মিছিলের পিছনে পিছনে অবস্থান নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা তাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এখানে এসেছি।
দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় মানববন্ধন : সহপাঠীর হাত ধরার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় মানববন্ধন করেছেন বিভাগটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। হামলাকারীদেরকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে তারা মানববন্ধনে অংশ নেয়। গতকাল সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হচ্ছে। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। তিনি বলেন, আমরা ভিসি স্যারের কাছে গিয়েছিলাম, তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করবেন। আমরা তার প্রমাণ দেখতে চাই।
মানববন্ধনে হামলার শিকার দুই শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আসাদ ও রোকেয়া গাজী লিনাও উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, অন্যায়ভাবে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন উল্লেখ করে আসাদ ও লিনা বলেন, হামলার পর থেকে আমরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমাদের ক্যাম্পাসে আমরা নিরাপদ নই। আমাদের ওপর কেন হামলা করা হলো? আমরা বিচার চাই।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুজ্জামান। এসময় অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানসহ বিভাগের অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
অবিলম্বে নির্যাতনকারীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বাকি জড়িতদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সব সাধারণ শিক্ষার্থীর ক্যাম্পাসে নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধন থেকে এসব দাবি আদায়ে ৭২ ঘণ্টা ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেন,  কোন ক্ষমতার দাপটে একজন শিক্ষার্থী আরেকজন শিক্ষার্থীর পরিচয়পত্র দেখতে চায়? এই সাহস তাদের কে দিল?
নিজেদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড বহন করেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে মারধর করার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) তিন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বহিষ্কৃত তিন শিক্ষার্থী হলো- সিফাত উল্লাহ সিফাত, আলে ইমরান পলাশ ও মাহমুদুর রহমান। তারা তিন জনই সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পলাশ সুর্যসেন হল শাখা ছাত্রলীগের কার্যনিবাহী সদস্য। বাকি দু’জন ছাত্রলীগকর্মী।
রাবি রিপোর্টার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের শহীদ মিনারে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগের হামলা ও শিক্ষক লাঞ্চিতের প্রতিবাদে মানবন্ধন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। সোমবার বেলা ১১ টায় বিশ্ববদ্যিালয়ের রবীন্দ্রভবনের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ আন্দোলন করে তারা।
মানববন্ধনে সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হোসাইন মিঠুর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন একই বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রাশেদ রিন্টু, গোলাম মোস্তফা, চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফরিদ, মোল্লা মো: সাঈদ এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর আল আজাদ প্রমুখ।
এসময় বক্তারা বলেন, ছাত্রলীগের কি চরিত্র সেটা আমরা আমাদের পরিবার থেকে দেখে এসেছি। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাহমিদুল হকের উপর লাঞ্চনাকারী যে ছাত্রলীগকে দেখেছি, সেই ছাত্রলীগের সাথে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের কোন মিল নেই। ক্ষমতাসীনদের দেখা উচিত এই ছাত্রলীগের ভিত্তিটা কোথায়। একজন শিক্ষকদের উপর বর্বরোচিত, নির্লজ্জ এবং বেহায়ার মত যারা হাত তুলতে পারে আমাদের সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে এদের প্রকৃত চেহারা চরিত্র বের করে আনা।
বক্তব্যে তারা আরও বলেন, কেন তারা সরকারের ঘোষণা করার পরেও  সাহস পায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের হামলা করার। আমরা জানি শহীদ মিনার একটি পবিত্র জায়গা শিক্ষা, শান্তি ,প্রগতি ছাত্রলীগের এই মূলনীতিতে ছাত্রলীগ বিশ্বাস করে। প্রগতির বার্তা বাহক শহীদ মিনারে দাড়িয়ে শিক্ষকরা মানববন্ধন করে। সেই মানবন্ধনের উপরে কিভাবে তারা হামলা করতে পারে? তাহলে বুঝা যায় আমাদের স্বাধীনতার যে চেতনা তা কোথায় হারিয়ে গেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। যারা আমাদের শিক্ষকদের উপর হামলা চালিয়েছে এরা কোন সংগঠন থেকে উঠে আসা ছাত্রলীগ, এদের মুখোশ উন্মোচন করে সরকারের কাছে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য,এসময় মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যায়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ