ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৬ মাসে ৫৯২ ধর্ষণ, ২ হাজার ৬৩ নারী নির্যাতনের শিকার

* সংরক্ষিত নারী আসন ২৫ বছর বহাল রাখার প্রতিবাদ
স্টাফ রিপোর্টার : গত ৬ মাসে সারাদেশে ৫৯২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে মোট ২ হাজার ৬৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। দেশের ১৪টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তারা এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি-জুন এই ৬ মাসে মোট ২ হাজার ৬৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৫৯২টি। এরমধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৮ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৬১ জনকে। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন ২৩ জন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৫ জন। এসিডদগ্ধ হয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে এসিডদগ্ধের কারণে মৃত্যু ২ জনের।
এতে বলা হয়, অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, এরমধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৭৭টি। নারী ও শিশু পাচার করা হয়েছে ১৩ জনকে। এরমধ্যে বিক্রি করা হয়েছে চার জনকে। এতে বলা হয়, বিভিন্ন কারণে ২৬৮ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আরও ২৭ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৩ জন গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতন করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন দুইজন। যৌতুকের জন্য হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১৩ জন। এরমধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে। উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ৯০ জনকে। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১১ জন। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ১৫৪ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন; আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ০৯ জন ও আত্মহত্যায় প্ররোচণা দেয়া হয়েছে ১৫ জনকে। ১৮৮ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ৮৪ জন। ৬৬ জনের সঙ্গে বাল্যবিয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ১৭১ জনকে। বে-আইনি ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে সাতটি। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে তিনজন। ২০ জনের জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ৬৮টি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে।
এদিকে নারী আসন নিয়ে রাজনৈতিক দল ছলাকলা করছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী বিলে নির্বাচনের বিধান না রেখে সংরক্ষিত নারী আসন ২৫ বছর বহাল রাখার প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটি বলছে, সংসদে নারী আসন নিয়ে রাজনৈতিক দল ছলাকলা করছে। তারা এ বিলের সংশোধনীর দাবি জানিয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর সুফিয়া কামাল ভবনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলন করে তারা এসব কথা বলে।
সাংবাদিক সম্মেলন আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, লক্ষি চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, সহ-সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ, অর্থ সম্পাদক দিল আফরোজ বেগম, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক বুলা ওসমান, স্বাস্থ্য সম্পাদক নূরুল ওয়ারা বেগম প্রমুখ।
মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে আছে এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনের মাধ্যমে নারীরা সংসদ সদস্য হবেন। কিন্তু সেই অঙ্গীকার না রেখে একধরনের প্রতারণা করা হয়েছে। সংসদে নারী আসন নিয়ে রাজনৈতিক দল ছলাকলা শুরু করেছে। এভাবে চললে পরবর্তী প্রজন্মের নারী সমাজ আমাদের ধিক্কার দেবে। সংশোধনের পথ এখনো খোলা আছে।’
আয়শা খানম আরও বলেন, স্বাধীনতার পর কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তাঁরা নারীর রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলেন। নারীদের সম-অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। সংসদে নারী আসন আরও ২৫ বছর রাখা হলে তাঁদের একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বানিয়ে অধস্তন করে রাখা হবে। সংরক্ষিত আসনের অনেক নারী সাংসদই তাঁদের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন উল্লেখ করে আয়শা খানম বলেন, এসব আসনের নারীদের কোনো নির্বাচনী এলাকা নেই। কোথাও কাজ করতে গেলে সম্মান পান না। ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী করে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর করা হয়েছে। যেখানে আসনসংখ্যা ৫০ ও সদস্যরা মনোনীত হয়ে আসবেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেখা চৌধুরী। সেখানে বলা হয়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা এবং সরাসরি নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালে নারী দিবসের অনুষ্ঠানে একই কথা বলেছিলেন। এ ছাড়া জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতেও তাই বলা আছে। কিন্তু প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করার পরে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করে, এই বিল পাস হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া আরও দুর্বল হবে। রাজনৈতিক শক্তির কাছে নারীরা একটি নির্ভরশীল গোষ্ঠী হিসেবে দাঁড়াবে; যা নারীর জন্য অসম্মানজনক। এ বিল সরকারের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য, গৃহীত নীতি, জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও সনদ ও এসডিজির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আগামী কয়েক মেয়াদের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচন, আসনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি ও নির্বাচনী এলাকা পুনর্র্নিধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারীকে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের রাখা হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীদের জন্য রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার অবস্থা তৈরি হয়নি। এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ১০-১৫, ১৫-৫০ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা আশ্বাস পেয়েছি, প্রতিশ্রুতি পেয়েছি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। মহাজোটের লিখিত ইশতেহারে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু তার কোনো বাস্তব প্রয়োগ আমরা দেখিনি। তাদের ঘোষিত লিখিত বিষয়ের সঙ্গে তারা একটি সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নিলেন।
বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়, নারীর রাজনৈতিক আন্দোলন একদিনের কাজ নয়। একদিনে নারীর ভোটের অধিকার, নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেদিক থেকে নারীর রাজনৈতিক অধিকার যতক্ষণ প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। নারীর এই রাজনৈতিক ক্ষতায়নের জন্য শুধু সরকারি দল নয়, অন্যসব রাজনৈতিক দলকেও সক্রিয় থাকতে হবে। বাংলাদেশে যে নারী ক্ষমতায়ন হয়েছে তা শুধু সরকারের একক প্রচেষ্টায় হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ