ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আগামী দিনের জল নিয়ে কিছু ভাবনা

আখতার হামিদ খান : আমরা সকলেই জানি, পৃথিবীর তিনভাগ জল ও একভাগ স্থল। কিন্তু অনেকেরই জানা নেই যে, এই বিশাল জলম-লের মাত্র ২.৮ শতাংশ স্বাদু বা প্রাণিজগতের ব্যবহারযোগ্য। এর মধ্যেও ২.১৫ শতাংশ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফঅঞ্চলে সারা বছর ব্যবহারের নাগালের বাইরে সঞ্চিত হয় ও পুঞ্জীভূত থাকে। অর্থাৎ বাকী ০.৬৫ শতাংশের ওপর পৃথিবীর স্থলভাগে সন্নিবিষ্ট প্রাণিজগতের অস্তিত্ব নির্ভর করে।
“জলের আর এক নাম জীবন”- এই সংখ্যাটি যে কোনো প্রাণির প্রত্যক্ষ অস্তিত্বের সঙ্গে সমার্থক, কিন্তু শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের বেলা আর একটি বিস্তৃত পরোক্ষ দিক আছে। সুপ্রাচীন যুগের নদী-নির্ভর জনপদের কাল থেকে সভ্যতার তথাকথিত বিবর্তন ও বিকাশে এবং জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের তাগিদে জলের সার্বিক ব্যবহার ও প্রয়োগ বেড়েছে। শুধু প্রাণধারণের জন্য দৈনন্দিন গড় মাথাপিছু ৮/৯ লিটার জল যথেষ্ট। কিছু আনুষঙ্গিক গার্হস্থ্য ক্রিয়াকর্মের জন্য, আমাদের দেশেই গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু দৈনিক ৭০ লিটার থেকে শহরাঞ্চলে ১৮০ লিটার প্রয়োজন। উন্নত দেশে এই অঙ্ক তিনগুণ থেকে পাঁচগুণ, এর সঙ্গে যোগ করতে হবে আর এক চাহিদা, যার পরিসর বৃহত্তর আর্থনীতিক কর্মকাণ্ডে; অর্থাৎ কৃষিসেচ, শক্তি ও শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা ইত্যাদিতে। এর পরিমাণ গার্হস্থ্য চাহিদার চেয়ে ৮/৯ গুণ বেশী।
ইদানীংকালে জলের প্রাপ্তি ও লভ্যতা নিয়ে নানা চিন্তা ও সংশয়ের অবতারণা হয়েছে। আমরা জানি পৃথিবীর স্থলভাগের ভূমিসম্পদ, বনজসম্পদ, খনিজসম্পদ ইত্যাদির আহরণ ও ব্যবহারের ওপর আর্থনীতিক প্রগতি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। আবার এইসব সম্পদের ব্যবহার জলসম্পদের প্রত্যক্ষ প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীদের মতে ভূমিসম্পদ সীমিত, খনিজসম্পদ শুধু সীমিত নয়, ক্রমশ ক্ষীয়মাণ। বনজ ও উদ্ভিদসম্পদের কিছু সময়কালের আবর্তনে পুনর্নবীকরণ সম্ভব। জলসম্পদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, গড় হিসাবে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে, বাষ্পীভবন, বৃষ্টি ও তুষারপাতের ভিতর দিয়ে, একটা বার্ষিক জলচক্র কাজকরে। পৃথিবীতে বিভিন্ন আবহমন্ডলে বিভিন্ন সময়ে খরা বা বন্যার হেরফের হলেও, মোটা দাগের হিসাবে বার্ষিক জলসম্পদ ও পুনর্নবীকরণের চিত্র প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে এই জলচক্র বহু হাজার বছর ধরে চলছে। সুতরাং লভ্য জলের পরিমাপ একই থাকছে এবং জল কোনো সময়েই ফুরিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই।
তা হলে ভাবনা কি নিয়ে? এই শতাব্দীর শেষ দশকের দরজায় দাঁড়িয়ে উত্তরটা পরিষ্কার হয়ে আসছে। নির্দিষ্ট বার্ষিক জলভান্ডারের ওপর দাবিদারের সংখ্যা দ্রুত বেগে বেড়েছে ও বাড়ছে। একটা হিসাবে ধারণা করা যায় যে, আদিম ঐতিহাসিক যুগ থেকে আঠারো শতকের শিল্পবিপ্লবের শুরু পর্যন্ত পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো প্রায় ৯০ কোটি। ১৯০০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ১৫০ কোটিতে পৌঁছায়। ২০০০ সাল পর্যন্ত এটা বেড়ে দাঁড়াবে আনুমানিক ৫৬০ কোটি, যার মধ্যে ভারতেই থাকবে ১০০ কোটির কাছাকাছি। ২০২৫ সাল নাগাদ আনুমানিক জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৭৫০ কোটি। এর ১/৩ অংশ শুধু থাকবে এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ উপমহাদেশে ও চীন ভূখণ্ডে। এর মধ্যে ২০১০ সার নাগাদ ভারতবর্ষের লোকসংখ্যা চীনকেও অতিক্রম করবে। অসম জন্মহারের জন্য। এই সামগ্রিক জনসংখ্যার সঙ্গে তাল রেখে ঐকিক নিয়মে আর্থনীতিক ক্রিয়াকর্মের ন্যূনতম বিস্তার ও আনুষঙ্গিক জল ব্যবহারের মাত্রা বাড়তে বাধ্য। ছবিটা তাৎক্ষণিক ও আপাতদৃষ্টিতে ভয়াবহ।
কিন্তু সত্যিই কতটা ভয়াবহ তা নিয়ে কিছু আলোচনা ও তথ্য বিশ্লেষণের অবকাশ আছে। মেরু অঞ্চল বাদ দিলে, পৃথিবীর স্থলভাগে স্বাদু জলভান্ডারের দুটি সোজা ভাগ আছে। প্রথমত মাটির ওপর দৃশ্যমান স্থির ও প্রবাহিত জল যা নদী, ঝর্ণা, হ্রদ, জলাশয়, জলাধার ইত্যাদিতে সঞ্চিত। দ্বিতীয় ভাগ হল, দৃষ্টির অগোচরে মাটির নীচে জলবাহী পলিস্তর বা শিলাস্তরের সঞ্চিত ভূ-জল। শুনতে হয়তো আশ্চর্য লাগবে যে, কোনো এক মুহূর্তে ভূ-পৃষ্ঠে দৃষ্ট জলের ভান্ডার, পাতালের ভূ-জলভান্ডারের অনুপাতে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। তবে নদী বা জলাশয়ই থেকে জল আহরণ সহজতর এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকেস ভূ-জলভান্ডারের একটা নির্দিষ্ট ভগ্নাংশই আহরণ করা সম্ভব। ভূ-জলভান্ডারের একটা গুণ হল যে আবহাওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয় এর ওপর ৫/৬ বছর ধরেও প্রভাবিত করতে পারে না। ফলে এর উৎস অনেক নির্ভরযোগ্য হয়। অবশ্য প্রাথমিকভাবে সব জলেরই উৎস বার্ষিক জল-চক্রের আবর্তনে বৃষ্টি ও তুষারপাত। পৃথিবীর নানা দেশ ও অঞ্চলে জলভান্ডারের বিস্তার ও বিন্যাস ভৌগোলিক ও ভূ-প্রকৃতি এবং আবহম-লের তারতম্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। এই বৈচিত্র্য আমাদের দেশেও সহজেই চোখে পড়ে। ভারতে মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাত গড়ে ১০৫ সেমি। যার থেকে কম-বেশী ৪০০০ ঘন কিমি জল সৃষ্টি হয়। এর থেকে ২৪০০ ঘন কিমি জল বার্ষিক সম্পদ হিসাবে গণ্য করা হয়। কিন্তু নানা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কারণে, আবার মাত্র ১১-২৫ ঘন কিমি জলকে লভ্য বা ব্যবহার্য সম্পদ হিসাবে গণ্য করা হয়। যদিও কোনো কোনো মহলে আরও ৪০০ থেকে ৮০০ ঘন কিমি জলের যোগান বাড়ানো সম্ভব মনে করা হয়। যাই হোক, এই ভা-ারের থেকে এই শতাব্দীর শেষ ভাগে এ পর্যন্ত মাত্র ৪০০ ঘন-কিমিঃ জল বিভিন্ন উৎস থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে। একটা হিসাবে বলা হয় যে, পৃথিবীর স্থলভাগের ২.১১ শতাংশ এদেশে, জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ আমাদের মধ্যে এবং জলসম্পদের ৪.৯ শতাংশ এদেশে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক এলাকা ভারতের দ্বিগুণ। কিন্তু চাষযোগ্য জমির হার অনেক কম। পরিবেশের ভারসাম্য রাখার জন্য এদেশে বনোচ্ছেদ করে আর চাষেল জমি বাড়ানো সম্ভব নয়। অন্য দিকে, শহর ও শিল্প-জনপদের অবাধ বিস্তারে লব্ধ চাষজমির পরিমাণ কমছে। সঙ্গে সঙ্গে বসতি ঘনত্বও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ জনসম্পদ ভারতের চেয়ে কম, কিন্তু কম বসতি ঘনত্ব ও সুষম জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য, কৃষি ও শিল্প-বিকাশেল মান পৃথিবীতে প্রথম সারিতে। চীনের জনসংখ্যা বেশী হলেও সামগ্রিক বসতি ঘনত্ব কম। অথচ জলসম্পদ দ্বিগুণের বেশী হওয়ার ফলে প্রতি হেক্টর চাষ-জমিতে বেশী লোকের জীবিকা সংস্থান হতে পারে।
এই আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের আর্থনীতিক ও পরিবেশগত কাঠামোর মধ্যে একটা বৈষম্য মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই সূত্রে আমাদের জলসম্পদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিছু উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকতে পারে। কিন্তু এ বিষয়টা আর একটু তলিয়ে দেখা যেতে পারে। ভূমি ও জলসম্পদ ব্যবহারের পারস্পরিক আর্থনীতিক সম্পর্কটাই ধরা যাক, আমাদের অর্থনীতি মূলত গ্রাম-মুখিন ও কৃষিনির্ভর। খাদ্যশস্য, অন্যান্য দানাশস্য ও বাণিজ্যিক ফসলের নিরাপত্তার জন্য কৃষিসেচে জলের ব্যবহার সমস্ত সম্পদের ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ ৪০০ ঘন কিমি ব্যবহৃত জলভান্ডারের মধ্যে ৩৫০ ঘন কিমি কৃষিক্ষেত্রে এবং বাকিটা শক্তি ও শিল্প উৎপাদনে, পরিবহন ব্যবস্থা, জনপদ ও গার্হস্থ্য জল সরবরাহে যায়। এর মধ্যে পানীয় জল সরবরাহ ১ থেকে ২  শতাংশের বেশী নয়। মনে রাখতে হবে আমাদের সার্বিক সম্পদের আরও ৭০০ ঘন কিমির বেশী এখনও অব্যবহৃত। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৫৯০ ঘন কিমি জলভান্ডারের ৪০ শতাংশ কৃষিকাজে, ৩১ শতাংশ শক্তি উৎপাদনে, ২১ শতাংশ শিল্পে ও ৮ শতাংশ জনপদ ও গার্হস্থ্য সরবরাহে যায়। জল ব্যবহারে বৈজ্ঞানিক ফসল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ফলে ২০ শতাংশ কৃষিসেচের জল পুনর্ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ ও শিল্প ক্ষেত্রে এই পুনর্ব্যবহারের হার যথাক্রমে ৯৯ ও ৮০ শতাংশ এবং গার্হস্থ্য বা জনপদ সরবরাহে ৬৫ শতাংশ। সে তুলনায় আমাদের কৃষি-জলের পুনর্ব্যবহার মাত্র ৭ শতাংশ এবং গার্হস্থ্য সরবরাহে ৩০ শতাংশ। এই তুলনামূলক পরিসংখ্যান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থনীতিক বিকাশের মডেলকে আপাতত সম্ভাবনীয় না মেনে নিয়েও; প্রাপ্য লভ্য জলসম্পদকে একটা সুচারু বৈজ্ঞানিক পরিচালন ব্যবস্থার আওতায় আনলে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একটা সুসহ মাত্রায় রাখলে জল নিয়ে আমাদের আপাত দুর্ভাবনার দায় থাকবে না। এই প্রসঙ্গেই আমাদের জলসম্পদ ব্যবহারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে কিছু আলোচনা করে উপসংহারে পৌঁছাতে পারি।
আমাদের চাষযোগ্য প্রায় ১৫ কোটি হেক্টর জমির মধ্যে ১১ কোটি হেক্টরে সেচ যোগানো সম্ভব। যার মধ্যে এ পর্যন্ত অর্ধেক জমিতে বড় বড় বাঁধ ও জলাধার তৈরি করে অথবা ছোটোখাটো প্রকল্পে জলাশয় তৈরি করে এবং একটা বড় অংশে ভূ-জলের সরবরাহ দিয়ে সেচ ও অন্যান্য কাজ করা হচ্ছে। দুঃখের বিষয় যে গত ছ’টি পাঁচ-সালা পরিকল্পনায় যে সেচ-সম্ভাবনা সৃষ্টি করা হয়েছিলো বড়ো বাঁধ দিয়ে তার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এখনও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। অথচ এ পর্যন্ত ভূমি সংরক্ষণে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় ভূমিক্ষয় ও বন্যার প্রকোপ ক্রমশ বেড়েছে। ফলে প্রতি বছর সৃষ্ট বর্ষার জলের একটা বড় অংশ অপচয় হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভূ-জলভান্ডারের মাত্র ২৩ শতাংশ বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। পানীয় জলের সরবরাহে এর ব্যবহার সর্বত্র সম্ভব। জলবাহী শিলাস্তরের বিন্যাস সর্বত্র সম্ভব। জলবাহী শিলাস্তরের বিন্যাস অনুযায়ী বিভিন্ন গভীরতায় কুয়ো বা টিউবয়েল বসালেই জলপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত। অন্তত আমাদের দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই। অনেকের ধারণা যে প্রচন্ড খরায় ভূ-জলভান্ডারও নিঃশেষিত হয়। কিন্তু এটা ভুল। জলাভাবের কারণ, ভূ-জলের উৎস হিসাবে অবৈজ্ঞানিক স্থান-নির্বাচন ও কুয়ো বা টিউবওয়েল তৈরিতে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ভূবিজ্ঞানীদের সার্থক পরামর্শে বৈজ্ঞানিক প্রথায় কুয়ো বা টিউবওয়েল বসালে সারা বছরই এবং বছরের পর বছর জল পাওয়া সম্ভব। তবে শিলাস্তরের ক্ষমতা অনুযায়ী জলের চাহিদা সীমায়িত রাখতে হবে। পানীয় জলের ব্যাপারে কোনো সমস্যাই থাকার কথা নয়। কৃষিসেচ সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ দরকার। আশার কথা, আমাদের পরিকল্পনাবিদেরা এ ব্যাপারে অধুনা সজাগ হয়েছেন এবং ভারত সরকার একটি মেয়াদভিত্তিক প্রকল্প চালু করেছেন। প্রাথমিক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, আমাদের জলসম্পদের আপাত কোনো অভাব নেই। আমাদের সমস্যা আহরণের ও ব্যবহারের কতকগুলি প্রযুক্তিগত দিক। যেমন ভূ-জল আহরণে শক্তি সরবরাহের ব্যাপার, ভূ-জলের ব্যবহারে ফসল নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো সীমিত এলাকার মধ্যে কেন্দ্রীভূত চাহিদার ফলে অনিয়ন্ত্রিত জল উত্তোলন ও ফলস্বরূপ জলের খবাবষ এর অবনমন। এসব সমস্যা গৌণ এবং সহজেই সমাধান করা যাবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও পদ্ধতির সাহায্যে। এই আলোচনার উপসংহার টেনে বলা যায়, যে আমাদের দেশে, বিশেষ করে সিন্ধু-গাঙ্গেয় পলি অববাহিকা এবং সমুদ্র কূলবর্তী ও ব-দ্বীপ অঞ্চলে এখনও বিস্তীর্ণ ভূ-জলভান্ডার আছে যা সম্যক ব্যবহারের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া কর্কটক্রান্তির দক্ষিণে উপমহাদেশের বড় মালভূমি অংশেও অন্তত পানীয় জলের জন্য ভূ-জলভান্ডারের কোনো অভাব নেই। সুতরাং আপাতত দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই।
তবু শেষ করার আগে আগামী একশো বছর বাদে এই দেশেল জলসম্পদে রূপরেখা নিয়ে একটা বক্তব্য রাখা যেতে পারে। জনসংখ্যা একটা বিশেষ হারে বাড়বেই। প্রতি ৩৫ থেকে ৪০ বছরে দ্বিগুণ হলে, সম্ভাব্য জনসংখ্যা তিন শো কোটির কাছাকাছি হবে। তখনও মনে রাখতে হবে যে সম্ভাব্য ২৪০০ ঘন কিমি জলসম্পদের অর্ধেকের বেশী সংরক্ষণের ব্যবস্থার অভাবে আজ ব্যবহার করতে পারছি না। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেও, এদেশের ৭৫০-১৫০০ মিমি বৃষ্টিপাত অঞ্চলে মোট ৯০ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১০ মিটার গভীর ১০০০০ বর্গমিটার আয়তনের ছোটো ছোটো জলাশয় তৈরি করলে বছরে আরও ৮০০ থেকে ৯০০ ঘন কিমি জল সংরক্ষণ সম্ভব। এর জন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তির দরকা নেই। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সামাজিক ও আর্থনীতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহমর্মিতা। এই প্রাসঙ্গিক আলোচনার সূত্রে আমরাআধুনিক কালের অনিবার্য সমস্যা পরিবেশ প্রদূষণ সম্বন্ধে কিছু মন্তব্য রাখতে পারি। শিল্পায়ন ও নগর জনপদ বিস্তারের পাশাপাশি আমরা অনেক ভূপৃষ্ঠের জলভা-ার ও অগভীর স্তরে ভূ-জলভান্ডার দূষিত করছি। আমাদের সমষ্টি চৈতন্যে বিধৃত হওয়া দরকার যে, প্রতি লিটার দূষিত জলের অর্থ, ব্যবহার্য সম্পদের অপচয়। এক লিটার জলের দূষণ রোধ করার অর্থ হচ্ছে এক লিটার জলের সম্পদ বৃদ্ধি। উন্নত দেশে এই চিন্তাধারা কাজ করছে। আশা করা যায়, আমাদের কৃষি, শিল্প, জনপদ বিস্তার, ইত্যাদি অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সামাজিক শুভবুদ্ধি কাজ করবে।
মানুষ আশাবাদী ও প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানের দিগন্ত প্রসারে ব্যস্ত। এক ‘শ বছর আগে চাঁদে মানুষের পদচারণা অকল্পনীয় ছিল। আজ তা সম্ভব। মানুষের সম্ভাব্য জলসমস্যার নিরিখে গত কয়ক দশক ধরে সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে রাসায়নিক পন্থায় স্বাদু জল তৈরির চেষ্টা চলছে। মধ্যপ্রাচ্য ও অন্য ২/১ টি উন্নত দেশে কয়েকটি ছোটো মাপের কারখানা পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। কিন্তু এই কাজ অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং খরচের বেশি অংশ যায় শক্তি সরবরাহে। আমাদের দেশেও ইদানীং গবেষণা চলেছে। গবেষণা পর্যায়ে প্রতি লিটার ১০/১২ পয়সা মূল্যে পাওয়া সম্ভব মনে হচ্ছে, যদিও দু’দশক আগে এই খরচ ৩০/৩৫ পয়সা পড়ত। কিন্তু এদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি লিটার এক পয়সা মূল্য খুবই বেশী। প্রয়োজনীয় শক্তি যোগানের প্রশ্নও আছে। তবে মানুষের নিত্য উদ্ভাবন শক্তির ওপর শ্রদ্ধা ও আস্থা রেখে এটা আশা করা কি অন্যায় হবে যে, আগামী এক শো বছরের মধ্যে অফুরন্ত সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অফুরন্ত সমুদ্রজলকে রূপান্তরিত করা সাধ্যায়ত্ত মূল্যে সম্ভব হবে? তাহলে জলসমস্যা চিরকালের মতোই সমাধান হয়ে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ