ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রেরণাময়ী জনপদ

সুলতানা সিমু : চারদিকে এক অন্যরকম প্রাণহীন নির্জনতা। বিস্তৃত আবাদি  ভূমি তবুও যেন মরুভূমি। প্রাণীদের বিচরণের এক অনন্য ভূমি তবুও প্রাণহীন। গাছগাছালি থেকে শুরু করে সব প্রকৃতির সব উপাদানই আছে তবুও যেন কিছুই নেই। প্রকৃতি যেন এখানে এসে কিছু সময়ের জন্য নির্জীব। অবাক প্রতিবেশীর মতো সময়টাও যেন হতবাক হয়ে এখানে থমকে দাঁড়িয়েছে। কিছু একটা বুঝাতে চাচ্ছে নিরব দর্শকটাকে। কিছু একটা আবদার করছে নতুন অতিথির কাছে। আর তালহাও যেন না বলা কথাগুলি বুঝে নিচ্ছে। হাজার আবদার তাকে গ্রাস করছে। এই মুহূর্তে সে যে জায়গাটাতে বসে আছে তা হচ্ছে তার জন্ম, শৈশব আর কৈশোরের কিছু দস্যিপনার উর্বর ভূমি। হঠাৎ কিছু একটা পায়ে বাধে তাকিয়ে দেখে একটি পুতুল। ওমা! এইযে আপ্পির প্রিয় পুতুলটা, ছলছল নেত্রে তাকিয়ে থাকে সে। আয়শা তালহার বড় বোন। গাজার ঠিক এই জায়গাটাতেই ছিল তাদের স্বপ্নপুরী। আম্মির কড়া শাসন আর আপ্পির মিষ্টি আদরেই বেড়ে উঠছিল সে। আম্মি অনেক ভালবাসতেন তার আয়শা তালহাকে। সারাক্ষণ চোখের কাজলের মতো চোখে চোখে রাখতেন। কি আর করবেন তিনি তার পৃথিবী বলতেই তো এই দুজন। আরেকজন আপন মানুষতো খুব আগেই চলে গেছেন প্রভুর সান্নিধ্যে। মোটামুটি ভালই কাটছিল দিনগুলি। বস্তির পরিচিত মানুষগুলি থেকে প্রায়ই শুনতে হতো তাকে, “তোমার চোখগুলি তোমার বাবার মতো অনেক কথা বলে, তোমার কন্ঠটা না তোমার বাবার মতন অনেক আবেগী, তোমার হাসি না তোমার বাবার মতো অনেক উদ্দমী”। তালহা শুনতো আর হাসতো। মাঝে মাঝে আম্মিকে প্রশ্ন করতো আম্মি বাবা কি? বাবার মানে কি?? তালহার মা অবাক হতেন না একটুও। আসলেও ওরতো মানে বুঝার কথা না। কি জবাব দিবেন তিনি? তার বাবাতো তার জন্মের আগেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন। কিছু না বলে কথা ঘুরানোর জন্য বলতেন, “দেখতো তালহা তোমার আপ্পি কই?? কি করে সে??” সেদিন না বুঝলেও আজ বুঝে তালহা সেই প্রশ্নগুলির মাঝে লুকিয়ে ছিল কত আবেগ, কত ভালোবাসা আর নিঃসঙ্গতা। আম্মির সেই আবেগই হয়তো তালহাকে আজ প্রেরণা জোগায়।
হঠাৎ আপুর পুুতুলটা জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে তালহা। আপ্পির অনেক প্রিয় ছিলো পুতুলটা। আর ওইটাই যেনো ছিলো তালহার মূল সমস্যা। ছোট্ট তালহাটি ভাবতো আপ্পি সবসময় আমার থেকে পুতুলটাকে বেশি ভালোবাসে তাইতো সে লুকিয়ে ফেলতো পুতুলটা। আপ্পি কান্না করে চোখ ফোলাতো আর যখন রাতে পুতুলটাকে বাদ দিয়ে তাকে জড়িয়ে ঘুমাতো তখন তালহার আনন্দ বলে বুঝানোর মতো না। ভাবটা এমন ছিলো সাত সমুদ্র তেরো নদীর মালিক একা সে। “বীর কখনো কাঁদে না তারা কষ্ট বা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবে পথ চলতে শিখে” আপ্পির এই কথাটি মনে পড়তেই উঠে দাঁড়ায় তালহা। ছোটবেলা যখন সামান্য জিনিস নিয়ে কাঁদতো আপ্পি তখন কথাটি বলতো। চোখের পানি শার্টের কিনারায় মুছে উঠে দাঁড়ায় তালহা। আজ অনেকদিন পর কেঁদেছে সে। শেষ কেঁদেছিল আজ থেকে ৮ বছর আগে। হঠাৎ মনে পড়লো সেই দিনের কথা।
প্রতিদিনের সূর্যের মতো ছিলো না ওইদিনের সূর্যটা। অসামান্য রশ্মির সাথে সাথে সূর্যটা মনে হয় যেনো অন্যরকম আলো বিচ্ছুরণ করছিলো। ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো স্কুল যাবে বলে রেডি হচ্ছিলো তালহা আয়শা। হঠাৎ আয়শাকে আম্মি বললেন,”মামুনি! আজকে তুমি তালহাকে স্কুলে দিয়ে চলে আসতে পারবে??? আমি আর তুমি একটু গাজার শহরে যাবো”। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় আয়শা কিন্তু বেকে বসে তালহা। সে আজ কিছুতেই স্কুলে যাবে না। অনেক বুঝিয়ে তাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফেরে আয়শা।
মনের মাধুরী মিশিয়ে আর্ট করছিল তালহা। হঠাৎ বিকট শব্দ। পরপর চারটা। ছুটির ঘন্টাও পড়ে যায়। ক্লাস থেকে বের হয়ে দেখে আজ গেটে তালহার জন্য কেউ দাঁড়িয়ে নাই। কিছু সময় আম্মি আপ্পির জন্য ওয়েট করে হাটতে থাকে তালহা। বাসা থেকে স্কুলে একা আসা যাওয়া করতে পারার পরেও আম্মি একা ছাড়তেন না তালহাকে। আজ কি হলো!!! মনে মনে ঠিক করে বাসায় গিয়ে আজকে আম্মিকে ঠিকই বকুনি দিবে। না আসার কারণ জানতে চেয়ে কঠিন কৈফিয়ত চাবে।
কেন যেনো চেনা পরিবেশটাকেই অজানা মনে হচ্ছে তালহার। বারুদের নাক ঝাঁঝরা করা গন্ধটাও পাচ্ছে।থমকে দাঁড়িয়ে ভাবে ভুল পথে আসিনি তো??? মনে করার চেষ্টা করে সে। নাহ ঠিকই আছে। কিন্তু বাম পাশের মসজিদটা কই??? প্রতিধ্বনি হয়ে প্রশ্নটাই ফিরে আসে। ভাবতে থাকে তালহা। ভাবনাটা এতই মারাত্মক ছিলো যে তালহার বয়সটাই যেনো ১০ বছর বাড়িয়ে দিলো। ভাবতে ভাবতে বাড়ির আঙিনায় এসে প্রতিদিনের মতো  আম্মি আম্মি বলে ডাকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় ছোট্ট তালহা।
কোথায় তাদের স্বপ্নপুরী?? কোথায় খেলার মাঠ??? আর কোথায়ই বা সেই ফুলের বাগানটি??? সবতো ধ্বংসস্তূপ। কি বা হলো এই ২ ঘন্টায়? যা তার পরিচিত পরিবেশটাকেই উলট পালট করে দিলো? আচ্ছা আম্মি আর আপ্পি কই??? তারাও কি পরিবেশটার মত অপরিচিত হয়ে গেলো নাকি?? যদি তাই হয় তাহলে কি হবে আমার??? রামিমের আব্বুর ডাকে হুশ ফিরে পায় তালহা। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই তিনি বললেন, “দাঁড়িয়ে আছো কেন?? চলো আমাদের সাথে।” কিছু না বলেই অজানায় পা বাড়ায় তালহা। সেই থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে।
সেদিন রক্তের বন্যা দেখে মনে হয়েছিলো তাদের অপ্রিয় রং হয়তো লাল তাই লাল রং বহনকারী মানুষকে মেরে স্বস্তি পায় তারা। তাই অদম্য একটা শখ ছিলো তাদের রক্তের রং কি তা জানা সাথে যোগ হলো শহীদি প্রেরণা। আর এই ইচ্ছাটাই লালন করেছে গত ৮ বছর। হঠাৎ বার্তা আসার সংকেতে চমকে উঠে তালহা। ও... হ্যাঁ এই সংকেতের জন্যই তো অপেক্ষা করছিলো তালহা।
পিছনে তার বেদনার অতীত আর সামনে তালহার প্রত্যাশার ভবিষ্যৎ। রক্তের মধ্যে লালন করা স্বপ্ন যেনো সত্যি হতে যাচ্ছে। এক সেকেন্ডও দেরী করলো না সে হাটতে থাকে। এইতো আধ কিলো দূরেই একটা কামান দেখা যাচ্ছে কিছু করতে হবেনা শুধু কামানের কাছাকাছি এসে গ্রেনেডটা ছুড়ে মারতে হবে।
মুখে ঘৃণার হাসি এনে গ্রেনেডটা মারার সাথে সাথে দুটি বিস্ফারণের শব্দ হয়। তালহা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো তার ঠিক নিচে পুতা ছিল কয়েকটি মাইন। তালহার অনড় পায়ের ছোয়া পেয়ে বিস্ফোরিত হয় মাইনটি। রক্তাক্ত অবস্থায় কামানের কিছু দূরে গিয়ে পড়ে তালহার গৌরবোজ্জ্বল দেহটি। চোখ দুটি যেনো কেউ জান্নাতি আঠা দিয়ে এটে দিচ্ছে। জোর করে একবার তাকানোর চেষ্টা করে তালহা দেখে অদূরে কামানের পাশে কিছু ইসরাইলী সেনার নিথর দেহ। লাল রক্তের ধারার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয় জীবনের শেষ  কিনারায় এসে দাঁড়ায় তালহা-একি!!! রক্তের রংতো দেখি এদেরও লাল!! সবারই তো লাল। তাহলে তারপরও নিপীড়ক আর্ত-নিপীড়িতের কাহিনী কেন জন্ম নেয়!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ