ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত নয়

মাতৃত্ব নারীর, কিন্তু মাতৃত্বের ফসল সমাজের। সামাজিক উৎসগুলোই মাতৃত্বের সমস্যাকে জটিল করে তোলে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি পদে পদে তার সর্বগ্রাস ছায়া পড়ে নারীর ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে যৌন জীবন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জীবন-এমনকি মাতৃত্বের মধ্যেও। সমাজব্যবস্থা মূলত মাতৃত্বের ফসলের উপর অধিকার আরোপ করে; মাতৃত্ব প্রক্রিয়ার প্রতি কোনও প্রকার সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে না। নারীকে কেবল উৎপাদন যন্ত্রের পার্টস হিসেবেই ভাবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রয়োজনে উৎপাদন যন্ত্রের পার্টস পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করে না। যে কারণে পুরুষের পক্ষে একাধিক বিয়ে এমনকি একই সময়ে একাধিক নারীর মাতৃত্ব সমস্যাগুলোকে দুটো দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার অবকাশ রয়েছে-
১. সামাজিক দৃষ্টিকোণ এবং
২. চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ মাতৃত্বের প্রশ্নকে কেবল শারীরিক সমস্যাকে কেন্দ্র করেই ব্যাখ্যা করা হয় এবং সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা সকল সমস্যার উৎসের সন্ধান ও তার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তাই নিরাপদ মাতৃত্বের প্রশ্নে সকল সামাজিক ইস্যুর মধ্যে সমস্যাগুলোর লুকানো থাকে- যা কোনভাবেই এড়ানো যায় না। সামাজিক ইস্যুগুলোর মধ্যে আছে-
-  নারীর বেড়ে ওঠার পেছনে সামাজিকীরণ প্রক্রিয়া
-  সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ
-  দৈনন্দিন খাদ্যভাসে নারীর প্রাপ্যতা
-  সামাজিক কুসংস্কার ও ঐতিহ্যগত প্রথা
-  বৈষম্যমূলক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রথা
-  লিঙ্গীয় শ্রম বিভাজন
-  বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা
-  পুরুষতান্ত্রিক শ্রম বাজারে নারীর অনুপ্রবেশ
-  বৈষম্যমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং
-  বংশ মর্যাদা/ উত্তরাধিকারী গণনায় নারীর অনুপস্থিতি
নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব প্রশ্নে সামাজিকীকরণ প্রসঙ্গটি অবান্তর মনে হতে পারে, কিন্তু সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া মানব জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলে অবিরত। তাছাড়া মাতৃত্ব হঠাৎ আবির্ভূত হওয়ার বিষয় নয়, তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি দীর্ঘ আয়োজন এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াও নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব পদ্ধতি সচেতন প্রভাব বিস্তার করে। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য চাই নারীর সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা। আরও সহজভাবে বলতে গেলে মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতাই হলো স্বাস্থ্য। প্রতিটি মানুষের সুস্থতায় প্রয়োজন পরিমাণমতো আহার নিদ্রা বিশ্রাম। কিন্তু আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর ও পুরুষের জন্য সুস্বাস্থ্যের মুখ্য তিনটি উপাদানের ভেতর-
এমনি একটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যের দুটি মুখ্য উপাদান ব্যতীত নারী কি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারে। আর সুস্বাস্থ্য ছাড়া কেমন করে নিরাপদ মাতৃত্ব আশা করা যায়? নিরাপদ মাতৃত্ব প্রশ্নে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নারী কর্তৃক প্রয়োগ হলেই মানবজাতির জন্য কল্যাণকর। কারণ প্রাকৃতিকভাবে শিশু জন্মগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব অধিক। তাই নারীর দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগটুকু তারই থাকা উচিত বেশি। কিন্তু আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিপরীত বিধান নির্ধারণ করে রেখেছে ফলে নিরাপদ মাতৃত্বের প্রশ্নকে কলবরে সমাধান করার প্রসঙ্গ ওঠে।
সরেজমিনে দেশের বিভিন্ন দাইয়ের ইতিবৃত্ত : রাতে সবাই ঘুমিয়ে। ঘরের চালে পাতাঝরার শব্দ হচ্ছে। এদিকে তীব্র ব্যথায় আড়ষ্ট আসছে শাহানার কণ্ঠ। দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে হাত পায়ের কাঁপন, সমস্ত শক্তি বিছানা থেকে ওঠে বসার চেষ্টা করছে। পারছে না। শেষরাতে বউ শাশুড়ির আতঙ্ক জড়ানো কথাবার্তায় ঘুম ভেঙে যায় শাহানার স্বামী আজিজের। সন্তান প্রসবের জন্য তার মা অভিজ্ঞ দাইকে নিয়ে এল। তারপর সারাদিন কী এক যন্ত্রণা, উত্তেজনা। বিকেল থেকে শুরু হলো খিঁচুনি। এ-অবস্থা দেখে দাইমা বলছেন- “তোমার বউয়ের আলগা বাতাস লাগছে। বড় হুজুর থ্যাইকা পানি পড়া নিয়া আহো।” আর খবর পেয়ে শাহানার বাবা তার গায়ের কিসমত কবিরাজকে নিয়ে এলেন। কবিরাজ রোগীর অবস্থা দেখে বললেন- “জ্বাল পড়া দিতে হবে। ঘরের মরিচ আনেন।” এরপর শুরু হলো দড়ির মাথায় আগুন জ্বেলে মরিচ পুড়ে শানুর নাকের ডগায় ধরা। ঘন্টাখানেক পরই নাকে মুখে বমি শুরু হলো। আবারও বমি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো- এভাবেই আজিজ আমাকে বলল কবিরাজের হাতুড়ে চিকিৎসার কথা।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রোকসানা হোসেন জেবা বলেন, “প্রথম সন্তান প্রসবের পর থেকেই শানুর অনবরত প্রসাব ঝরা এবং মাঝে মাঝে মলদ্বারের পরিবর্তে যোনিপথে মল এসে যেত। বাঁধাপ্রাপ্ত প্রসবের কারণে “ভ্যাসাইকো ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা এবং রেকটো ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলায় ভুগছিল। এ জটিল অবস্থা অপারেশন ছাড়া ভাল হবার কোনও উপায় নেই। গ্রামের মহিলারা এভাবে তিলে তিলে ভোগে চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সে জীবনের যখন শুরু তখনই ইতি টানছে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রসূতি মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে অশিক্ষিত দাই। সেকেল ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী ও পুরনো আমলের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি সজ্জিত দাই প্রয়োজনীয় মুহূর্তে ঠিক কি করা উচিত তা বিবেচনায় আনতে সক্ষম হন না। ফলে দেখা যায়, উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পেলে যে, প্রসূতি মা ও সন্তান দু’জনই সুস্থ থাকতো, তাদের কেউ একজন বা দু’জনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।” গ্রামাঞ্চলে আজও প্রসূতির ব্যথা উঠলে গর্ভবতীকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় পরিত্যক্ত ঘরটিতে। পরনের পেটিকোটের ফিতা টাইট করে পেটের ওপর বাঁধা হয়। তার উপর যতটুকু সম্ভব শক্ত করে একটি পুরনো গামছা বাঁধন দেয়া হয়। দাইদের ধারণা এভাবে শক্ত করে বাঁধলে বাচ্চা উপরে ওঠে না। অনেক ক্ষেত্রে দাইমা মহিলার পেট ধরে ঝাঁকুনি দেয় এবং কোমরের পেছন দিকে হাঁটু দিয়ে গুঁতোতে থাকে। এমনই এক রোী তার কষ্টের কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে- “সেই সকালে আমার প্রসব ব্যথা হয়েছে এবং বিকেল পর্যন্ত দাইমা অন্তত চল্লিশবার আমার ভেতরে হাত দিয়ে দেখেছে। প্রতিবারই যন্ত্রণায় আমি কুঁকড়ে গেছি। কিন্তু কেউ আমার আর্তচি’কারে গুরুত্ব দেয়নি।” বেশ ক’জন রোগীর কেস স্টাডির উদ্ধৃতি দিয়ে ডা. জেবা বলেন, এমন অভিজ্ঞতা গ্রামের বেশিরভাগ নারীরই। অথচ দাইমার হাতের নখের ময়লা মায়ের এবং সন্তানের শরীরে জীবাণু ছড়ায়। উপরন্ত তাদের হাতে পানের লাল রস ও চুনের দাগ তো লেগেই থাকে। দাইমারা তাদের টোটকা চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োগ করে প্রসব ব্যবস্থা সহজ করতে চান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভফুল প্যাসেন্টা পড়ার পর নোংরা কাপড় ঢুকিয়ে রাখা হয়, যাতে রক্ত বাইরে না আসে। ফলে সেখানে ইনফেকশন ছড়ায়। ইনফেকশন থেকে সেপটিক হয়ে মাতৃ মৃত্যুর একটি অন্যতম কারণ।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেবী। গর্ভবতী হওয়ার পর শাশুড়ির আদেশ, সৈয়দ বাড়ির বংশধর আসছে এই বাড়িতেই তার জন্ম হতে হবে। ঢাকায় নিয়মিত ডাক্তার দেখাতো বেবী। ডাক্তারের নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী হাতে ১৫ দিনের সময় রেখে বাসে করে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল বেবী। বাস, রিকশা নৌকা এবং হেঁটে সে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছল। দু’দিন পর তাঁর স্বামী আতিকের কাছে ফোন আসে “বেবী আর পৃথিবীতে নেই।” সন্তান প্রসব করার পূর্বে সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। প্রসবকালে কেমন ধরনের জটিলতায় সে ভুগছিল অশিক্ষিত দাই তার কিছুই বুঝতে পারেনি। সোনারগাঁও ইউনিয়নের ভট্রপুর গ্রামের অভিজ্ঞ দাইমা সুফিয়া খাতুন (৫৫) খুব গর্ব করেই বললেন- “আমার হাতে ৮ শতাধিক নবজাতকের খালাস হয়েছে। মাশাল্লাহ কোনও অঘটন ঘটেনি। গর্ভফুল বের করতে প্রসূতির মুখে আমার চুলের গোছা ঢুকিয়ে দেই। এরপর মুখদিয়ে বমির সাথে সাথে গর্ভফুল বের হয়ে আসে। হাত দিয়েই গর্ভফুল বের করা হয়। আর নবজাতকের নাভিমূল কাটার জন্য ব্লেড ও সুতাই যথেষ্ট।”
সন্তান প্রসবকালে মারা যাওয়া প্রথম নারী : প্রাচীনকালে নারী মৃত্যুর হার এখনকার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। যার প্রধান কারণ ছিল সন্তান প্রসবজনিত। এর মধ্যে গর্ভকালীন জটিলতা, শিশু মৃত্যু ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সমস্যা হচ্ছে অন্যতম। তবে প্যালিডেমোগ্রাফিক ও অ্যাথনোগ্রাফিক বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এর পিছনে রয়েছে সে সময়কার মানুষের স্বাস্থ্য সন্বন্ধে অসচেতনতা ও খারাপ স্বাস্থ্য। এছাড়া বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাতেও সন্তান প্রসবকালীন মৃত্যুর তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। মহিলাদের কঙ্কালের বিভিন্ন অস্থি বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ইউএবি ও স্পেনের মার্সিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় এক প্রাচীণ গর্ভবতী মহিলার কবর খনন করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ব্রোঞ্জ যুগের এ কবরের সম্ভাব্য সময় ছিল ১৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্ব সময়ের মধ্যে। এ কবরে অ্যাগারিক সংস্কৃতির শেষকৃত্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। মৃত মহিলার সম্ভাব্য বয়স ছিল ২৫ থেকে ২৬ বছর। আর গর্ভের বসয় ছিল ৩৭ থেকে ৩৯ সপ্তাহ। অনেক গবেষণার পর বর্তমান যুগের সমস্যার সাথে সে সময়ে সমস্যারও কিছু মিল পাওয়া যায়।
মহিলাটির গর্ভে সন্তানের অবস্থাজনিত জটিলতা ছিল। তাই সম্ভবত সন্তান প্রসবের সময় বিভিন্ন গর্ভকালীন জটিলতা খিঁচুনি বা হৃদরোগ তার মৃত্যু হয়েছিল। গবেষণা দলিটিতে ছিলেন ইউএবির অ্যাসামসিও মালগোসা, অ্যালিসিয়া অ্যালেসান ও সান্টিয়াগো স্যাফোন্ট। আরও ছিলেন মার্সিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদরোনা বালবে ও মারিয়া ম্যানুয়েল আয়ালা। তারা দৃঢ়ভাবে বলেছেন, এটিই হচ্ছে সন্তান প্রসবকালে মারা যাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন মহিলার কবর।
শতকরা ৯০ জনের ও অধিক প্রসবকালীন সময়ে আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা হতে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে গর্ভবতী নারীদের যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে-
-  উপজেলা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা কমিটিকে সক্রিয় করা।
-  সকল গর্ভবতী মায়ের নিবন্ধন এবং প্রসবপূর্ব সেবা।
-  প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা।
-  সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় জাতীয় রেফারেন্স ব্যবস্থা সক্রিয় করা।
-  শুধু সেবাকেন্দ্র স্থাপন নয়, একই সঙ্গে সেবা গ্রহণের ব্যাপারেও সচেতনতা সৃষ্টি করা।
-  গর্ভকালীন স্বাভাবিক কিছু পরিচর্যা ও মায়ের জীবন শংকামুক্ত রাখতে পারে এ ব্যাপারে আরও সচেতন করা।
-  গর্ভকালীন সেবা আরও সহজ ও সুলভে পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
-  মাতৃমৃত্যু রোধে বাল্যবিবাহ রোধে যে আইন রয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ।
-আখতার হামিদ খান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ