ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান : [পাঁচ]
অন্যদিকে গোয়েন্দাদের হাতে রাজধানী ঢাকায় ১০২ জন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী তালিকা আছে। তারা রাজধানীকে মাদকের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে সরাসরি মাদক চলে আসে ঢাকায় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। এরপর তারা ঢাকার অলি-গলি থেকে শুরু করে সারাদেশে মাদক পাচার করে। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ২৬ মে ২০১৮)
এক সময় ইয়াবা ব্যাংকক থেকে আসত পর্যটকদের মাধ্যমে। এখন মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসে উৎপাদিত হয়ে, সেখানে গড়ে উঠেছে ইয়াবা কারখানা। টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে চালান হয়। ডিলাররা মাঝে মধ্যে ইয়াবা নিয়ে ধরা পড়লেও আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণকারী মাফিয়ারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের হাত কত লম্বা? তারা কারা এ প্রশ্ন সর্বত্র আলোচিত।
সর্বনাশা নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা দেশজুড়ে তার ভয়ংকর থাবা বিস্তার করে চলেছে। কেউ জেনে, আবার কেউ না জেনেই বিপন্ন করছেন নিজের জীবন। দেশে এমন কোন পেশা নেই যেখানে ইয়াবা আসক্ত নেই। বিশেষ করে তরুণ সমাজ বেশি আসক্ত। ছাত্র সংগঠনগুলোতে তো অভাব নেই ইয়াবাসেবীর। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের গ্রামে গ্রামে ইয়াবা ব্যবহার ও বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে। এমন কি পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিকরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশার বাণিজ্যে। ফলে হেরোইন, ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকের ব্যবহার কমে গেলেও ইয়াবাসেবীর সংখ্যা দেশে ক্রমেই বাড়ছে।
সর্বনাশা ইয়াবা শুধু মিয়ানমার থেকেই আসছে এমন নয়, এখন দেশেও তৈরি হচ্ছে গোপনে। কিছু ওষুধ থেকে কৌশলে একটি বিশেষ রাসায়নিক উপাদান বের করে নিজেরা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে বানিয়ে ফেলছে ইয়াবা। সারা দেশে এরই মধ্যে পাওয়া গেছে বেশ কয়েকটি ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান। ধরা পড়া ইয়াবা কারিগররা অবৈধ এ কারবারে জড়িয়ে পড়ার কারণ জানাতে গিয়ে পুলিশকে বলেছে, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল জোগাড় করে দেশে ইয়াবা তৈরিতেই বেশি লাভ। মাত্র দুই হাজার টাকার কাঁচামালে দুই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা আয় করা যায়। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় ইয়াবা কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং ওই সব কারখানা থেকে আটক ব্যক্তিরা ১৬১ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে পুলিশকে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছে। (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ৩১ মে ২০১৮)
ইয়াবা তৈরিতে সুডোফেড্রিন নামের রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োজন হয়। দেশে একসময় ইয়াবার মূল উপাদান আমদানি করা হতো। রাসায়নিক দ্রব্যটি দিয়ে ইয়াবা তৈরি হচ্ছে জানার পর উপাদানটির আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। মূলত ২০১৭ সালে বেশ কয়েকটি কারখানা আবিষ্কারের পর সরকার এই রাসায়নিক দ্রব্যটির আমদানি নিষিদ্ধ করে। তবে বিশেষ পদ্ধতিতে এই রাসায়নিক সংগ্রহ করে ইয়াবা তৈরি অব্যাহত রেখেছে কারবারিরা। ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধে সুডোফেড্রিন রয়েছে। সেসব ওষুধ থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে সুডোফেড্রিন বের করে তার সঙ্গে ফসফরাস যোগ করে বিক্রিয়া ঘটিয়ে মিথাইল এমফিটামিন বানানো হয়। এই এমফিটামিনের সঙ্গে রং ও অন্যান্য রাসায়নিক মিলিয়ে ইয়াবা তৈরি করা হয়। মিয়ানমারসহ অনেক দেশে ইয়াবাকে বলা হয় মেথাফিটামিন।
মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পিস ইয়াবা ঢুকে-এটা সংবাদ মাধ্যমসহ ওই এলাকার সকলেই জানেন। কিন্তু ওই পথে ইয়াবা আসা বন্ধ হয়নি কেন? এখন বিমানবন্দর দিয়েও মাদক আসছে। স্থলপথ-আকাশপথ সব পথ দিয়ে যদি মাদক দেশে প্রবেশ করতে পারে তাহলে আমাদের সুরক্ষিত রয়েছে কোন পথ?
মাদক চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে টেকনাফ কক্সবাজার চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলটি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকলেও কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না মাদক চোরাচালান। মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন হিমশিম খাচ্ছে তেমনি দারুণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের সচেতন মহল।
কক্সবাজার জেলার র্সবত্র চলছে এখন ইয়াবার ছড়াছড়ি। টেকনাফ সীমান্ত এলাকা যেন এখন ইয়াবার কারখানায় পরিণত হয়েছে! হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক। পানের দোকান থেকে শুরু করে সবখানে ইয়াবা নামক মরণ মাদকটি পাওয়া যায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির পরও কীভাবে বানের পানির মতো দেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে ইয়াবার বড় বড় চালানগুলো মাদকের গডফাদার নামক দেশদ্রোহীরা তা ভাবিয়ে তুলেছে দেশের সচেতন মহলকে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকলেও একের পর এক মালিকবিহীন ইয়াবা আটক নিয়ে সাধারণের মাঝে যেমন কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। তেমনি আইনশৃঙ্খলা বহিনীর ব্যাপারে মানুষের দেখা দিয়েছে আস্থায় সংকট। প্রতিদিন সীমান্তে বা সড়কে কোথাও না কোথাও ছোট বড় ইয়াবার চালান আইনশৃংখলাবাহিনী আটক করতে সক্ষম হলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে মূল পাচারকারী ও রাঘব-বোয়াল গড ফাদাররা।
আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার হাতে প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে ইয়াবা। এতে আর্থিক ক্ষতি পোহাতে হচ্ছে পাচারকারী থেকে শুরু করে পাইকারী ও খুচরো বিক্রেতা সকলকে। ক্ষতি পূরণে নগরীতে গড়ে উঠছে ছোট ছোট ইয়াবার কারখানা।
সীমান্ত নিরাপত্তায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) পক্ষ থেকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী (বিজিপি) সদস্যদের নিকট বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সভায় সীমান্তের মাদক পাচার ও মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে স্থাপিত ৩৭টি ইয়াবা তৈরির কারখানা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। প্রতিটি সভায় মিয়ানমারের পক্ষ থেকে মাদক পাচার প্রতিরোধে ও ইয়াবা তৈরির কারখানা বন্ধের ব্যাপারে বিজিবিকে আশ্বস্ত করা হলেও কার্যত এ ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
২০১৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কতৃক সারাদেশে ৭৬৮ জন ইয়াবা পাচারকারীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে তালিকাভুক্ত উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফের অধিকাংশ পাচারকারীর নাম রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে প্রতিটি থানা ও বিজিবিসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নিকট আলাদা তালিকা রয়েছে।
টেকনাফে তথা কক্সবাজার জেলার মাদক ইয়াবা ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে এসেছে যে, কলেজছাত্র থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা পর্যন্ত কেউই এর ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মাদক এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমার সীমান্তে রিংরোড এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ৮ জুন ২০১৪ দশম জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদকে এ তথ্য জানান তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
তিনি বলেন, সীমান্তে অপরাধ দমন তথা মাদক চোরাচালান প্রতিরোধকল্পে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্থল সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং তৎসংলগ্ন রিংরোড রয়েছে। এই রিংরোড দিয়ে গাড়িতে টহলের মাধ্যমে গোটা সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আসাদুজ্জামান বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত রিংরোড এবং কাঁটাতারের বেড়ার মাধ্যমে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করলেও বাংলাদেশ সীমান্তে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই সরকার মিয়ানমার সীমান্তে ২৮৫ কিলোমিটার রিংরোড ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েকটি ধাপে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হবে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী বিজিবির সার্বক্ষণিক টহল কার্যক্রম পরিচালনা করে, নিশ্চিদ্র তল্লাশি ও নজরদারি বাড়িয়ে মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। (সূত্র : দৈনিক আমার দেশ ৯ জুন ২০১৪)
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের তুম্রু যোগাইন্যা এলাকা থেকে থানচি পর্যন্ত ২৭১ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭২ কিলোমিটার গহীন পাহাড়ি অঞ্চলই অরক্ষিত এলাকা। এই অরক্ষিত এলাকায় ইয়াবাসহ মাদক ও অন্যান্য চোরাচালানিদের শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তারাই ওই এলাকা দিয়ে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক নিয়ে আসছে। গত পাঁচ বছর ধরে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৪০ গডফাদার। এদের মধ্যে রয়েছেন একাধিক জনপ্রতিনিধিও। শুধু টেকনাফে রয়েছে ২০টি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। কক্সবাজারে রয়েছে ২১ শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী। এছাড়া ভারত থেকে ফেন্সিডিল চোরাচালানের সাথে জড়িত রয়েছে শতাধিক গডফাদার। সরকার পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদাররাও দল পাল্টায়। ফলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে ওই গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয় না।
মাদক চোরাকারবারিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থাকা অস্বভাবিক নয়। হয়তো আগেও ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বিদেশী নাগরিকদের মাদক পাচারে-সরবরাহে জড়িত থাকা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা কোনোভাবেই হাল্কা করে দেখার উপায় নেই। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ উত্তরার ১০ একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে দুই কেজি ৭শ’ গ্রাম হেরোইনসহ ছয় নাইজেরিয়ান নাগরিককে আটক করে র‌্যাব। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ বিমানবন্দর থেকে ১০ কেজি হেরোইনসহ হারুন ও আলন বক্স নামে দুই পাকিন্তানি নাগরিককে আটক করা হয়।
বিদেশী এসব নাগরিকের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে। এরা মাদক পাচারের জন্য নিরাপদ উপায় হিসেবে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করছে। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো এরা মাদকসহ আটক হলেও দেশে অধিকাংশই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার একই কাজে তৎপর রয়েছে। জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ