ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বুলবুলের ভরসা সাধারণ ভোটার লিটনের সরকারি ‘শক্তিমত্তা’

রাজশাহী : গতকাল সোমবার রাসিক মেয়র নির্বাচনে (বামে) বিএনপি’র বুলবুলের ও (ডানে) আ’লীগের লিটনের জনসংযোগ -সংগ্রাম

রাজশাহী অফিস : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়া লীগ দলীয় প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন দলের পাশাপাশি সরকারি ‘শক্তিমত্তা’ কাজে লাগানো সুযোগ পাবেন। অপরদিকে বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের ভরসা কেবলই দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্য এবং সাধারণ ভোটার। এমনটাই অভিমত এই নির্বাচনের পর্যবেক্ষক মহলের।
এখানকার বিশ্লেষকদের মতে, ইতোঃপূর্বে অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচন থেকে দুই মূল প্রতিপক্ষ দুই রকম অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাচ্ছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ চাচ্ছে যে কায়দা ও কৌশল ব্যবহার করে এই দু’টি নির্বাচনে বিজয় অর্জিত হয়েছে সেগুলো রাজশাহীতেও প্রয়োগ করা যায় কি-না। অন্যদিকে, বিএনপি এসব অপকৌশলের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথা ভাবছে।
খুলনা-গাজীপুরের অভিজ্ঞতা : কী ছিলো সেই কৌশল? বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার রিপোর্টে এসব বিষয় ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং তা দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছে। এই নির্বাচনে সরকারি মহলের অন্যতম কৌশল ছিলো, বিএনপি নেতাকর্মীদের কেন্দ্রমুখী হতে না দেয়া। এতে ভোটার উপস্থিতি যথাসম্ভব কম রাখা হয় এবং পুরো সিটিতে অনিয়ম না করে সুনির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্র বেছে নেয়া হয়। বিএনপির ভোট ব্যাংককে টার্গেট করা হয়। যেসব কেন্দ্রে বিএনপির ভোট অনেক বেশি সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অন্য কাউকে দাঁড়াতে দেয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকদের পুলিশ দিয়ে মাঠছাড়া করা হয়। এর প্রতিকারে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কিছুই করেনি। ইসি নিষ্ক্রিয় থাকায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হতে হয়। ভোটের দিন দল বেঁধে বুথে ঢুকে ব্যালটে সিল মারা হয় এবং জাল ভোট দেয়া হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রে সরকারি দলের কর্মীরা ঢুকে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে। স্বল্প সময়ে এভাবে কিছু ভোট দিয়ে তারা সটকে পড়ে এবং সুযোগ বুঝে আবার ফিরে আসে। তারা ফিরে যাওয়ার পরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয়। ততক্ষণে সাধারণ ভোটার আতঙ্কিত হয়ে কেন্দ্র ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। সরকারদলীয় প্রার্থীর প্রতিপক্ষের এজেন্টদেরকে বুথ থেকে বের করে দেয়া হয়। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনের আগের রাতে এজেন্টদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে আসায় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ে। প্রায় সব কেন্দ্রের সামনে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জটলা করে তাঁরা কার্যত কেন্দ্রের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণ করে। ভোটার বা পর্যবেক্ষক যে-ই আসুন, তাঁরা নজরদারি করেন। অনেক কেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্টরা সেখানে প্রথম বাধা পান। অনেকে শারীরিকভাবে আঘাত বা অপমান-অপদস্থ হয়ে সেখান থেকে ফিরে যান। গণমাধ্যমের কর্মীরা কেন্দ্রে পৌঁছার আগেই, অর্থাৎ সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর কিছু সময় আগেই এক দফা এ ঘটনাগুলো ঘটে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা ধানের শীষের ব্যাজ পরে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্ট সেজে নৌকার ভোট পাহারা দেয়ার মহড়াও চলে। কোন কোন কেন্দ্রে ভোটারদের প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারতে বাধ্য করা হয়। বাবার সঙ্গে শিশুর ভোট দেয়ার মতো অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটে। সবচেয়ে কমন ডায়ালগ ছিলো, ‘আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে, বাড়ি চলে যান।’ অনেকে ভোট দিতে এসে হতাশ হয়ে কেন্দ্র থেকে ফেরত যান। সিল মারা ব্যালট বিভিন্ন কেন্দ্রে পড়ে থাকতেও দেখা যায়। যা পরে সংবাদকর্মীরা ক্যামেরায় ধারণ করেন। কেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ লাইন, অথচ ভেতরে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। দুপুরের আগেই ব্যালট শেষ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। জাল ভোটের রীতিমতো উৎসব চলে। কেউ বাধা দেয়া দূরে থাক- আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহায়ক ভূমিকায় থাকার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এক ধরণের ভীতিকর পরিস্থিতিতে নির্বাচন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাদের সামনে ভয় ছিলো দুর্বৃত্তদের গুন্ডামি এবং অন্যদিকে চাকরি রক্ষা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুমকি। কোন কোন কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের ব্যাজ পরিহিত ভোটার ছাড়া অন্য কোনো ভোটারকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। গায়ে নৌকা প্রতীকের ব্যাজ লাগানো থাকলে তাদের জন্য সর্বত্র অবাধ চলাচলের সুযোগ রাখা হয়। কোথাও কোথাও প্রিজাইডিং কর্মকর্তা পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও ব্যর্থ হন। ভোটকেন্দ্রগুলো কার্যত নৌকার কর্মীদের টহল এবং নিয়ন্ত্রণে ছিল। দলবেঁধে ঢুকে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে ভোট কাটার ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে কোনো দাঙ্গা হাঙামা না বাঁধিয়ে সুকৌশলে কাজ সম্পন্ন করা হয়।
বিএনপি’র অভিযোগ : রাজশাহী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি অভিযোগ তুলেছে, বিএনপি নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়, বাড়ি বাড়ি অভিযান এবং নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে ও বিস্ফোরক আইনে নতুন মামলা দেয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নতুন তিনটি মামলা দেয়া হয়েছে। এসব সাজানো মামলায় নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে। আবার অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে, যাতে যে কাউকে ধরে এসব মামলায় কারাগারে পাঠানো যায়। এসব ঘটনা খুলনা নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে মনে করছে বিএনপি। মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, সরকার খুলনা ও গাজীপুরের মতো নির্বাচনী এজেন্টদের তাড়িয়ে দেয়া বা ভোটের আগেই এলাকাছাড়া করার পাঁয়তারা করছে। সে জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁর প্রত্যেক নির্বাচনী এজেন্টের নাম-পরিচয় ও ছবি স্থানীয় পত্রিকায় ছেপে দেবেন। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সেই তালিকা দেবেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। যেভাবে ভীতিকর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে, তা খুলনা স্টাইলের নির্বাচনের পূর্বাভাস বলে মনে হচ্ছে। বিএনপি’র মতে, এখানকার প্রার্থীও খুলনা-গাজীপুর মডেলের উপর ভরসা করে আছেন। আর বিএনপি ভরসা করছে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্য এবং সাধারণ মানুষের ভালোবাসার উপর। তাদেরকে একসঙ্গে দলীয় সন্ত্রাস, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব এবং আইন-প্রয়োগকারিদের এ্যাকশনের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। 
আওয়ামী লীগের ভাষ্য : অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন বিএনপি প্রার্থীর এ আশঙ্কাকে অমূলক এবং মিথ্যাচার ও অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, এখানে ভয় দেখানোর দরকার নেই। এমনিতে বিএনপির এজেন্ট-সংকট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রবল। তাই এজেন্ট হতে কেউ রাজি না-ও হতে পারে। রাজশাহী মহানগরীতে তার মেয়র থাকাকালে যে উন্নয়ন হয়েছে তা মানুষ মনে রেখেছে। আগামীতে এই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে জনগণ তাকে আবারো নির্বাচিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আর মামলার বিষয়ে পুলিশের দাবি, পুলিশের নিয়মিত মাদকবিরোধী ও নাশকতাবিরোধী অভিযানে কেউ আটক হতে পারে। এর মধ্যে রাজনৈতিক কারণে কোনো আটক বা অভিযান নেই। উল্লেখ্য, আওযামী লীগ প্রার্থী লিটন এরই মধ্যে তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন এবং এতে তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষিত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ